ভুয়া সমন জারিতে একতরফা ডিক্রি হাসিল করলে তামাদির অজুহাত টিকবে না: ৯ আদেশ ১৩ বিধিতে হাইকোর্টের রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক তাৎপর্যপূর্ণ রায়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, কোনো দেওয়ানী মামলায় বিবাদীদের ওপর যথাযথভাবে সমন জারি না করে কিংবা জালিয়াতিপূর্ণ উপায়ে সমন জারি দেখিয়ে একতরফা ডিক্রি (Exparte Decree) হাসিল করা হলে, পরবর্তীতে দেওয়ানী কার্যবিধির আদেশ ৯ নিয়ম ১৩ (Order 9 Rule 13 CPC) অনুযায়ী উক্ত ডিক্রি রদ (Set Aside) করতে হবে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক নজির ৫০ ডিএলআর (এডি) ২০৫ (বাংলাদেশ বনাম মশিউর রহমান) অনুযায়ী— “যখন কোনো একতরফা ডিক্রি প্রতারণার ভিত্তিতে অর্জিত প্রমাণিত হয়, তখন দরখাস্তটি তামাদিতে বারিত হলেও আদালত উক্ত প্রতারণামূলক ডিক্রি বহাল রাখতে পারেন না।” সমন জারির যথাযথতা প্রমাণের সম্পূর্ণ দায়ভার বাদীর ওপর বর্তায় এবং এক বিবাদীর সমন অপর বিবাদীর ওপর জারি দেখিয়ে একতরফা ডিক্রি হাসিল করা আইনের মারাত্মক লঙ্ঘন।
মামলাটি ঢাকার মূল্যবান সম্পত্তি নিয়ে উদ্ভূত। বাদী হাজী মো: জয়নাল আবেদীন ২০০৭ সালে ঢাকার ১ম সহকারী জজ আদালতে স্বত্ব মোকদ্দমা নং ২৩৯/২০০৭ দায়ের করেন (যা পরবর্তীতে স্থানান্তরিত হয়ে ঢাকার ৪র্থ অতিরিক্ত সহকারী জজ আদালতে স্বত্ব মোকদ্দমা নং ২৪৮/২০১০ হিসেবে পুনঃনম্বরভুক্ত হয়)।
মোকদ্দমার ঘটনার ধারাবাহিক ইতিবৃত্ত নিম্নরূপ:
- মূল স্বত্ব মামলার আরজি ও একতরফা ডিক্রি: বাদী তার আরজিতে ১৯৫৭ সালের ৮ মে তারিখের একটি রেজিস্ট্রিকৃত কবলা দলিলকে ভুয়া, বাতিল ও অকার্যকর ঘোষণা, আরএস রেকর্ড ভুল ঘোষণা এবং নালিশি জমিতে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার প্রার্থনা জানান। মামলাটিতে একাধিক বিবাদী থাকা সত্ত্বেও ২০১৯ সালের ১৮ আগস্ট বিজ্ঞ ৪র্থ অতিরিক্ত সহকারী জজ আদালত একতরফা শুনানিতে বাদীর অনুকূলে একতরফা রায় ও ডিক্রি (Exparte Decree) প্রদান করেন।
- সমন জারির জালিয়াতি ও বিবাদীদের অজ্ঞাতবাস: মামলায় মূল বিবাদী ১৩-১৪ এবং ১৭-২২ নম্বর বিবাদীরা উক্ত মামলার বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিলেন। নথিপত্রে দেখা যায়, প্রসেস সার্ভার কখনো বিবাদীদের ঠিকানায় যাননি। ১৩-১৪ নম্বর বিবাদীদের সমন ১৭-২২ নম্বর বিবাদীদের ওপর এবং ১৭-২২ নম্বর বিবাদীদের সমন ১৩-১৪ নম্বরের ওপর জারি দেখানো হয়েছে। এমনকি সকল বিবাদীর সমন ‘রাসেল’ (২০নং বিবাদী) নামক এক ব্যক্তির কাছে গ্রহণ দেখানো হয়েছে, যার কোনো ওকালতনামা বা ক্ষমতা ছিল না। কোনো ডাক রসিদ বা প্রসেসের সাক্ষীদের স্বাক্ষর নথিতে ছিল না।
- দখলের চেষ্টা ও ৯ আদেশ ১৩ বিধিতে মোকদ্দমা: বাদী ২০১৯ সালে গোপনে ডিক্রি হাসিল করার পর ২০২০ সালের ২৫ আগস্ট জমিতে এসে দখলের চেষ্টা করলে বিবাদীরা প্রথম জানতে পারেন যে তাদের বিরুদ্ধে গোপনে একতরফা ডিক্রি নেওয়া হয়েছে। বিবাদীরা ২৬ আগস্ট নকলের আবেদন করে ৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে জাবেদা নকল গ্রহণ করেন। এরপর ২০২০ সালের ৪ অক্টোবর তারিখে দেওয়ানী কার্যবিধির ৯ আদেশের ১৩ বিধিতে বিবিধ মোকদ্দমা নং ০১/২০২০ (Misc. Case No. 01 of 2020) দায়ের করে একতরফা ডিক্রি রদপূর্বক মূল মামলাটি পুনরায় শুনানির আবেদন জানান।
🛡️ বাদী জয়নাল আবেদীনের যুক্তি
- সমন যথাযথ জারি হয়েছে: বাদী দাবি করেন সাধারণ ও রেজিস্ট্রি ডাকে সকল বিবাদীর ওপর সমন জারি করা হয়েছিল। বিবাদীরা হাজির না হওয়ায় আদালত আইনানুগভাবে একতরফা ডিক্রি দিয়েছেন।
- ৪১৩ দিনের বিলম্ব ও তামাদির বাধা: তামাদি আইনের ১৬৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একতরফা ডিক্রি রদের মেয়াদ ৩০ দিন। বিবাদীরা ডিক্রির ৪১৩ দিন পর মামলা করায় এবং তামাদি আইনের ৫ ধারার মার্জনা আবেদন না দেওয়ায় দরখাস্তটি সরাসরি তামাদিতে বারিত।
- সাক্ষী হাজির না করার সুযোগ দাবি: বাদী দাবি করেন বিচারিক আদালত তাকে সাক্ষী পরীক্ষার যথেষ্ট সুযোগ না দিয়ে বিবিধ মোকদ্দমা মঞ্জুর করেছে, তাই মামলা রিমান্ডে পাঠানো উচিত।
🏛️ বিবাদী শাহ আলম গংদের জবাব ও দাবি
- প্রতারণামূলক সমন জারি: বিবাদীদের ঠিকানায় সমন যায়নি। এক বিবাদীর সমন অন্য বিবাদীর ওপর এবং সকলের সমন অননুমোদিত ব্যক্তির নিকট দিয়ে জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
- জানার তারিখ থেকে তামাদি গণনা: সমন জারি না হলে ১৬৪ অনুচ্ছেদের তামাদি গণনা শুরু হয় ডিক্রির কথা জানার তারিখ থেকে (Date of Knowledge)। বিবাদীরা ২৫ আগস্ট জেনে ৩ সেপ্টেম্বর নকল নিয়ে ৪ অক্টোবর মামলা করেছেন, যা তামাদির মধ্যে।
- প্রতারণা তামাদিকে বাতিল করে (50 DLR AD 205): আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতারণার মাধ্যমে ডিক্রি হাসিল করলে তামাদির প্রশ্ন তুলে ডিক্রি রক্ষা করা যায় না।
- বিচারিক আদালত (৪র্থ অতিরিক্ত সহকারী জজ আদালত, ঢাকা – ২০২৪):
২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিল বিজ্ঞ সহকারী জজ আদালত বিবিধ মোকদ্দমা নং ০১/২০২০ মঞ্জুর করেন। আদালত সমন জারির নথিপত্র পরীক্ষা করে দেখতে পান যে সমন জারিতে ভয়াবহ অনিয়ম ও জালিয়াতি হয়েছে। ফলে ২০১৯ সালের ১৮ আগস্টের একতরফা রায় ও ডিক্রি রদ (Set Aside) করে মূল স্বত্ব মোকদ্দমা নং ২৪৮/২০১০ পুনরায় শুনানির জন্য পূর্বের নম্বরে পুনরুজ্জীবিত (Restored) করা হয়। - জেলা জজ আদালত (১ম অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত, ঢাকা – ২০২৫):
বাদীর দায়েরকৃত দেওয়ানী রিভিশন নং ১৭৩/২০২৪-এ ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর বিজ্ঞ ১ম অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত বাদীর রিভিশন সরাসরি খারিজ করে বিচারিক আদালতের একতরফা ডিক্রি রদের আদেশ বহাল রাখেন।
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের বিজ্ঞ বিচারপতি মো: আলী রেজা রিভিশন শুনানিকালে দেওয়ানী কার্যবিধির সমন জারি সংক্রান্ত বিধিবিধান ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নজির বিশ্লেষণ করে নিম্নোক্ত যুগান্তকারী আইনি ব্যাখ্যা দেন:
দেওয়ানী কার্যবিধির ৫ আদেশের ১২ বিধি অনুযায়ী যেখানে সম্ভব সমন বিবাদীর ওপর ব্যক্তিগতভাবে জারি করতে হবে। একই সাথে Civil Rules and Orders (CRO)-এর ৬৯ বিধি অনুযায়ী একতরফা মোকদ্দমায় আদালত কখনোই ব্যক্তিগত সমন জারি ব্যতিরেকে সন্তুষ্ট হবেন না।
- ১৩-১৪ নম্বর বিবাদীরা এবং ১৭-২২ নম্বর বিবাদীরা পৃথক ঠিকানায় বসবাস করেন। এক বিবাদীর সমন অন্য বিবাদীর কাছে দেওয়া বা অননুমোদিত এক ব্যক্তির (রাসেল) কাছে সকল বিবাদীর সমন গ্রহণ দেখানো আইনসম্মত জারি নয়; বরং তা প্রতারণামূলক সমন জারি।
- প্রসেস সার্ভার বা সমনের সাক্ষীদের সাক্ষ্য আদালতে উপস্থাপিত হয়নি। ফলে বিবাদীদের ওপর কোনো বৈধ সমন জারি হয়নি বলে প্রমাণিত।
যে পক্ষ একতরফা ডিক্রির সুবিধা গ্রহণ করে, সেই বাদীর ওপরই আইনগতভাবে প্রমাণের ভার বর্তায় যে বিবাদীদের ওপর সমন যথাযথভাবে ও আইনসঙ্গত পদ্ধতিতে জারি হয়েছিল। এই মামলায় বাদী ডাক রসিদ বা উপযুক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করে উক্ত দায়ভার পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন।
হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ বনাম মশিউর রহমান (50 DLR (AD) 205) নজির উল্লেখ করে বলেন:
“When an ex parte decree is challenged on ground of fraud and some elements of fraud and collusion are found on the record, the Court should not sustain such fraudulent decree even if the application for setting aside the exparte decree is barred by limitation.”
অতএব, যেখানে সমন জারিতেই জালিয়াতির উপাদান বিদ্যমান, সেখানে বাদীর তামাদির আপত্তি আদালতে বিন্দুমাত্র গ্রহণযোগ্য নয়। তাছাড়া তামাদি আইনের ১৬৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সমন জারি না থাকলে বিবাদীদের ‘জ্ঞাত হওয়ার তারিখ’ থেকেই তামাদি গণনা হবে।
বাদীপক্ষ অধস্তন আদালতে একাধিকবার সময় নিয়েও কোনো সাক্ষী হাজির করেনি। এমনকি আদেশের দিনে মামলা প্রত্যাহারের দরখাস্ত দিয়ে বিচার বিলম্বিত করেছে। Civil Rules and Orders-এর ১৩৫ বিধি অনুযায়ী সাক্ষীর তালিকা আদালতে উপস্থাপন ছাড়া মৌখিক আবেদন অর্থহীন। অতএব রিভিশন পর্যায়ে এসে বাদীর রিমান্ডের আবেদন সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন হওয়ায় তা খারিজ করা হয়।
🏆 মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত রায় ও নির্দেশনাবলী
সার্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ, আইন ও নজির পর্যালোচনা শেষে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ নিম্নোক্ত চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন:
- ১. রুল খারিজ (Rule Discharged): বাদীর আনীত দেওয়ানী রিভিশন নং ৩৮/২০২৬-এর রুলটি কোনো খরচ ছাড়াই সরাসরি খারিজ করা হলো।
- ২. স্থিতাবস্থা প্রত্যাহার: ইতিপূর্বে হাইকোর্ট কর্তৃক জারিকৃত যেকোনো স্থগিতাদেশ ও স্থিতাবস্থা অবিলম্বে বাতিল করা হলো।
- ৩. একতরফা ডিক্রি বাতিল ও মূল মামলা পুনরুজ্জীবিত: ঢাকার ৪র্থ অতিরিক্ত সহকারী জজ আদালতে স্বত্ব মোকদ্দমা নং ২৪৮/২০১০-এ ২০১৯ সালের ১৮ আগস্টের একতরফা রায় ও ২১ আগস্টের একতরফা ডিক্রি চূড়ান্তভাবে বাতিল ও রদ (Set Aside) করা হলো এবং মূল মোকদ্দমাটি উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে দোতরফা শুনানির জন্য পুনরুজ্জীবিত (Restored to its original file and number) করা হলো।
- ৪. অবিলম্বে আদালতকে অবহিতকরণের নির্দেশ: এই রায়ের অনুলিপি অবিলম্বে অধস্তন বিচারিক আদালতে প্রেরণ করার নির্দেশ দেওয়া হলো।
- ন্যায্য বিচার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের মৌলিক অধিকার (Audi Alteram Partem): বিবাদীকে নোটিশ না দিয়ে গোপনে বিচার করে ডিক্রি হাসিল করা প্রাকৃতিক ন্যায়নীতি ও দেওয়ানী বিচার ব্যবস্থার পরিপন্থী।
- প্রতারণামূলক কার্যপদ্ধতি ডিক্রিকে কলুষিত করে: যে ডিক্রি সমন জালিয়াতির মাধ্যমে আসে, তা আইনগতভাবে অকার্যকর এবং কোনো পক্ষই এই ডিক্রির বৈধতা ভোগ করতে পারে না।
- তামাদির শুরু জানার তারিখ থেকে: বিবাদী যখন প্রথম ডিক্রির খবর পায় এবং যথাসময়ে নকল তুলে আদালতে আসে, তখন থেকেই তামাদি গণনা করতে হবে।
বাদী হিসেবে মামলা করলে বিবাদীর সঠিক ঠিকানা, পোস্টাল এডি রসিদ এবং জারি প্রতিবেদনের স্বাক্ষর নিশ্চিত করুন; নইলে একতরফা ডিক্রি যেকোনো সময় বাতিল হয়ে যাবে।
বিবাদী পক্ষ যদি কোনো একতরফা ডিক্রির খবর পান, কালক্ষেপণ না করে দ্রুত আদালতের নকল শাখায় দরখাস্ত দিন এবং পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে ৯ আদেশ ১৩ বিধিতে মামলা করুন।
বাদী যদি তামাদির অজুহাত তোলে, তবে সমন জালিয়াতির প্রেক্ষাপটে এই বিখ্যাত নজির উপস্থাপন করুন— প্রতারণার ক্ষেত্রে তামাদি বিচারকে রুখতে পারে না।
প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক বিবাদীর জন্য ব্যক্তিগত সমন নিশ্চিত করতে হবে; ক্ষমতা ছাড়া সহ-বিবাদীর কাছে সমন দিলে তা আইনের দৃষ্টিতে সমন জারি হিসেবে গণ্য হবে না।
দুই আদালত যখন সমন জারি না হওয়ার ব্যাপারে একমত হয়, তখন দেওয়ানী কার্যবিধির ১১৫(৪) ধারায় রিভিশন করে ডিক্রি ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব।

