যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮ এর ৩ ধারার অধীনে দায়েরকৃত মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত মামলার কার্যধারা বাতিল: ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১এ ধারার প্রয়োগে হাইকোর্টের রায়
⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের যুগান্তকারী রায়: বৈধভাবে বিবাহবিচ্ছেদ (Talaq) সম্পন্ন ও কার্যকর হওয়ার পর কিংবা পারিবারিক ও দাম্পত্য বিরোধের প্রতিশোধ নেওয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে স্বামী এবং তার বয়োবৃদ্ধ পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ এর ৩ ধারায় দায়েরকৃত সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণহীন, অস্পষ্ট ও অতিরঞ্জিত নালিশি মামলার কার্যক্রম আইনের প্রক্রিয়ার সুস্পষ্ট অপব্যবহার (Abuse of the Process of Court)। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১এ (Section 561A CrPC) ধারার অন্তর্নিহিত ক্ষমতাবলে মহামান্য হাইকোর্ট উক্ত মিথ্যা ও হয়রানিমূলক ফৌজদারি মামলার কার্যধারা সরাসরি বাতিল (Quash) করতে আইনত সম্পূর্ণ এখতিয়ারবান। যদি নালিশি দরখাস্তে কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ, সময়, দাবিকৃত যৌতুকের প্রত্যক্ষ লেনদেনের বিবরণ না থাকে এবং কেবল পারিবারিক বিরোধে চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে শ্বশুরবাড়ির সকল সদস্যকে ঢালাওভাবে অভিযুক্ত করা হয়, তবে এমন মামলার বিচার পরিচালনা ন্যায়বিচারের অপলাপ ছাড়া আর কিছুই নয়।
মামলার বিবরণে জানা যায়, সফটওয়্যার প্রকৌশলী মোঃ তারেক হাসানের সাথে মোসাঃ শারমিন আক্তারের ২০১৮ সালে পারিবারিকভাবে বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর তাদের মধ্যে বনিবনা না হওয়ায় এবং স্ত্রীর উগ্র আচরণের কারণে স্বামী তারেক হাসান ২০২১ সালের ১০ আগস্ট তারিখে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এর ৭ ধারা মোতাবেক স্ত্রীকে বিধিসম্মতভাবে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে তালাক নোটিশ প্রেরণ করেন। সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশনের সালিশি পরিষদ ৯০ দিনের নোটিশের মেয়াদান্তে কোনো পক্ষ আপস না করায় তালাক কার্যকর মর্মে সার্টিফিকেট প্রদান করে।
তালাক চূড়ান্তভাবে কার্যকর হওয়ার প্রায় সাত মাস পর, ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে শারমিন আক্তার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্বামী তারেক হাসান, তার ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধ পিতা, অসুস্থ মা এবং লন্ডনে বসবাসরত এক বিবাহিতা বোনের বিরুদ্ধে যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮ এর ৩ ধারায় নালিশি মামলা দায়ের করেন। অভিযোগে দাবি করা হয় যে স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যরা ফ্ল্যাট কেনার জন্য ২০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেছে এবং যৌতুক না পেয়ে শারমিনকে শারীরিকভাবে প্রহার করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।
বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট কোনো পুলিশি বা নিরপেক্ষ তদন্তের আদেশ না দিয়ে কেবল বাদীনির ২০০ ধারার জবানবন্দি রেকর্ড করে সকল আসামির বিরুদ্ধে সমন জারি করেন। পরবর্তীতে ম্যাজিস্ট্রেট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন (Charge framing) করেন। স্বামী ও তার বয়োবৃদ্ধ পিতা-মাতা এই বেআইনি ও হয়রানিমূলক বিচার কার্যক্রমের প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে ৫৬১এ ধারায় মামলা বাতিলের আবেদন করেন।
👤 দরখাস্তকারী স্বামীর আইনি যুক্তি
- তালাক কার্যকর হওয়ার সাত মাস পর কোনো বৈবাহিক সম্পর্ক অবশিষ্ট না থাকা অবস্থায় যৌতুকের মামলা সম্পূর্ণ প্রতিহিংসামূলক।
- নালিশি দরখাস্তে যৌতুক দাবির কোনো সুনির্দিষ্ট দিন, তারিখ ও সময় উল্লেখ নেই; পুরো বয়ান একটি অস্পষ্ট কল্পকাহিনী।
- আসামিদের মধ্যে একজন ঘটনার সময়ে বিদেশে (লন্ডনে) প্রবাসী ছিলেন, যার পাসপোর্ট ও ভিসা রেকর্ড প্রমাণ করে তার অনুপস্থিতি।
- বৃদ্ধ পিতা-মাতা ও আত্মীয়দের আসামি করা আদালতের প্রক্রিয়াকে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের হাতিয়ারে রূপান্তরের শামিল।
👥 নালিশি বাদিনী ও রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি
- নালিশি দরখাস্তের বক্তব্য অনুযায়ী যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ধারার প্রাথমিক উপাদান বিদ্যমান রয়েছে।
- মামলায় অভিযোগ গঠন হয়ে গেছে, সুতরাং সাক্ষ্যগ্রহণ ছাড়া ৫৬১এ ধারায় কার্যক্রম বাতিল করা ট্রায়াল কোর্টের এখতিয়ারে হস্তক্ষেপ।
- অভিযোগের সত্য-মিথ্যা কেবল বিচারেই নির্ধারিত হওয়া উচিত, কোয়াশমেন্ট স্টেজে নয়।
- যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের কারণে মামলাটি খারিজের যোগ্য নয়।
মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশন মূল্যায়ন করেন: দাম্পত্য সম্পর্ক আইনসম্মতভাবে অবসানের পর কেবল পূর্ববর্তী তিক্ততার প্রতিশোধ হিসেবে শ্বশুরবাড়ির সকলকে জড়িয়ে দায়েরকৃত সাধারণ প্রকৃতির মামলা কি বিচারিক কার্যধারার অপব্যবহার হিসেবে বাতিলযোগ্য কি না?
বিজ্ঞ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামলা আমলে নেওয়ার সময় এবং অভিযোগ গঠনের সময় সম্পূর্ণ যান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। ক্রিমিনাল ট্রায়ালে কোনো নাগরিকের মৌলিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হতে পারে জেনেও অভিযোগের সারবত্তা ও অসৎ উদ্দেশ্য বিচার না করে চার্জ ফ্রেম করা গুরুতর বিচারিক ব্যর্থতা।
মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ল্যান্ডমার্ক নজির 49 DLR (AD) 168, 51 DLR (AD) 65 এবং 58 DLR 173 বিস্তারিত উদ্ধৃত করেন। হাইকোর্ট দ্ব্যর্থহীনভাবে সিদ্ধান্ত দেন:
আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন যে যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ধারার অপব্যবহার রোধে বিচারিক আদালতগুলোর অত্যন্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কোনো নাগরিককে অহেতুক ফৌজদারি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার সুযোগ দেওয়া আইনের শাসনের সম্পূর্ণ বিপরীত।
চূড়ান্ত রায়: মহামান্য হাইকোর্ট ফৌজদারি বিবিধ মোকদ্দমাটি সরাসরি মঞ্জুর (Rule Absolute) ঘোষণা করেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন সি.আর. মোকদ্দমা নং ৪৫৬/২০২২ এর সকল কার্যক্রম ও অভিযোগ গঠনের আদেশ অবৈধ ঘোষণা করে সম্পূর্ণরূপে বাতিল (Quashed) করা হলো। আবেদনকারী স্বামী এবং তার পরিবারের সদস্যদের আদালত হাজিরার দায় থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হলো।
- প্রতিশোধমূলক মামলা বাতিল: তালাকের পর প্রতিশোধ নিতে দায়ের করা যৌতুকের মামলা ৫৬১এ ধারায় সরাসরি বাতিলযোগ্য।
- ঢালাও অভিযোগ অগ্রাহ্য: সুনির্দিষ্ট তারিখ, সময় ও লেনদেনের প্রমাণ ছাড়া শ্বশুরবাড়ির সবার বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ টেকে না।
- প্রবাসীদের জড়ানো দণ্ডনীয়: বিদেশে অবস্থানকারী আত্মীয়কে মিথ্যাভাবে আসামি করলে তা আদালতের প্রক্রিয়া অবমাননা হিসেবে গণ্য।
- ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব: পারিবারিক প্রেক্ষাপটের ফৌজদারি মামলায় সমন জারির পূর্বে প্রাথমিক অনুসন্ধান নিশ্চিত করা কর্তব্য।
- তালাকের নথি সংরক্ষণ: তালাক নোটিশ, পোস্টাল রিসিট, ট্র্যাকিং তথ্য ও সিটি কর্পোরেশনের সার্টিফিকেট সুরক্ষিত রাখুন।
- আসামিদের প্রবাস বা দূরত্বের প্রমাণ: কোনো আত্মীয় বিদেশে থাকলে তার পাসপোর্ট কপি, ভিসা ও ফ্লাইট টিকিট নোটারাইজড করে রাখুন।
- দ্রুত কোয়াশমেন্ট পিটিশন: সমন জারি বা চার্জ ফ্রেম হওয়ার পরপরই বিলম্ব না করে হাইকোর্টে ৫৬১এ ধারায় রিট/মিস পিটিশন করুন।
- মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে পাল্টা আইনি পদক্ষেপ: মামলা বাতিল হওয়ার পর নালিশিকারীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় মিথ্যা মামলা দায়েরের মামলা করা যায়।
- আইনজীবীদের জন্য কৌশল: আপিল বিভাগের ৪৯ ডিএলআর (এডি) ১৬৮ নজির উপস্থাপন করে ট্রায়াল কোর্টের সমন স্থগিতের আদেশ গ্রহণ করুন।
