অনিবন্ধিত হেবা অকার্যকর ও মামলা চলাকালে বেআইনি দখলের প্রতিকারে পূর্বাবস্থা পুনর্বহাল (Status Quo Ante): হাইকোর্টের রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক যুগান্তকারী দেওয়ানী রায়ে সুস্পষ্ট নীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন যে, রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮-এর ১৭(১)(এএ) ধারা (২০০৫ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর সংশোধনী) অনুসারে মুসলিম আইনের অধীন স্থাবর সম্পত্তির হেবা বা দানপত্র (Heba/Gift under Muslim Law) অবশ্যই রেজিস্ট্রিকৃত হতে হবে; কোনো অনিবন্ধিত মৌখিক বা কাঁচা হেবানামার জোরে রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের ওপর কোনো প্রিমা ফেসি (Prima Facie) স্বত্ব দাবি করা যায় না। একই সাথে, দেওয়ানী মামলা বিচারাধীন থাকাবস্থায় (Pendente Lite) যদি কোনো পক্ষ প্রশাসনিক ক্ষমতা বা পেশিশক্তি খাটিয়ে অপর পক্ষকে জমিতে বলপূর্বক বেদখল করে, তবে দেওয়ানী আদালত দেওয়ানী কার্যবিধির ৩৯ আদেশের ১ ও ২ বিধি এবং অন্তর্নিহিত ক্ষমতা ১৫১ ধারা (Section 151 CPC) প্রয়োগ করে অবিলম্বে পূর্বাবস্থা পুনর্বহাল (Status Quo Ante) আদেশ দিয়ে বেদখল হওয়া পক্ষকে দখল ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করতে পারে। এই আদেশ বাস্তবায়নে হাইকোর্ট দেওয়ানী কার্যবিধির ৯৪এ ধারা প্রয়োগ করে ডিসি, এসপি ও পুলিশ প্রশাসনকে ২০ কার্যদিবসের মধ্যে দখল নিশ্চিত করার কঠোর নির্দেশ দেন।
মামলাটি সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক থানাধীন অত্যন্ত মূল্যবান ১.১২৫ শতক জমি নিয়ে উদ্ভূত। ১৯৮৮ সালের ১০ জানুয়ারি তারিখে ২৫৪ নম্বর রেজিস্ট্রিকৃত সাফ-কবলা দলিলমূলে আব্দুল জলিল এবং হিরন খান যৌথভাবে ২.২৫ শতক জমি ক্রয় করেন। উক্ত দলিলের ভিত্তিতে আব্দুল জলিল পূর্ব পাশের ১.১২৫ শতক এবং হিরন খান পশ্চিম পাশের ১.১২৫ শতক জমিতে বৈধ মালিক হিসেবে পৃথক ভোগদখলে অধিষ্ঠিত হন।
পরবর্তীতে বিরোধের সূত্রপাত ও আইনি লড়াই নিম্নরূপ ধাপে বিস্তার লাভ করে:
- বাদীর রেজিস্ট্রি কবলা খরিদ ও ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারা: আব্দুল জলিল তার নিজ হিস্যার ১.১২৫ শতক জমি ২০১২ সালের ১৫ জুলাই তারিখে ২৮৫১ নম্বর রেজিস্ট্রিকৃত কবলা দলিলমূলে বর্তমান বাদী মোছা: গুল নাহার বেগমের নিকট বিক্রি করেন এবং দখল বুঝিয়ে দেন। বিবাদীরা বাধা দেওয়ায় ২০১২ সালে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৪৫ ধারার মামলায় বাদীর অনুকূলে দখল অর্পণের আদেশ হয়।
- অনিবন্ধিত হেবার মিথ্যা দাবি ও বিরোধ: মূল মালিক আব্দুল জলিল মৃত্যুবরণ করার পর তার পুত্র আব্দুল ডায়াস (২নং বিবাদী, যিনি লন্ডনে থাকেন) এবং হিরন খানের পুত্র মো: রওশন খান সাগর (১নং বিবাদী) দাবি করেন যে, আব্দুল জলিল নাকি ২০০৬ সালে তার পুত্র ডায়াসকে একটি অলিখিত/অনিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে উক্ত জমি হেবা করে দিয়েছিলেন।
- আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থা ও মধ্যাহ্নে বলপূর্বক দখল: ২০২৫ সালে সেশন জজ আদালত কর্তৃক ফৌজদারি রিভিশন নং ৩২/২০২৫-এ বাদীর অনুকূলে দখল ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ হলে বিবাদীরা হাইকোর্টে ফৌজদারি বিবিধ মামলা দায়ের করে। হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে বাদী আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে লিভ টু আপিল দায়ের করলে ২০২৫ সালের ১৪ মে চেম্বার আদালত নালিশি জমিতে উভয় পক্ষকে স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখার নির্দেশ দেন। কিন্তু বিবাদী রওশন খান সাগর ও স্থানীয় সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর যোগসাজশে আপিল বিভাগের আদেশ ঘোষণার পূর্বেই ১৪ মে দুপুর ১২:৩০ মিনিটে বেআইনিভাবে জমিতে প্রবেশ করে বাদীর নির্মাণকাজ ভেঙে দখল নিয়ে নেয়।
- সহকারী জজ আদালতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা ও পূর্বাবস্থা পুনর্বহাল: বাদী ছাতক সহকারী জজ আদালতে স্বত্ব মোকদ্দমা নং ৪৭/২০২৫ দায়ের করে ৩৯ আদেশের ১ ও ২ বিধি এবং ১৫১ ধারায় দরখাস্ত দাখিল করেন। ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি বিজ্ঞ বিচারিক আদালত বিবাদীদের বিরুদ্ধে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেন এবং এসিল্যান্ড ও ছাতক থানার ওসিকে নির্দেশ দেন বলপূর্বক বেদখলকৃত জমি থেকে বিবাদীদের সরিয়ে বাদীকে দখল বুঝিয়ে দিতে (Status Quo Ante)। জেলা জজ আদালত উক্ত আদেশ বহাল রাখলে বিবাদী হাইকোর্টে রিভিশন করেন।
🏛️ বাদী গুল নাহার বেগমের বক্তব্য
- বৈধ রেজিস্ট্রি কবলা খরিদ: বাদী ২০১২ সালের রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে জমির নিরঙ্কুশ মালিক এবং দীর্ঘকাল ধরে ভোগদখলে ছিলেন।
- অনিবন্ধিত হেবা আইনত বাতিল: ২০০৫ সালের সংশোধিত রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭(১)(এএ) ধারা মতে হেবা রেজিস্ট্রি না হলে তার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।
- আদালতের নির্দেশে দখল পুনরুদ্ধার: মামলা চলাকালে এসিল্যান্ডকে ব্যবহার করে অবৈধভাবে বেদখল করায় ১৫১ ধারায় পূর্বাবস্থা ফিরিয়ে দেওয়া ন্যায়বিচারের দাবি।
🛡️ বিবাদী রওশন খানের প্রতিরক্ষা যুক্তি
- ২০০৬ সালের পারিবারিক হেবা: বাদী কেনার পূর্বেই পিতা আব্দুল জলিল পুত্র ডায়াসকে হেবা করে দখল দিয়েছিলেন।
- আদেশ লংঘন হয়নি: আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থা আদেশ হয়েছিল দুপুর ২:৩০-এ, অথচ বিবাদীরা এসিল্যান্ডের উপস্থিতিতে দুপুর ১২:৩০-এ জমিতে উঠেছেন, ফলে কোনো আদালত অবমাননা হয়নি।
- নিষেধাজ্ঞা মামলায় দখল ফিরিয়ে দেওয়া যায় না: বিবাদীর দাবি, অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়ে পুলিশ দিয়ে দখল পরিবর্তন করার কোনো বিধান দেওয়ানী আইনে নেই।
- সহকারী জজ আদালত (ছাতক, সুনামগঞ্জ – ২০২৬):
২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি বিজ্ঞ বিচারিক আদালত ৮ নম্বর আদেশে বাদীর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা ও ১৫১ ধারার দরখাস্ত মঞ্জুর করেন। আদালত বলেন, অনিবন্ধিত হেবার জোরে বিবাদীদের কোনো প্রাইমা ফেসি স্বত্ব নেই। এসিল্যান্ডের এখতিয়ারবহির্ভূত আদেশে অবৈধভাবে দখল নেওয়ায় ছাতক থানার ওসি ও এসিল্যান্ডকে অবিলম্বে বাদীকে দখল ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। - আপিল আদালত (১ম অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত, সুনামগঞ্জ – ২০২৬):
বিবাদীর দায়েরকৃত বিবিধ আপিল নং ০১/২০২৬-এ ২০২৬ সালের ৩০ জুন বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত আপিলটি খারিজ করে বিচারিক আদালতের আদেশকে সম্পূর্ণ আইনসঙ্গত বলে ঘোষণা করেন।
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের বিজ্ঞ বিচারপতি মো: আলী রেজা দীর্ঘ চার কার্যদিবস ধরে উভয় পক্ষের সিনিয়র আইনজীবীদের শুনানি গ্রহণ করেন এবং দেশের সম্পত্তি আইন ও ইকুইটি আইনের নীতিসমূহ বিশ্লেষণ করেন:
হাইকোর্ট রায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ২০০৪ সালের রেজিস্ট্রেশন সংশোধন আইন যা ২০০৫ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে, তার মাধ্যমে ধারা ১৭-এর উপ-ধারা (১)-এ দফা (এএ) যুক্ত করা হয়েছে:
“Section 17(1)(aa): An instrument of gift of immovable property under Muslim Law must be registered.”
যেহেতু বিবাদীদের কথিত হেবাটি ২০০৬ সালের (অর্থাৎ আইন সংশোধনের পরবর্তী সময়ের) এবং তা সম্পূর্ণ অনিবন্ধিত, সেহেতু আইন অনুযায়ী এই দলিলের কোনো কার্যকারিতা নেই এবং এর ভিত্তিতে বিবাদীদের কোনো প্রাইমা ফেসি কেইস দাঁড়ায় না।
হাইকোর্ট সুপ্রতিষ্ঠিত ইকুইটি নীতি উল্লেখ করে বলেন: “Equity deems that done which ought to be done” (ন্যায়পরতা সেই কাজকেই ধরে নেয় যা করা উচিত ছিল)।
- কোনো পক্ষ যদি আদালতকে ফাঁকি দিয়ে মামলা চলাকালে (Pendente Lite) গায়ের জোরে অন্যের জমি দখল করে, তবে আইন কখনোই সেই দখলদারকে তার অবৈধ কাজের সুফল ভোগ করতে দেবে না।
- দেওয়ানী আদালত ১৫১ ধারার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা প্রয়োগ করে বেদখল হওয়ার পূর্বের অবস্থা ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ দিতে সম্পূর্ণ এখতিয়ারবান, যেন মামলার বিষয়বস্তু অক্ষুণ্ণ থাকে।
হাইকোর্ট বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, যখন দেওয়ানী মোকদ্দমা ও আপিল বিভাগে লিভ পিটিশন বিচারাধীন, তখন সহকারী কমিশনার (ভূমি) কীভাবে একজন নাগরিককে উচ্ছেদ করার আদেশ দেন? এসিল্যান্ডের দেওয়ানী স্বত্ব বা দখলের বিরোধ নিষ্পত্তির কোনো এখতিয়ার নেই।
- হাইকোর্ট দেওয়ানী কার্যবিধির ৯৪এ ধারা (Section 94A CPC) প্রয়োগ করে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং স্থানীয় থানাকে নির্দেশ দেন বাদীকে শান্তিপূর্ণভাবে দখল বুঝিয়ে দিতে এবং ২০ দিনের মধ্যে কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট পাঠাতে।
🏆 মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত রায় ও নির্দেশনাবলী
সার্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ, আইন ও নজির পর্যালোচনা শেষে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ নিম্নোক্ত চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন:
- ১. রুল খারিজ (Rule Discharged): বিবাদী রওশন খানের আনীত দেওয়ানী রিভিশন নং ২৩১৩/২০২৬-এর রুলটি কোনো খরচ ছাড়াই সরাসরি খারিজ করা হলো।
- ২. স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার: ইতিপূর্বে হাইকোর্ট কর্তৃক জারিকৃত স্থগিতাদেশের আদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার ও বাতিল করা হলো।
- ৩. পূর্বাবস্থা পুনর্বহাল ও নিষেধাজ্ঞা বহাল: বিচারিক আদালতের ৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের ৮ নম্বর আদেশ এবং জেলা জজ আদালতের আপিল খারিজের রায় চূড়ান্তভাবে বহাল রাখা হলো।
- ৪. ২০ দিনের মধ্যে কমপ্লায়েন্স রিপোর্টের নির্দেশ: জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার, সুনামগঞ্জকে অবিলম্বে বাদীকে দখল বুঝিয়ে দিয়ে অত্র হাইকোর্টে আগামী ২০ (বিশ) কার্যদিবসের মধ্যে বাস্তবায়নের প্রতিবেদন (Compliance Report) দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হলো।
- স্ট্যাটিউটরি হেবা আইনের বাস্তবায়ন: ২০০৫ সালের পর থেকে কোনো অলিখিত বা অনিবন্ধিত হেবানামা আইনত কার্যকর নয়।
- বেআইনি দখলের ফল ভোগের সুযোগ নেই: কোনো পক্ষ পেশিশক্তি খাটিয়ে আদালতের বিচার চলাকালে দখল নিলে আদালত ১৫১ ধারায় তা ফিরিয়ে দিয়ে পূর্বাবস্থা ফেরাতে বাধ্য।
- নির্বাহী কর্মকর্তাদের ক্ষমতার সীমা: এসিল্যান্ড বা পুলিশ কোনোভাবেই বিচারাধীন দেওয়ানী জমির স্বত্ব বা দখলের বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে উচ্ছেদ কার্যক্রম চালাতে পারেন না।
সন্তান বা আত্মীয়কে কোনো জমি হেবা করতে চাইলে অবশ্যই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে রেজিস্ট্রিকৃত হেবা দলিল সম্পাদন করতে হবে। সাদা কাগজে লিখিত হেবার কোনো মূল্য নেই।
মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় বিবাদী যদি দখল দখল করে নেয়, তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়ানী আদালতে ১৫১ ধারায় পূর্বাবস্থা পুনর্বহালের আবেদন করতে হবে।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) কোনো দেওয়ানী উচ্ছেদের আদেশ দিতে পারেন না। এমন এখতিয়ারবহির্ভূত পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দেওয়ানী আদালতের আশ্রয় নিতে হবে।
আদালতের নিষেধাজ্ঞার আদেশ বাস্তবায়নে বিবাদী বাধা দিলে ৯৪এ ধারায় পুলিশ প্রশাসনকে সরাসরি সম্পৃক্ত করার আর্তি জানান।
আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থা আদেশ লঙ্ঘনের দাবি করে কোনো পক্ষ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করলে উচ্চ আদালত তা অত্যন্ত কঠোর হস্তে দমন করেন।

