বিবাহ বহাল থাকলে বিলম্বিত দেনমোহর দাবি বেআইনি: খোলা তালাক ও খোরপোষণ নিয়ে হাইকোর্টের রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ মুসলিম পারিবারিক আইনের এক অতীব তাৎপর্যপূর্ণ রায়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, বৈবাহিক সম্পর্ক আইনত বলবৎ বা বহাল থাকাকালে (Subsisting Marriage) কোনো স্ত্রী স্বামীর নিকট থেকে সম্পূর্ণ দেনমোহর দাবি করতে পারেন না। প্রিভি কাউন্সিলের ঐতিহাসিক নজির হামিরা বিবি বনাম জুবায়দা বিবি (১৯১৬) এবং মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ১০ ধারা পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছেন যে— দেনমোহরের দুটি অংশ থাকে: আশু দেনমোহর (Prompt Dower) এবং বিলম্বিত দেনমোহর (Deferred Dower)। আশু দেনমোহর স্ত্রী যেকোনো সময় তলব করতে পারেন, কিন্তু বিলম্বিত মোহরানা কেবল বিবাহ বিচ্ছেদ (তালাক) অথবা স্বামী-স্ত্রীর কারও মৃত্যুর পরই প্রদেয় হয়। স্বামী কর্তৃক উপস্থাপিত তথাকথিত ‘খোলা তালাক’ প্রতারণামূলক ও নোটিশবিহীন হওয়ায় উভয়ের বৈবাহিক সম্পর্ক আইনত বহাল রয়েছে; ফলে অধস্তন আদালত কর্তৃক প্রদত্ত পূর্ণ দেনমোহরের ডিক্রি বাতিল করা হলো, তবে স্ত্রী ও নাবালিকা কন্যার ভরণপোষণ (Maintenance) বহাল থাকবে।
মামলাটি কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী পারিবারিক আদালতে ২০১১ সালে দায়েরকৃত দেনমোহর ও ভরণপোষণের মোকদ্দমা Family Suit No. 63 of 2011 থেকে উদ্ভূত। মামলার মূল বাদী মোসাম্মৎ রাশেদা খাতুন এবং তার নাবালিকা কন্যা।
মামলার মূল প্রেক্ষাপট ও ঘটনাবলী নিম্নরূপ:
- বিবাহ ও দাম্পত্য জীবন: ২০০২ সালের ৩ আগস্ট মুসলিম শরিয়াহ মোতাবেক বাদী রাশেদা খাতুন এবং বিবাদী মো: মিজানুর রহমানের বিবাহ সম্পন্ন হয়। তাদের দাম্পত্য জীবনে একটি কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করে। একপর্যায়ে স্বামী যৌতুক দাবি করে এবং ২০১১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ৫০,০০০ টাকা যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী ও কন্যাসন্তানকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়।
- পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের: আপস-মীমাংসা ব্যর্থ হওয়ায় বাদী রাশেদা খাতুন ভুরুঙ্গামারী পারিবারিক আদালতে Family Suit No. 63 of 2011 দায়ের করেন। তিনি দাবি করেন দেনমোহর ধার্য ছিল ১,২৯,৯৯৯ টাকা এবং তিনি উক্ত সম্পূর্ণ দেনমোহর ও বিগত এবং ভবিষ্যৎ ভরণপোষণ প্রার্থনা করেন।
- স্বামীর জবাব ও ‘খোলা তালাক’-এর দাবি: স্বামী মিজানুর রহমান লিখিত জবাব দাখিল করে দেনমোহর ২৯,৯৯৯ টাকা ছিল দাবি করেন। তিনি আরও দাবি করেন যে, তাদের মধ্যে আপসের ভিত্তিতে একটি ‘খোলা তালাক’ (Khula Talaq) সম্পাদিত হয়েছে এবং কাজি অফিসে রেজিস্ট্রি হয়েছে, যেখানে স্ত্রী দেনমোহর ও ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ বাবদ ৩১,০০০ টাকা বুঝে নিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিয়েছেন। সুতরাং দেনমোহর বা স্ত্রীর ভরণপোষণের আর কোনো দাবি চলতে পারে না।
- পারিবারিক আদালত ও জেলা জজের রায়: ২০১৪ সালের ১৭ এপ্রিল পারিবারিক আদালত স্বামীর খোলা তালাকের দাবি সম্পূর্ণ সাজানো ও জালিয়াতিপূর্ণ বলে প্রত্যাখ্যান করে এবং মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ১০ ধারায় সম্পূর্ণ দেনমোহর (১,২৯,৯৯৯ টাকা) আশু বিবেচনা করে পূর্ণ দেনমোহর ও ভরণপোষণের ডিক্রি দেয়। কুড়িগ্রাম ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত ২০১৫ সালের ২৮ মে Family Appeal No. 08 of 2014-এ উক্ত রায় বহাল রাখেন।
- হাইকোর্টে স্বামীর দেওয়ানী রিভিশন: বিবাহ বহাল থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ দেনমোহর প্রদানের আদেশের বিরুদ্ধে স্বামী মিজানুর রহমান হাইকোর্টে Civil Revision No. 4266 of 2015 দায়ের করেন।
🏛️ বাদী রাশেদা খাতুনের আইনি যুক্তি
- খোলা তালাক বানোয়াট ও নোটিশহীন: স্বামী সাদা কাগজে সই নিয়ে দূরবর্তী কাজি অফিসে জাল তালাক নিবন্ধন করিয়েছে। ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৭ ধারায় চেয়ারম্যানকে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি।
- নিকাহনামার ১০ ধারার প্রয়োগ: নিকাহনামায় আশু ও বিলম্বিত দেনমোহর পৃথক না থাকলে ১৯৬১ সালের আইনের ১০ ধারা অনুযায়ী সমগ্র দেনমোহর তলবি বা আশু হিসেবে গণ্য হবে।
- স্ত্রী ও কন্যার খোরপোষের অধিকার: স্বামী বিনা কারণে তাড়িয়ে দেওয়ায় স্ত্রী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাসন্তান আইন অনুযায়ী খোরপোষ পাওয়ার পূর্ণ হকদার।
🛡️ দরখাস্তকারী স্বামী মিজানুর রহমানের যুক্তি
- বিবাহ বহাল থাকলে বিলম্বিত দেনমোহর দেওয়া যায় না: মুসলিম আইন অনুযায়ী বিবাহ বলবৎ থাকাকালে কেবল বিলম্বিত মোহরানা তলব করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
- আশু মোহরানা ২৫০ টাকা পরিশোধিত: নিকাহনামার ১৪ নম্বর কলামে ২৫০ টাকা আশু মোহরানা ছিল যা ১৫ নম্বর কলাম অনুযায়ী অলংকার দিয়ে পরিশোধ করা হয়েছে।
- রেজিস্ট্রি খোলা তালাক: উভয় পক্ষের সম্মতিতে খোলা তালাক রেজিস্ট্রি হওয়ায় স্ত্রী কেবল ৩ মাসের ইদ্দতকালীন খোরপোষ পেতে পারে, অন্য কিছু নয়।
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর অধীন কোনো তালাক কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে হাইকোর্ট সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরেন:
- ৭(১) ধারার নোটিশ বাধ্যতামূলক: যে কোনো প্রকারের তালাক উচ্চারণের পর স্বামীকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ দিতে হবে এবং স্ত্রীর কাছে তার অনুলিপি পাঠাতে হবে।
- ৭(৩) ধারায় ৯০ দিনের সময়সীমা: চেয়ারম্যানের নিকট নোটিশ পৌঁছানোর তারিখ হতে ৯০ দিন অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত এবং সালিশি কাউন্সিলের আপস প্রচেষ্টা ব্যর্থ না হওয়া পর্যন্ত কোনো তালাক কার্যকর হয় না।
- খোলা বা মোবারতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য: ৮ ধারা মোতাবেক স্ত্রী কর্তৃক প্রদত্ত তালাক কিংবা পারস্পরিক সম্মতির খোলা বা মোবারত তালাকের ক্ষেত্রেও ৭ ধারার নোটিশ ও ৯০ দিনের বিধান আবশ্যিকভাবে প্রযোজ্য। বর্তমান মামলায় কোনো নোটিশই দেওয়া হয়নি, তদুপরি খোলা দলিলের সত্যতা আদালত কর্তৃক অসত্য প্রমাণিত হয়েছে। ফলে আইনত তালাক হয়নি এবং বিবাহ এখনো বহাল রয়েছে।
মাননীয় বিচারপতি মো: রিয়াজ উদ্দিন খান হানাফী ফিকহ এবং সুপ্রিম কোর্টের নজিরসমূহ বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে নিম্নোক্ত যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত প্রদান করেন:
ক. বিলম্বিত দেনমোহর বিবাহ বিচ্ছেদ ছাড়া তলব করা যায় না:
হাইকোর্ট সুন্নি হানাফী আইনের প্রতিষ্ঠিত মূলনীতি উদ্ধৃত করে বলেন: “In Hanafi law, the prompt dower is payable immediately after the marriage, if demanded by the wife; while the deferred dower is payable only on the dissolution of the marriage by death or by divorce.” যেহেতু উভয় আদালত নিশ্চিত হয়েছে যে তালাক কার্যকর হয়নি এবং বিবাহ এখনো বহাল রয়েছে, সেহেতু স্ত্রী বিলম্বিত দেনমোহর পাওয়ার অধিকারী নন।
খ. অধ্যাদেশের ১০ ধারার অপপ্রয়োগ নিরসন:
১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ১০ ধারা কেবল তখনই প্রযোজ্য হয় যখন নিকাহনামায় আশু ও বিলম্বিত মোহরানার কোনো উল্লেখই থাকে না। কিন্তু বর্তমান মামলার নিকাহনামায় (Exhibit-1) ১৪ নম্বর কলামে আশু হিসেবে ২৫০ টাকা নির্ধারিত ছিল এবং ১৫ নম্বর কলামে তা গহনা দ্বারা পরিশোধ দেখানো হয়েছে। ফলে পুরো দেনমোহরকে তলবি ধরে নিম্ন আদালত যে ডিক্রি দিয়েছিল, তা মারাত্মক আইনগত ভুল।
গ. স্ত্রী ও কন্যার নিয়মিত খোরপোষের অধিকার অলঙ্ঘনীয়:
হাইকোর্ট দ্ব্যর্থহীনভাবে আদেশ দেন যে, স্বামী স্ত্রীকে অন্যায়ভাবে ঘর থেকে বের করে দেওয়ায় এবং তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক আইনত বলবৎ থাকায় স্বামী স্ত্রীকে এবং তার ঔরসজাত অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাকে মাসিক ভরণপোষণ দিতে সম্পূর্ণভাবে বাধ্য।
📚 রায়ে উদ্ধৃত সুপ্রিম কোর্ট ও প্রিভি কাউন্সিলের ঐতিহাসিক নজিরসমূহ
- Hamira Bibi v. Zubaida Bibi, (1916) 43 I.A. 294: দেনমোহরের সংজ্ঞা ও আশু বনাম বিলম্বিত মোহরানার মৌলিক বিভাজন নির্ধারণকারী প্রিভি কাউন্সিলের বিশ্বখ্যাত রায়।
- Syed Ali Newaz Gardezi v. Lt. Col. Muhammad Yousus, 15 DLR (SC) 9: ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৭ ধারায় চেয়ারম্যানকে নোটিশ না দিলে কোনো তালাক কার্যকর হয় না; বৈবাহিক সম্পর্ক অটুট থাকে।
- Md. Serajul Islam v. Most. Helana Begum, 1999 BLT (AD) 850: তালাকের ক্ষেত্রে নোটিশের বিধান এবং পক্ষদের এফিডেভিট সংক্রান্ত আপিল বিভাগের নীতি।
- রুল আংশিক মঞ্জুর (Rule Made Absolute-in-Part): স্বামীর দায়েরকৃত দেওয়ানী রিভিশন আবেদনটি দেনমোহরের অংশে মঞ্জুর এবং ভরণপোষণের অংশে খারিজ করা হলো।
- দেনমোহরের ডিক্রি বাতিল: যেহেতু বিবাহ এখনো বলবৎ রয়েছে এবং আশু মোহরানা পরিশোধিত, সেহেতু বাদীর অনুকূলে প্রদত্ত সম্পূর্ণ দেনমোহরের ডিক্রি রদ ও বাতিল করা হলো।
- ভরণপোষণের ডিক্রি পূর্ণ বহাল: স্ত্রী এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাসন্তানের অনুকূলে বিচারিক আদালত কর্তৃক নির্ধারিত বিগত ও ভবিষ্যৎ মাসিক ভরণপোষণের ডিক্রি চূড়ান্তভাবে বহাল রাখা হলো।
১. বিবাহ বহালে বিলম্বিত দেনমোহর নয়
দাম্পত্য সম্পর্ক বহাল থাকা অবস্থায় বিলম্বিত দেনমোহর প্রদেয় হয় না; কেবল আশু দেনমোহর যেকোনো সময় তলবযোগ্য।
২. ৭ ধারার নোটিশ ছাড়া তালাক অকার্যকর
চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ এবং ৯০ দিন অতিবাহিত না হলে শরিয়াহ বা আইনে কোনো তালাক বা খোলা তালাক কার্যকর হয় না।
৩. ১০ ধারার শর্তের সীমাবদ্ধতা
নিকাহনামায় আশু ও বিলম্বিত মোহরানার উল্লেখ থাকলে ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ১০ ধারার তলবি অনুমান খাটে না।
৪. ভরণপোষণ অলঙ্ঘনীয় অধিকার
বিনা কারণে স্ত্রীকে আলাদা রাখলে স্ত্রী এবং সন্তানের আজীবন ভরণপোষণ দিতে পিতা আইনগতভাবে বাধ্য।
মামলা দায়েরের পূর্বে দেখুন আশু হিসেবে কত টাকা লেখা আছে এবং তা পরিশোধ দেখানো হয়েছে কি না; অন্যথায় দেনমোহরের প্রার্থনা আটকে যাবে।
তালাক না হয়ে থাকলে আরজিতে সম্পূর্ণ দেনমোহর না চেয়ে শুধুমাত্র অপরিশোধিত আশু মোহরানা ও নিয়মিত খোরপোষের প্রার্থনা রাখুন।
স্বামী যদি খোলা তালাক দাবি করে, তবে চেয়ারম্যানকে নোটিশ এবং ৯০ দিনের সালিশি কার্যক্রম আদালতের নথিতে প্রমাণ করতে হবে।
তালাক হোক বা বিবাহ বলবৎ থাকুক, নাবালক সন্তানের সাবালক হওয়া পর্যন্ত উপযুক্ত খোরপোষ দেওয়া পিতার পরম আইনি বাধ্যবাধকতা।
স্বামীর প্রতারণামূলক তালাকের দাবি খণ্ডন করতে স্ত্রী লিখিত জবাবের আগেই আরজি সংশোধন করে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনা স্পষ্ট করে তুলে ধরুন।

