শুনানির সুযোগ (Show Cause) ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার না দিয়ে কোনো গ্রাহককে ইচ্ছাকৃত খেলাপি (Willful Defaulter) ও সিআইবি লাল তালিকাভুক্ত করা বেআইনি: হাইকোর্টের রায়

মামলার মৌলিক তথ্যাবলি ও বিচারিক পরিচিতি

মামলার নাম ও নম্বর: রিট পিটিশন নং ১৭২৪০/২০২৫ (Writ Petition No. 17240 of 2025)
আদালত: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (সাংবিধানিক রিট এখতিয়ার)
বিচারপতিবৃন্দ: মাননীয় বিচারপতি জে. বি. এম. হাসান এবং মাননীয় বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল
পক্ষগণ: মেসার্স অ্যাপেক্স স্পিনিং অ্যান্ড উইভিং মিলস লিমিটেড (রিট পিটিশনার) বনাম বাংলাদেশ ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংক পিএলসি (রেসপনডেন্ট পক্ষ)
মূল আইন ও ধারা: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১, ২৭ ও ১০২; ব্যাংক-কোম্পানী আইন, ১৯৯১ (সংশোধিত ২০২৩) এর ধারা ২৭কক; বাংলাদেশ ব্যাংক বিআরপিডি সার্কুলার
মূল আইনি সিদ্ধান্ত: কাউকে ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ (Willful Defaulter) ঘোষণা করার পূর্বে সুনির্দিষ্ট কারণ দর্শানোর নোটিশ (Show Cause Notice) ও নিরপেক্ষ শুনানির সুযোগ প্রদান প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের অলঙ্ঘনীয় শর্ত। গোপন বা একতরফাভাবে সিআইবি-তে লাল তালিকাভুক্ত করা আইনের চোখে অবৈধ ও বাতিল।

১. পটভূমি ও বিরোধের প্রকৃতি

ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের লক্ষ্যে ব্যাংক-কোম্পানী আইন, ১৯৯১-এ ২০২৩ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে ধারা ২৭কক সংযোজন করা হয়। এর অধীনে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের (Willful Defaulters) বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষমতা প্রদান করা হয়— যেমন তাদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা, নতুন কোম্পানি বা ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তিতে বাধা, রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বাতিল এবং ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (CIB) লাল তালিকাভুক্তি। তবে এই কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োগের পূর্বে আইনের সুস্পষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে যে, গ্রাহককে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জানিয়ে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিতে হবে এবং তাদের বক্তব্য মূল্যায়নের জন্য নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করতে হবে।

অত্র মামলার বিবরণে প্রকাশ, রিট পিটিশনার মেসার্স অ্যাপেক্স স্পিনিং অ্যান্ড উইভিং মিলস লিমিটেড একটি বৃহৎ রপ্তানিমুখী টেক্সটাইল শিল্প প্রতিষ্ঠান। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং গ্যাস সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকের কয়েকটি কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করতে বিলম্বিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকের সাথে ঋণ পুনর্গঠন ও রিসিডিউলিংয়ের জন্য আবেদন করে সমঝোতার চেষ্টা করছিল।

কিন্তু সোনালী ব্যাংক পিএলসি কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ বা শুনানির সুযোগ না দিয়েই একতরফাভাবে রিট পিটিশনার প্রতিষ্ঠান ও তার পরিচালকদের ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি’ হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি ডাটাবেজে লাল তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ পাঠায় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক তা কার্যকর করে। ফলশ্রুতিতে পিটিশনারের সকল প্রকার এলসি খোলা, রপ্তানি কার্যক্রম এবং দৈনন্দিন ব্যাংকিং লেনদেন স্থবির হয়ে পড়ে এবং পরিচালকদের ব্যক্তিগত সুনাম মারাত্মকভাবে ভূলুণ্ঠিত হয়। সংক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিষ্ঠানটি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে।

২. রিট পিটিশনারের পক্ষে মূল সাংবিধানিক বিতর্ক

পিটিশনারের পক্ষে বিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শুনানিতে অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে সওয়াল করেন:

  1. প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের চরম লঙ্ঘন (Audi Alteram Partem): কোনো নাগরিক বা ব্যবসায়িক সত্তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে দণ্ডিত বা চিহ্নিত করা সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। কাউকেই তার বক্তব্য না শুনে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।
  2. ব্যাংক-কোম্পানী আইনের ২৭কক ধারার ব্যত্যয়: আইনের সংশোধিত ২৭কক ধারা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট মাস্টার সার্কুলারে সুস্পষ্ট বলা আছে— ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঘোষণার পূর্বে ঋণগ্রহীতাকে ব্যাংকের ‘শনাক্তকরণ কমিটি’ কর্তৃক লিখিত নোটিশ দিয়ে ব্যাখ্যা তলব করতে হবে। সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পেলে গ্রাহককে আপিল করার জন্য ৩০ দিনের সময় দিতে হবে। সোনালী ব্যাংক এই সমস্ত বিধিবদ্ধ ধাপ সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে গায়ের জোরে সিআইবি রেড লিস্ট করেছে।
  3. ব্যবসায়িক ধ্বংসের ঝুঁকি: একটি সচল কারখানা যেখানে শত শত শ্রমিক কর্মরত রয়েছে, সেখানে একতরফা সিআইবি ব্লকিংয়ের কারণে এলসি বন্ধ হয়ে কারখানাটি চিরতরে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

৩. বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অবস্থান

সোনালী ব্যাংকের পক্ষে বিজ্ঞ আইনজীবী দাবি করেন যে, ঋণগ্রহীতা একাধিক কিস্তি খেলাপি করেছেন এবং বারবার তাগাদা সত্ত্বেও বকেয়া পরিশোধ করেননি। ব্যাংক কোম্পানি আইনের মূল উদ্দেশ্যই হলো খেলাপিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। অতএব সিআইবি তালিকাভুক্তি একটি স্বাভাবিক ব্যাংকিং প্রক্রিয়া এবং এতে কোনো মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়নি।

৪. হাইকোর্ট বিভাগের গভীর বিচারিক পর্যবেক্ষণ ও নীতি নির্ধারণ

মাননীয় ডিভিশন বেঞ্চ সংবিধানের ৩১ ও ২৭ অনুচ্ছেদ, ব্যাংক-কোম্পানী আইনের ধারা ২৭কক এবং প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের মূলনীতি পর্যালোচনা করে সুদূরপ্রসারী পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করেন:

ক) অনিচ্ছাকৃত খেলাপি বনাম ইচ্ছাকৃত খিলাপির মৌলিক পার্থক্য

আদালত উল্লেখ করেন, ব্যবসায়িক ক্ষতি, বিশ্ববাজারের মন্দা বা অনিবার্য পরিস্থিতির কারণে একজন সৎ ব্যবসায়ীও সাময়িকভাবে ঋণখেলাপি হতে পারেন। আর ইচ্ছাকৃত খেলাপি হলেন তিনি— যিনি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও টাকা পরিশোধ করেন না, অথবা জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ নিয়ে অর্থ অন্যত্র পাচার বা আত্মসাৎ করেছেন। এই দুটিকে এক পাল্লায় মাপা আইনের চরম অজ্ঞতা। কাউকে ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি’র মতো একটি চরম অপবাদ দিতে হলে তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট জালিয়াতি বা অর্থ পাচারের অকাট্য তথ্য থাকতে হবে এবং তা শুনানির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।

খ) শোকজ নোটিশ ও নিরপেক্ষ শুনানি ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত বৈধ নয়

মাননীয় আদালত সুদৃঢ়ভাবে অভিমত প্রকাশ করেন যে, ব্যাংক-কোম্পানী আইনের ২৭কক ধারার অধীনে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঘোষণার পরিণতি একজন নাগরিকের নাগরিক অধিকার ও ব্যবসায়িক অস্তিত্বের ওপর চরম ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলে। সুতরাং এই ক্ষমতা কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা খেয়ালখুশিমতো প্রয়োগ করতে পারেন না। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো— কোনো প্রশাসনিক বা আধাবিচারিক সিদ্ধান্তে যদি কোনো নাগরিকের অধিকার খর্ব হয়, তবে Audi Alteram Partem (Hear the other side) নীতি মানা বাধ্যতামূলক, এমনকি সংশ্লিষ্ট আইনে শুনানির কথা স্পষ্টভাবে লেখা না থাকলেও তা আদালতের দ্বারা অন্তর্নিহিত শর্ত হিসেবে গণ্য হবে।

গ) আপিল বিভাগের নজিরসমূহ

হাইকোর্ট বিভাগ সুপ্রিম কোর্টের নজির Abdul Latif Mirza vs. Government of Bangladesh (31 DLR (AD) 1) এবং M/S Bengal Polymer Industries Ltd. vs. Bangladesh Bank (Writ Petition No. 15120 of 2025) উদ্ধৃত করে বলেন:

“Any punitive or exclusionary action taken by a bank or financial institution categorizing a borrower as a ‘Willful Defaulter’ without serving a prior show-cause notice and affording a personal hearing before an independent committee is ultra vires, void ab initio, and violative of Articles 27 and 31 of the Constitution.”

৬. চূড়ান্ত রায় ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা

সার্বিক আইনি ও সাংবিধানিক পর্যালোচনার পর হাইকোর্ট বিভাগ রিট পিটিশনটি মঞ্জুর করেন। আদালত সোনালী ব্যাংক পিএলসি কর্তৃক পিটিশনার কোম্পানিকে ইচ্ছাকৃত খেলাপি হিসেবে ঘোষণা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি সিস্টেমে লাল তালিকাভুক্ত করার আদেশকে বেআইনি, এখতিয়ারবহির্ভূত এবং আইনগত কর্তৃত্ববিহীন ঘোষণা করে বাতিল করেন।

একই সাথে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া হলো যে এই রায়ের কপি পাওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পিটিশনার প্রতিষ্ঠানের সিআইবি স্ট্যাটাস স্বাভাবিক করতে হবে যাতে তাদের নিয়মিত রপ্তানি এলসি খোলা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো বিঘ্ন না ঘটে। তবে ব্যাংক চাইলে আইন ও বিধিমালার পূর্ণাঙ্গ আনুষ্ঠানিকতা মেনে এবং পিটিশনারকে লিখিত শোকজ ও শুনানির সুযোগ প্রদান করে নতুন করে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে।

৭. ব্যাংক কর্মকর্তা ও শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় দিক

Related Articles

✍️ আইনি মতামত বা প্রশ্ন প্রকাশ করুন

Back to top button