অনিবন্ধিত বায়না চুক্তির অজুহাতে জমিতে থাকা ব্যক্তির উচ্ছেদ ও খাস দখল পুনরুদ্ধার: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়

⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক যুগান্তকারী রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮-এর ১৭এ ধারা (২০০৪ সালের সংশোধনী আইন যা ২০০৫ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর) অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তির বায়না চুক্তি অবশ্যই লিখিত ও নিবন্ধিত (Registered) হতে হবে। কোনো ব্যক্তি যদি অনিবন্ধিত বা মৌখিক বায়না চুক্তির অজুহাতে জমিতে ভোগদখল বজায় রেখে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২-এর ৫৩এ ধারা (Doctrine of Part Performance বা আংশিক চুক্তি বাস্তবায়ন)-এর অধীনে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে সুরক্ষার দাবি করেন, তবে আদালত তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করবেন। একই সাথে, জমির মূল মালিকের কাছ থেকে আত্মীয়তা বা অনুকম্পার খাতিরে অনুমতি সাপেক্ষে দখলে থাকা (Permissive Possession / Licensee) ব্যক্তির অনুমতি প্রত্যাহার (Revocation of License under Section 52, Easements Act, 1882) করা হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী (Trespasser) হিসেবে গণ্য হবেন এবং তাকে উচ্ছেদ করে খাস দখল পুনরুদ্ধারের ডিক্রি দেওয়া আইনসম্মত।

১. মামলার প্রেক্ষাপট ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ (Facts of the Case)

আলোচ্য মামলাটির উৎপত্তি হয়েছে সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর উপজেলাধীন মৌজার মোট ৮ শতাংশ বসতভিটা জমি এবং তাতে বিদ্যমান টিনশেড আধা-পাকা বসতঘর থেকে বিবাদীদের উচ্ছেদপূর্বক খাস দখল পাওয়ার দাবি নিয়ে। বাদীপক্ষ সিরাজগঞ্জের কাজীপুর সহকারী জজ আদালতে ২০১৬ সালে স্বত্ব মোকদ্দমা নং ৩৫/২০১৬ (Title Suit No. 35 of 2016) দায়ের করেন।

মামলার নথিপত্র ও সাক্ষ্যপ্রমাণ অনুযায়ী ঘটনার ধারাবাহিক সূত্রপাত নিম্নরূপ:

  • মালিকানার মূল ভিত্তি ও খতিয়ানভুক্ত স্বত্ব: নালিশি ৮ শতাংশ বসতভিটা জমির মূল মালিক ছিলেন বাদীপক্ষের পূর্বসূরিরা। সিএস (CS), এসএ (SA) এবং পরবর্তীতে আরএস (RS) খতিয়ানে বাদীপক্ষের নাম যথাযথভাবে রেকর্ডভুক্ত রয়েছে। তারা নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধ করে বৈধ স্বত্ববান হিসেবে সেখানে শান্তিপূর্ণ ভোগদখলে ছিলেন।
  • বাদীদের কর্মস্থল পরিবর্তন ও সাময়িক আবাসন সুবিধা প্রদান: বাদীপক্ষের ১ নম্বর বাদী মোছা: হেনা রহমান এবং তার পরিবারের সদস্যরা চাকরি ও জীবিকার প্রয়োজনে বগুড়া জেলায় স্থানান্তরিত হন। ফলে তাদের গ্রামের বসতবাড়িটি শূন্য অবস্থায় পড়ে থাকে।
  • অনুমতি সাপেক্ষে বসবাস (Permissive Possession): দরখাস্তকারী বিবাদীগণ বাদীপক্ষের দূর সম্পর্কের আত্মীয় ও পরিচিত হওয়ার সূত্রে বাদীদের কাছে মানবিক কারণে থাকার জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করেন। ফলশ্রুতিতে, বাদীপক্ষ ১৪১৮ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন মাসে (ইংরেজি ২০১২ সাল) বিবাদীদের সাময়িকভাবে নালিশি বসতবাড়িতে এক (১) বছরের জন্য বসবাসের মৌখিক অনুমতি দেন। এই অনুমতি আইনগতভাবে একটি লাইসেন্স (License) বা পারমিসিভ পজেশন হিসেবে গণ্য হয়।
  • দখল ত্যাগে অস্বীকৃতি ও প্রকাশ্য বিরোধ: এক বছর অতিবাহিত হওয়ার পর ২০১৩ সালে বাদীপক্ষ বগুড়া থেকে ফিরে এসে বিবাদীদেরকে নালিশি বসতভিটা খালি করে দেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু বিবাদীগণ জমি ছেড়ে দিতে টালবাহানা শুরু করেন এবং একপর্যায়ে জমি ত্যাগ করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান। বাদীপক্ষ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে আপস-মীমাংসার চেষ্টা করেন এবং পরবর্তীতে বিবাদীদের চূড়ান্ত নোটিশ প্রদান করে জমি ছাড়ার নির্দেশ দেন। বিবাদীরা শেষ পর্যন্ত জমি না ছাড়ায় বাদীপক্ষ ২০১৬ সালে উচ্ছেদ ও খাস দখল পুনরুদ্ধারের মোকদ্দমা দায়ের করতে বাধ্য হন।

২. বাদি ও বিবাদি পক্ষের আইনি অবস্থান ও দ্বন্দ্ব (Pleadings & Contentions)

🏛️ বাদীপক্ষের বক্তব্য ও আইনি দাবি

  1. নিরঙ্কুশ স্বত্ব ও স্বত্বাধিকার: নালিশি ৮ শতাংশ জমি খতিয়ানভুক্ত ও পৈতৃক সম্পত্তিসূত্রে বাদীদের নিজস্ব সম্পত্তি। বিবাদীরা কখনোই এই জমির স্বত্বাধিকারী বা সমঅংশীদার ছিলেন না।
  2. লাইসেন্স বা অনুমতি প্রত্যাহার: বিবাদীদের অবস্থান নিছক অনুকম্পাসূচক অনুমতি সাপেক্ষে (Permissive Possession under License)। ইজমেন্টস আইন ১৮৮২-এর ৫২ ধারা অনুসারে বাদীপক্ষ যখনই সেই অনুমতি প্রত্যাহার (Revoke) করেছেন, তখনই বিবাদীদের সেখানে থাকার আইনগত ভিত্তি চিরতরে বিলুপ্ত হয়েছে।
  3. অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে উচ্ছেদ: অনুমতি প্রত্যাহারের পর জমি আঁকড়ে ধরে থাকায় বিবাদীরা বেআইনি অনুপ্রবেশকারী (Trespassers)। সুতরাং প্রকৃত মালিক হিসেবে বাদীরা দেওয়ানী আদালতের মাধ্যমে বিবাদীদের উচ্ছেদ করে খাস দখল (Khas Possession) পাওয়ার শতভাগ হকদার।

🛡️ বিবাদীপক্ষের জবাব ও প্রতিরক্ষা যুক্তি

  1. কথিত বায়না চুক্তি ও পণ পরিশোধ: বিবাদীদের দাবি, তারা কোনো অনুমতি সাপেক্ষে ওঠেননি; বরং ১৪১৫ বঙ্গাব্দের ১৫ বৈশাখ (২০০৮ সাল) বাদীদের পূর্বসূরির সাথে ২,১০,০০০/- (দুই লাখ দশ হাজার) টাকায় জমি বিক্রির বায়না চুক্তি হয়েছিল এবং তারা সম্পূর্ণ টাকা অগ্রিম পরিশোধ করে দখলে আছেন।
  2. ধারা ৫৩এ-এর সুরক্ষা (Part Performance): বিবাদীরা দাবি করেন, যেহেতু তারা চুক্তির শর্তানুযায়ী সমুদয় টাকা পরিশোধ করেছেন এবং জমিতে ঘরবাড়ি নির্মাণ করেছেন, তাই সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ৫৩এ ধারা অনুসারে তারা উচ্ছেদের হাত থেকে সুরক্ষা পাবেন।
  3. প্রতিকূল দখল (Adverse Possession): বিকল্প যুক্তিতে বিবাদীরা দাবি করেন, তারা দীর্ঘ ১২ বছরের বেশি সময় ধরে প্রকাশ্য ও নিরবচ্ছিন্নভাবে জমিতে আছেন, ফলে তারা তামাদি সূত্রে প্রতিকূল স্বত্ব অর্জন করেছেন।
  4. চৌহদ্দির অস্পষ্টতা (Order 7 Rule 3): নালিশি ৮ শতাংশ জমির সুনির্দিষ্ট সীমানা ও চৌহদ্দি আরজিতে উল্লেখ করা হয়নি বলে মোকদ্দমাটি বাতিলযোগ্য।

৩. অধস্তন আদালতের বিচারিক কার্যক্রম ও আইনি মূল্যায়ন (Subordinate Courts)

মামলাটি প্রথমে সিরাজগঞ্জের কাজীপুর সহকারী জজ আদালতে বিচারিক শুনানিতে যায়। বিচারিক আদালত উভয় পক্ষের সাক্ষ্যপ্রমাণ, আরজি, জবাব এবং খতিয়ান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করেন:

  • বিচারিক আদালতের রায় (সহকারী জজ আদালত, ২০১৮):
    সহকারী জজ আদালত ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ বাদীর অনুকূলে রায় ও ডিক্রি প্রদান করেন। আদালত অভিমত দেন যে, বাদীপক্ষ উপযুক্ত রেকর্ডপত্র ও সাক্ষ্য দ্বারা জমির স্বত্ব প্রমাণ করতে পেরেছেন। অপরদিকে, বিবাদীপক্ষ যে বায়না চুক্তির দাবি করেছেন তা সম্পূর্ণ অলিখিত বা অনিবন্ধিত। ২০০৫ সালের রেজিস্ট্রেশন আইনের সংশোধনের পর অনিবন্ধিত বায়না চুক্তির কোনো আইনগত স্বীকৃতি নেই। তাছাড়া বিবাদীরা বাদীদের পূর্ববর্তী স্বত্ব স্বীকার করায় তারা কোনোভাবেই প্রতিকূল দখলের দাবিদার হতে পারেন না। ফলে বিবাদীদের লাইসেন্সি হিসেবে গণ্য করে উচ্ছেদের আদেশ দেওয়া হয়।
  • আপিল আদালতের রায় (২য় যুগ্ম জেলা জজ আদালত, ২০২২):
    সহকারী জজের উক্ত ডিক্রির বিরুদ্ধে বিবাদীগণ ২০১৮ সালে স্বত্ব আপিল নং ৮৫/২০১৮ দায়ের করেন। সিরাজগঞ্জের ২য় যুগ্ম জেলা জজ আদালত ২০২২ সালের ২০ জুলাই শুনানি শেষে আপিলটি সরাসরি খারিজ করে বিচারিক আদালতের রায় ও ডিক্রি সম্পূর্ণরূপে বহাল রাখেন। আপিল আদালতও নিশ্চিত করেন যে, অনিবন্ধিত বায়না চুক্তির জোরে মূল মালিকের উচ্ছেদ মোকদ্দমা প্রতিহত করা যায় না।

আপিল আদালতের রায়ের পর সংক্ষুব্ধ বিবাদীগণ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে দেওয়ানী কার্যবিধির ১১৫(১) ধারা অনুযায়ী দেওয়ানী রিভিশন নং ৫৮৭৯/২০২২ দায়ের করেন। মহামান্য হাইকোর্ট ২০২২ সালের ১৩ ডিসেম্বর রুল জারি করেন এবং নালিশি জমিতে উভয় পক্ষকে স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখার অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দেন।

৪. সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের গভীর আইনি পর্যবেক্ষণ (High Court’s Legal Findings)

হাইকোর্ট বিভাগে দীর্ঘ তিন কার্যদিবস ধরে উভয় পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন এবং নিম্ন আদালতের মূল নথি (Record of the lower courts) পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। মাননীয় বিচারপতি মো: আলী রেজা তার রায়ে দেশের সম্পত্তি আইন, চুক্তি আইন এবং আদালতের সুপ্রতিষ্ঠিত নজিরসমূহের আলোকে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও যুগান্তকারী আইনি ব্যাখ্যা প্রদান করেন:

⚖️ ১. সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ৫৩এ ধারা বনাম রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭এ ও ১৭বি ধারা

বিবাদীপক্ষের মূল আইনি যুক্তি ছিল যে, তারা ২০০৮ সালের চুক্তি অনুযায়ী টাকা পরিশোধ করে জমিতে থাকায় সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২-এর ৫৩এ ধারা অনুসারে ‘আংশিক চুক্তি বাস্তবায়ন’ (Doctrine of Part Performance)-এর সুরক্ষাপ্রাপ্ত।

হাইকোর্ট অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আইনগত ভুলটি ধরিয়ে দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন যে:

  • বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ২০০৪ সালে রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ সংশোধন করে (Registration Amendment Act, 2004 – Act No. XXV of 2004), যা ২০০৫ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে।
  • এই সংশোধনের মাধ্যমে ধারা ১৭এ (Section 17A) এবং ১৭বি (Section 17B) সন্নিবেশিত করা হয়। ১৭এ ধারার উপ-ধারা (১) অনুযায়ী, স্থাবর সম্পত্তি বিক্রির যেকোনো চুক্তি অবশ্যই লিখিত হতে হবে এবং তা সম্পাদন করার ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রেশনের জন্য উপস্থাপন করতে হবে।
  • একই সাথে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ৫৩এ ধারাতেও সংশোধন আনা হয়েছে। সংশোধিত আইনানুসারে, চুক্তিটি যদি লিখিত এবং আইন মোতাবেক রেজিস্ট্রিকৃত না হয়, তবে কোনো পক্ষই ৫৩এ ধারার অধীন ‘ঢাল’ (Shield) হিসেবে কোনো সুরক্ষা দাবি করতে পারবে না।
  • যেহেতু বিবাদীদের কথিত বায়না চুক্তিটি ২০০৮ সালের (অর্থাৎ ২০০৫ সালের সংশোধিত আইনের অনেক পরে) এবং তা সম্পূর্ণরূপে অনিবন্ধিত বা মৌখিক, সেহেতু আইন অনুযায়ী এই চুক্তির কোনো বৈধ অস্তিত্বই নেই। সুতরাং আদালত ঘোষণা করেন যে, ২০০৫ সালের পরবর্তী কোনো অনিবন্ধিত চুক্তির ওপর ভর করে ৫৩এ ধারার সুবিধা ভোগ করে জমিতে দখল বজায় রাখার কোনো আইনি সুযোগ নেই।

🏡 ২. ইজমেন্টস আইন ১৮৮২-এর ৫২ ধারা: পারমিসিভ পজেশন ও লাইসেন্স প্রত্যাহার

হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করেন যে, বাদি ও বিবাদীদের মধ্যকার সম্পর্কের ধরনটি ছিল পরিষ্কারভাবে ‘অনুমতি সাপেক্ষে বসবাস’ বা পারমিসিভ পজেশন।

  • ইজমেন্টস আইন ১৮৮২-এর ৫২ ধারা অনুসারে, যখন কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তিকে কোনো স্থাবর সম্পত্তিতে প্রবেশ বা সেখানে বসবাস করার অধিকার দেন, কিন্তু সম্পত্তিতে কোনো স্বত্ব বা স্বার্থ (Interest in property) সৃষ্টি করেন না, তখন তাকে ‘লাইসেন্স’ (License) বলা হয়।
  • লাইসেন্সির জমিতে কোনো স্থায়ী বা ব্যক্তিগত অধিকার সৃষ্টি হয় না। মূল মালিক যেকোনো সময় তার অনুমতি প্রত্যাহার (Revoke) করতে পারেন।
  • বাদীপক্ষ যখন বিবাদীদের জমি ছেড়ে দিতে বলেছেন এবং নোটিশ দিয়েছেন, তখন থেকেই লাইসেন্স প্রত্যাহার হয়ে গেছে। অনুমতি প্রত্যাহারের মুহূর্ত থেকেই বিবাদীদের আইনগত মর্যাদা শূন্য হয়ে গেছে এবং তারা সম্পত্তিতে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী (Trespasser) হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছেন। একজন প্রকৃত স্বত্ববান ব্যক্তি যেকোনো অনুপ্রবেশকারীকে আদালত মারফত উচ্ছেদ করতে পারেন।

⏳ ৩. প্রতিকূল দখল (Adverse Possession) দাবির স্ববিরোধিতা ও অসারতা

বিবাদীপক্ষ আদালতে দাবি করেছিল যে তারা ১২ বছরের অধিককাল জমিতে থাকায় তামাদি আইনের ১৪২ ও ১৪৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রতিকূল স্বত্ব অর্জন করেছেন। হাইকোর্ট এই দাবিটিকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন এবং আইনি স্ববিরোধিতা তুলে ধরেন:

  • স্বত্বের স্বীকৃতি ও প্রতিকূলতার সংঘাত: বিবাদীরা দাবি করেছেন যে তারা বাদীদের সাথে বায়না চুক্তি করে টাকা দিয়ে জমিতে উঠেছেন। যখনই একজন বিবাদী স্বীকার করেন যে তিনি বাদীর কাছ থেকে জমি কেনার চুক্তি করেছেন, তখনই তিনি বাদীর মূল মালিকানা নিঃশর্তভাবে স্বীকার করে নেন। আইন অনুযায়ী, যে ব্যক্তি বাদীর মালিকানা স্বীকার করে জমিতে প্রবেশ করে, সে কখনোই সেই একই বাদীর বিরুদ্ধে ‘প্রতিকূল ও বৈরী দখল’ (Hostile possession) দাবি করতে পারে না।
  • অনুমতি সাপেক্ষে দখল তামাদিতে পরিণত হয় না: উচ্চ আদালতের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো— “Once a permissive possession, always a permissive possession” (অনুমতি সাপেক্ষে দখল চিরকালই অনুমতি সাপেক্ষে থাকে)। অনুমতি সাপেক্ষে ভোগদখল যত শত বছরই হোক না কেন, তা কখনোই স্বত্বহীন ব্যক্তিকে স্বত্ববান করতে পারে না, যতক্ষণ না মালিকের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ও সুস্পষ্ট বৈরী ঘোষণা দিয়ে ১২ বছর অতিবাহিত হয়। আলোচ্য মামলায় বিবাদীদের দখলের মেয়াদ কোনোভাবেই প্রতিকূল দখলের সংজ্ঞায় পড়ে না।

📐 ৪. দেওয়ানী কার্যবিধির আদেশ ৭ নিয়ম ৩ ও সাক্ষ্য আইনের ১০২ ধারা
  • দেওয়ানী কার্যবিধির আদেশ ৭ নিয়ম ৩ (Order 7 Rule 3 CPC): বিবাদীরা অভিযোগ তুলেছিলেন যে আরজিতে নালিশি ৮ শতাংশ জমির সুনির্দিষ্ট সীমানা চিহ্নিত করা হয়নি। কিন্তু হাইকোর্ট রেকর্ড পর্যালোচনায় দেখতে পান যে আরজির তফসিলে দাগ নম্বর, খতিয়ান এবং চারদিকের সীমানা (চৌহদ্দি) স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ আছে এবং জমিটি সরেজমিনে চিহ্নিত করতে কোনো অস্পষ্টতা নেই। ফলে এই আপত্তি ভিত্তিহীন।
  • সাক্ষ্য আইনের ১০২ ধারা (Burden of Proof): বাদীরা যখন খতিয়ান ও রেকর্ড দ্বারা নিজেদের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং বিবাদীরাও তাদের বায়না দাবির মাধ্যমে বাদীদের পূর্বসূরির মালিকানা স্বীকার করে নিয়েছেন, তখন জমিতে বৈধভাবে থাকার অধিকার প্রমাণের সম্পূর্ণ দায়ভার বর্তায় বিবাদীদের ওপর। কিন্তু বিবাদীরা কোনো রেজিস্ট্রিকৃত দলিল প্রদর্শন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন।

📚 ৫. সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের তিনটি ঐতিহাসিক নজির অনুসরণ

মাননীয় হাইকোর্ট বেঞ্চ তার রায়ের সমর্থনে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের তিনটি যুগান্তকারী নজির বিশ্লেষণ ও উদ্ধৃত করেন:

  • মেহের খাতুন বনাম শরৎ কুমার (4 BCR (AD) 172): আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে রায় দিয়েছিলেন যে, অনুমতি সাপেক্ষে দখলে থাকা ব্যক্তির কোনো আইনি স্বত্ব থাকে না এবং লাইসেন্স প্রত্যাহারের পর মূল মালিকের খাস দখল ফিরে পাওয়ার অধিকার নিরঙ্কুশ।
  • আব্দুল কাদের বনাম এ কে নূর মোহাম্মদ (5 BLD (AD) 33): এই রায়ে আপিল বিভাগ সিদ্ধান্ত দেন যে, সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ৫৩এ ধারার সুবিধা পেতে হলে বিধিবদ্ধ শর্তাবলী অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করতে হবে; অন্যথায় আংশিক চুক্তির কোনো সুবিধা দাবি করা যাবে না।
  • বাংলাদেশ রেলওয়ে বনাম বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য (3 CLR (AD) 455): সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ও লাইসেন্সির উচ্ছেদ সম্পর্কিত আইনি মানদণ্ড এই রায়ে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

৫. উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও আদেশ (Final Verdict)

🏆 মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত রায় ও নির্দেশনাবলী

উভয় পক্ষের সওয়াল-জওয়াব, সাক্ষ্য ও আইনি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ নিম্নোক্ত চূড়ান্ত আদেশ ঘোষণা করেন:

  • ১. রুল খারিজ (Rule Discharged): দেওয়ানী রিভিশন নং ৫৮৭৯/২০২২-এ জারিকৃত রুলটি সম্পূর্ণভাবে খারিজ (Discharged) করা হলো।
  • ২. স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার (Status Quo Vacated): ইতিপূর্বে হাইকোর্ট কর্তৃক জারিকৃত স্থিতাবস্থার (Status Quo) অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার ও বাতিল করা হলো।
  • ৩. অধস্তন আদালতের রায় বহাল: সিরাজগঞ্জের কাজীপুর সহকারী জজ আদালতের স্বত্ব মোকদ্দমা নং ৩৫/২০১৬-এর মূল ডিক্রি এবং সিরাজগঞ্জের ২য় যুগ্ম জেলা জজ আদালতের স্বত্ব আপিল নং ৮৫/২০১৮-এর আপিল খারিজের আদেশ আইনসঙ্গত হিসেবে চূড়ান্তভাবে বহাল রাখা হলো।
  • ৪. উচ্ছেদ ও খাস দখল বাস্তবায়নের নির্দেশ: সহকারী জজ আদালতকে অবিলম্বে ডিক্রি জারির মাধ্যমে নালিশি ৮ শতাংশ বসতভিটা থেকে বিবাদীদের আইনানুগভাবে উচ্ছেদ করে বাদীপক্ষকে শান্তিপূর্ণ খাস দখল বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হলো।

৬. এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল আইনি কারণসমূহ (Ratio Decidendi)

উচ্চ আদালত কর্তৃক এই কঠোর ও সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে মূল আইনি যৌক্তিকতা ছিল নিম্নরূপ:

  1. আইনের শাসন ও স্ট্যাটিউটরি কমপ্লায়েন্স: ২০০৪ সালের সংশোধিত রেজিস্ট্রেশন আইনের মূল লক্ষ্য ছিল জমি সংক্রান্ত জাল-জুয়াচুরি ও অনিবন্ধিত চুক্তির আড়ালে বেআইনি দখলবাজি বন্ধ করা। মৌখিক বা কাঁচা কাগজের অনিবন্ধিত চুক্তিকে আশ্রয় দিলে জাতীয় সংসদের প্রণীত আইনের উদ্দেশ্যই নস্যাৎ হয়ে যেত।
  2. মালিকের সাংবিধানিক ও মৌলিক সম্পত্তির অধিকার রক্ষা: একজন নিরঙ্কুশ জমির মালিক তার নিজস্ব জমি অন্যকে সাময়িক ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে বিপদে পড়তে পারেন না। অনুমতি প্রত্যাহার করার পরও যদি উচ্ছেদ বিলম্বিত হয়, তবে সমাজে মানবিক কারণে আত্মীয় বা দরিদ্র মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার প্রথা চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
  3. দ্বিমুখী দাবির অগ্রহণযোগ্যতা: একই সঙ্গে ‘ক্রয়সূত্রে চুক্তিভিত্তিক দখলদার’ এবং ‘মালিকের বিরুদ্ধে প্রতিকূল দখলদার’— এই রূপ পরস্পরবিরোধী প্রতিরক্ষা গ্রহণ করে দেওয়ানী আদালতের ইকুইটি (Equity) প্রতিকার লাভ করা অসম্ভব।

৭. ভূমি মালিক ও জমি ক্রেতাদের জন্য ৫টি অবশ্য পালনীয় আইনি শিক্ষা
📝
১. জমি কেনার বায়না চুক্তি অবশ্যই রেজিস্ট্রি করতে হবে:
২০০৫ সালের ১ জুলাইয়ের পর কোনো সাদা কাগজ বা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখিত বায়না চুক্তির কোনো আইনি ভিত্তি নেই। রেজিস্ট্রি বায়না ছাড়া আপনি কখনোই আদালত মারফত জমিতে দখলের সুরক্ষা (ধারা ৫৩এ) দাবি করতে পারবেন না।

🤝
২. আত্মীয় বা পরিচিতদের সাময়িক আশ্রয়ে সতর্ক থাকুন:
কাউকে অনুকম্পা করে জমিতে থাকতে দিলে সর্বদা লিখিত শর্ত বা লাইসেন্স চুক্তি রাখা শ্রেয়। অনুমতি শেষ হওয়ার সাথে সাথে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত লিখিত আইনি নোটিশ প্রদান করতে হবে।

⚖️
৩. উচ্ছেদের মোকদ্দমায় মালিকানার প্রমাণাদি প্রস্তুত রাখুন:
অনুমতি সাপেক্ষে থাকা ব্যক্তিকে উচ্ছেদের জন্য খাস দখল পুনরুদ্ধারের মামলায় সিএস, এসএ, আরএস খতিয়ান এবং হাল সনের দাখিলা আদালতে উপস্থাপন করা আবশ্যক।

⏳
৪. প্রতিকূল দখলের বিভ্রান্তিকর ধারণায় বিশ্বাস করবেন না:
কারো দয়া বা অনুমতিতে বহু বছর থাকলেও কখনো তামাদি স্বত্ব জন্মে না। চুক্তি দাবি করে পরবর্তীতে প্রতিকূল দখলের যুক্তি আদালতে স্ববিরোধী হিসেবে প্রমাণিত হয়।

🏛️
৫. উচ্চ আদালতের রিভিশনে অধস্তন আদালতের তথ্যগত রায় সহজে বদলায় না:
দেওয়ানী কার্যবিধির ১১৫ ধারা একটি তত্ত্বাবধানমূলক এখতিয়ার। যদি বিচারিক ও আপিল আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছান, তবে কেবল মামলা বিলম্বিত করার জন্য রিভিশন করে পার পাওয়া যায় না।

৮. মামলার সারসংক্ষেপ ও পূর্ণাঙ্গ রেফারেন্স টেবিল
বিষয় / ক্ষেত্র বিবরণ ও আইনি তথ্য
মামলার নাম ও নম্বর Md. Azibor Rahman and others Vs. Most. Hena Rahman and others, Civil Revision No. 5879 of 2022
আদালতের নাম ও বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ | মাননীয় বিচারপতি মো: আলী রেজা (Mr. Justice Md. Ali Reza)
মূল মোকদ্দমা ও অধস্তন আদালত স্বত্ব মোকদ্দমা নং ৩৫/২০১৬, কাজীপুর সহকারী জজ আদালত, সিরাজগঞ্জ (ডিক্রি: ২৮.০৩.২০১৮)
আপিল মোকদ্দমা স্বত্ব আপিল নং ৮৫/২০১৮, ২য় যুগ্ম জেলা জজ আদালত, সিরাজগঞ্জ (আপিল খারিজ: ২০.০৭.২০২২)
নালিশি সম্পত্তির তফসিল সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর থানাধীন ৮ শতাংশ বসতভিটা জমি ও টিনশেড ঘর
প্রাসঙ্গিক আইনি বিধানাবলী Registration Act, 1908 (Sec 17A, 17B); Transfer of Property Act, 1882 (Sec 53A); Easements Act, 1882 (Sec 52); CPC, 1908 (Order 7 Rule 3, Sec 115); Evidence Act, 1872 (Sec 102).
উদ্ধৃত গুরুত্বপূর্ণ নজিরসমূহ 4 BCR (AD) 172 (Mehar Khatun Case); 5 BLD (AD) 33 (Abdul Kader Case); 3 CLR (AD) 455 (Bangladesh Railway Case).
হাইকোর্টের চূড়ান্ত আদেশ রুল খারিজ (Rule Discharged), স্থিতাবস্থা প্রত্যাহার (Status Quo Vacated), বিবাদীদের উচ্ছেদ ও খাস দখল বাস্তবায়নের নির্দেশ বহাল।
রায়ের তারিখ ও কার্যকারিতা রায় প্রদান: ০৬ আগস্ট ২০২৬ | আপলোড: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | চূড়ান্তভাবে কার্যকর
অফিসিয়াল রায়ের লিংক ও PDF 📄 সুপ্রিম কোর্টের অফিসিয়াল PDF ডাউনলোড
🏛️ সুপ্রিম কোর্ট জাজমেন্ট পোর্টাল
আইন প্রকাশ (Ain Prokash) — বাংলাদেশের আইন শিক্ষা, সুপ্রিম কোর্টের নির্ভরযোগ্য রায় এবং জুডিশিয়াল প্রশ্নব্যাংকের গবেষণা ও প্রকাশনা মাধ্যম।

Related Articles

Back to top button