পারিবারিক বিরোধ বা স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হলেও নাবালক সন্তানের আজীবন ভরণপোষণ পিতার নিঃশর্ত ও আইনি বাধ্যবাধকতা: হাইকোর্টের রায়
মামলার মৌলিক তথ্যাবলি ও বিচারিক পরিচিতি
| মামলার নাম ও নম্বর: | সিভিল রিভিশন নং ৪২১০/২০২৪ (Civil Revision No. 4210 of 2024) |
| আদালত: | বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (দেওয়ানি রিভিশন এখতিয়ার) |
| একক বেঞ্চ: | মাননীয় বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী |
| পক্ষগণ: | মো. আসাদুজ্জামান (বাদী-পিতা-দরখাস্তকারী) বনাম মোছা. তানজিনা আক্তার ও অন্য (বিবাদী পক্ষ) |
| মূল আইন ও ধারা: | পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ / পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ এর ধারা ৫; মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ধারা ৯ |
| মূল আইনি সিদ্ধান্ত: | দাম্পত্য সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হলেও নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ বহন করা পিতার নিঃশর্ত প্রাকৃতিক ও আইনগত দায়িত্ব। পিতার অর্থনৈতিক সংকট বা সন্তানের মায়ের কাছে বসবাস করা এই বাধ্যবাধকতা এড়ানোর কোনো অজুহাত হতে পারে না। |
১. মামলার ঘটনা ও নালিশের প্রেক্ষাপট
বিবাহবিচ্ছেদ এবং পারিবারিক ভাঙন মানবজীবনের এক অপ্রিয় বাস্তবতা। কিন্তু প্রায়শই দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার তীব্র বিদ্বেষ ও ক্ষোভের করুণ বলি হয় তাদের নিষ্পাপ সন্তানরা। বিবাহবিচ্ছেদের পর পিতা অনেক সময় সন্তানের খোঁজখবর নেওয়া বন্ধ করে দেন এবং ভরণপোষণ দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। অত্র মামলার রায়টি সন্তান প্রতিপালনে পিতার অবিচ্ছেদ্য ও পবিত্র আইনগত দায়িত্বকে পুনরায় সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মামলার বিবরণে জানা যায়, দরখাস্তকারী মো. আসাদুজ্জামান এবং প্রথম বিবাদী মোছা. তানজিনা আক্তারের বৈবাহিক জীবন কয়েক বছর চলার পর তাদের একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। পরবর্তীতে তাদের দাম্পত্য কলহ চরমে পৌঁছালে স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে তালাক প্রদান করা হয়। বিবাহবিচ্ছেদের পর মা তাঁর শিশু সন্তানকে নিয়ে পিতৃগৃহে আশ্রয় নেন এবং পারিবারিক আদালতে সন্তানের অতীত ও ভবিষ্যৎ মাসিক ভরণপোষণ (Maintenance) এবং চিকিৎসার খরচ দাবি করে পারিবারিক মামলা দায়ের করেন।
২. পারিবারিক আদালতের ডিক্রি ও আপিল আদালতের রায়
পারিবারিক আদালত উভয় পক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে নাবালক পুত্রের শিক্ষা, খাদ্য ও স্বাস্থ্য খরচের বাস্তব দিক বিবেচনা করে সন্তোষজনক পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন। আদালত আদেশ দেন যে, পিতা প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে সন্তানের অনুকূলে মাসিক ১০,০০০ (দশ হাজার) টাকা ভরণপোষণ বাবদ প্রদান করবেন এবং পূর্ববর্তী বকেয়া ভরণপোষণ বাবদ এককালীন ২ লক্ষ টাকা পরিশোধ করবেন।
উক্ত ডিক্রির বিরুদ্ধে পিতা জেলা জজ আদালতে পারিবারিক আপিল দায়ের করেন। পিতা দাবি করেন যে, তাঁর ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তিনি দ্বিতীয় বিবাহ করায় তাঁর নতুন সংসারের ব্যয়ভার রয়েছে; ফলে মাসিক দশ হাজার টাকা প্রদান তাঁর পক্ষে অসম্ভব। তাছাড়া স্ত্রী স্বেচ্ছায় সন্তানকে নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন, সুতরাং তাঁর নিজেরই সন্তানের খরচ বহন করা উচিত। অতিরিক্ত জেলা জজ আপিল খারিজ করে পারিবারিক আদালতের ডিক্রি সম্পূর্ণ বহাল রাখেন। অতঃপর পিতা সংক্ষুব্ধ হয়ে হাইকোর্টে এই সিভিল রিভিশন দায়ের করেন।
৩. হাইকোর্টে পিতার পক্ষে আইনি যুক্তি
দরখাস্তকারী পিতার পক্ষে বিজ্ঞ আইনজীবী শুনানিতে সওয়াল করেন:
- পিতার সামর্থ্যের বাইরে খোরপোষ নির্ধারণ: পারিবারিক আদালত পিতার বর্তমান মাসিক আয়ের কোনো দালিলিক প্রমাণ বা আয়কর নথি পর্যালোচনা না করেই মাত্রাতিরিক্ত মাসিক ১০,০০০ টাকা খোরপোষ নির্ধারণ করেছেন, যা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অযৌক্তিক।
- সন্তানের জিম্মার প্রশ্ন: মা জোরপূর্বক সন্তানকে আটকে রেখেছেন। পিতা সন্তানকে নিজের কাছে এনে লালন-পালন করতে প্রস্তুত। মা যদি সন্তানকে পিতার কাছে হস্তান্তর না করেন, তবে পিতার ওপর একা খোরপোষের সম্পূর্ণ বোঝা চাপানো অন্যায়।
- মায়ের নিজস্ব আয়ের বিবেচনা: নালিশকারী মা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এবং তিনি আর্থিকভাবে সচ্ছল। ফলে তিনি সন্তানের খরচে সমান অংশীদার হতে বাধ্য।
৪. বিবাদী ও সন্তানের পক্ষে যুক্তি
বিবাদী মাতার পক্ষে বিজ্ঞ আইনজীবী নিবেদন করেন যে, পিতা একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্য এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন। দ্বিতীয় বিয়ের অজুহাত দেখিয়ে প্রথম সন্তানের অধিকার অস্বীকার করা অমানবিক। মা সন্তানের হেফাজতকারী বা জিম্মাদার (Custodial Parent) হিসেবে দিনরাত সেবা করছেন, কিন্তু মুসলিম আইন ও পারিবারিক আদালত আইন অনুযায়ী সন্তানের অর্থনৈতিক খরচ বহনের একক ও প্রধান দায়িত্ব পিতার।
৫. হাইকোর্ট বিভাগের বিশদ বিশ্লেষণ ও আইনি সিদ্ধান্ত
মাননীয় একক বেঞ্চ মুসলিম আইন, পারিবারিক আদালত আইন এবং আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদের আলোকে মামলাটি বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেন:
ক) মুসলিম আইনে পিতার নিঃশর্ত দায়বদ্ধতা
মাননীয় আদালত উল্লেখ করেন, মুসলিম আইনশাস্ত্রের (Mohammedan Law by D.F. Mulla, Section 370) সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো— পিতা সক্ষম ও জীবিত থাকা অবস্থায় নাবালক পুত্রের প্রাপ্তবয়স্ক (Majority) হওয়া পর্যন্ত এবং কন্যা সন্তানের বিবাহ না হওয়া পর্যন্ত তাদের পূর্ণ ভরণপোষণ দিতে পিতা সম্পূর্ণ বাধ্য। মায়ের নিজস্ব সম্পদ বা আয় থাকলেও পিতাকে এই অর্থনৈতিক দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া যায় না। পিতা শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী না হলে সন্তানের ভরণপোষণ প্রদানে কোনো অক্ষমতার অজুহাত আদালত গ্রহণ করতে পারে না।
খ) হেফাজত (Hizanat) এবং ভরণপোষণের সম্পর্ক
পিতার এই দাবিকে মাননীয় আদালত সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে— “সন্তান পিতার কাছে না থাকলে পিতা খোরপোষ দেবেন না।” আদালত পরিষ্কার জানিয়ে দেন, ৭ বছর বয়স পর্যন্ত পুত্র সন্তান মায়ের হেফাজতে থাকা সন্তানের ধর্মীয় ও প্রাকৃতিক অধিকার। পিতা সন্তানের অভিভাবক (Guardian) হলেও মা হচ্ছেন প্রাকৃতিক জিম্মাদার। মা সন্তানকে নিজের কাছে রেখেছেন বলেই পিতা খোরপোষ বন্ধ করবেন— এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। বরং পিতা যেখানেই সন্তান থাকুক, তার খোরপোষ নিয়মিত পৌঁছে দিতে বাধ্য।
গ) সুপ্রিম কোর্টের নজিরসমূহ
হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত Md. Mizanur Rahman vs. Mosammot Rasheda Khatun (Civil Revision No. 4266 of 2015) এবং Rustom Ali vs. Jamila Khatun (43 DLR (AD) 301) উদ্ধৃত করে বলেন:
“The liability of the father to maintain his minor children is an absolute statutory and moral obligation. A father cannot escape this sacred duty on the plea of subsequent marriage, business loss, or separation from the mother. The welfare and dignity of the child are paramount.”
বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও শিক্ষা ব্যয়ের যুগে একটি ক্রমবর্ধমান শিশুর জন্য মাসিক ১০,০০০ টাকা কোনোভাবেই অতিরিক্ত বা বিলাসিতা নয়; বরং এটি একটি অত্যন্ত যৌক্তিক ও পরিমিত অংক।
৬. চূড়ান্ত রায় ও নির্দেশাবলী
হাইকোর্ট বিভাগ অধস্তন পারিবারিক আদালত ও জেলা জজ আদালতের রায়ে কোনো ধরনের আইনগত বা পদ্ধতিগত ত্রুটি খুঁজে পাননি। আদালত রায় দেন যে, নিম্ন আদালতের ডিক্রি সম্পূর্ণ আইনানুগ, সুবিবেচনাপ্রসূত এবং মানবিক।
অতএব, সিভিল রিভিশন আবেদনটি সরাসরি খারিজ করা হলো। দরখাস্তকারী পিতাকে পারিবারিক আদালতের ডিক্রি অনুসারে প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে সন্তানের অনুকূলে মাসিক ১০,০০০ টাকা খোরপোষ পরিশোধের নির্দেশ বহাল রাখা হলো। এছাড়া বকেয়া ২ লক্ষ টাকা আগামী ৩ মাসের মধ্যে দুটি সমান কিস্তিতে পারিবারিক আদালতে জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হলো, অন্যথায় পারিবারিক আদালত আইন অনুযায়ী পিতার বিরুদ্ধে দেওয়ানি আটকাদেশ (Civil Imprisonment) বা স্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের পরোয়ানা জারির নির্দেশ প্রদান করা হলো।
৭. অভিভাবক ও বিচারপ্রার্থীদের জন্য জরুরি আইনি পয়েন্ট
সন্তানের ভরণপোষণ সংক্রান্ত আইনি অধিকার:
- কত দিন ভরণপোষণ দিতে হবে: পুত্র সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক (১৮ বছর বা স্বাবলম্বী হওয়া) পর্যন্ত এবং কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে বিবাহ অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে।
- ভরণপোষণের আওতাভুক্ত ব্যয়: খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ছাড়াও সন্তানের বর্তমান মানসম্মত স্কুলের বেতন, বইপত্র, চিকিৎসা খরচ এবং ধর্মীয় শিক্ষার যাবতীয় খরচ ভরণপোষণের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
- পরবর্তী বিয়ের প্রভাব নেই: পিতা একাধিক বিয়ে করলেও বা নতুন সন্তান জন্মগ্রহণ করলেও পূর্বের সন্তানদের ভরণপোষণ কোনোভাবেই বন্ধ বা হ্রাস করা যায় না।
- পারিবারিক আদালতের ডিক্রি বাস্তবায়ন: খোরপোষের ডিক্রি অমান্য করলে পিতা কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই সরাসরি দেওয়ানি কারাগারে প্রেরিত হতে পারেন এবং তাঁর ব্যাংক হিসাব বা সম্পত্তি ক্রোক হতে পারে।
