কোম্পানির চেকে এনআই অ্যাক্টের ১৪১ ধারায় কোম্পানিকে পক্ষভুক্ত না করে কেবল পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা অচল: হাইকোর্টের রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ল্যান্ডমার্ক অনুশাসন: কোনো পাবলিক বা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির ব্যাংক হিসাব থেকে ইস্যুকৃত চেক ডিজঅনার হলে দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট (The Negotiable Instruments Act, 1881)-এর ১৪১ ধারার বিধান অনুযায়ী মূল প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানিটিই প্রাথমিক অপরাধী। উক্ত ধারার স্পষ্ট শর্ত হলো—কোম্পানিকে বাধ্যতামূলকভাবে মামলার মূল আসামি বা পক্ষভুক্ত (Implead as accused) করতে হবে। কোম্পানিকে অভিযুক্ত না করে শুধুমাত্র চেকে স্বাক্ষরকারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা কোনো পরিচালকের বিরুদ্ধে একক ও ব্যক্তিগতভাবে মামলা পরিচালনা করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং আইনের চোখে তা অচল (Not Maintainable)। পরিচালকের দায় হলো পরোক্ষ দায় (Vicarious liability); মূল অপরাধী কোম্পানিকে ছাড় দিয়ে কেবল প্রতিনিধির বিরুদ্ধে ফৌজদারি বিচার চলতে পারে না।
মামলার বিবরণে জানা যায়, প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড মেসার্স টেকনো বিল্ডার্স লিমিটেড নামক একটি নির্মাণকারী সংস্থাকে বাণিজ্যিক লিজ অর্থায়ন সুবিধা প্রদান করে। উক্ত ঋণের কিস্তি পরিশোধের লক্ষ্যে কোম্পানির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার একটি চেক কোম্পানির পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. মাসুদ রানা স্বাক্ষর করে প্রদান করেন।
পরবর্তীতে চেকটি ব্যাংকে পর্যাপ্ত তহবিল না থাকায় প্রত্যাখ্যাত হয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি আইনি নোটিশ জারি করে মেসার্স টেকনো বিল্ডার্স লিমিটেড কোম্পানিটিকে মামলার পক্ষ না করে শুধুমাত্র স্বাক্ষরকারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. মাসুদ রানাকে একক আসামি করে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, ঢাকায় এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় মামলা দায়ের করে। মহানগর দায়রা জজ আদালত আসামিকে ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং চেকের সমপরিমাণ অর্থদণ্ড প্রদান করেন। এর বিরুদ্ধে আসামি হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করেন।
👤 পরিচালকের আইনি যুক্তি
আসামিপক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবী জোরালো যুক্তি দেন যে, চেকটি ব্যক্তিগত কোনো দেনার জন্য দেওয়া হয়নি। এটি কোম্পানির কর্পোরেট অ্যাকাউন্টের চেক। এনআই অ্যাক্টের ১৪১ ধারা অনুযায়ী কোম্পানিকে আসামি না করে কেবল পরিচালকের সাজা প্রদান আইনের মৌলিক লঙ্ঘন।
👥 আর্থিক প্রতিষ্ঠানের যুক্তি
বাদীপক্ষ দাবি করে যে, যেহেতু আসামি নিজেই চেকে স্বাক্ষর করেছেন এবং তিনি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী, তাই তিনি সরাসরি অপরাধে জড়িত এবং তাকে আলাদাভাবে শাস্তি দিতে কোনো বাধা নেই।
হাইকোর্ট বিভাগ লক্ষ্য করেন যে, দায়রা আদালত কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ এবং এনআই অ্যাক্টের ১৪১ ধারার আইনগত পারস্পরিক সম্পর্ক অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। কোম্পানি আইনের দৃষ্টিতে একটি কৃত্রিম আইনি ব্যক্তি (Separate Legal Entity)। তার পক্ষে কর্মকর্তা চেক সই করলেও মূল দায় কোম্পানির। কোম্পানিকে বাদ দিয়ে ব্যক্তি কর্মকর্তাকে সাজা দেওয়া আইনানুগ হয়নি।
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ল্যান্ডমার্ক নজির Anees Ahmed Vs. State, 66 DLR (AD) 21 এবং 71 DLR (AD) 115 পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা করেন। আপিল বিভাগ স্পষ্টভাবে রায় দিয়েছেন: “Prosecution against the Directors or officers of a company under Section 141 of the NI Act without arraigning the Company itself as an accused is unsustainable in law.” মূল অপরাধী যেখানে অস্তিত্বে নেই, সেখানে প্রতিনিধির ওপর দায় চাপানো ফৌজদারি আইন নীতির চরম ব্যত্যয়।
চূড়ান্ত রায়: মহামান্য হাইকোর্ট ক্রিমিনাল রিভিশন মঞ্জুর করেন। মহানগর দায়রা জজ আদালত কর্তৃক প্রদত্ত সাজার আদেশটি আইনত বাতিল ও অচল ঘোষণা করে পিটিশনার ইঞ্জিনিয়ার মো. মাসুদ রানাকে বেকসুর খালাস প্রদান করা হয়। তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অর্থ ঋণ আদালতে নিয়মিত মামলার মাধ্যমে মূল কোম্পানি থেকে দেনা আদায়ের স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
- কোম্পানিকে আসামি করা বাধ্যতামূলক: কোম্পানির চেকে মামলা করতে হলে ১ নং আসামি হিসেবে কোম্পানিকে এবং ২ নং বা অন্যান্য আসামি হিসেবে সংশ্লিষ্ট পরিচালককে রাখতে হবে।
- পরোক্ষ দায়ের পূর্বশর্ত: প্রতিনিধি বা পরিচালকের অপরাধ সরাসরি নয়, বরং কোম্পানির অপরাধের আনুষঙ্গিক দায়।
- লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর নিয়ম: এনআই অ্যাক্টের ১৩৮(খ) ধারার নোটিশটিও কোম্পানির রেজিস্টার্ড ঠিকানা বরাবরে পাঠাতে হবে।
- নালিশি দরখাস্তের ড্রাফটিংয়ে সতর্কতা: কোম্পানির চেক হলে আরজির শিরোনামে “মেসার্স অমুক লিমিটেড, পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক” এভাবে কোম্পানিকে মূল আসামি করুন।
- নোটিশ প্রদানে নির্ভুলতা: নোটিশটি যেন শুধুমাত্র পরিচালকের ব্যক্তিগত ঠিকানায় না গিয়ে কোম্পানির নিবন্ধিত হেড অফিসেও জারি হয় তা নিশ্চিত করুন।
- পরিচালকদের আত্মপক্ষ সমর্থন: আপনি যদি কোনো কোম্পানির চেকে সই করার কারণে ব্যক্তিগতভাবে আসামি হন, তবে ১৪১ ধারার অজুহাত তুলে মামলা বাতিলের আবেদন করুন।
- ব্যাংকের লিগ্যাল টিমের জন্য নির্দেশনা: ড্রাফটিংয়ের ভুলে যেন কোটি টাকার মামলা টেকনিক্যাল কারণে খারিজ না হয় সেদিকে সতর্ক থাকুন।
- কোম্পানির রেজুলেশন যাচাই: চেকটি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনে দেওয়া হয়েছে কিনা তা লেনদেনের সময় যাচাই করে নিন।

