অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের পাসপোর্ট ইস্যু ও বিদেশে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে অভিভাবকত্ব আইন ১৮৯০ এর অধীনে মায়ের একক জিম্মাদারি ও ট্রাভেল পারমিশন: হাইকোর্টের রায়

⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত: অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন, ১৮৯০ (Guardians and Wards Act, 1890) এর অধীনে অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের জিম্মাদারি (Custody/Hizanat) নির্ধারণের ক্ষেত্রে সন্তানের কল্যাণ ও সর্বোচ্চ স্বার্থই (Welfare of the Minor is Paramount Consideration) আইনের একমাত্র এবং চূড়ান্ত মানদণ্ড। পিতা স্বাভাবিক প্রাকৃতিক অভিভাবক (Natural Guardian) হওয়া সত্ত্বেও যদি দাম্পত্য কলহ বা ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত সন্তানের পাসপোর্ট তৈরিতে অনাপত্তি (NOC) প্রদানে অস্বীকৃতি জানান কিংবা বিদেশে উন্নত চিকিৎসা গ্রহণে অন্যায্য বাধা সৃষ্টি করেন, তবে আদালত পিতা হিসেবে তার অধিকার স্থগিত রেখে সন্তানের জীবনরক্ষার স্বার্থে মায়ের অনুকূলে একক আইনি জিম্মাদারি ও বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি প্রদান করতে সম্পূর্ণ এখতিয়ারবান। পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে পিতার এনওসি ব্যতিরেকে কেবল মায়ের স্বাক্ষরে জরুরি পাসপোর্ট ইস্যুর নির্দেশ দেন মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ।

১. মামলার প্রেক্ষাপট ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ (Facts of the Case)

মামলার বিবরণে প্রকাশ, পেশায় চিকিৎসক ডাঃ নাদিয়া শারমিনের সাথে প্রকৌশলী তানভীর আহমেদের ২০১৫ সালে বিবাহ হয়। তাদের সংসারে ২০১৮ সালে একটি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে। সন্তানটি জন্মগত হৃদরোগ (Congenital Heart Defect) এবং স্নায়বিক জটিলতায় আক্রান্ত। ২০২০ সালে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে এবং শিশুটি সার্বক্ষণিকভাবে মায়ের স্নেহ-যত্নে বড় হতে থাকে।

২০২২ সালে শিশুটির শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হলে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড অতিদ্রুত ভারতের নারায়ণা হেলথ বা মাদ্রাজ মেডিকেল মিশনে ওপেন হার্ট সার্জারি করানোর জরুরি পরামর্শ দেয়। মা ডাঃ নাদিয়া শারমিন শিশুটির পাসপোর্ট তৈরি ও মেডিকেল ভিসার জন্য পিতার অনাপত্তিপত্র (NOC) চাইলে পিতা তানভীর আহমেদ ব্যক্তিগত শত্রুতা ও ক্ষোভের কারণে এনওসি দিতে সরাসরি অস্বীকার করেন। পিতা দাবি করেন যে মা সন্তানকে নিয়ে বিদেশে পালিয়ে যাবেন এবং তাকে আর দেশে ফেরত আনবেন না।

এমতাবস্থায় মা ঢাকার পারিবারিক আদালত ও জেলা জজ আদালতে অভিভাবকত্ব আইনে জরুরি দরখাস্ত দাখিল করেন। কিন্তু অধস্তন আদালত পর্যাপ্ত আইনি সাহসের অভাবে আদেশ দেন যে পিতার সম্মতি ছাড়া পাসপোর্ট প্রদানের কোনো এখতিয়ার পারিবারিক আদালতের নেই। সন্তানের জীবন যখন সংকটাপন্ন, তখন সংক্ষুব্ধ মা মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে এই সিভিল রিভিশন দায়ের করেন।

২. মাতা ও পিতার আইনি যুক্তি (Pleadings & Contentions)

👤 আবেদনকারী মায়ের আইনি যুক্তি

  • সন্তানের জীবন বাঁচানো প্রথম ও প্রধান কর্তব্য; চিকিৎসা বিলম্বিত হলে শিশুটি স্থায়ী পঙ্গুত্ব বা মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়বে।
  • মা নিজে একজন সরকারি চিকিৎসক এবং তিনি চিকিৎসা শেষে সন্তানকে দেশে ফেরত আনার বিষয়ে যেকোনো মুচলেকা দিতে প্রস্তুত।
  • পিতা সন্তানের কোনো চিকিৎসা ব্যয় বহন করছেন না, অথচ পাসপোর্ট প্রক্রিয়ায় বাধা দিয়ে সন্তানের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছেন।
  • অভিভাবকত্ব আইনের উদ্দেশ্য শিশুর কল্যাণ নিশ্চিত করা, পিতার অযৌক্তিক অহংকার রক্ষা করা নয়।

👥 বিপরীতপক্ষ পিতার যুক্তি

  • মুসলিম আইনে পিতা হলেন সন্তানের একমাত্র স্বাভাবিক অভিভাবক (Legal & Natural Guardian)।
  • পিতার সম্মতি ছাড়া কোনো নাবালককে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া অপহরণের (Kidnapping) সমতুল্য হতে পারে।
  • বাংলাদেশেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন, দেশেই চিকিৎসা করানো সম্ভব।
  • মায়ের হাতে একক জিম্মাদারি দিলে পিতার সাক্ষাতের অধিকার (Visitation Rights) চিরতরে নষ্ট হবে।

৩. বিচার্য বিষয় ও সাব-অর্ডিনেট কোর্টের ব্যর্থতা (Issues & Judicial Failure)

মহামান্য হাইকোর্টের সামনে মূল প্রশ্ন ওঠে: পিতা যদি প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে অসুস্থ শিশুর বিদেশে চিকিৎসার অনাপত্তি প্রদানে গড়িমসি করেন, তবে আদালত কি সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ (জীবনের অধিকার) এবং অভিভাবকত্ব আইনের অধীনে মায়ের একক আবেদনে পাসপোর্ট ও ট্রাভেলের অনুমতি দিতে পারেন?

অধস্তন পারিবারিক আদালত অত্যন্ত রক্ষণশীল মনোভাব দেখিয়েছিল। জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতিতে শিশুর জীবন বাঁচানোর চেয়ে প্রশাসনিক নিয়মের বেড়াজালকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া ছিল সম্পূর্ণ অমানবিক ও বিচারিক বিচক্ষণতার পরিপন্থি।

৪. হাইকোর্টের আইনি ব্যাখ্যা, রেশিও ও নজির বিশ্লেষণ (High Court’s Ratio)

মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রখ্যাত ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত Abu Baker Siddique v. Must. Ayesha Gujdar (42 DLR (AD) 1), 50 DLR (AD) 55 এবং 56 DLR 456 বিস্তারিত পর্যালোচনা করেন। মাননীয় বিচারপতিদ্বয় ঐতিহাসিক অভিমত প্রকাশ করেন:

“Under the Guardians and Wards Act, 1890, the welfare of the minor child is the paramount and supreme consideration which outweighs all legal or traditional rights of the father as natural guardian. When a child requires critical overseas medical surgery to save his life, and the father recalcitrantly withholds his consent out of marital acrimony, the Court must step in as parens patriae. No statutory rule or administrative circular can override the child’s constitutional right to life under Article 32 of the Constitution. The mother, having the actual physical custody and caring for the ill child, is fully entitled to apply for and obtain the passport without the father’s NOC.”

হাইকোর্ট আরও পর্যবেক্ষণ করেন যে পিতা হিসেবে অধিকার কেবল দাবি করলেই হয় না, তার দায়িত্বও পালন করতে হয়। সন্তানের বিপদে যে পিতা সহায় না হয়ে বাধা সৃষ্টি করে, সে পিতা অভিভাবকত্বের নৈতিক ও আইনি অগ্রাধিকার হারায়।

৫. হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায় ও দিকনির্দেশনা (Final Verdict)

চূড়ান্ত রায়: মহামান্য হাইকোর্ট সিভিল রিভিশন মোকদ্দমাটি সরাসরি মঞ্জুর (Rule Absolute) ঘোষণা করেন। অধস্তন আদালতের আদেশ বাতিল করা হলো। আদালত নির্দেশ প্রদান করেন যে মা ডাঃ নাদিয়া শারমিন নাবালক সন্তানের চিকিৎসার জন্য পাসপোর্ট এবং ভিসা প্রাপ্তির পূর্ণ অধিকারী হবেন। পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হলো যেন পিতার কোনো অনাপত্তিপত্র ছাড়াই কেবল মায়ের একক আবেদনে আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে শিশুটির ই-পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়। মা চিকিৎসা শেষে সন্তানকে সুস্থ করে দেশে ফিরিয়ে আনবেন মর্মে হাইকোর্টের রেজিস্ট্রারের নিকট একটি লিখিত হলফনামা দাখিল করবেন।

৬. রায়ের মূল আইনি শিক্ষা ও নজির (Core Principles)
  • প্যারামাউন্ট ওয়েলফেয়ার প্রিন্সিপাল: অভিভাবকত্ব নির্ধারণে শরিয়ত বা প্রচলিত নিয়মের চেয়ে শিশুর জীবন ও কল্যাণই সর্বোচ্চ।
  • পিতার এনওসি বাধ্যবাধকতা শিথিল: শিশুর জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে পিতার বাধা আদালত উপেক্ষা করতে পারেন।
  • আদালতের প্যারেন্টস প্যাট্রিয়া ভূমিকা: শিশুর সুরক্ষায় হাইকোর্ট স্বয়ং অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে প্রশাসনিক নির্দেশ দিতে পারেন।
  • পাসপোর্ট অধিদপ্তরের প্রতি অনুশাসন: আদালতের আদেশের পর কোনো পাসপোর্ট কর্মকর্তা এনওসির অজুহাতে নথি আটকে রাখতে পারবেন না।

৭. মা ও পারিবারিক আইনজীবীদের জন্য ৫টি জরুরি পরামর্শ
  1. মেডিকেল বোর্ডের প্রেসক্রিপশন সংগ্রহ: শিশুর অসুস্থতার গুরুত্ব ও বিদেশে চিকিৎসার সুপারিশ সংবলিত বিশেষজ্ঞ বোর্ডের সার্টিফিকেট সংরক্ষণ করুন।
  2. পিতার অস্বীকৃতির প্রমাণ তৈরি: পিতাকে চিঠি বা নোটিশ পাঠিয়ে এনওসি চাওয়া হয়েছিল কিন্তু তিনি দেননি—এমন সুস্পষ্ট লিখিত প্রমাণ প্রস্তুত রাখুন।
  3. পারিবারিক আদালতে জিম্মাদারির মামলা: সন্তান নিজ হেফাজতে থাকলে অভিভাবকত্ব আইনের ২৫ ধারায় জিম্মাদারি ও ট্রাভেল পারমিশনের আবেদন করুন।
  4. হাইকোর্টে রিভিশন বা রিট দায়ের: অধস্তন আদালত কালক্ষেপণ করলে হাইকোর্টে জরুরি মোশন ফাইল করে অন্তর্বর্তীকালীন পাসপোর্ট নির্দেশ নিন।
  5. আইনজীবীদের জন্য কৌশল: আপিল বিভাগের ৪২ ডিএলআর (এডি) ১ এবং সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করে শিশুর জীবনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করুন।

📑 মামলার পরিচিতি ও অফিসিয়াল রেকর্ড রেফারেন্স
মামলার নম্বর Civil Revision No. 3410 of 2023
মোকদ্দমার পক্ষগণ Dr. Nadia Sharmin (Mother-Petitioner) Vs. Engr. Tanvir Ahmed (Father-Opposite Party)
বিচারপতি ও বেঞ্চ Ms. Justice Kashefa Hussain & Mr. Justice Kazi Vali Ahmed
আইনি ক্ষেত্র ও অধিশাখা অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন ১৮৯০ (ধারা ৭ ও ২৫), সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১ ও ৩২, পাসপোর্ট ইস্যু ও নাবালকের হেফাজত
অফিসিয়াল রায় ও পূর্ণাঙ্গ নথি
📥 সুপ্রিম কোর্ট অফিসিয়াল রায় ডাউনলোড (PDF)

Related Articles

✍️ আইনি মতামত বা প্রশ্ন প্রকাশ করুন

Back to top button