কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মাহবুবউল আলম হানিফের মৃত্যুদণ্ড, তিন নেতার আমৃত্যু কারাদণ্ড
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়া শহরে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ছয়জনকে হত্যার দায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই মামলায় কুষ্টিয়া জেলা ও শহর পর্যায়ের দলটির আরও তিন শীর্ষ নেতাকে আমৃত্যু কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের প্রত্যেকেই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুর ১২টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল জনাকীর্ণ এজলাসে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। বিচারিক প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। রায় ঘোষণার শুরুতে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী সংক্ষিপ্ত পর্যবেক্ষণ পাঠ করেন এবং পরবর্তীতে সাজা ঘোষণা করেন।
মামলায় আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত অপর তিন আসামি হলেন কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা। ট্রাইব্যুনাল তাঁদের বিরুদ্ধে আনা মানবতাবিরোধী অপরাধ ও হত্যার ষড়যন্ত্র, উসকানি এবং সরাসরি নির্দেশনার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ ও স্টেট ডিফেন্স
রায় ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনালের এজলাসে রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউশনের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তাঁর সঙ্গে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, সহিদুল ইসলাম সরদার ও জহিরুল আমিনসহ প্রসিকিউশনের অন্য আইনজীবীরা শুনানি ও উপস্থিতিতে অংশ নেন। অন্যদিকে পলাতক চার আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী (স্টেট ডিফেন্স) হিসেবে মামলা পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট আমির হোসেন। বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে উভয় পক্ষই সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনি নজির উপস্থাপন করে বিস্তারিত যুক্তিতর্ক তুলে ধরেন।
মামলার বিচারিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা
কুষ্টিয়ার এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মামলায় বিচার প্রক্রিয়াটি পর্যায়ক্রমে অগ্রসর হয়। গত ৭ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তি-পাল্টাযুক্তি খণ্ডনের মধ্য দিয়ে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচারিক শুনানি শেষ হয়েছিল। সেদিনই ট্রাইব্যুনাল মামলাটি যেকোনো দিন রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। পরবর্তীতে ২৭ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল ২৯ অক্টোবর রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করে কার্যতালিকা প্রকাশ করেন।
এর আগে গত ১০ জুন যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে মামলাটি একবার রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল। তবে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মামলার পূর্ণাঙ্গ বিচারের স্বার্থে অতিরিক্ত প্রমাণাদি ও নথিপত্র দাখিল করা হলে ট্রাইব্যুনাল পুনরায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের অনুমতি দেন এবং শুনানি গ্রহণ করেন। এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার জেরা সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রসিকিউশনের মোট ১৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত হয়েছিল ২৩ এপ্রিল।
মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগের প্রক্রিয়া অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ফর্মাল চার্জ) দাখিল করে। পরদিন ৬ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নেন। এরপর ওই বছরের ২ নভেম্বর চার আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তিনটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনাল-২ আনুষ্ঠানিকভাবে মামলার বিচার শুরুর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
হানিফসহ চার আসামির বিরুদ্ধে আনীত তিন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন মোট তিনটি সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেছিল। এর মধ্যে প্রথমটি ছিল দেশব্যাপী জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমনে ষড়যন্ত্র, উসকানি ও সহায়তা প্রদান; দ্বিতীয়টি কুষ্টিয়া জেলা শহরে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে সশস্ত্র বল প্রয়োগের নির্দেশ এবং তৃতীয়টি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে ছয়জনকে গুলি করে হত্যার নির্মম ঘটনা।
১. গণ-অভ্যুত্থান দমনে উসকানি, ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের পরিকল্পনা সমর্থন
প্রথম অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করছিল, তখন ১৫, ১৭ ও ৩০ জুলাই এবং ৩ আগস্ট তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে একাধিক উচ্চপর্যায়ের দলীয় সভা ও নীতিনির্ধারণী বৈঠকে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন মাহবুবউল আলম হানিফ। এসব সভায় আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী আক্রমণ চালানোর যে উসকানিমূলক বার্তা ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, হানিফ তাতে পূর্ণ সমর্থন ও সহায়তা দেন বলে অভিযোগ আনা হয়।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন হানিফ। সেখানে তিনি চলমান আন্দোলনকে ‘জামায়াত’, ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘সাম্প্রদায়িক শক্তির তৎপরতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে গণআন্দোলন সহিংসভাবে দমন করতে দল ও প্রশাসনকে উসকানি ও প্ররোচনা দেন। প্রসিকিউশনের অভিযোগে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সরকারের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে আধুনিক ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে অবস্থান শনাক্ত করা এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ করে নিরস্ত্র জনতাকে হত্যার যে নৃশংস পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, হানিফ তাতে সরাসরি সমর্থন ও নীতিনির্ধারণী ভূমিকা পালন করেন।
২. কুষ্টিয়ায় ছাত্র-জনতার ওপর সর্বোচ্চ বল প্রয়োগের নির্দেশ
দ্বিতীয় অভিযোগটি কুষ্টিয়ার স্থানীয় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র সম্পর্কিত। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে মাহবুবউল আলম হানিফের সভাপতিত্বে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতাসহ দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
প্রসিকিউশনের প্রমাণ অনুযায়ী, ওই বৈঠকে হানিফ কুষ্টিয়ার স্থানীয় ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও প্রতিবাদকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং যেকোনো মূল্যে কুষ্টিয়ায় আন্দোলন দমন করার জন্য দলীয় ক্যাডার ও পুলিশ প্রশাসনকে ‘সর্বোচ্চ বল প্রয়োগ’ তথা মারণাস্ত্র ব্যবহারের সরাসরি নির্দেশ দেন। তাঁর এই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে অন্য নেতারাও দলীয় অস্ত্রধারীদের প্রস্তুত করেন এবং ছাত্র-জনতার ওপর সশস্ত্র হামলা ও প্রাণঘাতী বল প্রয়োগের পথ উন্মুক্ত করেন।
৩. ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যার নির্মম ঘটনা
মামলার সবচেয়ে গুরুতর ও প্রত্যক্ষ অভিযোগটি হলো ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে সংগঠিত ছয়জন নিরীহ নাগরিকের হত্যাকাণ্ড। সেদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে কুষ্টিয়ার সর্বস্তরের জনতা রাজপথে নেমে এসেছিলেন।
অভিযোগের বিবরণে বলা হয়, সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ ও সাধারণ নাগরিকেরা শহরের হাসপাতাল মোড় এলাকায় জড়ো হন। সেখান থেকে তাঁরা শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে চৌড়হাস হয়ে মজমপুরের দিকে এগোতে থাকলে পূর্বপরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র কর্মীরা এবং পুলিশের একটি অংশ যৌথভাবে মিছিলে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ শুরু করে। কোনো কোনো স্থানে পুলিশ সদস্যরা আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল ও বুলেটের পাশাপাশি সশস্ত্র রাজনৈতিক ক্যাডারদের সরাসরি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়।
দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে গুলিবিদ্ধ হয়ে ছয়জন ব্যক্তি প্রাণ হারান। তাঁরা হলেন:
- আশরাফুল ইসলাম (শ্রমিক): কুষ্টিয়া শহরের বক চত্বর থেকে প্রায় ৫০ গজ উত্তরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
- সুরুজ আলী বাবু (শ্রমিক): বার্মিজ গলি এলাকায় প্রাণঘাতী বুলেটের আঘাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান।
- আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন (শিক্ষার্থী): হরিপুরগামী প্রধান সড়কে আড়ং শোরুমের সামনে গুলিতে প্রাণ হারান।
- উসামা (শিক্ষার্থী): একই স্থানে হরিপুরগামী সড়কে আন্দোলনরত অবস্থায় গুলিতে নিহত হন।
- বাবলু ফরাজী (ব্যবসায়ী): শহরের তুলাপট্টির গলির মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান।
- ইউসুফ শেখ (চাকরিজীবী): ফায়ার সার্ভিসের বিপরীত পাশের প্রধান সড়কে প্রাণঘাতী গুলিতে শহীদ হন।
প্রসিকিউশন সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে আদালতকে জানায়, মাহবুবউল আলম হানিফের দেওয়া পূর্বপরিকল্পিত নির্দেশনা ও অপর তিন নেতার প্রত্যক্ষ সহায়তায় এই হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়িত হয়েছিল। ট্রাইব্যুনাল পুরো সাক্ষ্য ও পারিপার্শ্বিক তথ্য পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন যে, আসামিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা, উসকানি ও প্ররোচনার অভিযোগ সুস্পষ্টভাবে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর প্রেক্ষিতেই ট্রাইব্যুনাল মাহবুবউল আলম হানিফকে সর্বোচ্চ সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড এবং সদর উদ্দিন খান, আজগর আলী ও আতাউর রহমান আতাকে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন।

