কক্সবাজারের ইনানীতে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে মামলা, শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা ও ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন ইনানী পাটুয়ারটেক এলাকার ‘টুপটুপ রিসোর্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছে। অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত করতে ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফল পাওয়ার পরই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। এদিকে অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্য কারণ ও সার্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাতে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।
মামলা দায়ের ও রিসোর্টের ম্যানেজার আটক
মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাতে রাজি হননি উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার। তবে থানা-পুলিশের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, দায়ের করা মামলায় টুপটুপ রিসোর্টের মালিক ও চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার বাসিন্দা তানভীর সুলতান এবং নিয়াজ মোর্শেদকে আসামি করা হয়েছে। এর পাশাপাশি রিসোর্টের ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকেও মামলার আসামি করা হয়েছে। পুলিশ ইতিমধ্যে অভিযান চালিয়ে রিসোর্ট ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে আটক করেছে।
মরদেহ শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা ও হস্তান্তর প্রক্রিয়া
অগ্নিকাণ্ডে নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ হস্তান্তরের জটিলতা নিরসনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, “অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধার হওয়া মরদেহ, নিখোঁজ ব্যক্তি এবং পরিচয় শনাক্তের বিষয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।” বর্তমানে মরদেহগুলো কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে সংরক্ষিত রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে কক্সবাজারে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, ডিএনএ পরীক্ষার প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করতে কক্সবাজারের বিভিন্ন হাসপাতালে নমুনা সংগ্রহের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, পরিস্থিতির প্রয়োজনে রাজধানী ঢাকা থেকে সিআইডির অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ দল এনে কক্সবাজারেই ডিএনএ পরীক্ষার সার্বিক ব্যবস্থা করা হবে এবং সে লক্ষ্যেই প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহের কাজ চলছে।
অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ও দীর্ঘ উদ্ধার অভিযান
উল্লেখ্য, শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল আনুমানিক ৭টার দিকে উখিয়ার মেরিন ড্রাইভ এলাকার ইনানী পাটুয়ারটেকে অবস্থিত টুপটুপ রিসোর্টে আকস্মিকভাবে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনে পুরো রিসোর্টটি গ্রাস করে নেয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে টানা প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। উদ্ধার তৎপরতা শেষে ঘটনাস্থল থেকে মোট ১০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে অগ্নিদগ্ধ হয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় আরও ছয়জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা জানান, উদ্ধারের সময় মরদেহগুলো এমনভাবে পুড়ে গিয়েছিল যে খালি চোখে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কারোরই পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, রিসোর্টটির অবকাঠামোগত নির্মাণে বিভিন্ন অংশে বিপুল পরিমাণ কাঠ ও প্লাস্টিকের বোর্ডের ব্যবহার ছিল। এর ফলে আগুনের তীব্রতা অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের ভয়াবহতা ও ঘন ধোঁয়ার কারণে ভেতরে অবস্থানরত অতিথিরা নিরাপদে বের হওয়ার কোনো সুযোগ পাননি।
যেভাবে উদ্ধার হয় মরদেহগুলো
উদ্ধার অভিযান চলাকালে ভবনের ভেতরে মর্মান্তিক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন উদ্ধারকারীরা। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী:
- রিসোর্টের দোতলার একটি কক্ষের বিছানা থেকেই পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
- একই কক্ষের ওয়াশরুম থেকে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
- ভবনের তিনতলার একটি ওয়াশরুম থেকে একে অপরকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেন উদ্ধারকর্মীরা।
নিহতদের পরিচয় ও পারিবারিক সংযোগ
উদ্ধার হওয়া ১০ জনের মধ্যে স্বজন ও পারিবারিক সূত্রে সাতজনের পরিচয় প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তাঁরা হলেন:
- ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), বনশ্রী, ঢাকা
- মিলিতা মেহজাবিন আলভী (২৩), বনশ্রী, ঢাকা
- লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), খিলগাঁও, ঢাকা
- নাফিসতা মীম (২৭), খিলগাঁও, ঢাকা
- ফারিহা কবির (৩৩), চুয়াডাঙ্গা
- ফায়িজান আহম্মেদ (৫), চুয়াডাঙ্গা
- নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৮), আশুলিয়া
নিহতদের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আলভী ও নাফিস তেহামি জেরিফ সম্পর্কে মালিহা ও নাবিলার কাজিন। অন্যদিকে ফারিহা কবির হলেন জেরিফের বড় বোন এবং নিহত শিশু ফায়িজান তাঁদের ভাগ্নে। পারিবারিক অবকাশ যাপনে তাঁরা একসঙ্গে কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছিলেন।
আহতদের চিকিৎসা ও শারীরিক অবস্থা
অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে আহত ছয়জনকে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা সেবার আওতায় আনা হয়। আহত ব্যক্তিরা হলেন—ঢাকা মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) এবং সামিদা (৩২)।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে চারজনের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁদের শরীরের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত মারাত্মকভাবে পুড়ে গেছে। বাকি দুজনকে হাসপাতালে নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন
অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান ও কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল কি না, তা যাচাই করতে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনিম জাহানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ সংবলিত পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অনুমোদনহীন রিসোর্ট ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি
ভয়াবহ এই প্রাণহানির ঘটনার পর টুপটুপ রিসোর্টের বৈধতা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাসহ সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ঢাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জানান, টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টের কোনো ফায়ার সার্ভিস লাইসেন্স বা অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্র ছিল না। তিনি উল্লেখ করেন, নিয়ম মেনে প্রয়োজনীয় বৈধতা অর্জনের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটিকে পূর্বে সতর্ক করা হলেও রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ তা আমলে নেয়নি।
অন্যদিকে, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনও জানিয়েছেন যে প্রতিষ্ঠানটির কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কোনো প্রকার অনুমোদন বা ছাড়পত্র ছিল না। এ ছাড়া পর্যটন এলাকায় অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও রিসোর্টটিতে স্থানীয় লোকজনের প্রবেশাধিকার সীমিত রাখা হতো বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।

