থানায় জিডি (GD) করার নিয়ম ও অনলাইনে সাধারণ ডায়েরি করার সহজ উপায় (নমুনা ফরম্যাট সহ)
🛡️ সাধারণ ডায়েরি (GD) কী এবং কেন করা হয়?
সাধারণ ডায়েরি বা জিডি (General Diary – GD): বাংলাদেশ পুলিশ রেগুলেশনস (PRB) প্রবিধান ৩৭৭ এবং ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ৪৪ ধারা অনুযায়ী প্রতিটি থানায় প্রতিদিনের সার্বিক ঘটনা, অভিযোগ, নাগরিকের নিরাপত্তা শঙ্কা এবং মূল্যবান নথিপত্র হারানোর তথ্য যে অফিসিয়াল রেজিস্টার বইয়ে লিপিবদ্ধ করা হয় তাকে সাধারণ ডায়েরি বা জিডি বলা হয়। কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই যদি কোনো ব্যক্তি কারো কাছ থেকে প্রাণনাশের হুমকি পান, নিরাপত্তা শঙ্কা বোধ করেন কিংবা তার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), পাসপোর্ট, চেকবই বা সার্টিফিকেট হারিয়ে যায়—তবে ভবিষ্যতে যে কোনো আইনি সুরক্ষা ও প্রতিকার পাওয়ার প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ হলো থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এন্ট্রি করা।
১. কোন কোন পরিস্থিতিতে থানায় জিডি করা আবশ্যক?
- ভয়ভীতি ও জীবননাশের হুমকি পেলে: কেউ মোবাইলে, মেসেজে বা সরাসরি এসে প্রাণনাশের বা মারধরের হুমকি দিলে তাৎক্ষণিক আইনি রেকর্ড সৃষ্টির জন্য।
- মূল্যবান কাগজপত্র ও সার্টিফিকেট হারিয়ে গেলে: এস.এস.সি/এইচ.এস.সি মূল সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট বা জমির মূল দলিল হারালে ডুপ্লিকেট উত্তোলনের জন্য জিডি নম্বর বাধ্যতামূলক।
- স্মার্টফোন, সিম কার্ড বা ল্যাপটপ হারালে: হারিয়ে যাওয়া মোবাইল দিয়ে কোনো সন্ত্রাসী বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটলে পুলিশ যেন মূল মালিককে সন্দেহ না করে।
- ব্যাংক চেক বা সঞ্চয়পত্র হারিয়ে গেলে: ব্যাংকে স্টপ পেমেন্ট দেওয়ার পাশাপাশি জিডি কপি জমা দেওয়া আবশ্যক।
- জমিজমা বা সীমানা নিয়ে সম্ভাব্য বিরোধের আশঙ্কায়: প্রতিপক্ষ শান্তিভঙ্গ করতে পারে এমন যুক্তিসংগত আশঙ্কা থাকলে আগাম প্রতিরোধমূলক জিডি করা যায়।
- বাড়িভাড়াটিয়া বা গৃহকর্মী সংক্রান্ত তথ্য প্রদানে: নতুন ভাড়াটিয়ার নিরাপত্তা যাচাই ও পরিচিতি সুরক্ষায়।
২. সরাসরি কপি করার উপযোগী ৩টি বাস্তবসম্মত নমুনা জিডি আবেদন ফরম্যাট
নিচে দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে সাধারণ ৩টি ঘটনার প্রস্তুতকৃত জিডি দরখাস্তের ফরম্যাট দেওয়া হলো। আপনি বন্ধনীর মধ্যের তথ্য পরিবর্তন করে সরাসরি সাদা কাগজে আবেদন লিখতে পারেন:
📋 নমুনা ১: জীবননাশের হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের জিডি দরখাস্ত
বরাবর,
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)
[………………………] থানা, [………………………] জেলা।
বিষয়: জীবননাশের হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের প্রেক্ষিতে সাধারণ ডায়েরি (GD) করার আবেদন।
মহোদয়,
আমি নিম্নস্বাক্ষরকারী [আপনার নাম] (বয়স: ….. বছর), পিতা: [পিতার নাম], মাতা: [মাতার নাম], স্থায়ী সাং: [গ্রাম/মহল্লা], বর্তমান সাং: [বর্তমান ঠিকানা], পেশা: [পেশা], এই মর্মে থানায় হাজির হইয়া সাধারণ ডায়েরিভুক্তির আবেদন করিতেছি যে—
১. নিম্নবর্ণিত বিবাদী [বিবাদীর নাম] (বয়স: ….. বছর), পিতা: [পিতার নাম], সাং: [ঠিকানা] এর সহিত আমার পূর্বে জমিজমা/ব্যবসায়িক বিষয় লইয়া মনোমালিন্য চলিতেছিল।
২. এমতাবস্থায় গত [তারিখ] তারিখ আনুমানিক দুপুর [সময়] ঘটিকার সময় বিবাদী তাহার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর [বিবাদীর মোবাইল নম্বর] হইতে আমার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর [আপনার নম্বর]-এ কল দিয়া অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং আমাকে এই মর্মে সুস্পষ্ট হুমকি দেয় যে, “রাস্তাঘাটে পাইলে তোকে খুন করিয়া ফেলিব এবং তোর পরিবারের বড় ধরনের ক্ষতি করিব।”
৩. উক্ত ঘটনার পর হইতে আমি ও আমার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগিতেছি এবং যেকোনো সময় বিবাদী আমার ওপর সশরীরে প্রাণঘাতী হামলা করিতে পারে বলিয়া যুক্তিসংগত আশঙ্কা করিতেছি। ভবিষ্যতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিলে আইনি প্রমাণের স্বার্থে বিষয়টি ডায়েরিভুক্ত থাকা একান্ত প্রয়োজন।
অতএব, মহোদয়ের নিকট বিনীত প্রার্থনা, উপরোক্ত বিষয়টি থানার সাধারণ ডায়েরিতে (GD) এন্ট্রিভুক্ত করিয়া প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ ও আমার জানমালের নিরাপত্তা বিধানে আপনার মর্জি হয়।
বিনীত নিবেদক,
স্বাক্ষর: …………………………………
নাম: [আপনার নাম]
জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর: [এনআইডি নম্বর]
মোবাইল নম্বর: [আপনার সচল মোবাইল নম্বর]
📋 নমুনা ২: জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), সার্টিফিকেট বা পাসপোর্ট হারানোর জিডি
বরাবর,
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)
[………………………] থানা, [………………………] জেলা।
বিষয়: এসএসসি ও এইচএসসি মূল সার্টিফিকেট এবং এনআইডি কার্ড হারানোর সাধারণ ডায়েরি।
মহোদয়,
আমি নিম্নস্বাক্ষরকারী [আপনার নাম], পিতা: [পিতার নাম], সাং: [ঠিকানা], মোবাইল: [মোবাইল নম্বর], এই মর্মে জানাচ্ছি যে, গত [তারিখ] তারিখে আনুমানিক বিকাল [সময়] ঘটিকার সময় আমি [স্থান ১] হইতে [স্থান ২] যাওয়ার পথে আমার ব্যক্তিগত ফাইলটি হারিয়ে ফেলি। বহু খোঁজাখুঁজি করিয়াও উক্ত ফাইলের কোনো সন্ধান পাই নাই।
উক্ত হারিয়ে যাওয়া ফাইলে নিম্নবর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ছিল:
(ক) এসএসসি মূল সনদ ও নম্বরপত্র (রোল নং: ……, রেজিস্ট্রেশন নং: ……, বোর্ড: ঢাকা, পাসের সন: ……)।
(খ) এইচএসসি মূল সনদ (রোল নং: ……, রেজিস্ট্রেশন নং: ……, বোর্ড: ঢাকা, পাসের সন: ……)।
(গ) আমার মূল জাতীয় পরিচয়পত্র (স্মার্ট কার্ড নম্বর: ………………………..)।
উক্ত সনদসমূহ পুনরায় ডুপ্লিকেট উত্তোলন এবং হারিয়ে যাওয়া নথির অপব্যবহার রোধকল্পে বিষয়টি সাধারণ ডায়েরিভুক্ত করা একান্ত আবশ্যক।
অতএব, মহোদয় সমীপে প্রার্থনা, হারিয়ে যাওয়া নথিপত্রাদির বিবরণ থানার সাধারণ ডায়েরিভুক্ত করিয়া আমাকে জিডি নম্বরের একটি অনুলিপি প্রদানে আপনার সুমর্জি হয়।
নিবেদক,
[আপনার নাম ও স্বাক্ষর]
📋 নমুনা ৩: মোবাইল ফোন বা সিম কার্ড হারানোর জিডি ফরম্যাট
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)
[………………………] থানা, [………………………] জেলা।
বিষয়: ব্যবহৃত স্মার্টফোন ও রেজিস্ট্রেশনকৃত সিম কার্ড হারানোর জিডি।
মহোদয়,
বিনীত নিবেদন এই যে, গত [তারিখ] তারিখ আনুমানিক সন্ধ্যা [সময়] টার সময় [স্থানের নাম] এলাকায় আমার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি অসাবধানতাবশত পকেট হইতে পড়িয়া হারিয়ে যায়।
হারিয়ে যাওয়া মোবাইল ও সিমের বিবরণ:
(১) হ্যান্ডসেটের ব্র্যান্ড ও মডেল: [যেমন: Xiaomi Redmi Note 12]
(২) IMEI-1 নম্বর: [১৫ ডিজিটের আইএমইআই নম্বর]
(৩) IMEI-2 নম্বর: [১৫ ডিজিটের আইএমইআই নম্বর]
(৪) হারিয়ে যাওয়া সিম নম্বর: [০১৭XXXXXXXX]
(৫) মোবাইল সেটের আনুমানিক মূল্য: [২৫,০০০/- টাকা]
উক্ত মোবাইল ও সিম কার্ডের অপব্যবহারের দায় এড়াতে এবং সিম পুনরায় রি-ইস্যু করার স্বার্থে বিষয়টি সাধারণ ডায়েরিভুক্ত করার প্রার্থনা জানাচ্ছি।
নিবেদক,
[আপনার নাম ও মোবাইল]
৩. ঘরে বসে অনলাইনে জিডি (Online GD) করার ধাপে ধাপে সহজ উপায়
বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশ ঘরে বসেই নাগরিকদের অনলাইনে জিডি করার সুবিধা প্রদান করেছে। ‘Online GD’ মোবাইল অ্যাপ অথবা অফিসিয়াল ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে নিচের ধাপে জিডি করতে পারেন:
- অ্যাপ ডাউনলোড বা ওয়েবসাইটে প্রবেশ: গুগল প্লে স্টোর থেকে ‘Online GD’ অ্যাপ ইনস্টল করুন অথবা gd.police.gov.bd পোর্টালে যান।
- রেজিস্ট্রেশন ও এনআইডি যাচাই: আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর ও জন্ম তারিখ দিন। ক্যামেরা দিয়ে লাইভ ফেস ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করুন।
- ঘটনার ধরন নির্বাচন: ‘হারানো’ (Lost) নাকি ‘নিরাপত্তা শঙ্কা’ (Threat/Danger) তা সিলেক্ট করুন।
- থানা ও ঘটনাস্থল বাছাই: ঘটনাটি কোন থানার আওতাধীন এলাকায় ঘটেছে তা নির্বাচন করুন।
- বিবরণ লিপিবদ্ধ ও সাবমিট: হারানো জিনিস বা হুমকির বিস্তারিত লিখে সাবমিট বাটনে চাপ দিন।
- জিডি কপি ডাউনলোড: সংশ্লিষ্ট থানার ডিউটি অফিসার আবেদনটি অনুমোদন করা মাত্র আপনার প্রোফাইলে কিউআর কোড (QR Code) যুক্ত অফিসিয়াল ডিজিটালি স্বাক্ষরিত জিডি কপি প্রদর্শিত হবে, যা আপনি প্রিন্ট করে নিতে পারবেন।
৪. সাধারণ নাগরিকদের জন্য ৫টি জরুরি আইনি সতর্কতা
- জিডি করতে কোনো সরকারি ফি লাগে না: থানায় বা অনলাইনে জিডি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরকারি সেবা। কোনো অর্থ লেনদেন বেআইনি।
- স্বাক্ষরিত রিসিভ কপি অবশ্যই নিন: সরাসরি থানায় জমা দিলে আবেদনের ২য় কপিতে থানার সিল, জিডি নম্বর, তারিখ ও ডিউটি অফিসারের স্বাক্ষরযুক্ত রসিদ যত্নসহকারে সংরক্ষণ করুন।
- মিথ্যা জিডি করা দণ্ডনীয় অপরাধ: কাউকে অহেতুক ফাঁসাতে মিথ্যা জিডি করলে দণ্ডবিধির ১৮২ ও ২১১ ধারায় উল্টো আবেদনকারীর বিরুদ্ধে কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
- পুলিশ তদন্ত না করলে প্রতিকার: হুমকির ঘটনায় পুলিশ তদন্ত না করলে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৭ ধারায় শান্তিরক্ষার মুচলেকা মামলা করা যায়।
- জিডি দিয়ে সরাসরি আসামি গ্রেফতার করা যায় না: মনে রাখবেন জিডি কোনো নিয়মিত মামলা নয়; পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের পরোয়ানা ছাড়া জিডির ভিত্তিতে কাউকে গ্রেফতার করতে পারে না।
