চেক হারানো বা চুরির জিডি (GD) ও ব্যাংকে ‘Stop Payment’ নির্দেশনা সত্ত্বেও ধারা ১৩৮ এর মামলা পরিচালনা: চেকদাতার আত্মপক্ষ সমর্থন ও আইনি অনুমান খণ্ডন—হাইকোর্টের রায়
⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১ (NI Act) এর ১৩৮ ধারার অধীনে চেক ডিজঅনারের মামলায় কেবল থানায় চেক হারানোর একটি সাধারণ ডায়েরি (GD) দায়ের করা কিংবা ব্যাংকে চেক পরিশোধ স্থগিতের (‘Payment Stopped by Drawer’) লিখিত নির্দেশ দেওয়াই চেকদাতাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফৌজদারি দায় থেকে মুক্তি দেয় না। আইনের ১৩৯ ধারার সংবিধিবদ্ধ আইনি অনুমান (Statutory Presumption) অনুযায়ী চেকে স্বাক্ষর স্বীকার করলে ধরে নেওয়া হবে যে চেকটি বৈধ ঋণ বা আর্থিক দায় (Debt or Liability) পরিশোধের নিমিত্তেই প্রদান করা হয়েছে। এই আইনি অনুমান খণ্ডন করতে হলে চেকদাতাকে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হবে যে—(১) জিডিটি চেক উপস্থাপনের বহু পূর্বে প্রকৃত ঘটনা হিসেবে করা হয়েছিল, কোনো সাজানো ঢাল নয়; (২) বাদি ও আসামির মধ্যে কোনো বাণিজ্যিক বা আর্থিক লেনদেন কখনোই বিদ্যমান ছিল না; এবং (৩) বাদি কীভাবে চেকটি অবৈধভাবে হস্তগত করেছে তা আত্মপক্ষ সমর্থনে সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করা হয়েছে। অন্যথায় স্টপ পেমেন্ট মেমো থাকলেও তা ১৩৮ ধারার অধীনে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
মামলার বিবরণে প্রকাশ, চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী হাজী মোঃ কামাল হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ী মোঃ শফিউল আলম ১৫ লাখ টাকার একটি চেক ডিজঅনারের অভিযোগে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ৩য় আদালতে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় সি.আর. মোকদ্দমা নং ৮১২/২০২১ দায়ের করেন। বাদিপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যবসা পরিচালনার প্রয়োজনে কামাল হোসেন বাদি শফিউল আলমের কাছ থেকে নগদ ১৫ লাখ টাকা ধার নেন এবং সেই দায় পরিশোধে অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড, খাতুনগঞ্জ শাখার উক্ত চেক প্রদান করেন। চেকটি ব্যাংকে জমা দিলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ‘Payment Stopped by Drawer’ স্লিপসহ তা ফেরত দেয়।
আইনি নোটিশ জারির পর মামলা হলে আসামি কামাল হোসেন জামিন নিয়ে আদালতে দাবি করেন যে তিনি বাদির নিকট থেকে কোনো টাকা ধার নেননি। তিনি দাবি করেন যে তার স্বাক্ষরিত তিনটি ব্লাঙ্ক চেক সংবলিত চেক বইয়ের একটি পাতা তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে হারিয়ে গিয়েছিল, যার প্রেক্ষিতে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোতোয়ালী থানায় একটি জিডি (নং ৪১২, তারিখ ১৫-০৩-২০২১) করেছিলেন এবং একই সাথে ব্যাংকে স্টপ পেমেন্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন। বাদি সেই হারানো চেক কুড়িয়ে পেয়ে অসদুপায়ে ১৫ লাখ টাকার অঙ্ক বসিয়ে ভুয়া মামলা করেছেন।
যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালত বিচারান্তে আসামির আত্মপক্ষ সমর্থন প্রত্যাখ্যান করে তাকে ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ১৫ লাখ টাকা জরিমানার আদেশ দেন। মহানগর দায়রা জজ আপিল আদালতও উক্ত রায় বহাল রাখেন। উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে আসামি কামাল হোসেন হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন দায়ের করেন।
👤 দণ্ডিত আসামির আইনি যুক্তি
- চেকটিতে কোনো ঋণ ছিল না এবং চেক হারিয়ে যাওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে থানায় জিডি করা হয়েছিল।
- চেক ব্যাংকে উপস্থাপন করার আগেই ব্যাংকে ‘স্টপ পেমেন্ট’ কার্যকর করা হয়েছিল, যা আসামির সদিচ্ছার প্রমাণ।
- বাদি কোনো লিখিত রসিদ বা চুক্তিনামা আদালতে প্রদর্শন করতে পারেননি যার মাধ্যমে ১৫ লাখ টাকা নগদ প্রদানের প্রমাণ মেলে।
- আসামি সফলভাবে এনআই অ্যাক্টের ১৩৯ ধারার অনুমান খণ্ডন করতে সক্ষম হয়েছেন।
👥 নালিশিকারী বাদিপক্ষের যুক্তি
- চেকে আসামির নিজস্ব হাতের স্বাক্ষর রয়েছে যা আসামি কখনো অস্বীকার করেননি।
- টাকা পরিশোধ এড়ানোর একটি প্রচলিত অসৎ কৌশল হিসেবে চেকদাতারা চেক দেওয়ার পরপরই সাজানো জিডি ও স্টপ পেমেন্ট করে থাকেন।
- সুপ্রিম কোর্টের সুপ্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত অনুসারে স্টপ পেমেন্ট স্লিপ ১৩৮ ধারার অধীনে ডিজঅনার হিসেবেই গণ্য হবে।
- আসামি বাদির কাছে চেক কীভাবে গেল তা প্রমাণের জন্য কোনো সাক্ষ্য বা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।
মহামান্য হাইকোর্ট বিবেচনা করেন: থানায় নিছক একটি জিডি করা এবং ব্যাংকে স্টপ পেমেন্ট নির্দেশনা দেওয়া কি ১৩৮ ধারার অভিযোগ থেকে আসামিকে স্বয়ংক্রিয় অব্যাহতি দেয়, নাকি এই ধরনের ক্ষেত্রে আসামির ওপর প্রমাণের দায়ভার বহাল থাকে?
ট্রায়াল আদালত ও আপিল আদালত অত্যন্ত চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখেছিলেন যে, জিডি করা হলেও চেক পাওয়ার পর বাদি যখন ১৩৮ ধারার লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছিলেন, তখন আসামি সেই নোটিশের কোনো লিখিত জবাব দেননি। নোটিশের জবাব না দিয়ে নীরব থাকা আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের গল্পকে অবিশ্বস্ত ও বানোয়াট প্রমাণ করে।
মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত Majed Hossain v. State (52 DLR (AD) 160), 60 DLR (AD) 147 এবং ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিখ্যাত নজির Modi Cements Ltd. v. Kuchil Kumar Nandi (AIR 1998 SC 1057) ও Rangappa v. Sri Mohan (AIR 2010 SC 1898) বিশ্লেষণ করেন। হাইকোর্ট দ্ব্যর্থহীনভাবে নীতি নির্ধারণ করেন:
হাইকোর্ট আরও উল্লেখ করেন যে, বাণিজ্যিক লেনদেনের নিরাপত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করাই এনআই অ্যাক্টের মূল স্পিরিট। চেক প্রদান করে স্টপ পেমেন্ট করা বা ভুয়া জিডির মাধ্যমে আইনি ফাঁকফোকর তৈরির প্রয়াস কঠোরভাবে প্রতিহত করতে হবে।
চূড়ান্ত রায়: মহামান্য হাইকোর্ট ফৌজদারি রিভিশন মোকদ্দমাটি সরাসরি খারিজ (Discharged) করেন। অধস্তন আদালতের প্রদত্ত ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের রায় সম্পূর্ণ বহাল রাখা হলো। হাইকোর্ট আদেশ দেন যে আপিল দায়েরের সময় জমাকৃত শতকরা ৫০ ভাগ অর্থ বাদি অবিলম্বে উত্তোলন করতে পারবেন এবং অবশিষ্ট টাকা আদায়ের জন্য বিচারিক আদালতকে আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ও ক্রোকের কার্যক্রম গ্রহণ করতে নির্দেশ দেওয়া হলো।
- স্টপ পেমেন্টে ১৩৮ প্রযোজ্য: চেকে স্টপ পেমেন্ট স্লিপ থাকলে তা অপর্যাপ্ত তহবিলের মতোই অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
- জিডি স্বয়ংক্রিয় ঢাল নয়: শুধু থানায় জিডি করলেই দায় থেকে মুক্তি মেলে না; ঘটনার সত্যতা প্রমাণ করতে হবে।
- লিগ্যাল নোটিশের জবাব বাধ্যতামূলক: নোটিশ পাওয়ার পর উত্তর না দিলে পরবর্তীতে হারানো চেকের দাবি সরাসরি অচল।
- ১৩৯ ধারার কঠোরতা: স্বাক্ষরিত চেকে টাকার অঙ্ক বা তারিখ অন্য কেউ লিখলেও স্বাক্ষর স্বীকার করলে দায় বর্তাবে।
- ব্লাঙ্ক চেকে স্বাক্ষর পরিহার: কখনোই স্বাক্ষরিত ফাঁকা চেক ড্রয়ারে বা কাউকে দেবেন না; এটি মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
- চেক হারালে তাৎক্ষণিক আইনি পদক্ষেপ: জিডি করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম জানা থাকলে তাকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান।
- ১৩৮ এর নোটিশের দ্রুত জবাব দিন: নোটিশ পাওয়া মাত্রই ১৫ দিনের মধ্যে বিস্তারিত তথ্য ও জিডির কপি সহ রেজিস্ট্রি ডাকযোগে জবাব পাঠান।
- লেনদেনের হিসাব লিখিত রাখুন: ব্যবসায়িক কোনো লেনদেন সম্পন্ন হলে মানি রসিদ বা ভাউচারে স্পষ্ট সাইন করিয়ে রাখুন।
- আইনজীবীদের জন্য কৌশল: বাদিপক্ষ হিসেবে মামলা ড্রাফট করার সময় ৫২ ডিএলআর (এডি) ১৬০ নজির রেফার করে স্টপ পেমেন্ট যুক্তি ভেঙে দিন।

