দেরিতে ক্রস-অবজেকশন (Cross-Objection) দাখিলে আদালতের দরজা বন্ধ করা বেআইনি: ৪১ আদেশ ২২ বিধিতে হাইকোর্টের রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক তাৎপর্যপূর্ণ দেওয়ানী রায়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, দেওয়ানী কার্যবিধির ৪১ আদেশের ২২(১) বিধি (Order XLI Rule 22(1) CPC) অনুযায়ী আপিলে ক্রস-অবজেকশন (Cross-Objection বা বিপরীত আপত্তি) দাখিলের জন্য নির্ধারিত এক মাসের মেয়াদ কোনো অনমনীয় বা বাধ্যতামূলক (Not watertight or mandatory) বিধান নয়। উক্ত বিধির দ্বিতীয় অংশে আদালতকে “within such further time as the Appellate Court may see fit to allow” শীর্ষক সুস্পষ্ট সুরক্ষা কপাট (Safety Valve) প্রদান করা হয়েছে। আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক নজির ৫১ ডিএলআর (এডি) ২৫৩ অনুযায়ী— “আইনগত জটিলতা বা টেকনিক্যাল বিষয়ের চেয়ে বাস্তব ন্যায়বিচার (Substantial Justice) সর্বদা প্রাধান্য পাবে।” উপযুক্ত কারণ দর্শানো হলে আপিল আদালত ৭৭৯ দিনের মতো দীর্ঘ বিলম্বও মার্জনা করে ক্রস-অবজেকশন গ্রহণ করতে আইনত বাধ্য।
মামলাটি টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলাধীন বাবনাপাড়া মৌজার ১৭.৫ শতক মূল্যবান সম্পত্তি নিয়ে উদ্ভূত। বাদী কার্তিক চন্দ্র সাহা নাগরপুর সহকারী জজ আদালতে ২০০৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে Other Class Suit No. 32 of 2007 দায়ের করেন।
মামলার মূল প্রেক্ষাপট ও বিচারিক ঘটনাবলী নিম্নরূপ:
- স্বত্ব মামলার আরজি ও আংশিক ডিক্রি: বাদী কার্তিক চন্দ্র সাহা নালিশি ১৭.৫ শতক সম্পত্তিতে স্বত্ব ঘোষণা এবং উক্ত জমি কোনো অর্পিত সম্পত্তি (Vested Property) নয় এবং স্থানীয় হাট-বাজারের পেরিফেরিভুক্ত নয় মর্মে ডিক্রি প্রার্থনা করেন। উভয় পক্ষের ৩ জন ও ১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের পর ২০১০ সালের ২৯ জুন সহকারী জজ আদালত ১৭.৫ শতকের মধ্যে ১৩ শতক জমিতে বাদীর অনুকূলে আংশিক ডিক্রি (Decreed-in-part) প্রদান করেন।
- সরকারের আপিল ও ২২ দিনের বিলম্ব মার্জনা: উক্ত আংশিক ডিক্রির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার পক্ষে জেলা প্রশাসক, টাঙ্গাইল জেলা জজ আদালতে Other Class Appeal No. 08 of 2011 দায়ের করেন। সরকার ২২ দিন দেরিতে আপিল দাখিল করায় তামাদি আইনের ৫ ধারায় আবেদন করে বিলম্ব মার্জনা করিয়ে আপিল রেজিস্ট্রি করায়। পরবর্তীতে আপিলটি ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে বদলি হয়।
- বাদীর ক্রস-অবজেকশন ও ৭৭৯ দিনের বিলম্ব: বাদী কার্তিক চন্দ্র সাহার পক্ষে তার তদবিরকারক ব্যবসায়ী হওয়ায় এবং আইনজীবী আংশিক ডিক্রির খবর না দেওয়ায় তিনি অবশিষ্ট ৪.৫ শতক খারিজ হওয়ার খবর তাৎক্ষণিক জানতেন না। পরবর্তীতে ২০১২ সালের ১৪ আগস্ট রায়ের সহি-মোহর নকল তুলে বিষয়টি জানতে পেরে ২০১২ সালের ২৬ আগস্ট আপিল আদালতে ৪১ আদেশের ২২(১) বিধি অনুযায়ী ক্রস-অবজেকশন দাখিল করেন এবং তামাদি আইনের ৫ ধারায় ৭৭৯ দিনের বিলম্ব মার্জনা প্রার্থনা করেন।
- আপিল আদালত কর্তৃক যান্ত্রিকভাবে খারিজ: ২০১২ সালের ২৬ আগস্ট টাঙ্গাইলের ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত কোনো যুক্তিগ্রাহ্য বিবেচনা ছাড়াই নিছক ‘১ মাসের মধ্যে ক্রস-অবজেকশন দাখিল করা হয়নি’ অজুহাতে বাদীর ক্রস-অবজেকশন সরাসরি খারিজ করে দেন। এর বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয়ে বাদী হাইকোর্ট বিভাগে দেওয়ানী রিভিশন নং ২২/২০১৩ দায়ের করলে হাইকোর্ট রুল জারি করেন।
🏛️ বাদী কার্তিক চন্দ্র সাহার যুক্তি
- ৪১ আদেশের ২২(১) বিধির দ্বিতীয় অংশ কার্যকর: আইনে স্পষ্ট বলা আছে আদালত উপযুক্ত মনে করলে অতিরিক্ত সময় মঞ্জুর করতে পারেন; ১ মাসের নিয়ম বাধ্যতামূলক নয়।
- বিলম্বের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা: তদবিরকারক ব্যবসায়ী হওয়ায় এবং আইনজীবী অবহিত না করায় বিলম্ব হয়েছে। নকল পাওয়ার ১২ দিনের মধ্যে ক্রস-অবজেকশন দাখিল করা হয়েছে।
- আপিল বিভাগের নজির (৫১ ডিএলআর এডি ২৫৩): টেকনিক্যাল ত্রুটির চেয়ে প্রকৃত ন্যায়বিচার অগ্রাধিকার পাবে। সরকার ২২ দিনের ছাড় পেলে নাগরিক কেন বিলম্ব মার্জনা পাবে না?
🛡️ বিবাদী সরকারের অবস্থান
- ১ মাসের বিধিবদ্ধ তামাদি: দেওয়ানী কার্যবিধির ৪১ আদেশের ২২(১) বিধি অনুযায়ী আপিলের নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যেই ক্রস-অবজেকশন দিতে হবে।
- ৭৭৯ দিনের বিপুল বিলম্ব: দুই বছরেরও বেশি সময় পর ক্রস-অবজেকশন দিলে মামলার চূড়ান্ততা ক্ষুণ্ণ হয়।
- আইনজীবীর ভুল মার্জনাযোগ্য নয়: আইনজীবী রায় জানাননি— এই জাতীয় অজুহাত আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
টাঙ্গাইলের ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত ২০১২ সালের ২৬ আগস্ট তারিখে অত্যন্ত দায়সারা (Slipshod) ও যান্ত্রিক পদ্ধতিতে আদেশ দেন। আদালত কেবল বিধির প্রথম অংশ দেখে সিদ্ধান্ত নেন যে ১ মাসের মধ্যে ক্রস-অবজেকশন আসেনি। কিন্তু আদালত বিধির পরবর্তী অংশ— “or within such further time as the Appellate Court may see fit to allow” এবং তামাদি আইনের ৫ ধারার মূল উদ্দেশ্য বিবেচনা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে বিচারিক মনের প্রয়োগহীনতা (Non-application of judicial mind) প্রদর্শন করেন।
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের বিজ্ঞ বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরী দেওয়ানী কার্যবিধির বিধান ও উচ্চ আদালতের নজিরসমূহ বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত স্পষ্ট আইনি ব্যাখ্যা প্রদান করেন:
হাইকোর্ট রায়ে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করেন:
“The provision of Order XLI, Rule 22(1) of the Code is not watertight, rather a safety valve has been provided… this within one month for filing cross-objection is not mandatory and the said provision has given power to the appellate court to extend further period as the Appellate Court may see fit to allow.”
আইন প্রণেতাগণ কখনোই চাননি যে ১ মাসের সামান্য ব্যত্যয়ে একজন নাগরিকের প্রতিকার পাওয়ার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাক।
হাইকোর্ট বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ল্যান্ডমার্ক রায় আব্দুল কাদের মন্ডল বনাম শামসুর রহমান চৌধুরী (51 DLR (AD) 253) উদ্ধৃত করে বলেন:
“The principle that substantial justice shall take preponderance over technical consideration should always be kept in view in deciding whether or not there is sufficient cause for the delay.”
যেখানে বাদী নকল পাওয়ার মাত্র ১২ দিনের মাথায় আদালতে প্রতিকার চেয়েছেন, সেখানে বিলম্বের সন্তোষজনক কারণ বিদ্যমান ছিল।
হাইকোর্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যুগ্ম জেলা জজ আদালত যান্ত্রিকভাবে আবেদন নাকচ করে বিচারপ্রার্থী নাগরিকের মুখের ওপর আদালতের দরজা বন্ধ (Closed the door of the court) করে দিয়েছেন, যা আইনের পরিপন্থী এবং এর ফলে চরম অবিচার সংঘটিত হয়েছে।
🏆 মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত রায় ও নির্দেশনাবলী
সার্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ, আইন ও নজির পর্যালোচনা শেষে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ নিম্নোক্ত চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন:
- ১. রুল অ্যাবসলিউট (Rule Absolute): বাদীর আনীত দেওয়ানী রিভিশন নং ২২/২০১৩-এর রুলটি কোনো খরচ ছাড়াই অ্যাবসলিউট (মঞ্জুর) করা হলো।
- ২. আপিল আদালতের আদেশ বাতিল: টাঙ্গাইলের ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত কর্তৃক ২০১২ সালের ২৬ আগস্টের ক্রস-অবজেকশন খারিজের আদেশ সম্পূর্ণ বাতিল ও রদ (Set Aside) করা হলো।
- ৩. ৭৭৯ দিনের বিলম্ব মার্জনা ও ক্রস-অবজেকশন গ্রহণ: বাদীর ক্রস-অবজেকশন দাখিলের ৭৭৯ দিনের বিলম্ব মার্জনা করা হলো এবং ক্রস-অবজেকশনটি শুনানির জন্য গৃহীত হলো।
- ৪. ৬ মাসের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তির নির্দেশ: যেহেতু আপিলটি দীর্ঘদিনের পুরনো, সেহেতু টাঙ্গাইলের ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতকে মূল আপিল এবং ক্রস-অবজেকশন একত্রে আগামী ৬ (ছয়) মাসের মধ্যে দ্রুত নিষ্পত্তির কঠোর নির্দেশ প্রদান করা হলো।
- পদ্ধতিগত আইনের মূল উদ্দেশ্য সুবিচার নিশ্চিতকরণ: কোনো পদ্ধতিগত তামাদি বা সময়সীমা সুবিচার নিশ্চিত করার মাধ্যম, ন্যায়বিচার রুদ্ধ করার অস্ত্র নয়।
- বিবেচনামূলক ক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগ: আদালতকে যে ডিসক্রিশনারি পাওয়ার দেওয়া হয়েছে, তা যান্ত্রিকভাবে খারিজ করার জন্য নয়; বরং যৌক্তিক কারণে তা নমনীয়ভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
- উভয় পক্ষের সমতা রক্ষা: সরকার যখন আপিলে বিলম্বের সুবিধা পায়, তখন সংক্ষুব্ধ সাধারণ নাগরিকও যৌক্তিক কারণে ক্রস-অবজেকশনে বিলম্বের মার্জনা পাওয়ার অধিকারী।
বাদী যদি পুরো ডিক্রি না পেয়ে আংশিক পায় এবং বিবাদী আপিল করে, তবে বাদী পৃথক আপিল না করেও বিবাদীর আপিলেই ক্রস-অবজেকশন দিয়ে বাকি অংশের ডিক্রি চাইতে পারে।
আপিলের নোটিশ পাওয়ার ১ মাস পেরিয়ে গেলেও তামাদি আইনের ৫ ধারার আবেদন সহকারে উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে ক্রস-অবজেকশন দিন; আদালত তা মঞ্জুর করতে ক্ষমতাবান।
বিলম্ব মার্জনার ক্ষেত্রে আপিল বিভাগের এই মূলনীতি আদালতকে মনে করিয়ে দিন যে টেকনিক্যাল বাধার চেয়ে বাস্তব সুবিচার নিশ্চিত করা বিচারকের মূল দায়িত্ব।
দেরি হলে কবে রায় জানলেন এবং কবে নকল পেলেন তার সুনির্দিষ্ট তারিখ হলফনামায় উল্লেখ করুন।
আপিল আদালত যদি কোনো আবেদন কারণ ছাড়া দায়সারাভাবে খারিজ করে, তবে দেওয়ানী কার্যবিধির ১১৫ ধারায় রিভিশন করে তা বাতিল করিয়ে নেওয়া যায়।
দেওয়ানী বিচার প্রক্রিয়ায় একজন সংক্ষুব্ধ বিবাদী বা রেসপনডেন্টের প্রতিকার লাভের দুটি ভিন্ন পথ থাকে— একটি হলো স্বতন্ত্র আপিল দায়ের করা এবং অন্যটি হলো ৪১ আদেশের ২২ বিধির অধীন বিপরীত আপত্তি বা ক্রস-অবজেকশন আনয়ন করা। এই দুই পদ্ধতির তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেওয়ানী প্র্যাকটিসে অত্যন্ত আবশ্যক:
- কোর্ট ফি ও আর্থিক সাশ্রয়: স্বতন্ত্র আপিল দায়ের করতে হলে পূর্ণ কোর্ট ফি দিয়ে পৃথকভাবে নথি তৈরি করে নতুন আপিল নম্বর নিতে হয়। কিন্তু ক্রস-অবজেকশনের ক্ষেত্রে চলমান আপিলের ছায়াতলে থেকেই নালিশি রায়ের যে অংশ তার বিরুদ্ধে গেছে, সেটির প্রতিকার চাওয়া যায়।
- মূল আপিল প্রত্যাহৃত হলেও নিষ্পত্তি: ৪১ আদেশ ২২(৪) বিধি অনুযায়ী, মূল আপিলকারী যদি পরবর্তীতে আপিল প্রত্যাহার করে নেন বা আপিল কোনো কারণে খারিজও হয়ে যায়, তবুও ক্রস-অবজেকশন স্বাধীন আপিলের মতোই গুণাগুণের ভিত্তিতে বিচার্য থাকবে এবং আদালত রায় দিতে পারবেন।
- তামাদির ভারসাম্য ও ন্যায়ের স্বার্থ: সংক্ষুব্ধ পক্ষ মূল রায়ের পর হয়তো ভেবেছিল আংশিক ডিক্রি মেনেই চলবে। কিন্তু অপরপক্ষ আপিল করার পর সে নিজের অধিকার রক্ষার্থে সচেষ্ট হয়। এই কারণেই আইনে ১ মাসের সাধারণ সময়সীমার পাশে আদালতকে সময় বাড়ানোর অগাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
- আপিল বিভাগের মূল দৃষ্টিভঙ্গি: দেশের সর্বোচ্চ আদালতের একাধিক সিদ্ধান্তে পুনর্ব্যক্ত হয়েছে যে, সিভিল আদালতের কাজ হলো পক্ষদের স্বত্ব ও দখল নির্ধারণ করে টেকসই বিচার দেওয়া। প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে কাউকে বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত করা হলে তা বিচারহীনতার নামান্তর।

