ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪৭ ধারায় বাদীর অনুপস্থিতির কারণে নালিশি মামলা একবার খারিজ হয়ে আসামি খালাস পেলে একই অভিযোগে পুনরায় মামলা দায়ের সম্পূর্ণ বারিত: হাইকোর্ট
⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত: ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪৭ ধারার অধীন বাদীর গরহাজিরার কারণে নালিশি মোকদ্দমা খারিজ হলে তা নিছক কোনো নিষ্পত্তিহীন খারিজ নয়; এটি আইনের দৃষ্টিতে আসামির চূড়ান্ত খালাস (Acquittal)। ধারা ৪০৩ এবং সংবিধানের ৩৫(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী খালাসপ্রাপ্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে একই ঘটনা ও অপরাধের অভিযোগে দ্বিতীয়বার নালিশি মামলা দায়ের আইনত সম্পূর্ণ বারিত। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের এই সিদ্ধান্ত দেশের আইন অঙ্গনে একটি ঐতিহাসিক ও ল্যান্ডমার্ক দিকনির্দেশনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছে।
ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার অন্যতম প্রাচীন ও সম্মানিত নীতি হলো Nemo debet bis vexari pro una et eadem causa— অর্থাৎ একই অপরাধের জন্য কোনো নাগরিককে দুইবার আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বিপন্ন করা যাবে না। আমাদের সংবিধানের ৩৫(২) অনুচ্ছেদে এই অধিকারটিকে মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০৩ ধারায় তা সুনির্দিষ্ট বিধিবদ্ধ সুরক্ষা লাভ করেছে। প্রায়শই দেখা যায়, নালিশি মামলায় (Complaint Case) বাদী আদালতে হাজির না হওয়ায় বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট আদালত কার্যবিধির ২৪৭ ধারায় মামলাটি খারিজ করে দেন এবং আসামিকে খালাস প্রদান করেন। পরবর্তীতে সেই একই বাদী কোনো আপিল বা রিভিশন না করে চালাকি করে একই ঘটনা দেখিয়ে কিছুদিন পর আরেকটি নতুন নালিশি মামলা দায়ের করেন। অত্র রায়ে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ এই অপতৎপরতার বিরুদ্ধে একটি চূড়ান্ত ও অকাট্য আইনি নির্দেশনা প্রদান করেছেন।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে প্রকাশ, দ্বিতীয় পক্ষ মো. আব্দুল বাতেন দরখাস্তকারী মো. শাহজাহান আলীর বিরুদ্ধে ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে দণ্ডবিধির ৪২০/৪০৬ ধারায় একটি নালিশি সি.আর. মামলা দায়ের করেন। বিজ্ঞ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আসামির বিরুদ্ধে সমন জারি করেন এবং আসামি নিয়মিত হাজিরা দিয়ে জামিন লাভ করেন।
মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হলে বিচারিক আদালত সাক্ষ্যগ্রহণের একাধিক তারিখ ধার্য করেন। কিন্তু বাদী টানা তিনটি নির্ধারিত তারিখে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে অনুপস্থিত থাকেন। অবশেষে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪৭ ধারার বিধান প্রয়োগ করে বাদীর গরহাজিরায় মামলাটি খারিজ করেন এবং আসামিকে অত্র মামলার সমস্ত দায় হতে ‘খালাস’ (Acquitted) প্রদান করেন। কিন্তু বাদী উক্ত খালাসের আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে কোনো আপিল না করে, তিন মাস পর পুনরায় একই আদালতে একই ঘটনা ও একই নথিপত্রের উল্লেখ করে দ্বিতীয় একটি সি.আর. মামলা দায়ের করেন।
দ্বিতীয় মামলায় বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট নালিশকারীর আবেদন আমলে নিয়ে পুনরায় শাহজাহান আলীর বিরুদ্ধে সমন জারি করেন। আসামি আদালতে উপস্থিত হয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০৩ ধারার বিধান তুলে ধরে মামলাটি খারিজের দরখাস্ত দাখিল করেন। কিন্তু বিচারিক আদালত এই ভুল ধারণার ওপর নির্ভর করেন যে, যেহেতু পূর্বের মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ ব্যতীত খারিজ হয়েছিল, সেহেতু এটি কোনো চূড়ান্ত খালাস নয় এবং দ্বিতীয় মামলা চলতে কোনো বাধা নেই।
ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এই বেআইনি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয়ে আসামি শাহজাহান আলী হাইকোর্ট বিভাগে ফৌজদারি রিভিশন আবেদন দায়ের করেন।
👤 আবেদনকারী / দরখাস্তকারী পক্ষের আইনি যুক্তি
- ধারা ২৪৭ এর অলঙ্ঘনীয় ভাষা: ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪৭ ধারায় দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা হয়েছে— “If the complainant at any time fails to appear, the Magistrate shall, notwithstanding anything hereinbefore contained, acquit the accused, unless for some reason he thinks proper to adjourn the hearing of the case to some other day.” এখানে শব্দটি হলো ‘Acquit’ (খালাস), কোনো ডিসচার্জ (Discharge) নয়।
- ধারা ৪০৩ এর আইনি প্রাচীর: ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০৩(১) ধারা সুস্পষ্ট নির্দেশ করে যে, কোনো উপযুক্ত আদালত কর্তৃক কোনো ব্যক্তি একবার খালাস পেলে, যতদিন সেই খালাসের আদেশ বহাল থাকে, ততদিন সেই একই অপরাধের জন্য তার দ্বিতীয়বার বিচার হতে পারে না।
- আপিল না করার ফল: বাদী যদি মনে করতেন যে তাঁর অনুপস্থিতি অনিবার্য ছিল, তবে তাঁর একমাত্র আইনি প্রতিকার ছিল হাইকোর্টে কার্যবিধির ৪১৭(২) ধারায় খালাসের বিরুদ্ধে স্পেশাল লিভ টু আপিল (SLPA) দায়ের করা। আপিল না করে দ্বিতীয় নালিশ করা আদালতের বিচারিক এখতিয়ারের অবমাননা।
👥 বিপরীতপক্ষ / বাদীর আইনি অবস্থান
- অধস্তন আদালতের রায় ও আদেশ সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং প্রচলিত বিচারিক চর্চার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- আবেদনকারী পক্ষের বক্তব্য মামলার মূল আইনি ভিত্তি ও নথিপত্রের বিপরীতে দাঁড়ায় না।
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের সামনে মূল বিচার্য বিষয় ছিল: (১) সংশ্লিষ্ট বিশেষ আইনের বিধানাবলি কি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল, নাকি তা লংঘিত হয়েছে? (২) অধস্তন আদালত কি এখতিয়ারবহির্ভূত আদেশ প্রদান বা প্রমাণের ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে গুরুতর বিচারিক ভুল (Jurisdictional Error) করেছেন? এবং (৩) মামলার সামগ্রিক ঘটনা ও নথিপত্র বিবেচনায় সংক্ষুব্ধ পক্ষের আবেদন কি আইনত মঞ্জুরযোগ্য?
বিজ্ঞ বিচারপতি উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি গ্রহণ করেন, মামলার আরজি, জবাব ও মূল নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেন এবং আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতির আলোকে প্রতিটি বিচার্য বিষয়ের নিষ্পত্তি করেন।
মাননীয় একক বেঞ্চ ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ২৪৭, ৪০৩ এবং ভারতীয় ও পাকিস্তানি সুপ্রিম কোর্টসহ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বহু শতবর্ষের নজির বিশদভাবে পর্যালোচনা করেন:
ক) ২৪৭ ধারার খারিজ কোনো সাধারণ খারিজ নয়, এটি চূড়ান্ত খালাস
আদালত উল্লেখ করেন, দেওয়ানি কার্যবিধিতে বাদীর অনুপস্থিতিতে মামলা খারিজ হলে যেমন অর্ডার ৯ রুল ৯ মোতাবেক মামলা পুনঃরুজ্জীবিত (Restoration) করা যায়, ফৌজদারি আইনে নালিশি মামলার ক্ষেত্রে তেমন কোনো সুযোগ নেই। আইনসভা ইচ্ছা করেই ২৪৭ ধারায় ‘খালাস’ শব্দটি ব্যবহার করেছে যাতে বাদী দায়িত্বহীনভাবে কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে বছরের পর বছর তাকে আদালতে ঝুলিয়ে রাখতে না পারে। বাদী যখন মামলা ফেলে পালিয়ে যায় বা আদালতে আসে না, তখন আদালত আসামিকে মুক্তি নয়— চিরতরে খালাস প্রদান করে।
খ) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রতিষ্ঠিত নজির
হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত State vs. Abdul Karim (76 DLR (AD) 112) এবং ঢাকা হাইকোর্টের ল্যান্ডমার্ক রায় Mofizur Rahman vs. The State (27 DLR 45) স্মরণ করিয়ে দেন। আদালত বলেন:
“An order of acquittal recorded under Section 247 of the Code of Criminal Procedure on the ground of absence of the complainant is a final acquittal on merits in the eye of law. So long as that order is not set aside by the appellate court under Section 417, a second complaint based on the same allegations is completely barred under Section 403 of the Code and Article 35(2) of the Constitution.”
গ) ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারিক অজ্ঞতা
মাননীয় আদালত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট ফৌজদারি আইনের মৌলিক নীতি না জেনে এবং সংবিধানের মৌলিক অধিকার উপেক্ষা করে দ্বিতীয় মামলায় সমন জারি করে বিচারিক পদের চরম অপব্যবহার করেছেন। আইন সম্পর্কে আদালতের এই ধরনের উদাসীনতা ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
মহামান্য আদালত আরও অভিমত ব্যক্ত করেন যে, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে বিচারিক আদালতগুলোর দায়িত্ব হলো কোনো যান্ত্রিক বা অন্ধ দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে আইনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। উচ্চ আদালতের দীর্ঘ নজির ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই ব্যাখ্যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
চূড়ান্ত রায় ও আদেশ: সার্বিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ ফৌজদারি রিভিশন আবেদনটি পূর্ণাঙ্গভাবে মঞ্জুর করেন। নিম্ন আদালতে বিচারাধীন দ্বিতীয় সি.আর. মামলার সমন জারির আদেশ এবং সমস্ত বিচারিক কার্যক্রমকে সম্পূর্ণ অবৈধ, এখতিয়ারবহির্ভূত এবং বাতিল ঘোষণা করা হলো।
দরখাস্তকারী মো. শাহজাহান আলীকে দ্বিতীয় মামলার দায় থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হলো এবং তাঁর জামিননামার দায় প্রত্যাহার করা হলো।
- সুনির্দিষ্ট আইনি নীতি: ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪৭ ধারায় বাদীর অনুপস্থিতির কারণে নালিশি মামলা একবার খারিজ হ… সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের নীতি দেশের সকল আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক।
- সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতা: সুপ্রিম কোর্টের ঘোষিত এই রায় দেশের প্রতিটি আদালত ও ট্রাইব্যুনালকে নজির হিসেবে মেনে চলার বাধ্যবাধকতা তৈরি করে।
- প্রক্রিয়াগত ত্রুটির মারাত্মক প্রভাব: আইনের অলঙ্ঘনীয় বিধান অমান্য করে গৃহীত যেকোনো প্রশাসনিক বা বিচারিক পদক্ষেপ গোড়াতেই বাতিলযোগ্য।
- নাগরিক ও ব্যবসায়িক অধিকারের সুরক্ষা: সমতা, সততা এবং সুশাসনের স্বার্থে এই রায় বিচারপ্রার্থী ও পেশাজীবীদের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে।
- মামলার তারিখে নিয়মিত হাজিরা: সি.আর. মামলায় বাদীকে প্রতিটি তারিখে সশরীরে উপস্থিত থাকতে হবে অথবা যৌক্তিক কারণে অনুপস্থিত থাকলে অ্যাডভোকেটের মাধ্যমে সময় প্রার্থনার দরখাস্ত দিতে হবে।
- ২৪৭ ধারায় খারিজ হলে আপিলই একমাত্র পথ: যদি মামলা ২৪৭ ধারায় খারিজ হয়ে যায়, তবে দ্বিতীয় কোনো মামলা দায়ের করবেন না; ৬০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে খালাসের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করুন।
- আসামির দ্বৈত বিপত্তির সুরক্ষা: একবার ২৪৭ ধারায় খালাস পাওয়ার পর যদি বাদী একই বিষয়ে পুনরায় মামলা করে, তবে অবিলম্বে হাইকোর্টে এসে কার্যবিধির ৫৬১এ ধারায় দ্বিতীয় মামলা বাতিল করিয়ে নেওয়া আসামির সাংবিধানিক অধিকার।
- মামলা বা যেকোনো আইনি নোটিশের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের এই সাম্প্রতিকতম নজিরটি সঠিকভাবে উদ্ধৃত করুন।
- বিচারিক আদালতে মামলা শুনানিকালে মূল সংবিধিবদ্ধ বিধানের সাথে তথ্যের সামঞ্জস্য প্রমাণে সচেষ্ট থাকুন।
