শর্তযুক্ত রায়ের পর আদালত কার্যভারমুক্ত (Functus Officio): মৃত মোকদ্দমা পুনরুজ্জীবিত করা বেআইনি মর্মে হাইকোর্টের রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক ঐতিহাসিক দেওয়ানী রায়ে সুস্পষ্ট নীতি নির্ধারণ করেছেন যে, দেওয়ানী আদালত একবার কোনো মামলায় শর্তযুক্ত রায় ও ডিক্রি প্রদান করলে সেই নির্দিষ্ট বিষয়ে আদালত ‘ফাঙ্কটাস অফিসিও’ (Functus Officio – কার্যভারমুক্ত বা এখতিয়ারহীন) হয়ে যান। নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে শর্ত পূরণ (টাকা জমা) না করায় যে মোকদ্দমা স্বয়ংক্রিয়ভাবে খারিজ ও মৃত (Dead Case) হয়ে গেছে, দীর্ঘ ৮ বছর পর সেই মোকদ্দমায় অর্থ জমা নেওয়ার আবেদন মঞ্জুর করা সম্পূর্ণ এখতিয়ারবহির্ভূত ও আইনত অচল। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নজির উদ্ধৃত করে হাইকোর্ট স্পষ্ট করেন যে— “সুনির্দিষ্ট আইনগত বিধান ছাড়া আদালত নিজের চূড়ান্ত রায় পরিবর্তন বা পুনর্মূল্যায়ন করতে পারেন না।” একই সাথে মুসলিম আইনের হক-শুফা (Pre-emption) মামলায় দলিলের পণ কমানোর উদ্দেশ্যে ৬ আদেশের ১৭ বিধিতে আরজি সংশোধন সম্পূর্ণ বেআইনি।
আলোচ্য মামলাটি নাটোর জেলার অত্যন্ত মূল্যবান স্থাবর সম্পত্তি নিয়ে উদ্ভূত। বর্তমান দরখাস্তকারী খন্দকার ইশতিয়াক আহমেদ গংদের পূর্বসূরি নাটোরের ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ২০১৩ সালে মুসলিম আইনের অধীনে হক-শুফা (অগ্রক্রয়) দাবি করে Other Class (Shufa) Suit No. 36 of 2013 দায়ের করেন।
মামলার ধারাবাহিক ঘটনাবলী নিম্নরূপ:
- স্বীকৃতির ভিত্তিতে শর্তযুক্ত ডিক্রি (Judgment on Admission): মামলায় ১ ও ২ নম্বর বিবাদীরা ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট আদালতে দরখাস্ত দিয়ে মোকদ্দমা পরিচালনার ব্যয়ভার ও জটিলতা এড়াতে বাদীর অনুকূলে স্বীকৃতির ভিত্তিতে ডিক্রি (Judgment on Admission under Order 12 Rule 6 CPC) প্রদানের আবেদন জানান। এর বিপরীতে বাদীপক্ষ আরজি সংশোধন চেয়ে দলিলের মূল মূল্য ৫০ লাখ টাকার স্থলে ২০ লাখ টাকা করার আবেদন করে। ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর আদালত বাদীর আরজি সংশোধনের আবেদন খারিজ করে দেন এবং বিবাদীদের স্বীকৃতির ভিত্তিতে শর্তযুক্ত ডিক্রি দিয়ে নির্দেশ দেন যে বাদী আগামী ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে দলিলের পণ ও ক্ষতিপূরণ বাবদ মোট ৫২,৫০,০০০/- (বায়ান্ন লাখ পঞ্চাশ হাজার) টাকা আদালতে জমা দেবেন, অন্যথায় মোকদ্দমাটি তাৎক্ষণিকভাবে খারিজ হয়ে যাবে।
- নির্ধারিত ৩০ দিনে টাকা না দেওয়া ও হাইকোর্টে আপিল: বাদীপক্ষ নির্দিষ্ট ৩০ দিনের মধ্যে টাকা জমা দিতে ব্যর্থ হন। ফলে আদালতের আদেশের শর্তানুসারে মোকদ্দমাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে খারিজ হয়ে যায়। এরপর বাদী হাইকোর্টে ১ম আপিল নং ২৩/২০১৮ দায়ের করে ২০১৮ সালের ২৯ জানুয়ারি স্থগিতাদেশ লাভ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর বাদীপক্ষ হাইকোর্টের সেই ১ম আপিলটি আর পরিচালনা না করে (Non-prosecution) প্রত্যাহার করে নেন এবং হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ বাতিল হয়ে যায়।
- ৮ বছর পর বিচারিক আদালতে টাকা জমার অদ্ভুত আদেশ: হাইকোর্টে আপিল প্রত্যাহারের পর দীর্ঘ ৮ বছর পর ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল বাদীপক্ষ নাটোরের ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে দরখাস্ত দিয়ে পূর্বের সেই ৫২ লাখ ৫০ হাজার টাকা সরকারি চালানে জমা দেওয়ার অনুমতি চান। বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ আদালত ২০২৩ সালের ২৭ মে বাদীর আবেদন মঞ্জুর করেন এবং টাকা জমা নেন!
- জেলা জজ আদালত কর্তৃক আদেশ বাতিল: বিবাদীপক্ষ উক্ত আদেশের বিরুদ্ধে নাটোরের সিনিয়র জেলা জজ আদালতে দেওয়ানী রিভিশন নং ২৯/২০২৫ দায়ের করেন। ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল বিজ্ঞ জেলা জজ আদালত বিচারিক আদালতের আদেশ উল্টে দিয়ে ঘোষণা করেন যে বিচারিক আদালত বহু আগেই ফাঙ্কটাস অফিসিও হয়ে গেছেন এবং মৃত মামলায় টাকা জমা নেওয়া বেআইনি। এরপর বাদী হাইকোর্টে রিভিশন করেন।
🛡️ বাদী খন্দকার ইশতিয়াক আহমেদ গংদের দাবি
- হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের প্রভাব: বাদীপক্ষের দাবি, হাইকোর্টে ১ম আপিল থাকায় বিচারিক আদালতের ৩০ দিনের মেয়াদ কার্যকর ছিল না; আপিল প্রত্যাহারের পর তারা বৈধভাবেই চালানে ৫২,৫০,০০০/- টাকা জমা দিয়েছেন।
- ডিক্রি বহাল রাখার অধিকার: যেহেতু স্বীকৃতির ভিত্তিতে ডিক্রি হয়েছিল, সেহেতু টাকা জমা নেওয়ার মাধ্যমে বিচারিক আদালত ন্যায়বিচার করেছেন এবং জেলা জজ আদালতের রিভিশনে তা বাতিল করা ভুল।
- বীরেন্দ্র নাথ কর নজিরের অপ্রযোজ্যতা: বাদী দাবি করেন 10 BLC (AD) 157 নজিরটি এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় কারণ সেখানে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ ছিল না।
🏛️ বিবাদী আব্দুল আজিজ ঢালী গংদের জবাব
- আদালত Functus Officio: বিচারিক আদালত ২০১৭ সালে শর্তযুক্ত চূড়ান্ত আদেশ দেওয়ার সাথে সাথে কার্যভারমুক্ত হয়েছেন; নির্ধারিত ৩০ দিনে টাকা না দেওয়ায় মামলাটি ২০১৭ সালেই আইনগতভাবে মৃত।
- মৃত মামলায় টাকা জমার সুযোগ নেই: হাইকোর্টের আপিল প্রত্যাহারের সময় টাকা জমার কোনো সময় বৃদ্ধির নির্দেশনা নেওয়া হয়নি। ফলে ৮ বছর পর বিচারিক আদালতের টাকা গ্রহণ সম্পূর্ণ এখতিয়ারহীন।
- হক-শুফায় দর কষাকষি অবৈধ: মুসলিম অগ্রক্রয় আইনে ক্রেতা যে মূল্যে কিনেছেন সেই সম্পূর্ণ মূল্য দিতে হবে; আরজি সংশোধন করে দাম কমানোর কোনো সুযোগ নেই।
- বিচারিক আদালত (১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত, নাটোর – ২০২৫):
২০২৫ সালের ২৭ মে বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ আদালত বাদীর আবেদন মঞ্জুর করে ৫২ লাখ ৫০ হাজার টাকা সরকারি চালানে জমার নির্দেশ দেন। আদালত বিবেচনা করতে ব্যর্থ হন যে ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবরের শর্ত ভঙ্গের কারণে মামলাটি ৭ বছর পূর্বেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে খারিজ হয়ে গিয়েছিল। - জেলা জজ আদালত (সিনিয়র জেলা জজ আদালত, নাটোর – ২০২৬):
বিবাদীদের রিভিশনে ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল বিজ্ঞ সিনিয়র জেলা জজ আদালত যুগ্ম জেলা জজের আদেশটি সম্পূর্ণরূপে উল্টে দেন। জেলা জজ রায় দেন যে, বিচারিক আদালত বহু আগেই Functus Officio হয়ে গেছেন এবং একটি মৃত মামলাকে পুনরুজ্জীবিত করার কোনো এখতিয়ার আদালতের নেই।
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের বিজ্ঞ বিচারপতি আব্দুর রহমান মামলার নথিপত্র এবং দেওয়ানী কার্যবিধি ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নজির পর্যালোচনা করে নিম্নোক্ত তাৎপর্যপূর্ণ আইনি সিদ্ধান্তসমূহ প্রদান করেন:
হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিভিল আপিল নং ৬৭/২০২২-এর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত উদ্ধৃত করেন:
“The term ‘Functus Officio’ means that the jurisdiction of a designated authority comes to an end once he/she has performed his/her functions for which he/she was appointed… when a court has reached its final decision in respect of a matter, such court cannot vary/change its own decision, unless it is permitted by the specific provision of law.”
যুগ্ম জেলা জজ আদালত ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর শর্তযুক্ত ডিক্রি দিয়েছিলেন যে ৩০ দিনের মধ্যে টাকা না দিলে মামলা খারিজ হবে। ৩০ দিন অতিক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথে আদালত কার্যভারমুক্ত (Functus Officio) হয়ে গেছেন। দীর্ঘ ৮ বছর পর সেই একই বিষয়ে পুনরায় দরখাস্ত নিয়ে টাকা জমা গ্রহণ করা বিচারিক এখতিয়ারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন।
হাইকোর্ট মুসলিম আইনের ক্লাসিক্যাল মূলনীতি (Mulla’s Principles of Mahomedan Law) বিশদভাবে আলোচনা করে উল্লেখ করেন যে, হক-শুফা দাবি করতে হলে তিনটি তলব অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হয়:
- তলব-ই-মওয়াসিবাত (Talab-i-mowasibat): বিক্রির সংবাদ পাওয়ামাত্র তাৎক্ষণিক দাবি ঘোষণা।
- তলব-ই-ইশহাদ (Talab-i-ishhad): সাক্ষীদের উপস্থিতিতে বিক্রেতা বা ক্রেতার নিকট বা জমিতে গিয়ে দাবির পুনরাবৃত্তি।
- তলব-ই-তমলিক (Talab-i-tamlik): আদালতে নিয়মিত মোকদ্দমা দায়ের।
- অগ্রক্রয়কারীকে অবশ্যই মূল দলিলের নির্ধারিত শর্ত ও মূল্যের ভিত্তিতেই জমি গ্রহণ করতে হবে। দলিলের ৫০ লাখ টাকার মূল্যকে আরজি সংশোধন করে ২০ লাখ টাকা করার আবেদন অগ্রক্রয় আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী হওয়ায় বিচারিক আদালত তা নাকচ করে সঠিক করেছিলেন।
হাইকোর্ট রায়ের মূল রেশিওতে পর্যবেক্ষণ করেন:
“Procedural indulgence cannot be extended so far as to destroy the finality of proceedings or confer an unfair advantage upon a litigant who failed to act with due diligence… the petitioners have to make their bed and lie in it, i.e., accept the consequences and results of their actions.”
বাদী নিজেই হাইকোর্টের আপিল প্রত্যাহার করেছেন এবং কোনো সময় বৃদ্ধির আদেশ নেননি। অতএব নিজের গাফিলতির পরিণতি তাকেই ভোগ করতে হবে।
🏆 মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত রায় ও নির্দেশনাবলী
সার্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ, আইন ও নজির পর্যালোচনা শেষে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ নিম্নোক্ত চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন:
- ১. রুল খারিজ (Rule Discharged): বাদীর আনীত দেওয়ানী রিভিশন নং ১৩২৫/২০২৬-এর রুলটি কোনো খরচ ছাড়াই খারিজ করা হলো।
- ২. জেলা জজ আদালতের রায় বহাল: নাটোরের সিনিয়র জেলা জজ আদালত কর্তৃক দেওয়ানী রিভিশন নং ২৯/২০২৫ মঞ্জুর এবং যুগ্ম জেলা জজ আদালতের আদেশ বাতিলের রায় চূড়ান্তভাবে বহাল রাখা হলো।
- ৩. অগ্রক্রয় মামলা মৃত ও চূড়ান্ত খারিজ: নাটোরের ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে Shufa Suit No. 36 of 2013 চূড়ান্তভাবে খারিজ মর্মে সাব্যস্ত হলো।
- ৪. জমাকৃত ৫২ লাখ ৫০ হাজার টাকা উত্তোলনের নির্দেশ: বাদীপক্ষ তাদের জমাকৃত ৫২,৫০,০০০/- টাকা সরকারি ট্রেজারি থেকে কোনোপ্রকার হয়রানি বা বিলম্ব ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত/উত্তোলন করতে পারবেন মর্মে বিচারিক আদালতকে নির্দেশ প্রদান করা হলো।
- মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি রক্ষা: শর্তযুক্ত আদেশে স্বয়ংক্রিয়ভাবে খারিজ হয়ে যাওয়া মামলা অনির্দিষ্টকাল পর পুনরায় চালু করার সুযোগ দিলে বিচার ব্যবস্থার সমাপ্তি ও নিশ্চয়তা ভেঙে পড়বে।
- আদালতের এখতিয়ারের সীমাবদ্ধতা: রায় ঘোষণার পর আদালত নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর আর কোনো নিয়ন্ত্রণ রাখেন না (Functus Officio)।
- অগ্রক্রয় আইনের কঠোর শর্ত: হক-শুফা একটি কঠোর অধিকার; আদালতের বেঁধে দেওয়া সময় ও মূল্যের শর্ত অবহেলা করলে অধিকার চিরতরে বিলুপ্ত হয়।
আদালত যদি নির্দিষ্ট দিনে টাকা জমার শর্ত দেন এবং ব্যর্থতায় খারিজের আদেশ থাকে, তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই টাকা জমা দিন; একদিন দেরি হলেও মোকদ্দমা মৃত হয়ে যাবে।
উচ্চ আদালতে আপিল প্রত্যাহার করার সময় নিম্ন আদালতে টাকা জমার সময় বৃদ্ধির কোনো নির্দেশনা না নিলে নিম্ন আদালতে আর প্রতিকার পাওয়া যাবে না।
বিবাদী পক্ষ হিসেবে যদি দেখেন আদালত পূর্বে নিষ্পত্তি হওয়া বিষয়ে পুনরায় আদেশ দিচ্ছেন, তবে আদালতকে স্মরণ করিয়ে দিন যে আদালত ইতোমধ্যে Functus Officio হয়ে গেছেন।
মুসলিম অগ্রক্রয়ে কবলা দলিলের মূল্য হ্রাস চেয়ে আরজি সংশোধন করা যায় না; সম্পাদনকৃত দলিলের সম্পূর্ণ পণ গ্রহণে প্রস্তুত থাকতে হবে।
স্বীকৃতির ডিক্রি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে, কিন্তু নির্ধারিত শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে মামলা পুনরায় চালু করার আর কোনো পথ থাকে না।

