আদালতের নথি জালিয়াতি করে আসামির নাম পরিবর্তন, বাদী আটক
ঢাকার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন একটি ফৌজদারি মামলার মূল নথিতে গুরুতর জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। আদালতের সংরক্ষিত নথি দেখার সুযোগ নিয়ে মূল নালিশি দরখাস্ত, তার সত্যায়িত অনুলিপি, মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এবং পূর্ববর্তী বিচারিক আদেশে আসামির নাম কেটে অন্য এক ব্যক্তির নাম হাতে লিখে প্রতিস্থাপন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মামলার বাদী মো. নূরে আলমকে হাতেনাতে আটক করে রাজধানীর কোতোয়ালি থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে।
রোববার (৮ নভেম্বর) এ ঘটনায় ঢাকার ভারপ্রাপ্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহবুবুর রহমানের আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. শরীফ উদ্দিন ভূঁইয়া বাদী হয়ে রাজধানীর কোতোয়ালি থানায় একটি নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন। আদালত প্রাঙ্গণে বিচারিক নথি জালিয়াতির এ ঘটনায় বিচার বিভাগ ও আইনজীবী অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. শরীফ উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, আদালতের মূল নথিপত্রে এভাবে ঘষামাজা, কাটাকাটি ও তথ্য পরিবর্তনের ঘটনাটি ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিচারকের দৃষ্টিগোচর করা হয়। পরবর্তীতে আদালতের বিজ্ঞ বিচারকের সুস্পষ্ট আদেশের পরিপ্রেক্ষিতেই কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং অভিযুক্ত বাদী নূরে আলমকে পুলিশি হেফাজতে দেওয়া হয়েছে।
যেভাবে ধরা পড়ে নথি জালিয়াতির ঘটনা
আদালতের সংশ্লিষ্ট সূত্র ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ঢাকার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলার শুনানির দিন ধার্য ছিল। গত ২০ সেপ্টেম্বর মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম ও শুনানির জন্য সংশ্লিষ্ট নথি আদালতে উপস্থাপন করা হয়। সে সময় মামলার বাদী মো. নূরে আলম নিজের প্রয়োজনে মামলার নথিটি একটু দেখার কথা বলে আদালতের দায়িত্বপ্রাপ্ত বেঞ্চ সহকারীর কাছ থেকে তা হাতে নেন।
পরবর্তীতে ওই দিন বিকেলের আদালতের দৈনন্দিন কার্যক্রম শেষে নথিপত্র গোছানোর সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত বেঞ্চ সহকারীর নজরে আসে যে, মামলার মূল নালিশি দরখাস্তে স্পষ্ট কাটাকাটি ও তথ্যগত পরিবর্তন করা হয়েছে। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তিনি নথিটি গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে শুরু করেন। পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষার পর দেখা যায়, মামলার কেবল একটি পৃষ্ঠায় নয়, বরং নথির একাধিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মূল নথিপত্রে একইভাবে কাটাকাটি ও হস্তাক্ষরে নাম পরিবর্তনের মারাত্মক জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারে বেঞ্চ সহকারী মো. শরীফ উদ্দিন উল্লেখ করেন, বিচারাধীন মামলার মূল নালিশি দরখাস্তে টাইপ করা ২ নম্বর আসামি জুনায়েতের নাম ও ঠিকানা কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। সেখানে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে হাতে লিখে ‘সজিব হোসেন ওরফে বাবু’ নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একই কৌশলে তার বাবার নাম ও স্থায়ী ঠিকানাও জালিয়াতি করে পরিবর্তন করা হয়।
পরবর্তীতে নথির অন্যান্য অংশ পর্যালোচনা করে আদালত দেখতে পান, মূল নালিশি দরখাস্ত ছাড়াও আদালতে দাখিলকৃত নালিশি দরখাস্তের সত্যায়িত অনুলিপি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনেও একই কৌশলে মূল আসামির নাম কেটে সজিব হোসেন ওরফে বাবুর নাম বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ নথিপত্র অনুযায়ী, জালিয়াতির মাধ্যমে যুক্ত করা এই সজিব হোসেন ওরফে বাবুর বিরুদ্ধে আদালত ইতিপূর্বে কোনো অপরাধ আমলে গ্রহণ করেননি বা তার বিরুদ্ধে কোনো বিচারিক প্রক্রিয়াও শুরু হয়নি।
জিজ্ঞাসাবাদে আইনজীবীর সম্পৃক্ততার দাবি বাদীর
আদালতের বিচারিক নথিতে ঘষামাজা, কাটাকাটি ও স্পর্শকাতর তথ্য পরিবর্তনের এ গুরুতর বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর বেঞ্চ সহকারী অবিলম্বে বিচারককে অবহিত করেন। এরপর বিচারকের সরাসরি নির্দেশনায় অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি), আদালতের জারিকারক মো. আবুল কালাম এবং অফিস সহায়ক মো. বোরহান উদ্দিনের উপস্থিতিতে অভিযুক্ত মামলার বাদী মো. নূরে আলমকে আদালতের খাসকামরায় নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মামলার মূল নথিতে জালিয়াতি ও তথ্য বিকৃতির বিষয়টি স্বীকার করেন বাদী নূরে আলম। তবে তিনি দাবি করেন, তিনি নিজে এই কাটাকাটি বা কোনো কিছু লেখেননি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, তার পূর্বে নিয়োজিত আইনজীবী মো. মাহবুবুর রহমান খান এবং অজ্ঞাতনামা আরও দুই থেকে তিনজন ব্যক্তি পরস্পর যোগসাজশে ও পরিকল্পিতভাবে নথির বিভিন্ন অংশে আসামির নাম ও ঠিকানা পরিবর্তন করেছেন।
তবে বিচারিক পর্যবেক্ষণে আদালত উল্লেখ করেন, বাদীর মৌখিক বক্তব্যের পাশাপাশি তার সক্রিয় প্ররোচনা ও নির্দেশনায় পূর্ববর্তী নিয়োজিত আইনজীবী এ জালিয়াতির কাজ করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও উঠে আসে যে, বিচারিক প্রক্রিয়ায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি ও অন্যায্য সুবিধা হাসিলের উদ্দেশ্যে সংঘটিত এ জালিয়াতির ঘটনায় বাদী ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ছাড়াও অন্য কোনো চক্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিচারকের নির্দেশে নিয়মিত মামলা ও পুলিশে হস্তান্তর
আদালতের সংরক্ষিত নথিপত্রে অনুমোদিত প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে ইচ্ছাকৃত কাটাকাটি, ঘষামাজা এবং আসামির নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতারণা ও জালিয়াতির স্পষ্ট প্রমাণ মেলায় তাৎক্ষণিকভাবে বাদী নূরে আলমকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে তাকে কোতোয়ালি থানা পুলিশের হেফাজতে হস্তান্তর করা হয় এবং নিয়মিত মামলা রুজু করার নির্দেশ প্রদান করা হয়।
আদালতের লিখিত আদেশে বিচারক মো. মাহবুবুর রহমান উল্লেখ করেন, আদালতের কোনো রূপ অনুমতি বা আইনানুগ এখতিয়ার ছাড়াই বিচারাধীন মামলার মূল নালিশি দরখাস্ত, এর সত্যায়িত অনুলিপি, তদন্ত প্রতিবেদন এবং পূর্ববর্তী বিভিন্ন তারিখের আদেশনামায় ইচ্ছাকৃতভাবে কাটাকাটি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পূর্বের আসামি ‘জুনায়েত’-এর পরিবর্তে ‘সজিব হোসেন ওরফে বাবু’র নাম বসিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে।
বিচারিক আদেশে বিচারক আরও উল্লেখ করেন, জিজ্ঞাসাবাদে বাদী স্বীকার করেছেন যে, তার প্ররোচনায় তার পূর্ববর্তী আইনজীবী এই কাজ সম্পন্ন করেছেন। এই জালিয়াতির পেছনে কোনো বৃহৎ স্বার্থান্বেষী মহলের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। ফলে ঘটনাটি আদালতের ভেতরে প্রশাসনিকভাবে মীমাংসা না করে নিয়মিত ফৌজদারি আইনের আওতায় তদন্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। সে কারণেই বেঞ্চ সহকারীকে কোতোয়ালি থানায় নিয়মিত এজাহার দায়েরের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং বাদীকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
‘নথি জালিয়াতি বিচারব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত’
আদালতের মূল নথিপত্র বিকৃতির এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সরকারি কৌঁসুলিরা। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী এ বিষয়ে বলেন, “আদালতের নথিপত্রে কাটাকাটি ও জালিয়াতি করে আসামির নাম পরিবর্তনের ঘটনা বিচারব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত। বিচার বিভাগ সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাস্থল। সেই বিচারালয়ের মূল নথিপত্রই যদি এভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে পরিবর্তন করা হয়, তাহলে সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাবেন।”
তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে আরও বলেন, “এটি কোনোভাবেই বরদাশত করার মতো অপরাধ নয়। এ ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষ অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কোনো আইনজীবী বা অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।”
আইনজীবীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি বার সমিতির
এদিকে একজন আইনজীবীর নাম জালিয়াতির সঙ্গে জড়িয়ে আসায় বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে আইনজীবী সমাজ। এ বিষয়ে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবুল কালাম খান স্পষ্ট ভাষায় জানান, আইন পেশা একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ, দায়িত্বশীল এবং পবিত্র পেশা। এ পেশাকে ব্যবহার করে কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াতে পারে না।
তিনি বলেন, “কোনো আইনজীবীর বিরুদ্ধে আদালতের নথি জালিয়াতি বা কাটাকাটি করার মতো অনৈতিক ও বেআইনি কাজে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে ঢাকা আইনজীবী সমিতি তার ব্যক্তিগত দায়ভার গ্রহণ করবে না।”
আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আরও উল্লেখ করেন, “অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীকে শোকজ করা হবে। তদন্তে তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের বিধিমালা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
আদালতের নথি জালিয়াতির এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার প্রেক্ষিতে কোতোয়ালি থানা পুলিশ ইতোমধ্যে বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশের তদন্তে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী বা আদালতের অন্য কোনো কর্মচারীর গাফিলতি বা সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা উদঘাটন করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

