লেটার অব ক্রেডিট (L/C)-এর দায় অর্থ ঋণ আদালত আইনের অধীনে সংবিধিবদ্ধ ‘ঋণ’: ব্যাংক এশিয়া বনাম যমুনা ব্যাংক মামলায় হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়
⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত
বাণিজ্যিক ঋণপত্র বা লেটার অব ক্রেডিট (Letter of Credit – L/C)-এর অধীনে সৃষ্ট কোনো আর্থিক দায় অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ২(গ) ধারার সংজ্ঞামতে শতভাগ সংবিধিবদ্ধ ‘ঋণ’ (Debt)। কোনো ইস্যুকারী ব্যাংক (Issuing Bank) একবার এলসি গ্রহণ ও অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা প্রদানের পর পরবর্তীতে ক্রেতা ও বিক্রেতার অভ্যন্তরীণ বিরোধ বা ফোর্সড লোন তৈরি না হওয়ার অজুহাত তুলে নেগোশিয়েটিং ব্যাংকের (Negotiating Bank) পাওনা পরিশোধে অস্বীকৃতি জানাতে পারে না। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ রায় দিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং নিয়মে এলসি হলো সম্পূর্ণ স্বাধীন চুক্তি এবং এই দায় খেলাপি হলে সরাসরি অর্থ ঋণ আদালতে মামলা গ্রহণযোগ্য। ব্যাংক এশিয়ার আপিল খারিজ করে যমুনা ব্যাংকের অনুকূলে কোটি টাকার ডিক্রি বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট।
১. মামলার প্রেক্ষাপট ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ (Facts of the Case)
মামলাটি চট্টগ্রাম অর্থ ঋণ আদালতের ২০১৪ সালের ৩৯৯ নং অর্থ ঋণ মোকদ্দমার (Artha Rin Suit No. 399 of 2014) রায়ের বিরুদ্ধে ব্যাংক এশিয়া লিমিটেড কর্তৃক দায়েরকৃত প্রথম আপিল। মোকদ্দমার মূল ঘটনা হলো, ব্যাংক এশিয়া লিমিটেড তার এক আমদানিকারক গ্রাহকের অনুকূলে অভ্যন্তরীণ ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি (Inland Letter of Credit) ইস্যু করে। যমুনা ব্যাংক লিমিটেড নেগোশিয়েটিং ব্যাংক হিসেবে উক্ত এলসির কাগজপত্র ও ডকুমেন্ট যাচাই করে এবং ব্যাংক এশিয়ার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও পেমেন্ট নিশ্চিতকরণ পাওয়ার পর বেনিফিশিয়ারি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে এলসির মূল্য বাবদ কোটি টাকা পরিশোধ করে।
পরবর্তীতে এলসির নির্ধারিত মেয়াদপূর্তিতে যমুনা ব্যাংক অর্থ ফেরতের দাবি জানালে ব্যাংক এশিয়া দাবি করে যে, তাদের গ্রাহক মালপত্র বুঝে পায়নি এবং ব্যাংকে কোনো ‘ফোর্সড লোন’ সৃষ্টি না হওয়ায় এই দায় অর্থ ঋণ আইনের আওতায় কোনো ঋণ হিসেবে গণ্য হতে পারে না। এই অবস্থায় যমুনা ব্যাংক চট্টগ্রাম অর্থ ঋণ আদালতে কোটি টাকার ডিক্রি চেয়ে অর্থ ঋণ মামলা দায়ের করে এবং আদালত যমুনা ব্যাংকের অনুকূলে ডিক্রি প্রদান করেন। এর বিরুদ্ধেই ব্যাংক এশিয়া হাইকোর্টে আপিল দায়ের করে।
২. বাদী ও বিবাদীর মুখোমুখি আইনি অবস্থান (Pleadings & Contentions)
🟢 যমুনা ব্যাংকের যুক্তি
- এলসি একটি কঠোর ও স্বাধীন বাণিজ্যিক চুক্তি (Independent Contract)।
- ইস্যুকারী ব্যাংক একবার একসেপ্টেন্স দিলে তা পরিশোধ করতে আইনত বাধ্য।
- অর্থ ঋণ আইনের ২(গ) ধারায় ব্যাংকিং সুবিধায় সৃষ্ট সকল দায়ই অর্থ ঋণের এক্তিয়ারভুক্ত।
🔴 ব্যাংক এশিয়ার যুক্তি
- গ্রাহকের অনুকূলে নগদ লোন ডিসবার্স করা হয়নি, কেবল গ্যারান্টি ছিল।
- গ্রাহক পণ্য না পাওয়ায় ব্যাংক দায়মুক্ত থাকবে।
- অর্থ ঋণ আদালতে দুই ব্যাংকের মধ্যকার এলসি বিরোধ বিচারযোগ্য নয়।
৩. অধস্তন অর্থ ঋণ আদালতের রায় (Judgment of Trial Court)
চট্টগ্রামের অর্থ ঋণ আদালতের বিজ্ঞ জজ ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর তারিখে মামলাটি সম্পূর্ণ ডিক্রি করেন। আদালত সুস্পষ্টভাবে রায় দেন যে, ইউসিপিডিসি (UCP 600) ও দেশের প্রচলিত ব্যাংকিং আইন অনুযায়ী এলসি ইস্যুকারী ব্যাংক নেগোশিয়েটিং ব্যাংকের বৈধ পেমেন্ট আটকে রাখতে পারে না এবং এই আর্থিক পাওনা অর্থ ঋণ আইনের সংজ্ঞায় সরাসরি ঋণ হিসেবে আদায়যোগ্য।
৪. হাইকোর্ট বিভাগের গভীর আইনি পর্যবেক্ষণ ও রেশিও (High Court’s Ratio Decidendi)
বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান এবং বিচারপতি তামান্না রহমান খালিদীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আপিলটি বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে রায় প্রদান করেন:
৫. চূড়ান্ত রায় ও ফলাফল (Final Verdict)
হাইকোর্ট বিভাগ ব্যাংক এশিয়ার দায়েরকৃত প্রথম আপিলটি সরাসরি খারিজ (Dismissed) করে দেন এবং অর্থ ঋণ আদালত চট্টগ্রামের ডিক্রি শতভাগ বহাল রাখেন। একই সাথে নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে মূল টাকা ও আরোপিত সুদ পরিশোধের নির্দেশ প্রদান করেন।
৬. রায়ের মূল আইনি শিক্ষা ও নজির
- ইস্যুকারী ব্যাংক একবার স্বীকৃতি দিলে তা ফেরত নেওয়ার কোনো আইনগত অধিকার থাকে না।
- অর্থ ঋণ আদালত বাণিজ্যিক এলসি বিরোধ ও আর্থিক নিষ্পত্তির উপযুক্ত ট্রাইব্যুনাল।
- গ্রাহকের সাথে ব্যাংকের বিরোধের দায় নেগোশিয়েটিং ব্যাংকের ওপর চাপানো সম্পূর্ণ অবৈধ।
৭. ব্যবসায়ী ও ব্যাংকারদের জন্য ৫টি জরুরি সতর্কতা ও করণীয়
- এলসি নথিপত্র যথাযথ যাচাই: নেগোশিয়েশনের পূর্বে এলসি ক্লজ ও পরিবহন দলিল নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করুন।
- লিখিত একসেপ্টেন্স নিশ্চিতকরণ: ইস্যুকারী ব্যাংক থেকে অফিসিয়াল সুইফট বা লিখিত পেমেন্ট আশ্বাস ছাড়া অর্থ ছাড় করবেন না।
- অর্থ ঋণ আদালতে অবিলম্বে নোটিশ: এলসি খেলাপি হলে সাধারণ দেওয়ানী আদালতের বদলে দ্রুত অর্থ ঋণ আদালতে শরণাপন্ন হন।
- গ্রাহকের নিরাপত্তা জামানত: এলসি খোলার সময় গ্রাহকের নিকট থেকে পর্যাপ্ত স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রাখুন।
- ইউসিপিডিসি নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা: আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যিক ঋণপত্র পরিচালনায় ব্যাংকিং নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটাবেন না।

