আরজিতে জমির সুনির্দিষ্ট চৌহদ্দি ও পরিমাপের ঘাটতি থাকলে উচ্ছেদের ডিক্রি কার্যকর অসম্ভব: হাইকোর্টের রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ (Code of Civil Procedure, 1908)-এর ৭ আদেশের ৩ নম্বর নিয়ম (Order VII Rule 3) এবং সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ও ৯ ধারা অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তির দখল পুনরুদ্ধার বা উচ্ছেদের (Recovery of Possession and Eviction) মোকদ্দমায় আরজির তফসিলে নালিশি জমির এমন সুস্পষ্ট বিবরণ ও চারদিকের সুনির্দিষ্ট সীমানা বা চৌহদ্দি (Specific boundaries and demarcation) প্রদান করা বাধ্যতামূলক যাতে আদালত ও জারিকারক কর্মকর্তা জমিন চিহ্নিত করতে কোনো প্রকার অনিশ্চয়তার মুখে না পড়েন। আরজিতে যদি কোনো বৃহৎ দাগের মধ্য হতে অস্পষ্টভাবে খণ্ডিত জমির দাবি করা হয় এবং তার চারদিকের সীমানা বা স্কেচ ম্যাপ (Hand sketch map) সংযুক্ত না থাকে, তবে উক্ত অস্পষ্ট তফসিলে প্রদত্ত কোনো ডিক্রি জারিযোগ্য নয় (Inexecutable decree) এবং এরূপ ত্রুটিপূর্ণ আরজির মোকদ্দমা সরাসরি খারিজযোগ্য।
মামলার বিবরণে জানা যায়, গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার বাসিন্দা মোসাঃ জাহানারা বেগম ও অন্যান্যরা সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে একটি স্বত্ব ঘোষণা ও উচ্ছেদের মামলা দায়ের করেন। আরজির তফসিলে উল্লেখ করা হয় যে, নালিশি এসএ ১৮২ দাগের মোট ৯০ শতক জমির মধ্য থেকে বাদীদের ক্রয়কৃত ১৫ শতক নাল জমি বিবাদী মোঃ সিরাজউদ্দিন জোরপূর্বক দখল করে রেখেছেন। কিন্তু আরজির তফসিলে ওই ১৫ শতক জমি বৃহৎ ৯০ শতক দাগের কোন কোণে বা কোন অংশে অবস্থিত—তার কোনো উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিমের প্রতিবেশীর নাম বা সুস্পষ্ট পরিমাপ উল্লেখ করা হয়নি; কেবল লেখা হয় ‘১৮২ দাগের আন্দরে ১৫ শতক’।
বিবাদী মোঃ সিরাজউদ্দিন লিখিত জবাবে তফসিলে অস্পষ্টতা এবং ৭ আদেশের ৩ নিয়মের লংঘনের বিষয়ে প্রাথমিক আপত্তি উত্থাপন করেন। তিনি দাবি করেন যে ১৮২ দাগের বিভিন্ন অংশে একাধিক শরিকের বাড়িঘর রয়েছে। কিন্তু সিনিয়র সহকারী জজ আদালত কোনো সার্ভেয়ার বা অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগ না করেই আরজির অস্পষ্ট বিবরণের ওপর ভিত্তি করে বাদীদের অনুকূলে খাস দখলের ডিক্রি প্রদান করেন। জেলা জজ আদালতে আপিল ব্যর্থ হওয়ার পর সংক্ষুব্ধ বিবাদী মোঃ সিরাজউদ্দিন হাইকোর্টে এই রিভিশন আবেদন দায়ের করেন।
👤 আবেদনকারী বিবাদীর আইনি যুক্তি
আবেদনকারীর বিজ্ঞ আইনজীবী যুক্তি দেন যে, ৭ আদেশের ৩ নিয়মের বিধান বাধ্যতামূলক। চৌহদ্দি ছাড়া জারি আদালত কার জমি ভেঙে কাকে বুঝিয়ে দেবে? অস্পষ্ট তফসিলে উচ্ছেদের ডিক্রি দিলে জারি পর্যায়ে বিশৃঙ্খলা ও নিরপরাধ প্রতিবেশীদের ভিটা ভাঙার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়।
👥 বিপরীতপক্ষ বাদীদের যুক্তি
বাদীদের আইনজীবী দাবি করেন যে, দলিলের মধ্যে ১৫ শতকের পরিমাণ স্পষ্ট আছে এবং জারি মামলার সময় আমিন পাঠিয়ে জমি মেপে নিলেই চৌহদ্দি স্পষ্ট হয়ে যাবে, ফলে আরজির ত্রুটি মারাত্মক নয়।
হাইকোর্ট বিভাগ নথিপত্র পরীক্ষা করে দেখতে পান যে, উভয় অধস্তন আদালত দেওয়ানি কার্যবিধির মৌলিক সুরক্ষামূলক বিধান সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন। আদালত কখনোই এমন কোনো ডিক্রি পাস করতে পারে না যা জারিকারক কর্মকর্তা কার্যকর করতে অক্ষম। বৃহত্তর দাগ থেকে কোনো নির্দিষ্ট অংশ উদ্ধারের ক্ষেত্রে ট্রায়াল চলাকালীন লোকাল ইনভেস্টিগেশন (Local Investigation under Order XXVI Rule 9) করে জমি চিহ্নিত না করা সরাসরি বিচারিক অবিবেচনা।
মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ল্যান্ডমার্ক নজির 43 DLR (AD) 126, 49 DLR (AD) 115 এবং 53 DLR 245 বিশ্লেষণ করেন। আপিল বিভাগ দ্ব্যর্থহীনভাবে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন: “The provisions of Order VII Rule 3 of the Code of Civil Procedure are mandatory. In a suit for declaration of title and recovery of possession of an unspecified portion of a larger plot, the plaint must contain such description and boundaries as are sufficient to identify the land. A decree passed on a vague and indefinite schedule is unexecutable in law, and the executing court cannot travel beyond the decree to carve out a new land.”
চূড়ান্ত রায়: সিভিল রিভিশন মোকদ্দমাটি মঞ্জুর করা হয়। অধস্তন আদালতসমূহের প্রদত্ত উচ্ছেদ ও খাস দখলের ডিক্রি সম্পূর্ণ রদ ও বাতিল ঘোষণা করা হয়। তবে বাদীদের স্বত্ব সম্পূর্ণ বিনষ্ট না করে মামলাটি ট্রায়াল কোর্টে রিমান্ডে পাঠানো হয়। বাদীদের ৬০ দিনের সময় দেওয়া হয় আরজি সংশোধন করে সুনির্দিষ্ট চৌহদ্দি ও হ্যান্ড স্কেচ ম্যাপ দাখিল করতে এবং ট্রায়াল জজকে নির্দেশ দেওয়া হয় অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগ করে জমি চিহ্নিতকরণের পর নতুন রায় প্রদান করতে।
- ৭ আদেশের ৩ নিয়মের কঠোরতা: উচ্ছেদ মামলায় সীমানা চিহ্নিতহীন আরজি দেওয়ানি আদালতের দৃষ্টিতে অসম্পূর্ণ ও মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ।
- জারি আদালতের সীমাবদ্ধতা: জারি আদালত কখনোই মূল ডিক্রির বাইরে গিয়ে নতুন সীমানা আবিষ্কার করতে পারে না।
- কমিশন তদন্তের আবশ্যকতা: বড় দাগের ভেতর থেকে জমি খাস দখল চাইলে ট্রায়াল চলাকালেই ম্যাপ তৈরি বাধ্যতামূলক।
- আরজিতে চৌহদ্দি নিখুঁত করা: মামলা ফাইলিংয়ের পূর্বেই সরজমিনে গিয়ে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিমের প্রকৃত দখলদারের নাম লিখুন।
- হ্যান্ড স্কেচ ম্যাপ সংযুক্তি: বড় দাগের জমি হলে আরজির সাথে লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত স্কেচ ম্যাপ দাখিল করুন।
- ২৬ আদেশের ৯ নিয়মে কমিশন চাওয়া: বিবাদী সীমানা নিয়ে আপত্তি তুললে বাদী হিসেবে নিজেই কমিশনার নিয়োগের দরখাস্ত দিন।
- বিবাদীর প্রথম ডিফেন্স: আরজিতে চৌহদ্দি না থাকলে লিখিত জবাবে ৭ আদেশের ৩ নিয়মের প্রাথমিক আপত্তি জোরালোভাবে তুলুন।
- আইনজীবীদের জন্য কৌশল: আপিল বিভাগের ৪৯ ডিএলআর (এডি) ১১৫ নজির আদালতে উপস্থাপন করে অস্পষ্ট আরজির বিরুদ্ধে সওয়াল করুন।

