দেনমোহর মৌখিক পরিশোধের দাবি লিখিত রসিদ বা দাখিলা ছাড়া পারিবারিক আদালতে অগ্রাহ্য: নিকাহনামায় উল্লিখিত মোহরানা স্বামীকে এককালীন পরিশোধের নির্দেশ—হাইকোর্টের রায়
⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের যুগান্তকারী রায়: মুসলিম বিবাহ ও পারিবারিক আইন অনুযায়ী ‘দেনমোহর’ (Mahr/Dower) স্ত্রীর একটি অলঙ্ঘনীয়, শর্তহীন ও সুরক্ষিত আর্থিক অধিকার, যা স্বামীর ওপর একচ্ছত্র ঋণ (Debt) হিসেবে বর্তায়। পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ (Family Courts Ordinance, 1985) এর অধীন দায়েরকৃত দেনমোহর আদায়ের মামলায় স্বামী যদি দাবি করে যে তিনি বৈবাহিক জীবনকালে স্বর্ণালঙ্কার, নগদ অর্থ বা উপহার সামগ্রী প্রদানের মাধ্যমে দেনমোহর সম্পূর্ণ পরিশোধ করে দিয়েছেন, তবে সেই দাবির সপক্ষে স্ত্রীর স্বাক্ষরযুক্ত সুনির্দিষ্ট লিখিত প্রাপ্তিস্বীকার রসিদ, রেজিস্ট্রি দাখিলা বা অকাট্য দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপনের সম্পূর্ণ দায়ভার স্বামীর ওপরই বর্তাবে। নিছক পরিবারের সদস্য বা আত্মীয়স্বজনের সুবিধাজনক মৌখিক সাক্ষ্য দ্বারা দেনমোহর পরিশোধের দাবি প্রমাণ করা আইনত অসম্ভব। সাক্ষ্য আইন ১৮৭২ এর ৯১ ও ৯২ ধারার নীতি অনুযায়ী নিবন্ধিত নিকাহনামার লিখিত শর্তকে মৌখিক জবানবন্দি দিয়ে নস্যাৎ করা যায় না। স্বামীকে সম্পূর্ণ দেনমোহর এককালীন পরিশোধের নির্দেশ দেন মহামান্য হাইকোর্ট।
মামলার বিবরণে জানা যায়, কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা উপজেলার মোসাঃ রোজিনা বেগমের সাথে মোঃ শহিদুল ইসলামের ২০১০ সালে রেজিস্ট্রি নিকাহনামা মূলে বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। নিকাহনামার ১৩ ও ১৪ নম্বর কলামে মোট দেনমোহর ধার্য করা হয় ১০,০০,০০০ (দশ লাখ) টাকা, যার মধ্যে বিয়ের সময় উসুল দেখানো হয় ৫০,০০০ টাকার অলঙ্কার এবং বাকি ৯,৫০,০০০ টাকা বাকি বা বিলম্বিত দেনমোহর (Deferred Dower) হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকে। দাম্পত্য জীবনে তাদের একটি কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করে।
পরবর্তীতে স্বামী শহিদুল ইসলাম দ্বিতীয় বিবাহে উদ্যত হলে দাম্পত্য কলহ চরমে ওঠে এবং স্বামী স্ত্রীকে সন্তানসহ পৈতৃক বাড়িতে পাঠিয়ে ভরণপোষণ বন্ধ করে দেন। নিরুপায় হয়ে স্ত্রী রোজিনা বেগম কুষ্টিয়ার সহকারী জজ ও পারিবারিক আদালতে দেনমোহর ও খোরপোষের মোকদ্দমা নং ৪৫/২০২১ দায়ের করেন।
স্বামী শহিদুল ইসলাম লিখিত জবাব দাখিল করে দাবি করেন যে তিনি বিদেশে চাকরি করাকালে স্ত্রীর নামে একাধিকবার ব্যাংকে টাকা পাঠিয়েছেন এবং সংসার জীবনে স্ত্রীর অনুরোধে পাঁচ ভরি ওজনের স্বর্ণের গহনা ও নগদ ৫ লাখ টাকা দিয়ে পুরো দেনমোহর মৌখিকভাবে চুকিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু স্বামী উক্ত পরিশোধের সমর্থনে স্ত্রীর কোনো লিখিত রসিদ বা দেনমোহর পরিশোধের দলিল আদালতে দাখিল করতে পারেননি। পারিবারিক আদালত স্ত্রীর অনুকূলে ৯,৫০,০০০ টাকার ডিক্রি প্রদান করেন। জেলা জজ আপিল আদালতও স্বামীর আপিল খারিজ করেন। সংক্ষুব্ধ স্বামী হাইকোর্ট বিভাগে রিভিশন দায়ের করেন।
👤 রিভিশনকারী স্বামীর আইনি যুক্তি
- পারিবারিক জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অর্থ লেনদেনে আনুষ্ঠানিক লিখিত রসিদ নেওয়ার রেওয়াজ সমাজে সচরাচর থাকে না।
- স্বামীর ভাই ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ সাক্ষী হিসেবে আদালতে শপথ নিয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন যে সালিশে দেনমোহর পরিশোধের কথা আলোচিত হয়েছিল।
- ব্যাংক রেমিট্যান্সের মাধ্যমে প্রেরিত অর্থ দেনমোহরের দায় সমন্বয়ে খরচ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া উচিত।
- পারিবারিক আদালত স্বামীর মৌখিক সাক্ষ্য বিবেচনায় না নিয়ে একপেশে ডিক্রি জারি করেছে।
👥 ডিক্রিদার স্ত্রীর পক্ষে বিজ্ঞ আইনজীবীর যুক্তি
- নিকাহনামা একটি সরকারি পাবলিক ডকুমেন্ট এবং সেখানে দেনমোহরের সুনির্দিষ্ট হিসাব লিখিত রয়েছে।
- স্বামীর সংসার খরচ বা উপহার সামগ্রী প্রদান কখনোই দেনমোহর হিসেবে গণ্য হতে পারে না যে পর্যন্ত না স্ত্রী সুস্পষ্ট সম্মতি দেন।
- দেনমোহর একটি আইনগত ঋণ; ঋণ পরিশোধ প্রমাণের দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে দেনাদারের। লিখিত প্রমাণহীন মৌখিক গল্প আইনের চোখে মূল্যহীন।
- পারিবারিক আদালতের রায় সম্পূর্ণ সঠিক ও বহাল রাখার যোগ্য।
মহামান্য হাইকোর্টের সামনে আইনগত প্রশ্ন আসে: মুসলিম বিবাহে নিকাহনামায় লিপিবদ্ধ দেনমোহরের দেনা মৌখিক সাক্ষ্য দ্বারা পরিশোধ প্রমাণিত হতে পারে কি না? স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে প্রেরিত স্বাভাবিক সংসার খরচের অর্থ কি দেনমোহর হিসেবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর্তনযোগ্য?
পারিবারিক আদালত ও জেলা জজ আদালত উভয়ই সাক্ষ্য মূল্যায়নে দেখতে পান যে স্বামী যেসব ব্যাংক স্টেটমেন্ট দাখিল করেছেন তা পরিবারের ভরণপোষণ ও সন্তানের পড়াশোনার নিয়মিত খরচ। সেখানে দেনমোহর বাবদ প্রদানের কোনো সুনির্দিষ্ট উল্লেখ নেই।
মহামান্য বিচারপতি মোঃ সোহরাওয়ার্দী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রখ্যাত নজির 50 DLR (AD) 163, 47 DLR (AD) 54 এবং 35 DLR 285 বিস্তারিত উদ্ধৃত করেন। হাইকোর্ট দ্ব্যর্থহীনভাবে নীতি নির্ধারণ করেন:
হাইকোর্ট আরও উল্লেখ করেন যে, সমাজে অনেক স্বামী দেনমোহর পরিশোধ না করার অসৎ ফন্দি এঁটে পরবর্তীতে উপহার বা বাজার খরচের টাকাকে দেনমোহর বলে মিথ্যা দাবি তোলেন। এই ধরনের কুযুক্তিকে পারিবারিক আদালতে স্থান দেওয়া নারীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।
চূড়ান্ত রায়: মহামান্য হাইকোর্ট সিভিল রিভিশন মোকদ্দমাটি সরাসরি খারিজ (Discharged) করেন। পারিবারিক আদালতের ৯,৫০,০০০ টাকার দেনমোহর এবং মাসিক খোরপোষের ডিক্রি সম্পূর্ণ বহাল রাখা হলো। স্বামীকে আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে পারিবারিক আদালতে ডিক্রিকৃত সম্পূর্ণ অর্থ জমা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হলো; অন্যথায় পারিবারিক আদালতকে দেওয়ানি কারাগারে আটক এবং স্বামীর স্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রয় করে ডিক্রির অর্থ স্ত্রীর অনুকূলে আদায়ের কঠোর নির্দেশ প্রদান করা হলো।
- লিখিত রসিদ ছাড়া দেনমোহর পরিশোধ অচল: স্ত্রীর সইযুক্ত লিখিত দাখিলা ছাড়া মৌখিক দাবির কোনো মূল্য নেই।
- সংসার খরচ দেনমোহর নয়: স্বামীকে স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতেই হবে, তাকে দেনমোহরের সাথে গুলিয়ে ফেলা বেআইনি।
- নিকাহনামার প্রাধান্য: নিবন্ধিত নিকাহনামার শর্তকে আত্মীয়দের মৌখিক সাক্ষ্য দিয়ে নস্যাৎ করা যায় না।
- এককালীন ডিক্রি কার্যকর: দেনমোহর অনাদায়ে পারিবারিক আদালতের দেওয়ানি জেল ও ক্রোক জারির পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে।
- দেনমোহর পরিশোধকালে রসিদ সম্পাদন: বিয়ের পর দেনমোহর বাবদ কোনো স্বর্ণ বা অর্থ দিলে তা কাজীর মাধ্যমে নিকাহনামায় নোট করান অথবা লিখিত রসিদ নিন।
- ব্যাংক ট্রানজেকশনে স্পষ্ট উল্লেখ: ব্যাংকে অর্থ পাঠালে ডিপোজিট স্লিপে বা বিবরণে ‘দেনমোহর বাবদ’ সুস্পষ্টভাবে লিখতে হবে।
- দেনমোহরের দাবি না ছাড়া: কোনো বিরোধ ছাড়াই স্ত্রী যেন কোনো সাদা কাগজে দেনমোহর মাফের সই না দেন।
- পারিবারিক আদালতে দ্রুত শরণাপন্ন হওয়া: স্বামী অবহেলা করলে বিলম্ব না করে দেনমোহর ও খোরপোষের আরজি দাখিল করুন।
- আইনজীবীদের জন্য কৌশল: সাক্ষ্য আইনের ৯১/৯২ ধারা ও ৫০ ডিএলআর (এডি) ১৬৩ নজির রেফার করে স্বামীর মৌখিক ডিফেন্সের গ্রহণযোগ্যতা বাতিল করান।

