বাংলাদেশে ট্রেডমার্ক রেজিস্ট্রেশন করার নিয়ম, ধাপ ও সরকারি খরচের পূর্ণাঙ্গ হিসাব (DPDT গাইড)

®️ ট্রেডমার্ক কী এবং ব্যবসা সুরক্ষায় কেন অপরিহার্য?

ট্রেডমার্ক আইন, ২০০৯ (Tradename and Trademarks Act, 2009) অনুযায়ী: ট্রেডমার্ক হলো একটি স্বতন্ত্র প্রতীক, লোগো, নাম, শব্দ বা চিত্র যা একটি ব্যবসা বা কোম্পানির পণ্য ও সেবাকে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান থেকে আইনগতভাবে আলাদা করে। ট্রেডমার্ক রেজিস্ট্রেশন না থাকলে যে কেউ আপনার প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডের নাম বা লোগো হুবহু নকল করে বাজারে নিম্নমানের পণ্য বিক্রি করতে পারে, যার ফলে আপনার আর্থিক ও সুনামের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (DPDT)-এর মাধ্যমে ট্রেডমার্ক নিবন্ধন করলে আপনি উক্ত নামের ওপর ১০ বছরের জন্য একচ্ছত্র একক আইনি মালিকানা লাভ করবেন এবং যে কোনো নকলকারীর বিরুদ্ধে আদালতে দেওয়ানি নিষেধাজ্ঞা ও ফৌজদারি মামলা দায়েরের অধিকার পাবেন।

১. ট্রেডমার্ক রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করার ৫টি আবশ্যকীয় ধাপ

  1. ধাপ ১: ট্রেডমার্ক সার্চ (Search & Availability): আবেদন করার পূর্বে DPDT ডেটাবেজে অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হতে হবে যে প্রস্তাবিত নামটি পূর্বে অন্য কেউ রেজিস্ট্রি করেছে কি না। আন্তর্জাতিক ‘Nice Classification’ অনুযায়ী ১ থেকে ৩৪ পণ্য এবং ৩৫ থেকে ৪৫ পর্যন্ত সেবার ক্লাস রয়েছে।
  2. ধাপ ২: আবেদন দাখিল (Filing Form TM-1): ট্রেডমার্ক আইনজীবী বা এজেন্টের মাধ্যমে লোগোর নমুনা, ট্রেড লাইসেন্স কপি এবং নির্ধারিত সরকারি ফি প্রদান করে ফর্ম TM-1 দাখিল করতে হয়। আবেদন দাখিলের সাথে সাথেই একটি ‘Acknowledgement Slip’ বা ট্রেডমার্ক অ্যাপ্লিকেশন নম্বর পাওয়া যায়, যার ফলে আপনি নামের সাথে ™ প্রতীক ব্যবহার করতে পারেন।
  3. ধাপ ৩: নিরীক্ষা ও পরীক্ষণ রিপোর্ট (Examination Report): রেজিস্ট্রার দপ্তর আবেদনটি যাচাই করে দেখবে নামটিতে কোনো ত্রুটি বা সাদৃশ্য আছে কি না। কোনো আপত্তি না থাকলে আবেদনটি সরাসরি পরবর্তী ধাপে যায়, আপত্তি থাকলে শুনানিতে উত্তর দিতে হয়।
  4. ধাপ ৪: ট্রেডমার্ক জার্নালে প্রকাশনা (Journal Publication): অনুমোদনের পর সরকারি ‘ট্রেডমার্ক জার্নাল’-এ আবেদনটি সাধারণ জনগণের অবগতির জন্য প্রকাশ করা হয়। জার্নাল প্রকাশের পরবর্তী ২ মাসের মধ্যে যদি কোনো পক্ষ আপত্তি (Opposition) না তোলে, তবে ট্রেডমার্কটি রেজিস্ট্রেশনের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুত হয়।
  5. ধাপ ৫: রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট অর্জন (Certificate of Registration): চূড়ান্ত ফি পরিশোধের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি সার্টিফিকেট জারি হয়। তখন থেকে আপনি নামের সাথে রেজিস্টার্ড প্রতীক ® ব্যবহার করতে পারবেন।

২. ট্রেডমার্ক রেজিস্ট্রেশনের সরকারি ফি ও খরচের তালিকা

সরকার নির্ধারিত অফিসিয়াল ফি তালিকা নিচে তুলে ধরা হলো (ভ্যাট ব্যতিরেকে):

কাজের ধাপ ফরমের নাম সরকারি ফি
অফিসিয়াল সার্চ ফি Form TM-4 ১,০০০ টাকা
মূল আবেদন দাখিল ফি (প্রতি ক্লাস) Form TM-1 ৫,০০০ টাকা
জার্নাল প্রকাশনা ফি Journal Fee ১,৫০০ টাকা
রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট ফি Form TM-11 ১৫,০০০ টাকা
মোট আনুমানিক সরকারি ফি (ভ্যাট ও লিগ্যাল চার্জ ছাড়া) ২২,৫০০ টাকা

৩. উদ্যোক্তাদের জন্য ৫টি জরুরি পরামর্শ

  1. সাধারণ বা বর্ণনামূলক নাম পরিহার করুন: ‘মিষ্টি দই’ বা ‘খাটি তেল’ জাতীয় সাধারণ নাম ট্রেডমার্ক হয় না; নাম উদ্ভাবনী ও ইউনিক হতে হবে।
  2. ব্যবসা শুরুর সাথে সাথেই আবেদন করুন: বাংলাদেশে ‘First to File’ নিয়ম চালু রয়েছে; যিনি আগে আবেদন করবেন তিনিই আইনত অগ্রাধিকার পাবেন।
  3. নকলের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি পদক্ষেপ: কেউ নাম নকল করলে ট্রেডমার্ক আইনের ৯৭ ধারায় দায়রা আদালতে ফৌজদারি মামলা বা জেলা জজে নিষেধাজ্ঞার মামলা করা যায়।
  4. ১০ বছর পর নবায়ন: ট্রেডমার্ক সার্টিফিকেটের মেয়াদ ১০ বছর। ১০ বছর পূর্ণ হওয়ার ৬ মাস পূর্বেই নবায়ন আবেদন করতে হবে।
  5. এজেন্ট বা আইনজীবীর অভিজ্ঞতা যাচাই: ট্রেডমার্ক ফাইলিং বিশেষায়িত আইনি কাজ, তাই নিবন্ধিত আইপি আইনজীবীর মাধ্যমেই ফরম দাখিল করুন।

Related Articles

✍️ আইনি মতামত বা প্রশ্ন প্রকাশ করুন

Back to top button