একই দেনার একাধিক চেকে পৃথক মামলা হলেও ফৌজদারি কার্যবিধির ২৩৪ ধারায় যৌথ বিচার: হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (CrPC)-এর ধারা ২৩৪ এবং নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ১৩৮ ধারা অনুযায়ী যদি একই ব্যবসায়িক লেনদেন বা দেনা পরিশোধের উদ্দেশ্যে একই ব্যক্তির অনুকূলে ১২ মাসের মধ্যে সংঘটিত অনধিক ৩টি চেক ডিজঅনার হয়, তবে পৃথক পৃথক ৩টি নালিশি মামলা রুজু হলেও বিচারিক আদালত উভয় পক্ষের সাক্ষ্য ও সময়ের অপচয় রোধ এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে উক্ত মামলাসমূহকে একীভূত করে যৌথ বিচার (Joint trial and consolidation) পরিচালনা করতে পারেন। একই দেনায় পৃথক বিচারে আসামীকে পরপর সাজা দিয়ে দ্বৈত শাস্তির মুখোমুখি করা বিচারিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ঢাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এস. এম. মাহফুজুর রহমান ব্যবসায়িক পণ্য ক্রয়ের নিমিত্তে মেসার্স ডেল্টা ট্রেডার্সের অনুকূলে ১০ লাখ টাকা করে মোট ৩টি চেক প্রদান করেন। তিনটি চেকই একই তারিখে ব্যাংকে উপস্থাপন করা হলে অপর্যাপ্ত তহবিলের কারণে ডিজঅনার হয়। বাদীপক্ষ একটিমাত্র লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে ৩০ লাখ টাকা দাবি করেন। অতঃপর বাদী চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একই দিনে ৩টি পৃথক নালিশি মামলা দায়ের করেন।
মামলা তিনটি যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালত নং ৪-এ বিচারের জন্য বদলি হয়। আসামি মাহফুজুর রহমান ফৌজদারি কার্যবিধির ২৩৪ ও ২৩৯ ধারা অনুসারে তিনটি মামলার লেনদেন, পক্ষ ও নোটিশ অভিন্ন হওয়ায় একইসাথে যৌথ বিচার পরিচালনার দরখাস্ত দাখিল করেন। কিন্তু ট্রায়াল জজ আসামির দরখাস্ত খারিজ করে পৃথক পৃথক ৩টি ট্রায়াল শুরু করেন, যার ফলে আসামির বিরুদ্ধে ৩ বছরের কারাদণ্ড ও পৃথক জামানতের ঝুঁকি তৈরি হয়। উক্ত আদেশের বিরুদ্ধে আসামি হাইকোর্টে এই ফৌজদারি রিভিশন আবেদন দায়ের করেন।
👤 আবেদনকারী আসামির আইনি যুক্তি
আসামির বিজ্ঞ আইনজীবী যুক্তি দেন যে, ফৌজদারি কার্যবিধির ২৩৪ ধারায় স্পষ্ট বিধান রয়েছে যে ১২ মাসের মধ্যে সংঘটিত একই ধরনের ৩টি অপরাধ এক সাথে চার্জ গঠন করে বিচার করা যায়। এতে আদালতের মূল্যবান সময় বাঁচে এবং অভিন্ন সাক্ষীর বারবার সাক্ষ্য দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
👥 নালিশকারী বাদীর যুক্তি
বাদীপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন যে, প্রতিটি চেকের জন্য অপরাধ পৃথকভাবে সংঘটিত হয়েছে। এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় প্রতিটি চেক স্বতন্ত্র কজ অব অ্যাকশন তৈরি করে, ফলে পৃথক বিচার আইনসঙ্গত।
হাইকোর্ট বিভাগ নথিপত্র পরীক্ষা করে দেখতে পান যে, ট্রায়াল জজ ফৌজদারি কার্যবিধির নমনীয় ও সমন্বিত বিচারের বিধান অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন। যেখানে পক্ষগণ এক, দেনার উৎস এক এবং লিগ্যাল নোটিশ এক, সেখানে একই সাক্ষীদের তিনটি পৃথক এজলাসে ঘুরিয়ে তিনটি পৃথক রায় দেওয়া বিচারিক ক্ষমতার অপচয়।
মহামান্য হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত 49 DLR (AD) 255 এবং 64 DLR 122 উল্লেখ করেন। আপিল বিভাগ স্পষ্টভাবে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন: “Section 234 of the Code of Criminal Procedure is intended to prevent harassment of the accused and multiplicity of proceedings. Where multiple cheques are issued in the course of the same commercial transaction within 12 months, the court possesses the inherent and statutory jurisdiction to consolidate the trials and try up to three offences together.”
চূড়ান্ত রায়: ফৌজদারি রিভিশন মোকদ্দমাটি মঞ্জুর করা হয়। ট্রায়াল জজের পৃথক বিচারের আদেশ বাতিল ঘোষণা করা হয়। আদালতকে নির্দেশ দেওয়া হয় যে তিনটি মামলাকে একীভূত করে কার্যবিধির ২৩৪ ধারা অনুযায়ী একটি চার্জ গঠন করে যৌথভাবে সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন করতে হবে এবং একটি সমন্বিত রায়ের মাধ্যমে বিরোধটি দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।
- ২৩৪ ধারার সুবিধা: একই বছরের ৩টি চেক ডিজঅনার মামলা একীভূত করে বিচার করা পুরোপুরি আইনসম্মত।
- হয়রানি প্রতিরোধ: একই দেনায় পৃথক মামলার ফলে আসামীকে যেন অতিরিক্ত জেল না খাটতে হয় তার সুরক্ষা।
- আদালতের সময়ের সদ্ব্যবহার: একক সাক্ষ্য ও শুনানিতে বিরোধ নিষ্পত্তি বিচার বিভাগের দক্ষতা বৃদ্ধি করে।
- যৌথ বিচারের লিখিত আবেদন: একই বাদীর একাধিক চেক মামলা থাকলে চার্জ গঠনের পূর্বেই ২৩৪ ধারার দরখাস্ত দিন।
- একই লেনদেন প্রমাণ: চুক্তিপত্র দাখিল করে আদালতকে বোঝান যে চেকগুলো একই ব্যবসার সিকিউরিটি ছিল।
- একীভূত সাজার সুবিধা: যৌথ বিচার হলে আদালত সচরাচর সাজা একসাথে চলার (Concurrent sentence) আদেশ দেন।
- বাদীপক্ষের সতর্কতা: ৩টির বেশি চেক থাকলে বা পৃথক তারিখের হলে তবেই আলাদা মামলা কার্যকর থাকে।
- আইনজীবীদের জন্য কৌশল: আপিল বিভাগের ৬৪ ডিএলআর ১২২ রায় রেফার করে মামলা একীভূত করার আর্জি জানান।

