মায়ের দ্বিতীয় বিবাহ সন্তানের কাস্টডি বাতিলের স্বয়ংক্রিয় কারণ নয়: সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন, ১৮৯০ (Guardians and Wards Act, 1890)-এর ১৭ ধারা এবং মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী নাবালক সন্তানের হেফাজত বা কাস্টডি (Hizanat) নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘সন্তানের কল্যাণই একমাত্র সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত বিবেচ্য বিষয়’ (Welfare of the minor is paramount consideration)। বিবাহবিচ্ছেদের পর মা যদি কোনো অপরিচিত ব্যক্তির সাথে দ্বিতীয় বিবাহ (Remarriage with a stranger) বন্ধনে আবদ্ধ হন, তবে প্রাচীন শরিয়াহ ফতোয়ায় মায়ের অধিকার খর্ব হওয়ার সাধারণ নিয়ম থাকলেও তা কোনো অনমনীয় বা পরম আইন নয়। যদি আদালত নিশ্চিত হন যে সৎপিতার গৃহে সন্তান নিরাপদে, পরম স্নেহে ও উন্নত পরিবেশে প্রতিপালিত হচ্ছে এবং পিতার নিকট হস্তান্তর করলে সন্তানের পড়াশোনা ও মানসিক বিকাশ মারাত্মক ব্যাহত হবে, তবে মায়ের হেফাজতই বহাল থাকবে।
মামলার বিবরণে জানা যায়, খুলনা মহানগরের বাসিন্দা মোঃ ফারুক হোসেনের সাথে মোছাঃ বিলকিস বেগমের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। তাদের একমাত্র কন্যা সন্তান (বয়স ৭ বছর) মায়ের কাছে লালিত-পালিত হচ্ছিল। বিচ্ছেদের দুই বছর পর মা বিলকিস বেগম একজন সরকারি চাকরিজীবীকে দ্বিতীয় বিবাহ করেন। এরপরই পিতা ফারুক হোসেন পারিবারিক জজ আদালতে অভিভাবক আইনের ২৫ ধারায় মামলা দায়ের করে দাবি করেন যে মুসলিম আইন অনুসারে মা পরপুরুষের সাথে বিবাহ করায় কন্যার হেফাজতের সমস্ত অধিকার হারিয়েছেন।
পারিবারিক আদালত সরেজমিনে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করেন এবং ৭ বছরের কন্যাসন্তানের মতামত ও সৎপিতার আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন। তদন্তে উঠে আসে যে সৎপিতা কন্যাকে নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করেন এবং খুলনা শহরের নামীদামী স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন। পক্ষান্তরে পিতা ফারুক হোসেন নিজেও দ্বিতীয় বিবাহ করেছেন এবং তার নতুন সংসারে সন্তান রয়েছে। আদালত পিতার আবেদন খারিজ করে মায়ের হেফাজত বহাল রাখেন। জেলা জজ আদালতে আপিল ব্যর্থ হওয়ার পর পিতা হাইকোর্টে এই রিভিশন মামলা দায়ের করেন।
👤 আবেদনকারী পিতার আইনি যুক্তি
পিতার আইনজীবী যুক্তি দেন যে, মুসলিম আইনের ৩৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মাতা কোনো রক্তসম্পর্কহীন ব্যক্তিকে বিয়ে করলে কন্যার হিজানতের অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে পিতার অনুকূলে হস্তান্তরিত হয়। পারিবারিক আদালতের রায় শরিয়াহ বিরোধী।
👥 বিপরীতপক্ষ মাতার যুক্তি
মাতার আইনজীবী যুক্তি দেখান যে, অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইনের ১৭ ধারা শরিয়াহ আইনের চেয়ে প্রাধান্য পায়। পিতা স্বয়ং দ্বিতীয় বিয়ে করায় পিতার সংসারে সৎমায়ের অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হওয়ার তীব্র ঝুঁকি রয়েছে।
পারিবারিক আদালত এবং জেলা জজ আদালত শিশুটির সর্বোত্তম শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তাকে প্রধান্য দিয়ে অত্যন্ত মানবিক ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। নাবালিকা কন্যা তার শৈশব থেকেই মায়ের পরম সান্নিধ্যে বড় হচ্ছে। হঠাৎ করে তাকে পিতার নতুন সংসারে পাঠিয়ে দিলে তার মানসিক জীবনে অপূরণীয় বিপর্যয় ঘটবে।
মহামান্য হাইকোর্ট বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত Abu Baker Siddique vs. Most. Ayesha Sultana, 38 DLR (AD) 106 এবং 51 DLR (AD) 292 বিস্তারিত উদ্ধৃত করেন। আপিল বিভাগ যুগান্তকারীভাবে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন: “The rules of Hizanat under traditional Muslim law are not rigid and inflexible. The paramount consideration is the welfare of the minor child. A mother’s remarriage to a stranger does not work as an absolute disqualification. If the court finds that the child is happy, secure and receiving proper education with the mother, her custody will not be disturbed merely because she has remarried.”
চূড়ান্ত রায়: সিভিল রিভিশন মোকদ্দমাটি সরাসরি খারিজ (Dismissed) করা হয়। কন্যার হেফাজত মায়ের কাছে বহাল রাখার পারিবারিক আদালতের রায় শতভাগ নিশ্চিত করা হয়। তবে পিতাকে প্রতি মাসের প্রথম ও তৃতীয় শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কন্যার সাথে সাক্ষাৎ ও সময় কাটানোর অধিকার (Visitation rights) প্রদান করা হয় এবং পিতাকে প্রতি মাসে মেয়ের খোরপোষ বাবদ ১৫,০০০ টাকা নিয়মিত প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
- সন্তানের কল্যাণই পরম আইন: সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানসিক সুরক্ষার চেয়ে কোনো যান্ত্রিক নিয়ম বড় নয়।
- দ্বিতীয় বিবাহের নমনীয়তা: মায়ের দ্বিতীয় বিবাহ হলেই কাস্টডি হারাবে—এই প্রাচীন ধারণা সুপ্রিম কোর্ট বহু আগেই বিলুপ্ত করেছেন।
- সাক্ষাতের ভারসাম্যপূর্ণ অধিকার: হেফাজত মায়ের কাছে থাকলেও পিতা সবসময় কন্যার সাথে নিয়মিত দেখার আইনি অধিকার রাখেন।
- সন্তানের ইতিবাচক পরিবেশ প্রমাণ: মা দ্বিতীয় বিয়ে করলে আদালতে প্রমাণ করুন যে সৎপিতা সন্তানের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল।
- স্কুল ও স্বাস্থ্য রেকর্ড দাখিল: সন্তানের ধারাবাহিক স্কুলের রেজাল্ট ও শারীরিক সুস্থতার রিপোর্ট আদালতে উপস্থাপন করুন।
- পিতার সৎমায়ের পরিবেশ তুলে ধরা: পিতা যদি নিজে দ্বিতীয় বিয়ে করে থাকেন, তবে সেই সংসারে সন্তান অবহেলিত হবে তা আদালতকে বোঝান।
- সাক্ষাতের নিয়ম মেনে চলা: আদালতের নির্ধারিত দিনে পিতাকে মেয়ের সাথে নির্বিঘ্নে দেখা করতে সহায়তা করুন।
- আইনজীবীদের জন্য কৌশল: আপিল বিভাগের ৩৮ ডিএলআর (এডি) ১০৬ (আবু বকর সিদ্দিক মামলা) শুরুতেই আদালতের সামনে তুলে ধরুন।

