প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ মামলায় জালিয়াতির অভিযোগ: আইনজীবী ছিদ্দিক উল্লাহ মিয়াকে ঢাকা ছাড়তে আপিল বিভাগের নিষেধাজ্ঞা
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত একাধিক মামলায় জালিয়াতির মাধ্যমে রায় নেওয়ার গুরুতর অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ছিদ্দিক উল্লাহ মিয়াকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঢাকা ছাড়তে নিষেধ করেছেন আপিল বিভাগ। শুনানিকালে সংশ্লিষ্ট ঘটনার প্রেক্ষিতে আইনজীবী ছিদ্দিক উল্লাহ মিয়া সর্বোচ্চ আদালতের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তবে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না দিয়ে আগামী সোমবার পরবর্তী আদেশ দেওয়ার দিন ধার্য করেছেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চ এই আদেশ দেন। শুনানির একপর্যায়ে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, পরবর্তী আদেশ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট আইনজীবী রাজধানী ঢাকা ত্যাগ করতে পারবেন না।
এর আগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত একটি রিট মামলায় রুল জারির পর কোনো প্রকার আনুষ্ঠানিক ও নিয়মিত শুনানি ছাড়াই সরাসরি রায় নেওয়ার বিষয়টি আপিল বিভাগের নজরে আসে। অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল আদালতকে জানান, মামলার নথিপত্র এবং কার্যপ্রণালী নিবিড়ভাবে পর্যালোচনার সময় এই কথিত জালিয়াতি ও নজিরবিহীন অনিয়মের বিষয়টি ধরা পড়ে।
ঘটনার গুরুত্ব ও নথির অসঙ্গতি বিবেচনায় নিয়ে আপিল বিভাগ মৌখিকভাবে পর্যবেক্ষণ দেন যে, সত্য উদঘাটন ও বিচারিক স্বচ্ছতা বজায় রাখার স্বার্থে প্রয়োজনে তৎকালীন হাইকোর্টের বিচারপতি নাইমা হায়দারের বেঞ্চের সংশ্লিষ্ট সব রায় পুনর্বিবেচনা (রিকল বা রিভিউ) করা হতে পারে। এমনকি প্রয়োজন দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের বিচারপতিদের কাছ থেকেও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়া হতে পারে বলে সর্বোচ্চ আদালত উল্লেখ করেন।
নয়টি মামলায় একই প্রক্রিয়ায় রায় নেওয়ার অভিযোগ
আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত মোট নয়টি পৃথক মামলায় শুনানি ও রায় গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সুপরিকল্পিত জালিয়াতি ও কারসাজির অভিযোগ উঠেছে আইনজীবী ছিদ্দিক উল্লাহ মিয়ার বিরুদ্ধে। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে বিচারপতি নাইমা হায়দারের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের তৎকালীন দ্বৈত বেঞ্চে নিয়মিত আইনি প্রক্রিয়া এবং বিচারিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করে এসব রায় নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।
পরবর্তীতে রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের ওইসব বিতর্কিত রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল দায়ের করে। আপিল বিভাগে নথিপত্র যাচাই-বাছাই ও আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনাকালে রায় পাওয়ার দ্রুততা, প্রক্রিয়াগত বিচ্যুতির চিত্র এবং জালিয়াতির দিকগুলো উন্মোচিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার (২৮ অক্টোবর) সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর প্রেক্ষাপট ও নথির বিষয়ে ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা দিতে আইনজীবী ছিদ্দিক উল্লাহ মিয়াকে আপিল বিভাগে তলব করা হয়। নির্ধারিত দিনে তিনি হাজির হয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চান, তবে বিষয়টি গুরুতর হওয়ায় আপিল বিভাগ ঢাকা ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে পরবর্তী আদেশের জন্য দিন নির্ধারণ করেন।
যে প্রক্রিয়ায় রায় হাসিলের অভিযোগ
মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০২০ সালের ৯১৯ নম্বর রিট মামলায় বিচারপতি নাইমা হায়দারের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বিভাগের দ্বৈত বেঞ্চ ২০২৩ সালের ১৬ অক্টোবর চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। ওই রায়ে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০১৩’-এর ৭ নম্বর বিধি অনুযায়ী ৬০ শতাংশ নারী কোটা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। ফলে তৎকালীন প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলাফল আদালত কর্তৃক বাতিল ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে আগামী ছয় মাসের মধ্যে নতুন করে সংশোধিত মেধাতালিকা প্রণয়ন করে রিট আবেদনকারীদের নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিল।
তদন্ত ও অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, মূল রিট পিটিশনে আবেদনকারীর সংখ্যা ছিল মোট ৫৮ জন। কিন্তু পরবর্তীতে আদালতের চোখ ফাঁকি দিয়ে আরও ৬৪ জনকে নতুন সহ-আবেদনকারী (কো-পিটিশনার) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে একটি অতিরিক্ত হলফনামা সম্পন্ন করা হয়। সবচেয়ে বড় অনিয়মের অভিযোগ হলো—হাইকোর্টের নিয়মিত সেকশন-প্রক্রিয়া অনুসরণ, আবেদনকারীদের নাম যথাযথভাবে তালিকাভুক্তকরণ কিংবা বিবাদী পক্ষ অর্থাৎ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে কোনো প্রকার আইনি নোটিশ প্রদান ছাড়াই নথিটি সরাসরি এজলাসে বিচারকের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
অভিযোগে আরও প্রকাশ পায়, কোনো নিয়মতান্ত্রিক সুযোগ না দিয়েই মাত্র এক দিনের মধ্যে আবেদন মঞ্জুর এবং রুলের শুনানি সম্পন্ন দেখানো হয়। মূল শুনানির মাত্র চার দিনের মাথায় হাইকোর্ট বিভাগ থেকে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ঘোষিত রায়ে রিটের মূল ৫৮ জন আবেদনকারীকে কার্যত বাইরে রেখে পরবর্তীতে নিয়মবহির্ভূতভাবে যুক্ত হওয়া নতুন ৬৪ জন সহ-আবেদনকারীর অনুকূলে নিয়োগের আদেশ দেওয়া হয়েছিল বলে সুস্পষ্ট তথ্য উঠে এসেছে। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত এ ধরনের মোট নয়টি মামলায় প্রায় অভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
আইনজীবীর বক্তব্য ও আদালতের অবস্থান
হাইকোর্টের দেওয়া এসব রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল শুনানিকালে বিচারপতিদের সামনে নথিপত্রের অসঙ্গতি প্রকট হয়ে ওঠে। আপিল বিভাগ শুনানিতে প্রক্রিয়াগত বিচ্যুতির বিষয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। আদালত স্পষ্ট করেন যে, বিচার বিভাগের মর্যাদা ও স্বচ্ছতা রক্ষায় প্রয়োজনে বিচারপতি নাইমা হায়দারের তৎকালীন বেঞ্চের সব রায় পুনর্বিবেচনা করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের বিচারপতিদের বক্তব্যও বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।
এদিকে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে আইনজীবী ছিদ্দিক উল্লাহ মিয়া আত্মপক্ষ সমর্থন করে দাবি করেন, মামলা চলাকালে মূল আবেদনকারীদের মধ্য থেকে কিছু ব্যক্তি বাদ পড়েছিলেন এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী কিছু নতুন আবেদনকারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তিনি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই দায়িত্ব পালন করেছেন দাবি করে আরও উল্লেখ করেন, আদালতের সংশ্লিষ্ট সেকশনে হয়তো কিছু প্রক্রিয়াগত জটিলতা বা বিভ্রান্তি তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তবে আপিল বিভাগে তিনি ইতোমধ্যেই ঘটনার সার্বিক প্রেক্ষিতে আদালতের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।


