জাল বা ঘষামাজা দলিলের ফটোকপি দিয়ে নামজারি গ্রহণ দণ্ডবিধির ৪৭১ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ: হাইকোর্ট বিভাগের কঠোর সিদ্ধান্ত

⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত

ভূমি অফিসে নামজারি বা জমা-খারিজ করানোর উদ্দেশ্যে কোনো রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের ফটোকপিতে দাগ নম্বর বা জমির পরিমাণ টেম্পারিং (Tampering) করে তা খাঁটি দলিল হিসেবে ব্যবহার করা দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪৭১ ধারামতে সরাসরি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি জেনেশুনে এমন জাল বা কৃত্রিম দলিল সরকারি ভূমি অফিসে দাখিল করে মিউটেশন খতিয়ান প্রস্তুত করায়, তবে মূল দলিলের অবর্তমানে কেবল ফটোকপি দাখিলের অজুহাতে অপরাধের দায় থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ রায় দিয়েছেন যে, ভূমি রাজস্ব প্রশাসনকে বিভ্রান্ত করে অসদুপায়ে সরকারি রেকর্ড সৃষ্টির চেষ্টা ফৌজদারি আইনে মারাত্মক অপরাধ এবং এ ধরনের ক্ষেত্রে আপিল আদালত কর্তৃক আসামির খালাস আদেশ আইনত ত্রুটিপূর্ণ।

১. মামলার প্রেক্ষাপট ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ (Facts of the Case)

মামলাটি বগুড়া সদর থানার ২০১৩ সালের ৬৩ নং মামলার (জিআর নং ১৭০/২০১৩) সূত্র ধরে উদ্ভূত। মামলার বাদী মোঃ নাজিউল্লাহ রহমান রানা এজাহারে অভিযোগ করেন যে, আসামীপক্ষ তাদের সাথে যৌথ সম্পত্তিতে অতিরিক্ত ৫ শতাংশ জমি গ্রাস করার কুমতলবে ২০০৬ সালের ৯ এপ্রিল তারিখের ৫২০০ নং রেজিস্ট্রিকৃত হেবা দলিলের ফটোকপিতে হস্তলিখিতভাবে সিএস ১৬৭৮ ও আরএস ১১৬৬৪ দাগ নম্বর যুক্ত করে। উক্ত জাল ফটোকপি সহকারী কমিশনার (ভূমি) বগুড়া অফিসে দাখিল করে ২০১১-১২ সালের ১০২৮৭(১ক-১) নং নামজারি কেস মারফত নিজ নামে খতিয়ান সৃজন করিয়ে নেয়।

পরবর্তীতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মূল বালাম বই তল্লাশি করে দেখা যায় যে, মূল হেবা দলিলে উক্ত দাগ নম্বরের কোনো অস্তিত্বই নেই। জালিয়াতি ধরা পড়ায় এসি ল্যান্ড উক্ত বেআইনি নামজারি আদেশ বাতিল করেন এবং বাদী থানায় ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন।

২. বিচারিক ও আপিল আদালতের সিদ্ধান্ত

বগুড়ার অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ২০২৩ সালের ২৭ নভেম্বর তারিখে আসামীকে দণ্ডবিধির ৪৭১ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে ২ (দুই) বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। কিন্তু অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ৫ম আদালত বগুড়া আপিল নং ০৬/২০২৪-এ এই যুক্তিতে আসামীকে খালাস দেন যে, ফটোকপি দাখিল করা হয়েছিল এবং মূল দলিল জব্দ করা হয়নি। এই খালাসের বিরুদ্ধেই বাদী সংক্ষুব্ধ হয়ে হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন দায়ের করেন।

৩. হাইকোর্ট বিভাগের পর্যবেক্ষণ ও রেশিও

বিচারপতি শেখ তাহসিন আলী রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে পর্যবেক্ষণ করেন:

(১) ৪৭১ ধারার মূল উপাদান ব্যবহার (Using as Genuine): দণ্ডবিধির ৪৭১ ধারার প্রধান শর্ত হলো জালিয়াতি জানা সত্ত্বেও কোনো নকল বা ভুয়া দলিলকে সরকারি দপ্তরে খাঁটি হিসেবে উপস্থাপন করে সুবিধা নেওয়া। এখানে আসামী ফটোকপির ওপর দাগ বসিয়ে নামজারি করিয়ে নিয়ে অপরাধ সম্পূর্ণ করেছে।
(২) বালাম বই সর্বশ্রেষ্ঠ সাক্ষ্য: সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সরকারি বালাম বইয়ে যে দাগ নেই, তা ফটোকপিতে যোগ করা সুনির্দিষ্ট জালিয়াতি।

৪. চূড়ান্ত রায় ও দিকনির্দেশনা

হাইকোর্ট বিভাগ আপিল আদালতের খালাস আদেশ স্থগিত ও বাতিল করেন এবং মামলাটি যথাযথ সাক্ষ্য পুনর্মূল্যায়ন ও আইন অনুযায়ী পুনর্বিচারের জন্য সংশ্লিষ্ট সেশন আদালতে প্রেরণের নির্দেশ দেন।

৫. নাগরিক ও দলিল লেখকদের জন্য জরুরি সতর্কতা

  1. দলিলের ফটোকপিতে কোনো পরিবর্তন নয়: মূল দলিলের বাইরে কোনো ফটোকপিতে দাগ বা পরিমাণ কাটাকাটি করা সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ।
  2. বালাম বই যাচাই: সন্দেহজনক দলিলের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে তল্লাশ দিয়ে বালাম বহির সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করুন।
  3. নামজারিতে মূল দলিলের প্রদর্শন: এসি ল্যান্ড অফিসে নামজারির শুনানিতে মূল দলিলের মূল কপি প্রদর্শন বাধ্যতামূলক।
📋 মামলার পরিচিতি ও অফিশিয়াল সুপ্রিম কোর্ট রেফারেন্স
মামলার নম্বর Criminal Revision No. 2326 of 2025
বিচারপতি Justice Sk. Tahsin Ali
পক্ষগণ Md. Naziullaha Rahman (Rana) Vs. The State and another
আইন ও ধারা Penal Code, 1860 (Section 471), Code of Criminal Procedure (Section 439)
মূল রায় (PDF) 📥 সুপ্রিম কোর্টের মূল ভেরিফায়েড রায় ডাউনলোড করুন (PDF)

Related Articles

✍️ আইনি মতামত বা প্রশ্ন প্রকাশ করুন

Back to top button