আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার (Right of Private Defence) প্রয়োগে মৃত্যু ঘটলেও তা অপরাধ নয়, পেনাল কোডের ১০০ ধারায় খুনের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি: হাইকোর্টের রায়

মামলার মৌলিক তথ্যাবলি ও বিচারিক পরিচিতি

মামলার নাম ও নম্বর: ক্রিমিনাল আপিল নং ৩১৯০/২০২২ (Criminal Appeal No. 3190 of 2022)
আদালত: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (ফৌজদারি আপিল এখতিয়ার)
বিচারপতিবৃন্দ: মাননীয় বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ এবং মাননীয় বিচারপতি বিশ্বজিৎ দেবনাথ
পক্ষগণ: মো. রফিকুল ইসলাম (আপিলকারী-আসামি) বনাম রাষ্ট্র (রেসপনডেন্ট)
মূল আইন ও ধারা: দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এর ধারা ৯৬, ৯৭, ৯৯, ১০০ এবং ৩০০ (ব্যতিক্রম ২); সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ এর ধারা ১০৫
মূল আইনি সিদ্ধান্ত: জীবনের তাৎক্ষণিক আশঙ্কা ও মারাত্মক শারীরিক আঘাত থেকে বাঁচতে আত্মরক্ষার্থে বলপ্রয়োগে হামলাকারীর মৃত্যু ঘটলেও তা খুন নয়। আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে মাপকাঠিতে মেপে আঘাত করা সম্ভব নয়।

১. ঘটনার পটভূমি ও মামলার বিবরণ

আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার (Right of Private Defence) ফৌজদারি আইনের অন্যতম মৌলিক মানবীয় নীতি। আইন কোনো নাগরিককে কাপুরুষের মতো নিজের জীবন আক্রমণকারীর হাতে তুলে দিতে বাধ্য করে না। অত্র মামলার বিবরণে জানা যায়, আপিলকারী মো. রফিকুল ইসলাম তাঁর নিজস্ব রেকর্ডীয় ও দখলীয় জমিতে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ করছিলেন। এমতাবস্থায় ভিকটিম ও তার সঙ্গীরা বেআইনি অস্ত্রশস্ত্র (লোহার রড, দা ও লাঠি) নিয়ে অতর্কিতভাবে জমিতে অনধিকার প্রবেশ করে কাজ বন্ধ করার হুমকি দেয় এবং নির্মাণ সামগ্রী ভাঙচুর শুরু করে।

আপিলকারী বাধা দিতে গেলে আক্রমণকারীরা তাকে ঘিরে ফেলে এবং লোহার রড দিয়ে মাথায় সজোরে আঘাত করে। আপিলকারী মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং তাঁর মাথা ফেটে রক্তাক্ত জখম হয়। আক্রমণকারীরা যখন তাকে মাটিতে চেপে ধরে পুনরায় ধারালো দা দিয়ে কোপ মারার জন্য উদ্যত হয়, তখন নিজের আসন্ন মৃত্যু নিশ্চিত জেনে আপিলকারী পাশে পড়ে থাকা রাজমিস্ত্রির একটি লোহার করাত/যন্ত্র তুলে নিয়ে আত্মরক্ষার্থে অন্ধের মতো হাত চালায়। সেই আঘাতে মূল আক্রমণকারীর গলায় ও বুকে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে হাসপাতালে তার মৃত্যু ঘটে।

২. বিচারিক আদালতের রায়

ঘটনার পর নিহতের ভাই বাদী হয়ে আপিলকারীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। বিচারিক দায়রা আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণ গ্রহণ শেষে এই অভিমত ব্যক্ত করেন যে, যদিও আপিলকারী প্রথমে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তথাপি তিনি মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগ করেছেন এবং ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে মৃত্যু ঘটিয়েছেন। তাই বিচারিক আদালত আত্মরক্ষার অধিকারের দাবি সম্পূর্ণ নাকচ করে আপিলকারীকে দণ্ডবিধির ৩০৪ (অংশ-১) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন। উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে আপিলকারী হাইকোর্টে আপিল দায়ের করেন।

৩. হাইকোর্টে আপিলকারীর আইনি যুক্তি

আপিলকারীর পক্ষে বিজ্ঞ সিনিয়র অ্যাডভোকেট যুক্তি দেখান যে:

  • পেনাল কোডের ১০০ ধারার প্রযোজ্যতা: আক্রমণকারীরা প্রাণঘাতী অস্ত্র নিয়ে এসেছিল এবং আপিলকারীর মাথায় মারাত্মক জখম করেছিল। সাক্ষ্য হিসেবে আপিলকারীর সরকারি হাসপাতালের জখমি সনদপত্র (Injury Certificate) প্রদর্শনীভুক্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আপিলকারীর মনে যুক্তিসঙ্গত আশঙ্কা (reasonable apprehension) সৃষ্টি হয়েছিল যে, আত্মরক্ষা না করলে তার মৃত্যু ঘটবে বা তিনি স্থায়ীভাবে পঙ্গু হবেন। পেনাল কোডের ১০০ ধারার ১ম ও ২য় দফা অনুযায়ী এমন পরিস্থিতিতে হামলাকারীর মৃত্যু ঘটানোও আইনসঙ্গত।
  • সোনালী পাল্লায় মেপে আত্মরক্ষা সম্ভব নয়: যখন একজন মানুষ মাটিতে পড়ে রক্তাক্ত অবস্থায় বাঁচার জন্য লড়াই করে, তখন কতটুকু বলপ্রয়োগ ন্যায়সঙ্গত আর কতটুকু অতিরিক্ত তা কোনো সুক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক স্কেলে মেপে করা সম্ভব নয় (Cannot be weighed in golden scales)।
  • সাক্ষ্য আইনের ১০৫ ধারার ভার লাঘব: ফৌজদারি মামলায় আত্মরক্ষার দাবি প্রমাণের ক্ষেত্রে আসামিকে প্রসিকিউশনের মতো “সন্দেহাতীতভাবে” প্রমাণ করতে হয় না; শুধুমাত্র “সম্ভাবনার ভারসাম্য” (preponderance of probability) দ্বারাই তা প্রমাণ করা যথেষ্ট।

৪. রাষ্ট্রপক্ষের পাল্টা যুক্তি

রাষ্ট্রপক্ষে বিজ্ঞ সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল দাবি করেন যে, আক্রমণকারী দল জমিতে এলেও তাদের নিরস্ত্র করার সুযোগ ছিল। আপিলকারী আত্মরক্ষার নামে বেপরোয়াভাবে প্রাণঘাতী স্থানে আঘাত করেছেন যা দণ্ডবিধির ৯৯ ধারার সীমা লঙ্ঘন করেছে। তাই অধস্তন আদালত ৩০২ ধারার সাজা কমিয়ে ৩০৪ ধারায় সাজা দিয়ে সঠিক বিচার করেছেন।

৫. হাইকোর্ট বিভাগের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচারিক বিশ্লেষণ

মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ নথিপত্র, নিহতের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত এবং আপিলকারীর মেডিকেল ইনজুরি রিপোর্ট পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করে সুদূরপ্রসারী পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন:

ক) পেনাল কোডের ৯৬ থেকে ১০৬ ধারার মূল দর্শন

আদালত উল্লেখ করেন, দণ্ডবিধির ৯৬ ধারায় পরিষ্কার ঘোষণা করা হয়েছে— “আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার প্রয়োগে কৃত কোনো কাজই অপরাধ নয়” (Nothing is an offence which is done in the exercise of the right of private defence)। দণ্ডবিধির ১০০ ধারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নাগরিককে নিজের জীবন বা শরীরের নিরাপত্তায় আক্রমণকারীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটানোর বৈধ অধিকার প্রদান করে, যদি আক্রমণটি এমন হয় যার ফলে তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের (grievous hurt) যুক্তিসঙ্গত আশঙ্কা জন্ম নেয়।

খ) ঘটনায় প্ররোচনা ও প্রাথমিক আগ্রাসন কার ছিল?

রেকর্ড পর্যালোচনায় দেখা যায়, আপিলকারী নিজ জমিতে বৈধ কাজে নিয়োজিত ছিলেন। ভিকটিম দলবলসহ সশস্ত্র অবস্থায় অনধিকার প্রবেশ করে প্রথমে আপিলকারীর মাথায় গুরুতর আঘাত হেনে আক্রমণ শুরু করে। আক্রমণকারী ছিল অন্তত চারজন এবং আপিলকারী ছিলেন একা। ফলে আপিলকারী আগ্রাসী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন আক্রমণের শিকার।

গ) উত্তেজনার মুহূর্তে বলপ্রয়োগের পরিমাপ

মাননীয় আদালত ভারতীয় ও বাংলাদেশি সুপ্রিম কোর্টের বহু ঐতিহাসিক রায় উল্লেখ করে অভিমত দেন। আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক Kalam Molla vs. The State (75 DLR (AD) 289) এবং State vs. Fazlur Rahman (42 DLR (AD) 180) নজির উদ্ধৃত করে আদালত বলেন:

“A person who is facing an imminent threat to his life cannot be expected to modulate his defence step by step or calculate the precise amount of force required to repel the assault. The instinct of self-preservation is a natural human reaction, and the law protects such action under Section 100 of the Penal Code.”

মাটিতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা একজন ব্যক্তির পক্ষে এটা ভাবার অবকাশ থাকে না যে তার হাতের অস্ত্রটি করাত নাকি লাঠি, কিংবা সে হামলাকারীর হাত নাকি বুকে আঘাত করছে। তার একমাত্র লক্ষ্য থাকে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

৬. চূড়ান্ত রায় ও খালাস

হাইকোর্ট বিভাগ সুদৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, আপিলকারী মো. রফিকুল ইসলাম আইনানুগভাবে তাঁর আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার প্রয়োগ করেছেন এবং পেনাল কোডের ১০০ ধারার আওতায় তিনি সম্পূর্ণ সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। বিচারিক আদালত দণ্ডবিধির ১০০ ধারার বিধান এবং আসামির প্রাপ্ত গুরুতর জখমের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে চরম ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।

অতএব, আপিলটি মঞ্জুর করা হলো। বিচারিক আদালত কর্তৃক প্রদত্ত ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের রায় বাতিল করা হলো। আপিলকারীকে খুনের অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করে বেকসুর খালাস প্রদান করা হলো।

৭. আইনজ্ঞ ও সাধারণ নাগরিকদের জন্য আইনি বার্তা

Related Articles

✍️ আইনি মতামত বা প্রশ্ন প্রকাশ করুন

Back to top button