পারিবারিক আদালতে স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণ (খোরপোষ) মামলা করার নিয়ম ও আইনি অধিকার
⚖️ ভরণপোষণ (Maintenance/Nafqah): স্ত্রীর শর্তহীন অলঙ্ঘনীয় অধিকার
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এর ৯ ধারা এবং পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩ এর বিধান মতে: বিবাহ বহাল থাকাকালে স্ত্রীকে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও প্রসাধনসামগ্রী প্রদান করা স্বামীর জন্য একটি অলঙ্ঘনীয় ও নিঃশর্ত আইনগত দায়িত্ব। স্বামী যদি অন্যায্যভাবে স্ত্রীকে ভরণপোষণ প্রদান না করে কিংবা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে স্ত্রীকে পৈতৃক বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়, তবে স্ত্রী নিজের জন্য এবং তার নাবালক সন্তানের জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করে বিগত বকেয়া খোরপোষ এবং ভবিষ্যৎ মাসিক খোরপোষ আদায়ের ডিক্রি পাওয়ার সম্পূর্ণ আইনি অধিকারী। স্ত্রী সচ্ছল হলেও স্বামীর ভরণপোষণ দেওয়ার দায়িত্ব কখনোই লাঘব হয় না।
১. কোন কোন ক্ষেত্রে স্ত্রী আলাদা বসবাস করেও খোরপোষ পাওয়ার অধিকারী?
- শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন: স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকজন শারীরিক আঘাত বা মানসিক অত্যাচার করলে স্ত্রী নিজের আত্মরক্ষার্থে বাপের বাড়ি চলে গেলেও খোরপোষ পাবেন।
- অনুমতি ছাড়া ২য় বিয়ে করলে: সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করলে প্রথম স্ত্রী আলাদা বসবাস করে পূর্ণ খোরপোষ দাবি করতে পারেন।
- দেনমোহর পরিশোধ না করলে: বিয়ের পর তলবি দেনমোহর (Prompt Dower) স্ত্রী চাওয়ার পর স্বামী তা পরিশোধ না করলে স্ত্রী স্বামীর বাড়ি ত্যাগ করলেও খোরপোষের অধিকারী থাকেন।
- গৃহ হতে অন্যায়ভাবে তাড়িয়ে দিলে: স্বামী যদি স্ত্রীকে ঘর থেকে বের করে দেয় এবং খোঁজখবর না নেয়।
২. মোকদ্দমা চলাকালীন ‘অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোষ’ (Pendente Lite Maintenance)
পারিবারিক মামলার একটি চমৎকার সুবিধা হলো—মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে যদি সময় লাগে, তবে মামলার শুরুতেই স্ত্রী আদালতের নিকট অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোষের আবেদন করতে পারেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিচারক মামলার প্রাথমিক শুনানিতেই প্রতি মাসের নির্দিষ্ট তারিখে স্ত্রীর একাউন্টে অথবা আদালতে একটি নির্ধারিত অঙ্কের টাকা (যেমন: প্রতি মাসে ১০,০০০ থেকে ২৫,০০০ টাকা) জমা দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করতে পারেন। স্বামী উক্ত অন্তর্বর্তীকালীন অর্থ দিতে ব্যর্থ হলে আদালত স্বামীর লিখিত জবাব কেটে দিয়ে একতরফা ডিক্রি জারি করতে পারেন।
৩. সন্তানের ভরণপোষণের আইনগত মাপকাঠি
সন্তানের ভরণপোষণ সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের নীতি:
- সন্তান মায়ের হেফাজতে থাকুক বা নানার বাড়িতে থাকুক—পিতা হিসেবে সন্তানের খাদ্য, শিক্ষা, পোশাক ও চিকিৎসার যাবতীয় খরচ বহন করা পিতার একক দায়িত্ব।
- ছেলে সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক (১৮ বছর) হওয়া পর্যন্ত এবং কন্যাসন্তান বিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত আজীবন পিতার কাছ থেকে ভরণপোষণ পাবে।
- মা যদি অন্য পুরুষের সাথে ২য় বিবাহও করেন, তবুও সন্তানের ভরণপোষণ বন্ধ করার অধিকার পিতার নেই।
৪. স্বামী টাকা পরিশোধ না করলে আদালতের কঠোর পদক্ষেপ
পারিবারিক আদালত আইনের ১৬ ধারা অনুযায়ী ডিক্রিকৃত খোরপোষের টাকা স্বামী যথাসময়ে জমা না দিলে আদালত কঠোর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন:
- বেতন ও ব্যাংক হিসাব ক্রোক: স্বামী চাকরিজীবী হলে আদালত সরাসরি তার নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেবেন তার মাসিক মূল বেতন থেকে খোরপোষের টাকা কেটে স্ত্রীর একাউন্টে পাঠিয়ে দিতে।
- স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও নিলাম: স্বামীর মালিকানাধীন জমি, বাড়ি বা ফ্ল্যাট ক্রোক করে প্রকাশ্যে নিলাম ডেকে পাওনা অর্থ উসুল করা হয়।
- দেওয়ানি কারাগারে আটক (Civil Imprisonment): সকল প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অর্থ পরিশোধে ইচ্ছাকৃত অবহেলা করলে আদালত স্বামীকে গ্রেফতার করে দেওয়ানি জেলে পাঠানোর আদেশ প্রদান করেন।
