চেক ডিজঅনারের ৩০ দিন পর লিগ্যাল নোটিশ পাঠালে মামলা তামাদিতে সম্পূর্ণ অচল: হাইকোর্টের কঠোর রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট (The Negotiable Instruments Act, 1881)-এর ১৩৮(খ) ধারার শর্তানুযায়ী ব্যাংক থেকে চেক ডিজঅনারের মেমো প্রাপ্তির ঠিক ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে চেক প্রদানকারী বরাবর অর্থ পরিশোধের লিখিত আইনি নোটিশ (Demand Notice) জারি করা একটি সংবিধিবদ্ধ অলঙ্ঘনীয় পূর্বশর্ত। এই ৩০ দিনের সময়সীমা অত্যন্ত কঠোর (Strict and Mandatory) এবং এতে তামাদি আইনের ৫ ধারার সাধারণ বিলম্ব মওকুফের কোনো বিধান প্রযোজ্য নয়। ব্যাংক বা অভিযোগকারী যদি ৩০ দিনের পর ৩১তম বা ৩২তম দিনে নোটিশ প্রেরণ করে, তবে উক্ত নালিশি মামলাটি আইনের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ মৃত ও তামাদিতে বারিত (Barred by Limitation)। এমন মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট আদালত কর্তৃক অপরাধ আমলে নেওয়া সম্পূর্ণ এখতিয়ারবহির্ভূত এবং প্রদত্ত সমস্ত সাজা বাতিলযোগ্য।
মামলার বিবরণে জানা যায়, পিটিশনার মো. কামরুল হাসান ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেডের একজন গ্রাহক ছিলেন। তিনি তার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা পরিচালনার জন্য গৃহীত ঋণের কিস্তি হিসেবে ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার একটি চেক প্রদান করেন। চেকটি ২০২৩ সালের ১০ মে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে উপস্থাপন করা হলে অপর্যাপ্ত তহবিলের কারণে একই দিনে ডিজঅনার মেমোসহ ফেরত আসে।
ব্যাংকের আইন বিভাগীয় কর্মকর্তা অবহেলাবশত উক্ত মেমো প্রাপ্তির ঠিক ৩৪ দিন পর অর্থাৎ ২০২৩ সালের ১৩ জুন লিগ্যাল নোটিশ রেজিস্ট্রি ডাকযোগে প্রেরণ করেন। পরবর্তীতে যথারীতি ৩০ দিন পার হলে ঢাকা সিএমএম আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালত ব্যাংকের আইনজীবীর মৌখিক অজুহাত গ্রহণ করে যে ব্যাংক বন্ধ ছিল—আসামিকে ১ বছরের কারাদণ্ড ও চেকে উল্লেখিত ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন। মহানগর দায়রা জজ আদালতও তা বহাল রাখেন। সংক্ষুব্ধ আসামি হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করেন।
👤 আসামিপক্ষের মূল যুক্তি
আসামির বিজ্ঞ আইনজীবী দৃঢ়ভাবে যুক্তি দেন যে, ১৩৮(খ) ধারায় ‘Within thirty days of the receipt of information’ শব্দবন্ধ রয়েছে। এখানে কোনো বিলম্ব মওকুফের আবেদন চলে না। ৩৪ দিনে নোটিশ পাঠানোয় অপরাধের কোনো কজ অব অ্যাকশন (Cause of Action) জন্ম নেয়নি।
👥 ব্যাংকের যুক্তি
ব্যাংক দাবি করে যে, অভ্যন্তরীণ অডিট ও ছুটির কারণে ৪ দিন দেরি হয়েছে যা অনিচ্ছাকৃত, অতএব ন্যায়বিচারের স্বার্থে সামান্য বিলম্ব মার্জনা করে সাজা বহাল রাখা উচিত।
হাইকোর্ট বিভাগ পর্যালোচনা করে দেখতে পান যে, স্পেশাল ল (Special Law)-এর ক্ষেত্রে জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট বা লিমিটেশন অ্যাক্টের শিথিলতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে খাটে না। এনআই অ্যাক্ট একটি বিশেষ ফৌজদারি স্ট্যাটিউট, যার প্রতিটি কার্যপ্রণালীগত পদক্ষেপ অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করতে হয়। নিম্ন আদালত ৪ দিনের বিলম্ব ক্ষমা করে সম্পূর্ণ এখতিয়ারহীন বিচার করেছেন।
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রখ্যাত নজির 57 DLR (AD) 59 এবং 63 DLR (AD) 201 উল্লেখ করেন। আপিল বিভাগের সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত: “The period of 30 days prescribed in clause (b) of Section 138 is mandatory. A notice issued even a single day beyond 30 days is fatal to the prosecution.” সুতরাং এই নোটিশের ওপর কোনো ফৌজদারি ট্রায়াল চলতে পারে না।
চূড়ান্ত রায়: ক্রিমিনাল রিভিশনটি মঞ্জুর করা হয়। অধস্তন আদালত কর্তৃক প্রদত্ত আসামির ১ বছরের কারাদণ্ড ও ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের রায় সম্পূর্ণ রদ ও বাতিল করে পিটিশনার মো. কামরুল হাসানকে বেকসুর খালাস প্রদান করা হয়। তবে ব্যাংককে দেওয়ানি ফোরামে বা অর্থ ঋণ আদালতে গিয়ে পাওনা দাবির সুযোগ বহাল রাখা হয়।
- ৩০ দিনের সময়সীমা অলঙ্ঘনীয়: ডিজঅনার মেমো পাওয়ার দিন থেকে ৩০ দিন হিসাব করতে হবে। ৩১তম দিনে নোটিশ পাঠালে সম্পূর্ণ মামলা বাতিল হবে।
- বিলম্ব মওকুফের সুযোগ নেই: এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার নোটিশ প্রদানে বিলম্ব হলে কোনো আদালত তা ক্ষমা করার এখতিয়ার রাখেন না।
- পোস্ট অফিসের রসিদের তারিখই ভিত্তি: নোটিশ ড্রাফটের তারিখ নয়, ডাকঘরে বুকিংয়ের মূল সিল ও রসিদের তারিখই নোটিশ জারির প্রামাণ্য তারিখ।
- মেমো প্রাপ্তির দিন ক্যালেন্ডারে দাগিয়ে রাখা: ব্যাংক থেকে চেক ফেরত আসার দিনটি লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত করে অন্তত ২০ দিনের মধ্যে নোটিশ পাঠান।
- রেজিস্ট্রি ডাক ও কুরিয়ার উভয় মাধ্যমে প্রেরণ: নোটিশটি রেজিস্ট্রি ডাকযোগে এডি সহ এবং প্রথম সারির কুরিয়ারে একই সাথে প্রেরণ করুন।
- আসামিপক্ষের প্রথম কাজ তামাদি যাচাই: নোটিশ পাওয়ার পর বা আরজির সাথে ডাক রসিদের তারিখ গণনা করে তামাদির ব্যত্যয় পেলে চার্জ বাতিলের আবেদন করুন।
- ব্যাংকের লিগ্যাল অফিসারদের সতর্কতা: অবহেলার কারণে মামলার তামাদি নষ্ট হলে ব্যাংকের নিজস্ব লিগ্যাল টিমের বিরুদ্ধে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করুন।
- আইনজীবীদের জন্য ক্যালকুলেশন টিপস: ৩০ দিনের শেষ দিন সরকারি ছুটি থাকলে কেবল পরের কর্মদিবসে নোটিশ পাঠানো বৈধ হতে পারে, নতুবা নয়।

