ফলাফল নিশ্চিত হলে সূচনালগ্নেই মামলা কবর দেওয়া আদালতের কর্তব্য: ৭ আদেশ ১১ বিধিতে হাইকোর্টের রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক কঠোর বিচারিক রায়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, যে মামলার চূড়ান্ত পরিণতি ও ব্যর্থতা দিনের আলোর মতো সুস্পষ্ট, বিচারিক সময় ও অর্থ অপচয় রোধে দেওয়ানী কার্যবিধির ৭ আদেশ ১১ বিধির (Order VII Rule 11 CPC) অধীন সেই মামলাকে শুরুতেই ‘কবর’ (Buried at its inception) দেওয়া আদালতের পবিত্র কর্তব্য (২২ বিএলসি ১৩৮)। কোনো ব্যক্তি নিয়োগ পরীক্ষায় নিজে দরখাস্তকারী বা প্রার্থী না হয়ে নিছক নিয়োগ প্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জ করে দেওয়ানী আদালতে মোকদ্দমা দায়ের করতে পারে না; কারণ তার কোনো ‘মামলা করার অধিকার বা লোকাস স্ট্যান্ডি’ (Locus Standi) এবং ‘মামলার কারণ’ (Cause of Action) বিদ্যমান থাকে না। নিছক অলঙ্কারপূর্ণ ভাষা দিয়ে আরজি ড্রাফট করলেই ভিত্তিহীন মামলা বাঁচিয়ে রাখা যায় না; অধস্তন আদালত কর্তৃক আরজি খারিজের রায় সম্পূর্ণ আইনসম্মত ঘোষণা করে হাইকোর্ট রিভিশন আবেদন সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন।
মামলাটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে ২০২২ সালে দায়েরকৃত স্বত্ব মোকদ্দমা Other Class Suit No. 80 of 2022 থেকে উদ্ভূত।
মামলার মূল প্রেক্ষাপট ও ঘটনাবলী নিম্নরূপ:
- বিদ্যালয়ের নিয়োগ ও বাদীর আরজির দাবি: চাঁপাইনবাবগঞ্জের কালীগঞ্জ ইসমাইল মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, আয়া ও অফিস সহায়ক পদে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়। বাদী মোসা: নেস্তারা বেগম স্বত্ব ও স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মামলা দায়ের করে অভিযোগ তোলেন যে, কোনো বৈধ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করেই ৩-৬ নম্বর বিবাদীদের বেআইনিভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে বাদী নিজে আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং উক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল ও স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার দাবি জানান।
- বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ৭ আদেশ ১১ বিধির দরখাস্ত: বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটি ও প্রধান শিক্ষক (১ ও ২ নম্বর বিবাদী) লিখিত জবাবের সাথে দেওয়ানী কার্যবিধির ৭ আদেশ ১১ বিধিতে আরজি সরাসরি খারিজের (Rejection of Plaint) আবেদন জানান। তারা প্রমাণপত্র দাখিল করে দেখান যে, জাতীয় দৈনিক ‘মানবজমিন’ এবং স্থানীয় দৈনিক ‘গৌড় বাংলা’ পত্রিকায় যথানিয়মে দু’দফা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল এবং মাউশির (DSHE) মহাপরিচালকের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ সম্পন্ন হয়ে প্রার্থীরা ২০২২ সালের ১০ মে যোগদান করেছেন।
- বাদী নিজে প্রার্থীই ছিলেন না: বিবাদীপক্ষ আদালতের নজরে আনে যে, বাদী নেস্তারা বেগম ওই নিয়োগে কখনোই কোনো চাকরির আবেদনপত্র দাখিল করেননি এবং তিনি নিয়োগ পরীক্ষার প্রার্থীও ছিলেন না। ফলে তার কোনো ক্ষুণ্ন হওয়ার মতো অধিকার নেই এবং মামলার কারণও নেই।
- সহকারী জজ ও জেলা জজ আদালত কর্তৃক আরজি খারিজ: ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর শিবগঞ্জ সিনিয়র সহকারী জজ আদালত ৭ আদেশ ১১ বিধির দরখাস্ত মঞ্জুর করে বাদীর আরজি সরাসরি খারিজ করে দেন। এর বিরুদ্ধে বাদী জেলা জজ আদালতে Title Appeal No. 92 of 2023 দায়ের করলে সিনিয়র জেলা জজ ২০২৪ সালের ৬ মার্চ আপিল খারিজ করে ট্রায়াল কোর্টের আদেশ বহাল রাখেন।
- হাইকোর্টে বাদীর দেওয়ানী রিভিশন: উভয় আদালতের সমবর্তী আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয়ে বাদী নেস্তারা বেগম হাইকোর্টে Civil Revision No. 4894 of 2024 দায়ের করেন।
🏛️ বাদী নেস্তারা বেগমের যুক্তি
- পূর্ণাঙ্গ বিচার ছাড়া আরজি খারিজ বেআইনি: আরজিতে মামলার কারণ উল্লেখ রয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ ছাড়া প্রাথমিক পর্যায়েই মামলা খারিজ করে দেওয়া ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
- মামলার কারণ (Cause of Action) বিদ্যমান: সার্কুলার না পাওয়ায় বাদী বঞ্চিত হয়েছেন; এই বিতর্কিত তথ্যটি সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে ট্রায়ালে নিষ্পত্তিমূলক ছিল।
- ৭ আদেশ ১১ বিধির অপপ্রয়োগ: আপিল বিভাগের নজির (৫৭ ডিএলআর এডি ১৮) অনুযায়ী কেবল আরজির বক্তব্যের ভিত্তিতে বিবেচনা করতে হবে; বিবাদীর জবাবে নয়।
🛡️ বিবাদী বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকদের যুক্তি
- বাদীর কোনো লোকাস স্ট্যান্ডি নেই: বাদী নিজে কোনো আবেদনপত্র জমা দেননি বা পরীক্ষায় অংশ নেননি। প্রার্থী না হয়ে নিয়োগ বাতিলের মামলা করার অধিকার আইনে নেই।
- নিয়োগ প্রকাশ্য ও আইনানুগ: জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকে দু’বার সার্কুলার প্রকাশ করে ডিজি প্রতিনিধির উপস্থিতিতে নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে।
- ফলহীন মামলা শুরুতেই কবর দেওয়া আবশ্যক: যে মামলার পরিণতি নিশ্চিত ব্যর্থতা, তাকে বাঁচিয়ে রেখে বিবাদীদের হয়রানি না করে শুরুতেই খারিজ করাই বিধান (২২ বিএলসি ১৩৮)।
রায়ে হাইকোর্ট বিভাগ দেওয়ানী কার্যবিধির ৭ আদেশ ১১ বিধির মৌলিক দর্শন ও আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেন:
- Cause of Action-এর অর্থ: মামলার কারণ হলো সেই সকল প্রাসঙ্গিক তথ্যের সমষ্টি (Bundle of material facts), যা প্রমাণ করতে পারলে বাদী আদালতের নিকট থেকে প্রার্থিত প্রতিকার পাওয়ার আইনগত অধিকার লাভ করেন। নিছক কোনো অসন্তোষ বা ক্ষোভ মামলার কারণ হতে পারে না।
- চাতুর্যপূর্ণ আরজি ড্রাফটিংয়ের ফাঁদ: আইনজীবী যদি অতি চাতুর্যের সাথে অলঙ্কারপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করে আরজি লেখেন কিন্তু আরজির ভেতরে বাদীর কোনো বাস্তব আইনগত অধিকারের ভিত্তি না থাকে, তবে আদালত আরজি টিকিয়ে রাখতে বাধ্য নয়।
- বিচারিক সময় অপচয় রোধ: আদালত কোনো অর্থহীন বা ফলহীন মামলাকে (Fruitless/Futile litigation) বছরের পর বছর বয়ে বেড়ানোর জন্য নয়। ৭ আদেশ ১১ বিধির উদ্দেশ্যই হলো এমন অচল মামলাকে শুরুতেই চিহ্নিত করে খারিজ করে দেওয়া যাতে অপরপক্ষ অহেতুক খরচ ও হয়রানি থেকে রক্ষা পায়।
মাননীয় বিচারপতি আব্দুর রহমান রিভিশন মামলার নথিপত্র এবং আপিল বিভাগের সুপ্রতিষ্ঠিত নজিরসমূহ পর্যালোচনা করে নিম্নোক্ত তাৎপর্যপূর্ণ অভিমত ব্যক্ত করেন:
ক. প্রার্থী না হয়ে নিয়োগ চ্যালেঞ্জ করার অধিকার কারো নেই (Lack of Locus Standi):
হাইকোর্ট দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন: “The plaintiff was neither an applicant nor a candidate in the impugned recruitment process. She has not demonstrated that she possessed any vested, accrued or legally enforceable right… A person cannot ordinarily maintain an action merely by questioning an appointment unless he or she is able to demonstrate a legally recognizable interest.” আবেদনই না করে নিছক কাল্পনিক ধারণার বশে মামলা করার কোনো লোকাস স্ট্যান্ডি বাদীর নেই।
খ. নিশ্চিত ব্যর্থ মামলাকে শুরুতেই কবর দিতে হবে (Buried at Inception):
আদালত 22 BLC (HC) 138 (Abdul Khaleque vs. Bangladesh)-এর সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন: “It is the settled principle of law that while the ultimate result of the suit is as clear as the daylight, such a suit should be buried at its inception so that no further time is consumed in a fruitless litigation.” যে মামলার আরজিতেই কোনো অধিকার নেই, তার জন্য সাক্ষ্য গ্রহণের ট্রায়াল করা বিচারিক অর্থের নিছক অপচয়।
গ. আরজির মিথ্যা দাবি প্রামাণ্য নথিতে ধসে গেছে:
বাদী আরজিতে দাবি করেছিলেন কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়া গোপনে নিয়োগ হয়েছে। অথচ নথিতে দেখা যায় জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে উন্মুক্তভাবে নিয়োগ হয়েছে এবং নির্বাচিত শিক্ষকরা ২০২২ সাল থেকে কর্মরত আছেন। ফলে বাদীর সম্পূর্ণ মামলাটি বিদ্বেষপ্রসূত এবং হয়রানিমূলক।
📚 রায়ে উদ্ধৃত সুপ্রিম কোর্টের দিকনির্দেশক নজিরসমূহ
- Abdul Khaleque v. Government of Bangladesh, 22 BLC (HC) 138: নিশ্চিত ফলহীন মামলাকে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট ব্যর্থতা থাকলে সূচনালগ্নেই খারিজ করে কবর দিতে হবে।
- Abdul Malek Sawdagar v. Md. Mahbubey Alam, 57 DLR (AD) 18: আরজি পড়ার মাধ্যমেই যদি মামলার আইনি অসারতা প্রকাশিত হয়, তবে ৭ আদেশ ১১ বিধিতে তা তাৎক্ষণিক খারিজযোগ্য।
- রুল ডিসচার্জ (Rule Discharged): বাদী নেস্তারা বেগমের দায়েরকৃত দেওয়ানী রিভিশন আবেদনটি সরাসরি খারিজ করা হলো।
- আরজি খারিজের ডিক্রি চূড়ান্ত বহাল: শিবগঞ্জ সিনিয়র সহকারী জজ আদালত ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা জজ আদালত কর্তৃক ৭ আদেশ ১১ বিধিতে আরজি খারিজের সমবর্তী রায় চূড়ান্তভাবে বহাল ও কার্যকর রাখা হলো।
- স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার: মামলার কারণে শিক্ষকদের এমপিও বা কার্যক্রমে ইতিপূর্বে প্রদত্ত সকল স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হলো।
১. প্রার্থী না হলে মামলা নয়
নিয়োগ পরীক্ষায় নিজে প্রার্থী না হয়ে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে দেওয়ানী মামলা দায়ের করতে পারে না।
২. শুরুতেই মামলা কবর দেওয়ার নীতি
ব্যর্থতা নিশ্চিত হলে পূর্ণ বিচার না করে ৭ আদেশ ১১ বিধিতে শুরুতেই মোকদ্দমা সমাহিত করা আদালতের দায়িত্ব (২২ বিএলসি ১৩৮)।
৩. লোকাস স্ট্যান্ডি ও কজ অব অ্যাকশন
ক্ষুণ্ন হওয়ার মতো কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ বা অধিকার না থাকলে নিছক ধারণার বশে কোনো মোকদ্দমা রক্ষণীয় হয় না।
৪. রিভিশনাল এখতিয়ারের সীমাবদ্ধতা
উভয় নিম্ন আদালত আইনের সঠিক প্রয়োগে আরজি খারিজ করলে রিভিশন আদালত তাতে অহেতুক হস্তক্ষেপ করবে না।
প্রতিপক্ষের কোনো পদক্ষেপে আপনার নিজের কোনো সুনির্দিষ্ট আইনগত অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হয়ে আরজি প্রস্তুত করুন।
আরজিতে বাদীর কোনো অধিকার প্রকাশ না পেলে পূর্ণ বিচারের ঝামেলা পোহানোর আগেই ৭ আদেশ ১১ বিধিতে আরজি খারিজের আবেদন পেশ করুন।
প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ হিসেবে পত্রিকায় প্রকাশিত মূল সার্কুলার ও রেজুলেশনের কপি নথিতে প্রস্তুত রাখুন যাতে মিথ্যা মামলার মুখ বন্ধ করা যায়।
মনে রাখবেন, মূল ঘটনা সত্য না হলে কেবল চটকদার বাক্য ব্যবহার করে আরজি সাজিয়ে আদালতকে বিভ্রান্ত করা যায় না।
ট্রায়াল ও আপিল উভয় আদালত আরজি খারিজ করলে উচ্চ আদালতে রিভিশন টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব।

