তথ্য গোপন করে নেওয়া জামিন বাতিল, ১৬ বছরের শিশুকে কিশোর উন্নয়নকেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ
চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী থানায় দায়ের করা একটি বলাৎকার মামলায় হাইকোর্টে জামিন আবেদন বিচারাধীন থাকার তথ্য গোপন করে জামিন নেওয়ার ঘটনায় আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত ১৬ বছর বয়সী এক শিশুর জামিন বাতিল করেছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে পুনরায় গাজীপুরের কিশোর উন্নয়নকেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গতকাল সোমবার (১৯ অক্টোবর) চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭-এর বিচারক শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। শুনানি চলাকালে হাইকোর্টে থাকা মামলার মূল নথি কীভাবে বিচারিক আদালতে উপস্থাপন করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীকেও সতর্ক করেছেন আদালত। ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আলমগীর মোহাম্মদ ইউনুছ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলার বিবরণ ও মূল অভিযোগ
মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্ট নথিসূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন খলিলপট্টি মারকাযুল কুরআন ওয়াচ্ছুন্নাহ মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের ১০ বছর বয়সী এক শিশু শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুর মা বাদী হয়ে ঘটনার প্রায় চার মাস পর, গত ১১ মে কোতোয়ালী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলায় মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের ১৬ বছর বয়সী শিক্ষক আব্দুল্লাহ বিন হুমায়ুনকে একমাত্র আসামি করা হয়। এজাহারে অভিযোগ আনা হয়েছে যে অভিযুক্ত ওই শিশু শিক্ষক এর আগেও বিভিন্ন সময়ে ভুক্তভোগী শিশুটিকে একাধিকবার বলাৎকার করেছে। মামলা দায়েরের দিনই কোতোয়ালী থানা পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করে। ওই সময় বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আইনের বিধান অনুযায়ী তাকে কিশোর উন্নয়নকেন্দ্রে রাখা হয়।
হাইকোর্টে আবেদন বিচারাধীন থাকার তথ্য গোপন
আদালত ও ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারকের আদালতে আসামিপক্ষের জামিনের আবেদন করা হলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। জামিন শুনানির সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী ট্রাইব্যুনালকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে এই মামলার বিষয়ে উচ্চ আদালত কিংবা হাইকোর্ট বিভাগে কোনো মামলা বা জামিনের আবেদন বিচারাধীন নেই।
তবে জামিন মঞ্জুর হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে বাদীপক্ষ। পরে তারা জানতে পারেন যে বিচারিক আদালতে জামিন চাওয়ার আগেই আসামির পক্ষে হাইকোর্ট বিভাগে জামিন চেয়ে আবেদন করা হয়েছিল। হাইকোর্টে জামিন সংক্রান্ত আবেদনটি ‘ক্রিমিনাল আপিল মামলা নং-৪৮১৪/২০২৬’ হিসেবে বিচারাধীন রয়েছে।
নথি অনুযায়ী, মামলাটি হাইকোর্টের অ্যানেক্স ভবনের ৮ নম্বর আদালতে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। হাইকোর্ট থেকে সর্বশেষ গত ১৫ সেপ্টেম্বর এক আদেশে জানানো হয়েছিল যে অবকাশকালীন ছুটির পর এ বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
জামিন বাতিলের আবেদন ও আদালতের কঠোর পর্যবেক্ষণ
উচ্চ আদালতে জামিন আবেদন বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও সেই তথ্য সম্পূর্ণ গোপন করে বিচারিক আদালত থেকে জামিন হাসিল করার বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন বাদীপক্ষের আইনজীবী। এরপর তথ্য গোপনের বিষয়টি উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনালে জামিন বাতিলের আবেদন জমা দেওয়া হয়।
ট্রাইব্যুনাল সূত্রে প্রকাশ, সোমবার ওই জামিন বাতিলের আবেদনের ওপর উভয়পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থিতিতে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে হাইকোর্টে আবেদন বিচারাধীন থাকার বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় এবং তথ্য গোপনের বিষয়টি আমলে নিয়ে আদালত তাৎক্ষণিকভাবে শিশুটির পূর্বের জামিন আদেশ বাতিল ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে অভিযুক্ত শিশুকে পুনরায় গাজীপুরের কিশোর উন্নয়নকেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক।
এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের পিপি আলমগীর মোহাম্মদ ইউনুছ জানান, উচ্চ আদালতে কোনো জামিনের আবেদন বিচারাধীন থাকা অবস্থায় বিচারিক আদালতে একই বিষয়ে জামিন প্রার্থনা করার কোনো আইনি সুযোগ নেই। এটি আইনসম্মত নয়। এ ছাড়া হাইকোর্টে বিচারাধীন মামলার মূল নথি বিচারিক আদালতে কীভাবে উপস্থাপন করা হলো, তা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে আদালত সংশ্লিষ্ট আইনজীবীকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন।

