তালাক দেওয়ার সঠিক নিয়ম ও খরচ: আইনি নোটিশ, সালিশি পরিষদ ও কার্যকর করার ধাপ (২০২৬)
⚖️ তালাক ও বিবাহবিচ্ছেদের মৌলিক আইনি বিধান
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ (MFLO, 1961) এর ৭ ধারা অনুযায়ী: কেবল মুখে তিনবার “তালাক” উচ্চারণ করলেই কিংবা নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট করলেই আইনের দৃষ্টিতে বিবাহবিচ্ছেদ কার্যকর হয় না। বৈধভাবে তালাক সম্পন্ন করতে হলে স্বামীকে (অথবা কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে ক্ষমতা থাকলে স্ত্রীকে) সরকার নিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রারের (কাজী) মাধ্যমে লিখিত নোটিশ প্রস্তুত করে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান / সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এবং অপর পক্ষের নিকট প্রেরণ করতে হবে। নোটিশ প্রেরণের তারিখ হতে ঠিক ৯০ (নব্বই) দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তালাক আইনত কার্যকর হবে। এই বাধ্যতামূলক সংবিধিবদ্ধ নিয়ম লঙ্ঘন করা ফৌজদারি অপরাধ।
১. তালাকের প্রকারভেদ: স্বামী ও স্ত্রীর অধিকার
👤 স্বামী কর্তৃক একতরফা তালাক
মুসলিম শরিয়ত ও প্রচলিত আইনে স্বামী স্ত্রীকে যে কোনো সময় কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই একতরফা তালাক দেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করেন। তবে তালাক দিলেও স্ত্রীকে সম্পূর্ণ বকেয়া ও বিলম্বিত দেনমোহর এবং ৯০ দিনের ইদ্দতকালীন খোরপোষ পরিশোধ করা স্বামীর জন্য শর্তহীন বাধ্যতামূলক দায়।
👩 স্ত্রী কর্তৃক তালাকে তাফবিজ (Tafweez)
নিকাহনামার (কাবিননামা) ১৮ নম্বর কলামে স্ত্রীকে যদি স্বামী নিঃশর্ত বা শর্তাধীন তালাক প্রদানের ক্ষমতা দিয়ে থাকেন, তবে স্ত্রী সেই অর্পিত ক্ষমতাবলে স্বামীকে একতরফা তালাক নোটিশ পাঠাতে পারেন। সুপ্রিম কোর্টের নজির অনুযায়ী তালাকে তাফবিজ দিলে স্ত্রীর দেনমোহর কোনোক্রমেই বাতিল বা মওকুফ হয় না।
২. আইনানুগভাবে তালাক কার্যকর করার ৪টি আবশ্যিক ধাপ
- ধাপ ১: কাজীর মাধ্যমে লিখিত তালাকনামা সম্পাদন: একজন সরকার নিবন্ধিত কাজীর নিকট গিয়ে তালাকের কারণ লিপিবদ্ধপূর্বক তালাকনামায় স্বাক্ষর করা।
- ধাপ ২: চেয়ারম্যান/মেয়র এবং অপর পক্ষকে নোটিশ প্রেরণ: ১৯৬১ সালের আইনের ৭(১) ধারা অনুযায়ী কাজীর স্বাক্ষরিত তালাক নোটিশ এক কপি সংশ্লিষ্ট পৌরসভা মেয়র / ইউপি চেয়ারম্যান / সিটি কর্পোরেশন কাউন্সিলর বরাবর এবং অপর কপি সরাসরি স্ত্রীর (বা স্বামীর) ঠিকানায় রেজিস্ট্রি এ/ডি (AD) ডাকযোগে প্রেরণ করতে হবে। ডাক রসিদ যত্নসহকারে সংরক্ষণ করুন।
- ধাপ ৩: ৯০ দিনের ইদ্দতকাল ও সালিশি পরিষদ (Arbitration Council): নোটিশ গ্রহণের ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান উভয় পক্ষকে নিয়ে একটি সালিশি পরিষদ গঠন করবেন আপসের উদ্দেশ্যে। পক্ষগণ আপসে ব্যর্থ হলে কিংবা কোনো পক্ষ উপস্থিত না হলেও নোটিশ প্রাপ্তির তারিখ হতে ৯০ দিন পার হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক আইনত কার্যকর হয়ে যায়।
- ধাপ ৪: তালাক কার্যকর সার্টিফিকেট ও বালাম বইয়ে এন্ট্রি: ৯০ দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর চেয়ারম্যান বা মেয়রের অফিস থেকে ‘তালাক কার্যকর সার্টিফিকেট’ সংগ্রহ করতে হবে এবং কাজী অফিসে গিয়ে তালাক রেজিস্ট্রি বালামে স্বাক্ষর করে চূড়ান্ত তালাক প্রত্যয়নপত্র গ্রহণ করতে হবে।
৩. তালাক রেজিস্ট্রেশন সরকারি ফি ও আইনি খরচ তালিকা
আইন ও বিচার বিভাগ কর্তৃক নির্ধারিত সরকারি গেজেট অনুযায়ী তালাক রেজিস্ট্রেশন ফি নিম্নরূপ:
| সেবার বিবরণ | সরকারি নির্ধারিত ফি |
|---|---|
| কাজী অফিসে তালাক নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) ফি | ২০০ টাকা |
| তালাকনামার নকল বা সার্টিফাইড কপি ফি | ৫০ টাকা |
| রেজিস্ট্রি ডাকযোগে নোটিশ প্রেরণ খরচ (২টি কপি) | ১০০ – ১৫০ টাকা |
| এডভোকেট বা কাজীর ড্রাফটিং চার্জ (ঐচ্ছিক) | ১,৫০০ – ৩,০০০ টাকা |
৪. তালাক সংক্রান্ত ৫টি মারাত্মক ভুল ও আইনি সতর্কতা
- নোটারি এফিডেভিট কোনো তালাক নয়: আদালতে নোটারির মাধ্যমে হলফনামা করে ঘরে বসে থাকলে বিয়ে বিচ্ছেদ হয় না; চেয়ারম্যানকে নোটিশ না দিলে বিবাহ বহাল থাকে।
- নোটিশ না দেওয়ার শাস্তি: ৭ ধারার বিধান না মেনে নোটিশ না দিলে স্বামীকে ১ বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা ১০,০০০ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে।
- স্ত্রী গর্ভবতী থাকলে তালাকের নিয়ম: স্ত্রী গর্ভবতী থাকা অবস্থায় তালাক নোটিশ পাঠালে সন্তান প্রসব না হওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হবে না (৯০ দিনের মেয়াদ প্রযোজ্য হবে না)।
- দেনমোহর মাফ হয় না: স্বামী বা স্ত্রী যেই তালাক দিক না কেন, দেনমোহরের টাকা কখনোই মাফ হয় না; স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করে সম্পূর্ণ টাকা আদায় করতে পারেন।
- সন্তানের হেফাজত ও খোরপোষ: তালাক হলেও সন্তানের লালন-পালনের যাবতীয় ভরণপোষণ পিতা হিসেবে আজীবন বহন করতে হবে।

