স্ত্রীর অতীত ও চলমান ভরণপোষণ প্রদান স্বামীর অলঙ্ঘনীয় দায়, আলাদা থাকলেও প্রযোজ্য: হাইকোর্ট
⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের দ্বৈত বেঞ্চ মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ (MFLO 1961)-এর ৯ ধারা এবং পারিবারিক আদালত আইন সংক্রান্ত এক ল্যান্ডমার্ক রায়ে ঘোষণা করেছেন যে, স্বামীর অবহেলা, নিষ্ঠুরতা বা পরিত্যাগ করার কারণে স্ত্রী যদি পৈতৃক বাড়িতে পৃথক বসবাস করতে বাধ্য হন, তবুও বিবাহ বলবৎ থাকাকালীন এবং ইদ্দতকালীন সময় পর্যন্ত স্ত্রীর সমস্ত অতীত বকেয়া (Past Maintenance) এবং চলমান ভবিষ্যৎ খোরপোশ (Future Maintenance) পরিশোধ করা স্বামীর জন্য অলঙ্ঘনীয় ও নিঃশর্ত আইনি দায়। “স্ত্রী স্বেচ্ছায় পিত্রালয়ে অবস্থান করছেন” মর্মে স্বামীর ফাঁকা অজুহাত আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে না। পারিবারিক আদালত কর্তৃক ধার্যকৃত বকেয়া ও মাসিক ভরণপোষণের ডিক্রি পূর্ণ বহাল রেখেছেন মহামান্য হাইকোর্ট।
১. মামলার প্রেক্ষাপট ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ (Facts of the Case)
মামলাটির উৎপত্তি কুমিল্লা জেলার পারিবারিক আদালত ও সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মোসাম্মৎ ফরিদা বেগম কর্তৃক দায়েরকৃত পারিবারিক মোকদ্দমা নং ১৮২/২০১৯ থেকে। বাদী ফরিদা বেগমের সাথে বিবাদী মো. মাহবুবুর রহমানের বিবাহ ২০১৪ সালে রেজিস্ট্রিকৃত নিকাহনামামূলে সম্পন্ন হয় এবং তাদের সংসারে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়।
বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই স্বামী ও তার পরিবারের লোকজন যৌতুকের দাবিতে বাদীর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করেন। ২০১৭ সালের শেষের দিকে বিবাদী বাদীকে মারধর করে এক কাপড়ে সন্তানসহ বাবার বাড়িতে তাড়িয়ে দেন। এরপর দীর্ঘ ৩ বছর যাবৎ স্বামী বাদীর কোনো খোঁজখবর নেননি এবং স্ত্রী ও সন্তানের কোনো খোরপোশের অর্থ প্রদান করেননি। বাধ্য হয়ে স্ত্রী ফরিদা বেগম ২০১৯ সালে পারিবারিক আদালতে দেনমোহর, অতীত ৩ বছরের বকেয়া ভরণপোষণ এবং মাসিক চলমান ভরণপোষণ দাবি করে মোকদ্দমা দায়ের করেন।
পারিবারিক আদালত উভয় পক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে স্ত্রীর অনুকূলে বকেয়া খোরপোশ বাবদ ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং প্রতি মাসে নিয়মিত ৮,০০০ টাকা করে খোরপোশ প্রদানের ডিক্রি দেন। বিবাদী উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে জেলা জজ আদালতে পারিবারিক আপিল দায়ের করলে অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত তা খারিজ করেন। অতঃপর বিবাদী সংক্ষুব্ধ হয়ে হাইকোর্টে এই সিভিল রিভিশন দায়ের করেন।
২. বাদী ও বিবাদীর মুখোমুখি আইনি অবস্থান (Pleadings & Contentions)
🟢 স্ত্রী-বাদীর আইনগত যুক্তি (Wife’s Case)
- স্বামী শারীরিক নির্যাতন করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার কারণেই স্ত্রী বাবার আশ্রয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছেন।
- বিয়ে বলবৎ থাকাকালে স্বামীকে খাবার ও পোশাকের সংস্থান করতে হবে, স্ত্রী আলাদা থাকতে বাধ্য হলেও এই দায়িত্ব কমে না।
- মুসলিম পারিবারিক আইনে স্ত্রী তার অতীত বকেয়া (Past Maintenance) পাওয়ার পূর্ণ অধিকারী।
- কন্যাসন্তানের ভরণপোষণ বিয়ের পূর্ব পর্যন্ত পিতাকেই বহন করতে হবে।
🔴 স্বামী-আসামির যুক্তি (Husband’s Defense)
- স্ত্রী স্বামীর অবাধ্য হয়ে (Nushuz) নিজ ইচ্ছায় বাবার বাড়িতে চলে গেছেন এবং দাম্পত্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করেছেন।
- স্বামীর ঘরে ফিরে না আসলে কোনো অতীত খোরপোশ পাওয়ার অধিকার স্ত্রীর নেই।
- পারিবারিক আদালত যে পরিমাণ খোরপোশ ধার্য করেছেন তা স্বামীর আর্থিক সামর্থ্যের চেয়ে অতিরিক্ত।
৩. অধস্তন আদালতের রায় ও সিদ্ধান্তের পর্যালোচনা (Judgments of Lower Courts)
পারিবারিক আদালত নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখতে পান যে স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেননি বা কোনো সালিশ বৈঠক ডাকেননি। স্বামীর নির্যাতন ও অবহেলার কারণেই স্ত্রী আলাদা থাকতে বাধ্য হয়েছেন যা সাক্ষীদের সাক্ষ্যে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। ফলে আদালত বাদীর অনুকূলে দেনমোহর ও বকেয়াসহ খোরপোশের সঠিক ডিক্রি প্রদান করেন যা আপিল আদালত বহাল রাখেন।
৪. হাইকোর্ট বিভাগের গভীর আইনি পর্যবেক্ষণ ও নজির বিশ্লেষণ (High Court’s Reasoning & Ratio Decidendi)
মাননীয় বিচারপতি কাশেফা হোসেন ও বিচারপতি কাজী ওয়ালী আহমেদের ডিভিশন বেঞ্চ মুসলিম আইন ও সংবিধানের বিধানের আলোকে রায় প্রদান করেন:
📌 অতীত ভরণপোষণ (Past Maintenance) পাওয়ার অধিকার:
হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ল্যান্ডমার্ক রায় (Rustom Ali vs. Jamila Khatun, 43 DLR (AD) 301) উদ্ধৃত করে ঘোষণা করেন যে, বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী স্ত্রী কেবল বর্তমান নয়, বরং অতীতের বকেয়া খোরপোশও (Past Maintenance) আদায়ের পূর্ণ আইনি অধিকারী। স্বামী যদি স্ত্রীকে অবহেলা করে ফেলে রাখে, তবে স্ত্রী যত দিন খোরপোশ ছাড়া কাটাতে বাধ্য হয়েছেন, সেই পুরো মেয়াদের বকেয়া পাওনা স্বামী থেকে আদায় করতে পারবেন।
📌 যুক্তিসঙ্গত কারণে আলাদা বসবাস অবাধ্যতা নয়:
আদালত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, যখন স্বামীর অত্যাচার বা খোরপোশ না দেওয়ার কারণে স্ত্রী বাবার বাড়ি আশ্রয় নেন, তখন তাকে কোনোভাবেই ‘অবাধ্য’ বা ‘Nushuz’ বলা যাবে না। এটি স্ত্রীর জীবনের নিরাপত্তার জন্য যুক্তিসঙ্গত পৃথক বসবাস (Justifiable Separate Living)।
৫. হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায় ও দিকনির্দেশনা (Final Verdict & Directions)
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ স্বামীর রিভিশন আবেদনটি সরাসরি খারিজ করে দেন। পারিবারিক আদালতের ডিক্রি বহাল রেখে স্বামীকে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে সমস্ত বকেয়া খোরপোশের অর্থ পারিবারিক আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। ব্যর্থতায় দেওয়ানী কার্যবিধির ২১ আদেশের বিধানমতে স্বামীর সম্পত্তি ক্রোক ও দেওয়ানী কারাদণ্ডের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়।
৬. রায়ের মূল আইনি শিক্ষা ও নজির (Core Legal Principles & Ratio)
- অতীত খোরপোশের বৈধতা: মুসলিম আইনে স্ত্রী কেবল বর্তমান নয়, ফেলে রাখা পূর্ববর্তী সময়ের বকেয়া ভরণপোষণও আইনসঙ্গতভাবে দাবি করতে পারেন।
- স্বামীর শর্তহীন দায়: স্ত্রী আলাদা থাকতে বাধ্য হলেও বিবাহ বলবৎ থাকাকালে এবং তালাকের ক্ষেত্রে ইদ্দতকাল পর্যন্ত ভরণপোষণ দেওয়া স্বামীর মৌলিক দায়িত্ব।
- সন্তানের স্থায়ী সুরক্ষা: কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে সাবালিকা হওয়া ও বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত পিতার খোরপোশ প্রদানের দায় অব্যাহত থাকে।
৭. সাধারণ নাগরিক ও আইনজীবীদের জন্য ৫টি জরুরি সতর্কতা ও করণীয়
- খোরপোশ অস্বীকারের বিপদ: পারিবারিক কলহ হলেও স্ত্রীকে নিয়মিত ভরণপোষণ বা ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠিয়ে রসিদ সংরক্ষণ করা স্বামীর জন্য নিরাপদ।
- দেরি না করে মামলা দায়ের: স্ত্রী দীর্ঘদিন খোরপোশ না পেলে অতিরিক্ত বিলম্ব না করে ৩ বছরের তামাদির মধ্যে পারিবারিক আদালতে যাওয়া উচিত।
- আয়ের উপযুক্ত প্রমাণ দাখিল: স্ত্রীর আইনজীবীকে স্বামীর ব্যবসা, চাকরি বা ব্যাংক একাউন্টের প্রমাণাদি আদালতে দাখিল করে সম্মানজনক খোরপোশ নির্ধারণের দাবি তুলতে হবে।
- তালাক হলেও ইদ্দতের অধিকার: স্বামী তালাক দিলেও ইদ্দতের ৯০ দিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ ভরণপোষণ দিতে হবে, অন্যথায় স্ত্রী ডিক্রি পাবেন।
- ডিক্রি কার্যকরে সক্রিয়তা: পারিবারিক আদালতের রায় হওয়ার পর টাকা না দিলে সরাসরি জারি মামলা (Execution Case) দায়ের করে গ্রেফতারি পরোয়ানা নিতে হবে।

