অর্থ ঋণ আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকলেও এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় চেক ডিজঅনার মামলা চলতে কোনো আইনি বাধা নেই: হাইকোর্টের দ্ব্যর্থহীন সিদ্ধান্ত
মামলার মৌলিক তথ্যাবলি ও বিচারিক পরিচিতি
| মামলার নাম ও নম্বর: | ক্রিমিনাল রিভিশন নং ৪১৮০/২০২৪ (Criminal Revision No. 4180 of 2024) |
| আদালত: | বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (ফৌজদারি রিভিশন এখতিয়ার) |
| একক বেঞ্চ: | মাননীয় বিচারপতি মো. বদরুজ্জামান |
| পক্ষগণ: | মো. আমিনুল ইসলাম (দরখাস্তকারী-ঋণগ্রহীতা) বনাম রাষ্ট্র ও সোনালী ব্যাংক পিএলসি (বিবাদী পক্ষ) |
| মূল আইন ও ধারা: | দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১ এর ধারা ১৩৮; অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ধারা ৫ ও ১৯; ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ধারা ৫৬১এ |
| মূল আইনি সিদ্ধান্ত: | অর্থ ঋণ মামলা একটি দেওয়ানি প্রতিকার যা ঋণ আদায়ের জন্য দায়ের করা হয়; অপরদিকে এনআই অ্যাক্ট ১৩৮ ধারা বাণিজ্যিক বিশ্বাসভঙ্গ ও চেক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ফৌজদারি অপরাধ। দুটি মামলা সমান্তরালভাবে চলতে কোনো বাধা নেই। |
১. মামলার পটভূমি ও বিরোধের বিষয়বস্তু
ব্যাংকিং ও বাণিজ্যিক অর্থায়নে অন্যতম সাধারণ দৃশ্য হলো, যখন কোনো ঋণগ্রহীতা ঋণের কিস্তি খেলাপি করেন, তখন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যুগপৎভাবে দুটি আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে: প্রথমত, অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর অধীনে অর্থ পুনরুদ্ধারের জন্য দেওয়ানি মামলা এবং দ্বিতীয়ত, ঋণের বিপরীতে জমাকৃত চেক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণে দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১ (The Negotiable Instruments Act, 1881) এর ১৩৮ ধারায় চেক ডিজঅনারের ফৌজদারি নালিশ। ঋণগ্রহীতারা প্রায়শই দাবি করেন যে একই ঋণের টাকার জন্য দুটি আদালতে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করা দ্বৈত বিপত্তি (Double Jeopardy) এবং আইনের অপব্যবহার। অত্র রায়ে মহামান্য আদালত এই বিতর্কের একটি সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত আইনি সমাধান প্রদান করেছেন।
মামলার বিবরণে প্রকাশ, দরখাস্তকারী মো. আমিনুল ইসলাম তাঁর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নামে সোনালী ব্যাংক পিএলসি থেকে ২ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা গ্রহণ করেন। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁর প্রদত্ত ১ কোটি টাকার একটি চেক ব্যাংকে জমা দেওয়া হলে তা ‘অপর্যাপ্ত তহবিল’ মর্মে ডিজঅনার হয়। ব্যাংক আইনানুগ লিগ্যাল নোটিশ প্রদানের পর ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় সি.আর. মামলা দায়ের করে। একই সাথে ব্যাংক অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ অনুযায়ী বকেয়া ঋণ আদায়ের জন্য অর্থ ঋণ আদালতে আলাদা মামলা দায়ের করে।
২. বিচারিক আদালত ও উচ্চ আদালতে আসামির আবেদন
যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালতে এনআই অ্যাক্টের মামলাটি বিচারের জন্য এলে দরখাস্তকারী ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪১এ ধারায় অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেন। তাঁর মূল যুক্তি ছিল, যেহেতু একই টাকা আদায়ের জন্য বিশেষায়িত অর্থ ঋণ আদালতে ইতিমধ্যেই মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং সেখানে বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রয়ের প্রক্রিয়া চলছে, সেহেতু ফৌজদারি আদালতে একই চেকে বিচার চলতে পারে না। এটি আইনের প্রক্রিয়ার অপব্যবহার।
বিচারিক আদালত আসামির আবেদন খারিজ করে চার্জ গঠন করেন। এরপর আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১এ ধারা এবং রিভিশন এখতিয়ারে হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন করে ফৌজদারি মামলার সমস্ত কার্যক্রম বাতিলের (Quashment) প্রার্থনা জানান।
৩. হাইকোর্টে দরখাস্তকারীর আইনি বিতর্ক
দরখাস্তকারীর পক্ষে বিজ্ঞ কৌঁসুলি নিবেদন করেন যে:
- একই অর্থের জন্য দ্বৈত দায়: অর্থ ঋণ আদালত আইনে স্পষ্ট বলা আছে যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ আদায়ের জন্য এই আইনটি একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ আইন (Self-contained code)। যখন ব্যাংক বিশেষ আদালতে সম্পত্তির বিরুদ্ধে ডিক্রি প্রার্থনা করছে, তখন একই টাকার জন্য চেক ডিজঅনার মামলায় আসামিকে জেলে পাঠানো অসাংবিধানিক।
- নিপীড়নমূলক পদক্ষেপ: একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একই আর্থিক বিষয়ের ওপর দুটি ভিন্ন আদালতে একই সাথে মামলা পরিচালনা আসামির ওপর চরম আর্থিক ও মানসিক নির্যাতন চাপিয়ে দেয়।
- উচ্চ আদালতের পূর্ববর্তী স্থগিতাদেশ: আইনজীবী কয়েকটি পূর্ববর্তী স্থগিতাদেশের বরাত দিয়ে দাবি করেন যে দেওয়ানি বিষয় নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফৌজদারি কার্যক্রম স্থগিত থাকা উচিত।
৪. ব্যাংক কর্তৃপক্ষের পাল্টা অবস্থান
সোনালী ব্যাংক পিএলসির পক্ষে বিজ্ঞ আইনজীবী শুনানিতে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, অর্থ ঋণ আদালতের মামলার উদ্দেশ্য হলো পাওনা টাকা পুনরুদ্ধার করা যা সম্পূর্ণ দেওয়ানি স্বভাবের (Civil remedy in personam and in rem)। অন্যদিকে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারা হলো আর্থিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের শাস্তিযোগ্য অপরাধ। চেকে স্বাক্ষর করে তা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার মাধ্যমে আসামি একটি প্রকাশ্য ফৌজদারি অপরাধ করেছেন যার শাস্তি কারাদণ্ড ও জরিমানা। কোনো দেওয়ানি পুনরুদ্ধার মামলা অপরাধের দায় থেকে কাউকে অব্যাহতি দিতে পারে না।
৫. হাইকোর্ট বিভাগের বিশদ বিচারিক পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ
মাননীয় বিচারপতি মো. বদরুজ্জামান সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ (দ্বৈত বিপত্তি রোধ), এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারা এবং অর্থ ঋণ আদালত আইনের বিধানসমূহ অত্যন্ত বিশ্লেষণাত্মকভাবে পর্যালোচনা করেন। আদালতের মূল সিদ্ধান্তসমূহ নিম্নরূপ:
ক) দ্বৈত বিপত্তি (Double Jeopardy) সংক্রান্ত ধারণার অবসান
আদালত উল্লেখ করেন, সংবিধানের ৩৫(২) অনুচ্ছেদ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০৩ ধারায় যে দ্বৈত বিপত্তির কথা বলা হয়েছে, তা প্রযোজ্য হয় তখন— যখন একই অপরাধের জন্য কোনো ব্যক্তিকে দুইবার ফৌজদারি বিচার বা দণ্ড প্রদান করা হয়। অর্থ ঋণ আদালতের মামলা কোনো ফৌজদারি অপরাধের বিচার নয়; এটি ঋণ চুক্তি লঙ্ঘনের কারণে আদালতের মাধ্যমে দেনা আদায়ের দেওয়ানি প্রক্রিয়া। অপরদিকে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার মামলা হলো চেক নামক একটি হস্তান্তরযোগ্য দলিল ব্যাংকে বাউন্স করিয়ে বাণিজ্যিক প্রতারণা সংঘটনের ফৌজদারি অপরাধ। সুতরাং এখানে কোনো দ্বৈত বিপত্তির প্রশ্নই ওঠে না।
খ) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তসমূহ
হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একগুচ্ছ যুগান্তকারী পূর্ণাঙ্গ রায়ের ওপর নির্ভর করেন। বিশেষ করে Majed Hossain vs. The State (56 DLR (AD) 124), Khondaker Mahtabuddin vs. The State (49 DLR (AD) 142) এবং Monzur Alam vs. The State (55 DLR (AD) 67) মামলাসমূহের নজির উল্লেখ করে আদালত বলেন:
“It is now a settled proposition of law that proceedings under Section 138 of the Negotiable Instruments Act and a suit under the Artha Rin Adalat Ain, 2003 are entirely distinct and separate remedies. One is for criminal penal liability for dishonour of cheque, while the other is for recovery of loan amount. Both can proceed simultaneously and parallelly without one obstructing the other.”
গ) অর্থ ঋণ আদালতের রায়ে টাকা পরিশোধ হলে কী হবে?
আদালত এটিও সুস্পষ্ট করেন যে, ভবিষ্যতে যদি অর্থ ঋণ আদালতের নিলাম বিক্রির মাধ্যমে অথবা সরাসরি ঋণগ্রহীতা কর্তৃক ব্যাংকের সমুদয় পাওনা পরিশোধ হয়ে যায়, তবে সেই অর্থ এনআই অ্যাক্টের অর্থদণ্ডের সাথে সমন্বয় (adjustment) করা যেতে পারে। কিন্তু যতদিন ঋণ অপরিশোধিত রয়েছে এবং চেক ডিজঅনারের উপাদান বিদ্যমান রয়েছে, ততদিন ফৌজদারি বিচার কার্যক্রম এক মুহূর্তের জন্যও স্থগিত করা যাবে না।
৬. চূড়ান্ত রায় ও ফলাফল
মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ সুদৃঢ় অভিমত ব্যক্ত করেন যে, অর্থ ঋণ আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকা এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার মামলার কার্যক্রম বাতিলের কোনো আইনসঙ্গত ভিত্তি হতে পারে না। দরখাস্তকারীর আবেদন সম্পূর্ণ সারবত্তাহীন ও সময়ক্ষেপণের অপচেষ্টা মাত্র।
অতএব, ফৌজদারি রিভিশন আবেদনটি সরাসরি খারিজ করা হলো। বিজ্ঞ যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালতকে কোনো ধরনের অপ্রয়োজনীয় মুলতবি প্রদান ব্যতীত দ্রুততম সময়ে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার মূল মামলার বিচারকার্য সম্পন্ন করার নির্দেশ প্রদান করা হলো।
৭. ব্যাংক কর্মকর্তা ও ঋণগ্রহীতাদের জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ
জরুরি আইনি বিষয়াবলী:
- সমান্তরাল মামলার বৈধতা: ব্যাংক বা ঋণদাতা একই ঋণের বিপরীতে অর্থ ঋণ মামলা এবং এনআই অ্যাক্ট মামলা একই সাথে শুরু ও পরিচালনা করতে সম্পূর্ণ আইনত ক্ষমতাবান।
- ফৌজদারি দায় এড়ানোর উপায় নেই: দেওয়ানি আদালতে মামলা ফাইল করা আছে— এই অজুহাতে ফৌজদারি আদালতের সমন বা ওয়ারেন্ট অবহেলা করলে জামিন বাতিল ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কা থাকে।
- আপস বা সমন্বয়ের বিধান: ফৌজদারি মামলা থেকে রেহাই পেতে হলে চেকের অর্থ পরিশোধ করে অথবা ব্যাংকের সাথে আনুষ্ঠানিক রিসিডিউলিং (Rescheduling) বা এককালীন আপসরফার (Solennama) মাধ্যমে ফৌজদারি আদালতের মামলা প্রত্যাহার করাতে হবে।
