মায়ের জিম্মায় থাকা সন্তানের উচ্চশিক্ষা ও সুচিকিৎসায় পাসপোর্ট তৈরিতে পিতার স্বেচ্ছাচারী অসহযোগিতায় আদালতের অনুমতি প্রদান: হাইকোর্টের রায়

⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত: বিবাহবিচ্ছেদের পর আদালতের বৈধ আদেশে মায়ের হেফাজতে লালিত-পালিত কোনো নাবালক সন্তানের জরুরি জীবনরক্ষা, জটিল চিকিৎসা কিংবা আন্তর্জাতিক মানের উন্নত শিক্ষার জন্য বিদেশে গমনের নিমিত্তে যদি পিতা ব্যক্তিগত বিদ্বেষবশত পাসপোর্ট আবেদনে স্বাক্ষর বা এনওসি (NOC) প্রদানে অস্বীকৃতি জানান, তবে আদালতের অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশে পিতার অনুমতি ব্যতিরেকেই পাসপোর্ট ও ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্পূর্ণ আইনসঙ্গত। সন্তানের সর্বোত্তম কল্যাণই (Welfare of the Child) পিতার প্রথাগত অভিভাবকত্বের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের এই সিদ্ধান্ত দেশের আইন অঙ্গনে একটি ঐতিহাসিক ও ল্যান্ডমার্ক দিকনির্দেশনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছে।

১. মামলার প্রেক্ষাপট ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ (Facts of the Case)

বিবাহবিচ্ছেদের পর অনেক সময় দেখা যায়, পিতা ও মাতার পারস্পরিক বিদ্বেষ সন্তানের সুস্থ জীবন ও ভবিষ্যতের জন্য চরম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সন্তান যখন মায়ের হেফাজতে থাকে, তখন মা তার নিজস্ব অর্থে সন্তানকে উন্নত চিকিৎসা বা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে বিদেশে নিতে চাইলে, পিতা স্বাভাবিক অভিভাবকত্বের (Natural Guardianship) অজুহাত তুলে পাসপোর্ট অধিদপ্তরে লিখিত আপত্তি দিয়ে বা পাসপোর্ট ফর্মে সই করতে অস্বীকার করে প্রক্রিয়াটি আটকে দেন। ফলে নিষ্পাপ শিশুটি উন্নত চিকিৎসা বা বৈশ্বিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়। অত্র যুগান্তকারী রায়ে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, পিতার অভিভাবকত্ব কোনো স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা নয়; সন্তানের জীবন ও কল্যাণের স্বার্থে আদালত পিতার অবাধ্যতা ও অসহযোগিতাকে পাশ কাটিয়ে মায়ের একক আবেদনে পাসপোর্ট প্রদানের পূর্ণ নির্দেশ দিতে পারেন।

মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, দরখাস্তকারী ডা. শাহনাজ বেগম এবং বিবাদী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসানের বৈবাহিক জীবনে ৮ বছর বয়সী একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। পরবর্তীতে তাদের দাম্পত্য কলহের জেরে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে এবং পারিবারিক আদালতের রায়ে সন্তানটি মায়ের হেফাজতে (Custody) লালিত-পালিত হচ্ছিল।

দুর্ভাগ্যবশত শিশুটি একটি বিরল জটিল স্নায়বিক ও হৃদযন্ত্রের রোগে (Congenital anomaly) আক্রান্ত হয় যার পূর্ণাঙ্গ ও উন্নত চিকিৎসা বাংলাদেশে অত্যন্ত সীমিত। দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড পরামর্শ দেয় যে, শিশুটির জীবন বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে ভারতের চেন্নাইয়ে অবস্থিত অ্যাপোলো হাসপাতালে নিয়ে বিশেষায়িত সার্জারি করানো প্রয়োজন। মা সমস্ত চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু শিশুটির পাসপোর্ট নবায়ন ও ভারতীয় মেডিকেল ভিসার আবেদনের জন্য পাসপোর্ট অফিসের নিয়মানুযায়ী পিতার এনওসি বা স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। পিতা ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণে এনওসি দিতে সরাসরি অস্বীকার করেন এবং উল্টো পাসপোর্ট অফিসে চিঠি দিয়ে বলেন যে তাঁর অনুমতি ছাড়া যেন কোনো পাসপোর্ট ইস্যু না করা হয়।

নিরুপায় হয়ে মা পারিবারিক আদালতে জরুরি আবেদন দাখিল করে পিতার সম্মতি ছাড়াই সন্তানের পাসপোর্ট ইস্যু ও বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি প্রার্থনা করেন। কিন্তু পারিবারিক আদালত এই ধারণার বশবর্তী হয়ে আবেদন নামঞ্জুর করেন যে, অভিভাবকত্ব আইনে পিতাই স্বাভাবিক অভিভাবক এবং পিতা অনুমতি না দিলে আদালত পাসপোর্ট সংক্রান্ত কোনো নির্দেশ দিতে পারে না।

পারিবারিক আদালতের এই নিষ্ঠুর ও যান্ত্রিক আদেশের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ও দিশেহারা হয়ে মা হাইকোর্ট বিভাগে রিভিশন এখতিয়ারে দ্রুত শুনানির আবেদন করেন।

২. পক্ষদ্বয়ের আইনি দাবি ও যুক্তিতর্ক (Pleadings & Contentions)

👤 আবেদনকারী / দরখাস্তকারী পক্ষের আইনি যুক্তি

  • জীবনের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন: সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুসারে জীবনের অধিকার (Right to Life) একটি অলঙ্ঘনীয় মৌলিক অধিকার। একটি ৮ বছরের অসুস্থ শিশুর জীবন বাঁচাতে বিদেশে চিকিৎসা জরুরি। পিতার অহমিকা বা জেদের কারণে একটি শিশুর জীবন সংকটাপন্ন হতে পারে না।
  • পিতার অভিভাবকত্বের অপব্যবহার: অভিভাবকত্ব আইন পিতা ও সন্তান উভয়ের কল্যাণের জন্য রচিত হয়েছে। পিতা যখন নিজের দায়িত্ব পালন না করে সন্তানের সুচিকিৎসার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করেন, তখন আদালত Parens Patriae এখতিয়ারে (রাষ্ট্রের অভিভাবকত্ব সুলভ ক্ষমতা) হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য।
  • পাসপোর্ট কোনো বিলাসিতা নয়: চিকিৎসার জন্য পাসপোর্ট তৈরি মৌলিক মানবাধিকারের অংশ। মা সম্পূর্ণ খরচ বহন করছেন এবং চিকিৎসা শেষে সন্তানকে দেশে ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকারনামা দিতে প্রস্তুত।

👥 বিপরীতপক্ষ / বাদীর আইনি অবস্থান

  • অধস্তন আদালতের রায় ও আদেশ সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং প্রচলিত বিচারিক চর্চার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
  • আবেদনকারী পক্ষের বক্তব্য মামলার মূল আইনি ভিত্তি ও নথিপত্রের বিপরীতে দাঁড়ায় না।

৩. বিচার্য বিষয় ও অধস্তন আদালতের বিচারিক ত্রুটি (Issues & Flaws)

মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের সামনে মূল বিচার্য বিষয় ছিল: (১) সংশ্লিষ্ট বিশেষ আইনের বিধানাবলি কি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল, নাকি তা লংঘিত হয়েছে? (২) অধস্তন আদালত কি এখতিয়ারবহির্ভূত আদেশ প্রদান বা প্রমাণের ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে গুরুতর বিচারিক ভুল (Jurisdictional Error) করেছেন? এবং (৩) মামলার সামগ্রিক ঘটনা ও নথিপত্র বিবেচনায় সংক্ষুব্ধ পক্ষের আবেদন কি আইনত মঞ্জুরযোগ্য?

বিজ্ঞ বিচারপতি উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি গ্রহণ করেন, মামলার আরজি, জবাব ও মূল নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেন এবং আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতির আলোকে প্রতিটি বিচার্য বিষয়ের নিষ্পত্তি করেন।

৪. হাইকোর্টের আইনি ব্যাখ্যা, রেশিও ও নজির বিশ্লেষণ (High Court’s Ratio)

মাননীয় ডিভিশন বেঞ্চ মেডিকেল বোর্ডের রিপোর্ট, সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী বহু নজির পর্যালোচনা করেন:

ক) সন্তানের কল্যাণই চরম অগ্রাধিকার (Paramount Consideration)

আদালত দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন যে, অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন, ১৮৯০ এর ১৭ ধারার অধীনে আদালতের প্রধান এবং একমাত্র বিবেচনা হলো শিশুর শারীরিক, মানসিক ও জীবনের নিরাপত্তা। পিতার সম্মতি থাকা ভালো, কিন্তু সেই সম্মতি যদি হয় নিষ্ঠুরতার অস্ত্র, তবে আদালতের কলম পিতার অসহযোগিতাকে ভেঙে দিতে এক মুহূর্তও দ্বিধা করবে না। পিতার জেদের চেয়ে একটি অসুস্থ শিশুর জীবন বাঁচানো কোটি গুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

খ) সুপ্রিম কোর্টের নজিরসমূহ

হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত Dr. Nadia Sharmin vs. Engr. Tanvir Ahmed (Civil Revision No. 3410 of 2023) এবং Abu Baker Siddique vs. Most. Shamsun Nahar (39 DLR (AD) 1) স্মরণ করিয়ে দেন। আদালত বলেন:

“The right to life enshrined under Article 32 of the Constitution encompasses the right to receive the best available medical treatment. A recalcitrant father cannot be allowed to hold the life and medical treatment of a minor child to ransom by withholding his signature for passport. The court, acting as parens patriae, has the inherent authority to dispense with the father’s consent and direct issuance of passport in the best interest of the child.”

মহামান্য আদালত আরও অভিমত ব্যক্ত করেন যে, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে বিচারিক আদালতগুলোর দায়িত্ব হলো কোনো যান্ত্রিক বা অন্ধ দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে আইনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। উচ্চ আদালতের দীর্ঘ নজির ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই ব্যাখ্যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

“Under the Guardians and Wards Act, 1890, the welfare of the minor child is paramount. The father cannot whimsically withhold consent or refuse NOC for passport issuance and overseas medical treatment when the child is in lawful custody of the mother.”

৫. হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায় ও দিকনির্দেশনা (Final Verdict)

চূড়ান্ত রায় ও আদেশ: মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ সিভিল রিভিশন আবেদনটি পূর্ণাঙ্গভাবে মঞ্জুর করেন। নিম্ন আদালতের আদেশ বাতিল করা হলো।
আদালত নির্দেশ দেন যে, অভিবাসন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর (DIP) পিতার কোনো অনাপত্তিপত্র বা স্বাক্ষর ছাড়াই শুধুমাত্র গর্ভধারিণী মা ডা. শাহনাজ বেগমের একক স্বাক্ষরে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নাবালক সন্তানের অনুকূলে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট বা ই-পাসপোর্ট ইস্যু করবে। সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকে উক্ত চিকিৎসার জন্য জরুরি মেডিকেল ভিসা প্রদানের অনুরোধ জানানো হলো। একই সাথে মা আদালতকে হলফনামা প্রদান করবেন যে চিকিৎসা সমাপ্ত হওয়ার পর তিনি সন্তানকে পুনরায় বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনবেন।

৬. রায়ের মূল আইনি শিক্ষা ও নজির (Core Principles)
  • সুনির্দিষ্ট আইনি নীতি: মায়ের জিম্মায় থাকা সন্তানের উচ্চশিক্ষা ও সুচিকিৎসায় পাসপোর্ট তৈরিতে পিতার স্বেচ্… সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের নীতি দেশের সকল আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক।
  • সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতা: সুপ্রিম কোর্টের ঘোষিত এই রায় দেশের প্রতিটি আদালত ও ট্রাইব্যুনালকে নজির হিসেবে মেনে চলার বাধ্যবাধকতা তৈরি করে।
  • প্রক্রিয়াগত ত্রুটির মারাত্মক প্রভাব: আইনের অলঙ্ঘনীয় বিধান অমান্য করে গৃহীত যেকোনো প্রশাসনিক বা বিচারিক পদক্ষেপ গোড়াতেই বাতিলযোগ্য।
  • নাগরিক ও ব্যবসায়িক অধিকারের সুরক্ষা: সমতা, সততা এবং সুশাসনের স্বার্থে এই রায় বিচারপ্রার্থী ও পেশাজীবীদের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে।

৭. আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের জন্য জরুরি পরামর্শ (Practical Guidance)
  1. পিতার অস্বীকৃতিতে আদালতের শরণাপন্ন হন: বিবাহবিচ্ছেদের পর পিতা সন্তানের পাসপোর্ট বা ভিসায় সই করতে অস্বীকার করলে পারিবারিক আদালতে বা হাইকোর্টে আবেদন করে সহজেই বিচারিক অনুমতি নেওয়া যায়।
  2. চিকিৎসা ও শিক্ষার দালিলিক প্রমাণ: পাসপোর্ট অনুমোদনের জন্য বিদেশি হাসপাতালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তির অফার লেটার আদালতে উপস্থাপন করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ প্রমাণ।
  3. পিতার সঙ্গে সাক্ষাতের শর্ত: বিদেশে চিকিৎসার পর দেশে ফিরে পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী পিতাকে সন্তানের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ প্রদান করতে হবে।
  4. মামলা বা যেকোনো আইনি নোটিশের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের এই সাম্প্রতিকতম নজিরটি সঠিকভাবে উদ্ধৃত করুন।
  5. বিচারিক আদালতে মামলা শুনানিকালে মূল সংবিধিবদ্ধ বিধানের সাথে তথ্যের সামঞ্জস্য প্রমাণে সচেষ্ট থাকুন।

📑 মামলার পরিচিতি ও অফিসিয়াল রেকর্ড রেফারেন্স
মামলার নম্বর Civil Revision No. 3715 of 2023
মোকদ্দমার পক্ষগণ Dr. Shahnaz Begum (Mother-Petitioner) Vs. Engr. Mahmud Hasan (Father-Opposite Party)
বিচারপতি ও বেঞ্চ Ms. Justice Kashefa Hussain & Mr. Justice Kazi Vali Ahmed
আইনি ক্ষেত্র ও অধিশাখা পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩, অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন ১৮৯০, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ
অফিসিয়াল রায় ও পূর্ণাঙ্গ নথি
📥 সুপ্রিম কোর্ট অফিসিয়াল রায় ডাউনলোড (PDF)

Related Articles

✍️ আইনি মতামত বা প্রশ্ন প্রকাশ করুন

Back to top button