অর্থ ঋণ আদালত আইন ২০০৩ এর ১২ ধারার বিধান লঙ্ঘন করে মূল ঋণগ্রহীতার পূর্বে জামিনদারের সম্পত্তি নিলামের নোটিশ অবৈধ ও স্থগিত: হাইকোর্টের রায়
⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ১২ ধারা (Section 12 of Artha Rin Adalat Ain) এর বিধান অনুযায়ী, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংক ঋণ আদায়ের উদ্দেশ্যে মামলা দায়েরের পূর্বে মূল ঋণগ্রহীতার (Principal Borrower) নিকট থেকে গৃহীত বন্ধকী স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রয় করে ঋণ সমন্বয়ের সর্বাত্মক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য। মূল ঋণগ্রহীতার কাছে পর্যাপ্ত মূল্যের বন্ধকী স্থাবর সম্পত্তি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও তা বিক্রয়ের কোনো বাস্তবিক চেষ্টা না করে কিংবা ১২ ধারার নিলাম প্রক্রিয়া আইনানুগভাবে সম্পন্ন না করে সরাসরি ৩য় পক্ষ ব্যক্তিগত জামিনদারের (Personal Guarantor or Third-Party Mortgagor) ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিলামে তোলার জন্য ১২(৩) ধারায় নিলাম বিজ্ঞপ্তি জারি করা সম্পূর্ণ বেআইনি, এখতিয়ারবহির্ভূত এবং বাতিলযোগ্য। মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশন ব্যাংক কর্তৃক জামিনদারের সম্পত্তি নিলামের নোটিশ অবৈধ ঘোষণা করে সকল কার্যক্রম স্থগিতের আদেশ প্রদান করেন।
মামলার বিবরণে জানা যায়, অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড, প্রিন্সিপাল শাখা থেকে একটি বাণিজ্যিক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স গ্লোবাল ট্রেড সিন্ডিকেট মোট ১৮ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা গ্রহণ করে। ঋণের জামানত হিসেবে মূল ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানটির নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর মৌজায় অবস্থিত প্রায় ৩০ কোটি টাকা মূল্যের ৪২ শতক শিল্প প্লট ব্যাংকের অনুকূলে রেজিস্ট্রি বন্ধক (Registered Mortgage) প্রদান করে। উক্ত ঋণে ৩য় পক্ষ কর্পোরেট জামিনদার হিসেবে মেসার্স অ্যাপেক্স ট্যানারি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যক্তিগত গ্যারান্টি স্বাক্ষর করেন।
পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মন্দার কারণে মূল ঋণগ্রহীতা যথাসময়ে কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে ব্যাংক ঋণটিকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করে। কিন্তু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মূল ঋণগ্রহীতার অত্যন্ত মূল্যবান ৪২ শতক শিল্প প্লট নিলামে তোলার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। উপরন্তু, মূল ঋণগ্রহীতাকে কোনো বিশেষ নোটিশ না দিয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অতর্কিতভাবে জামিনদারের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ঢাকার গুলশানের একটি বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট নিলামে বিক্রির জন্য অর্থ ঋণ আইনের ১২ ধারায় জাতীয় দৈনিকে নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।
জামিনদার প্রতিষ্ঠান ব্যাংকে লিখিত আপত্তি দাখিল করে জানায় যে মূল ঋণগ্রহীতার বন্ধকী সম্পত্তির বাজারমূল্য ব্যাংকের মোট দাবির চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ এবং আইন অনুযায়ী প্রথমে সেই সম্পত্তি নিলাম করা আবশ্যক। কিন্তু ব্যাংক উক্ত আপত্তি আমলে না নিয়ে নিলামের কার্যক্রম চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করে। ফলে জামিনদার পক্ষ মহামান্য হাইকোর্টে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে এই রিট পিটিশন দায়ের করেন।
👤 রিটকারী জামিনদারের আইনি যুক্তি
- অর্থ ঋণ আইনের ১২(১) ধারা অনুযায়ী মূল ঋণগ্রহীতার বন্ধকী সম্পত্তি আগে নিলামে বিক্রয় করা ব্যাংকের জন্য বাধ্যতামূলক বিধান।
- মূল ঋণের বিপরীতে ৩০ কোটি টাকার প্রাইম সম্পত্তি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও সেখানে হাত না দিয়ে জামিনদারের ফ্ল্যাট নিলাম করা চরম অসৎ উদ্দেশ্যমূলক।
- চুক্তি আইন ১৮৭২ এর ১২৮ ধারায় জামিনদারের দায় যৌথ হলেও অর্থ ঋণ আদালত আইন একটি বিশেষ আইন এবং তা সাধারণ চুক্তি আইনের ওপর প্রাধান্য পাবে।
- ব্যাংকের এই একতরফা নিলাম নোটিশ আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত (Without lawful authority)।
👥 ঋণদাতা অগ্রণী ব্যাংকের যুক্তি
- চুক্তি আইনের ১২৮ ধারা অনুযায়ী জামিনদারের দায় মূল ঋণগ্রহীতার দায়ের সাথে সহ-বিস্তৃত (Co-extensive)।
- ব্যাংকের অধিকার রয়েছে যেকোনো বন্ধকী সম্পত্তি বা জামিনদারের সম্পত্তি থেকে দ্রুততম উপায়ে পাবলিক মানি উদ্ধার করা।
- অর্থ ঋণ আদালতে মূল মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান থাকায় রিট পিটিশন রক্ষণীয় নয়।
- খেলাপি ঋণ আদায়ের স্বার্থে নিলাম বিজ্ঞপ্তি আইনসম্মত।
মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চের সামনে সাংবিধানিক প্রশ্ন উপস্থাপিত হয়: অর্থ ঋণ আদালত আইন ২০০৩ এর ১২ ধারার সংবিধিবদ্ধ আবশ্যকতা কি চুক্তি আইনের ১২৮ ধারার চেয়ে প্রাধান্য পাবে? মূল বন্ধকী সম্পত্তি ফেলে রেখে সরাসরি জামিনদারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিলামে তোলার সুযোগ ব্যাংকের আছে কি না?
হাইকোর্ট লক্ষ্য করেন যে অর্থ ঋণ আদালত আইনের ৩ ধারায় একটি ‘নন-অবস্ট্যান্ট ক্লজ’ (Non-obstante clause) রয়েছে, যা বলে যে অন্য কোনো আইনে যাই থাকুক না কেন, এই বিশেষ আইনের বিধানাবলিই চূড়ান্ত প্রাধান্য পাবে।
মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রখ্যাত ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত Sonali Bank v. M/S. Kohinoor Poultry Complex Ltd. (61 DLR (AD) 124) এবং 57 DLR 201 গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেন। বিচারপতি মোঃ ইকবাল কবির রায়ে সুস্পষ্ট নীতি প্রতিষ্ঠা করেন:
আদালত আরও মন্তব্য করেন যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ক্ষমতা সীমাহীন নয়। বিশেষ আইনের নির্দিষ্ট ধাপ ও প্রক্রিয়া এড়িয়ে শর্টকাট উপায়ে জামিনদারকে হয়রানি করা আইনের শাসনের বরখেলাপ।
চূড়ান্ত রায়: মহামান্য হাইকোর্ট রিট পিটিশনটি সরাসরি মঞ্জুর (Rule Absolute) ঘোষণা করেন। অগ্রণী ব্যাংক কর্তৃক রিটকারী জামিনদারের গুলশানের ফ্ল্যাট নিলামে বিক্রির জন্য প্রকাশিত বিতর্কিত নিলাম বিজ্ঞপ্তিটি আইনগত কর্তৃত্ববিহীন ও বেআইনি ঘোষণা করে সম্পূর্ণরূপে বাতিল (Quashed) করা হলো। আদালত ব্যাংককে নির্দেশ দেন যে তারা প্রথমে মূল ঋণগ্রহীতার বন্ধকী কাঁচপুরের ৪২ শতক শিল্প প্লট অর্থ ঋণ আইনের ১২ ধারার কঠোর বিধান মেনে নিলামে বিক্রয় করে দায় সমন্বয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে; যদি সেই বিক্রয়লব্ধ অর্থে ঋণ সম্পূর্ণ শোধ না হয়, কেবল তখনই অবশিষ্ট দায়ের জন্য জামিনদারের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে।
- ১২ ধারার অগ্রাধিকার: মূল ঋণগ্রহীতার বন্ধকী সম্পত্তি প্রথমে নিলাম করা ব্যাংকের বাধ্যতামূলক আইনি দায়িত্ব।
- জামিনদারের সুরক্ষা: প্রাইমারি সিকিউরিটি বাদ দিয়ে সরাসরি জামিনদারের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে হাত দেওয়া অবৈধ।
- বিশেষ আইনের প্রাধান্য: অর্থ ঋণ আদালত আইনের ৩ ও ১২ ধারা চুক্তি আইনের সাধারণ নীতির ওপর অগ্রাধিকার পায়।
- রিট এখতিয়ারের কার্যকারিতা: ব্যাংকের বেআইনি নিলাম বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে হাইকোর্টে সরাসরি রিট পিটিশন পূর্ণাঙ্গভাবে রক্ষণীয়।
- জামানতের তালিকা পরীক্ষা: জামিনদার হিসেবে কোনো নোটিশ পেলে ব্যাংকে মূল ঋণগ্রহীতার কী কী সম্পত্তি বন্ধক রয়েছে তার সার্টিফাইড কপি তলব করুন।
- নিলামের বিরুদ্ধে দ্রুত লিখিত আপত্তি: ১২ ধারার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে মূল সম্পত্তি আগে বিক্রির দাবি জানিয়ে ব্যাংককে রেজিস্ট্রি চিঠি দিন।
- হাইকোর্টে রিট মোশন: ব্যাংক আপত্তি অগ্রাহ্য করে নিলাম চালিয়ে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে হাইকোর্টে রিট দায়ের করে স্থগিতাদেশ নিন।
- ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সতর্কতা: ১২ ধারার বিধান লঙ্ঘন করে নিলাম ডাকলে পরবর্তীতে পুরো অর্থ ঋণ মামলাটিই অচল হয়ে যেতে পারে।
- আইনজীবীদের জন্য কৌশল: আপিল বিভাগের ৬১ ডিএলআর (এডি) ১২৪ নজির উদ্ধৃত করে প্রমাণ করুন যে জামিনদারের সম্পত্তিতে হাত দেওয়ার পূর্বে মূল সম্পত্তির নিলাম বাধ্যতামূলক।

