ভারতের ইতিহাস বদলে দেওয়া ১০টি সুপ্রিম কোর্টের রায় | 10 Judgments That Changed India

ভূমিকা
আইন ও বিচার ব্যবস্থা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। প্রখ্যাত আইনজীবী জিয়া মোদির রচিত “10 Judgments That Changed India” বইটি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এমন দশটি যুগান্তকারী রায়ের প্রামাণ্য দলিল, যা ভারতের সাংবিধানিক ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। বইটি শুধু দশটি আইনি মামলার সারসংক্ষেপ নয়; বরং এটি স্বাধীন ভারতের গণতান্ত্রিক বিবর্তনের এক জীবন্ত ইতিহাস, যা আমাদের মতো উপমহাদেশীয় আইন কাঠামোতে প্র্যাকটিস করা যেকোনো আইনজীবী ও আইন শিক্ষার্থীর জন্য অবশ্য পাঠ্য একটি বিষয়। আজকের প্রথম পর্বে আমরা বইটির প্রথম দুটি ঐতিহাসিক মামলার প্রেক্ষাপট, আইনি বিতর্ক এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
অধ্যায় ১: কেশবানন্দ ভারতী বনাম স্টেট অফ কেরালা (১৯৭৩) – সংবিধানের ‘মৌলিক কাঠামো’ (Basic Structure Doctrine)
প্রেক্ষাপট
ভারতের স্বাধীনতার পরপরই বিভিন্ন রাজ্য সরকার সামাজিক বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে ভূমি সংস্কার আইন প্রণয়ন করতে শুরু করে। এর ফলে অনেক বড় জমিদার তাদের হাজার হাজার একর জমি হারান। কেরালার এডনির মঠের (Edneer math) প্রধান স্বামী কেশবানন্দ ভারতী কেরালার এই ভূমি সংস্কার আইনের কারণে আর্থিকভাবে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। তিনি এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। প্রখ্যাত আইনজীবী নানি পালখিওয়ালা (Nani Palkhivala) এই মামলায় পিটিশনারের পক্ষে লড়েন এবং ভারতের সংবিধানের ২৪তম, ২৫তম ও ২৯তম সংশোধনীর সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করেন।
আইনি বিতর্ক: শঙ্করী প্রসাদ থেকে গোলকনাথ
কেশবানন্দ মামলার রায় বোঝার জন্য এর আগের আইনি ইতিহাস জানা জরুরি। শঙ্করী প্রসাদ (১৯৫১) এবং সজ্জন সিং (১৯৬৪) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল যে, মৌলিক অধিকারসহ সংবিধানের যেকোনো অংশ সংশোধন করার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা সংসদের রয়েছে এবং এই সংশোধনীগুলো আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার (Judicial Review) আওতাভুক্ত নয়। কিন্তু ১৯৬৭ সালের বিখ্যাত গোলকনাথ (Golak Nath) মামলায় ৬:৫ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সুপ্রিম কোর্ট তার পূর্বের অবস্থান থেকে সরে আসে। আদালত রায় দেয় যে, সংবিধান সংশোধন অনুচ্ছেদ ১৩(২)-এর অধীনে একটি ‘আইন’ (Law) হিসেবে গণ্য হবে, এবং তাই সংসদ চাইলেই মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করে এমন কোনো সংশোধনী আনতে পারবে না। এই রায়ের ফলে ক্ষুব্ধ হয়ে তৎকালীন ভারত সরকার ২৪তম সংশোধনী পাস করে গোলকনাথ মামলার রায়কে অকার্যকর করে দেয় এবং সংবিধান সংশোধনে সংসদের অসীম ক্ষমতা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে।
ঐতিহাসিক রায় ও এর প্রভাব
সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ১৩ জন বিচারপতির বেঞ্চ গঠিত হয় এই মামলার জন্য, যা টানা পাঁচ মাস ধরে শুনানি করে। প্রায় ৮০০ পৃষ্ঠা এবং ৪,২০,০০০ শব্দের এই বিশাল রায়টি আন্তর্জাতিক সাংবিধানিক আইনের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। ৭:৬ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে আদালত এক যুগান্তকারী রায় প্রদান করে। আদালত স্বীকার করে যে, অনুচ্ছেদ ৩৬৮ অনুযায়ী সংসদের সংবিধান সংশোধন করার বিশাল ক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু এই ক্ষমতা অসীম বা বাঁধাহীন নয়। সংসদ সংবিধানের এমন কোনো পরিবর্তন বা সংশোধন করতে পারবে না, যা সংবিধানের “মৌলিক কাঠামো” বা Basic Structure-কে ধ্বংস বা বিকৃত করে দেয়।
তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সিক্রিসহ অন্যান্য বিচারপতিরা মৌলিক কাঠামোর বেশ কিছু উপাদান নির্দিষ্ট করেন, যার মধ্যে রয়েছে:
- সংবিধানের সর্বোচ্চ আধিপত্য (Supremacy of the Constitution)
- গণতান্ত্রিক ও প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা
- সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র
- আইন, শাসন ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার পৃথকীকরণ (Separation of Powers)
- বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
এই ‘বেসিক স্ট্রাকচার ডকট্রিন’ পরবর্তীতে স্বৈরাচারী শাসনের কবল থেকে ভারতের গণতন্ত্রকে রক্ষা করার সবচেয়ে বড় আইনি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে।
অধ্যায় ২: মানেকা গান্ধী বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া (১৯৭৮) – জীবনের অধিকারের (Right to Life) সম্প্রসারণ
প্রেক্ষাপট
১৯৭৫ সালের বিতর্কিত জরুরি অবস্থার (Emergency) অবসানের পর ১৯৭৭ সালে যখন জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসে, তখন রাজনৈতিক পটভূমি সম্পূর্ণ বদলে যায়। ইন্দিরা গান্ধীর পুত্রবধূ মানেকা গান্ধীর পাসপোর্ট, পাসপোর্ট অ্যাক্ট, ১৯৬৭-এর ১০(৩)(গ) ধারা অনুযায়ী ‘জনস্বার্থে’ বাজেয়াপ্ত করে নতুন সরকার। সরকার জনস্বার্থের কারণ দেখিয়ে এই পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ দর্শাতে বা মানেকা গান্ধীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ দিতেও অস্বীকৃতি জানায়। এর বিরুদ্ধে মানেকা গান্ধী সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন এবং দাবি করেন যে அரசின் এই স্বেচ্ছাচারী পদক্ষেপের মাধ্যমে তার সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার (অনুচ্ছেদ ১৪, ১৯ এবং ২১) চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে৷
আইনি বিশ্লেষণ: ‘Due Process’ বনাম ‘Procedure established by law’
ভারতীয় সংবিধান প্রণেতারা অনুচ্ছেদ ২১-এ ‘আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি’ (Procedure established by law) শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন এবং বিচারিক অস্পষ্টতা এড়াতে আমেরিকান ‘Due Process of Law’ (আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া) ধারণাটি স্বেচ্ছায় বর্জন করেছিলেন। ১৯৫০ সালের এ.কে. গোপালন (A.K. Gopalan) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট এর অত্যন্ত আক্ষরিক ও সংকীর্ণ একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিল। গোপালন মামলায় বলা হয়েছিল যে, মৌলিক অধিকারগুলো একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো এবং সংসদ যদি কোনো প্রক্রিয়া তৈরি করে আইন পাস করে, তবে তা যতই স্বেচ্ছাচারী হোক না কেন, আদালত তাতে হস্তক্ষেপ করবে না।
রায় ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব
মানেকা গান্ধী মামলায় ৭ জন বিচারপতির বেঞ্চ এ.কে. গোপালন মামলার সেই যান্ত্রিক চিন্তাধারা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসে। আদালত রায় দেয় যে, সংবিধানের মৌলিক অধিকারগুলো আলাদা কোনো জলাশয় নয়, বরং এদের স্রোত একে অপরের সাথে মিশে একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী ন্যায়বিচারের স্রোত তৈরি করে। অনুচ্ছেদ ২১-এর অধীনে কোনো ব্যক্তির জীবন বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার জন্য শুধু আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি পদ্ধতি থাকলেই চলবে না, সেই পদ্ধতিটিকে অবশ্যই ন্যায্য, ন্যায়সঙ্গত এবং যুক্তিসঙ্গত (fair, just and reasonable) হতে হবে। পদ্ধতিটি কোনোভাবেই কাল্পনিক, নিপীড়নমূলক বা স্বেচ্ছাচারী হতে পারবে না।
এই রায়ের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট কার্যত আমেরিকান ‘Due Process’ বা ‘আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া’ ধারণাটিকে ভারতীয় সংবিধানে অলিখিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। আদালত আরও নিশ্চিত করে যে, বিদেশে ভ্রমণের অধিকার অনুচ্ছেদ ২১-এর অধীনে ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতার’ (Personal Liberty) একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানেকা গান্ধী মামলার এই যুগান্তকারী ব্যাখ্যাটি পরবর্তীতে ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় এক নতুন মানবাধিকার যুগের সূচনা করে। এর ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট জীবনের অধিকারের (Right to Life) পরিধি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করে, যার মধ্যে কারাবন্দীদের অধিকার, সুস্থ ও দূষণমুক্ত পরিবেশের অধিকার, বিনামূল্যে শিক্ষার অধিকার, বাসস্থানের অধিকার এবং মর্যাদাপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার অন্যান্য অধিকার অন্তর্ভুক্ত হয়।
অধ্যায় ৩: মোহাম্মদ আহমেদ খান বনাম শাহ বানো বেগম (১৯৮৫) – ধর্মীয় মৌলবাদ বনাম নারী অধিকার
প্রেক্ষাপট
১৯৭৮ সালে মোহাম্মদ আহমেদ খান নামে পেশায় একজন আইনজীবী তার ৬২ বছর বয়সী স্ত্রী শাহ বানো বেগমকে ‘ট্রিপল তালাক’ উচ্চারণের মাধ্যমে ডিভোর্স দেন। ৪০ বছরের দাম্পত্য জীবনের এমন আকস্মিক অবসানের পর মুসলিম আইন অনুযায়ী স্বামী ইদ্দতকালীন সময়ে শাহ বানোকে ৩০০০ টাকা মোহরানা (Mahr) প্রদান করেন। কিন্তু গৃহহীন এবং আর্থিকভাবে অসহায় শাহ বানো ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ১২৫ ধারার অধীনে খোরপোষ বা মেইনটেইনেন্স (Maintenance) দাবি করে আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে এসে পৌঁছায়৷
আইনি বিতর্ক
মোহাম্মদ আহমেদ খানের যুক্তি ছিল যে, মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) অনুযায়ী তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর প্রতি স্বামীর আর্থিক দায়বদ্ধতা কেবল ইদ্দতকালীন সময় পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। তিনি দাবি করেন যে এই ব্যক্তিগত আইনটি সাধারণ আইনের (CrPC Section 125) উপর প্রাধান্য পাবে। এছাড়াও, CrPC এর ১২৭ ধারা অনুযায়ী তালাকের সময় মোহরানা পরিশোধ করা হলে ১২৫ ধারার খোরপোষের আদেশ বাতিল করার কথা বলা আছে বলে তিনি যুক্তি দেখান।
ঐতিহাসিক রায় ও এর প্রভাব
পাঁচ বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ এই মামলায় ঐতিহাসিক রায় প্রদান করে। আদালত জানায় যে, CrPC এর ১২৫ ধারাটি সম্পূর্ণরূপে ধর্মনিরপেক্ষ এবং এটি মুসলিমদের জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য। আদালত পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করে যে, মোহরানা (Mahr) কোনোভাবেই বিবাহ বিচ্ছেদের পেমেন্ট বা ডিভোর্সের ক্ষতিপূরণ নয়, বরং এটি বিবাহের সময় প্রদত্ত একটি সম্মানসূচক অর্থ। সুতরাং, মোহরানা প্রদান করলেই আজীবন খোরপোষ দেওয়ার দায়িত্ব থেকে স্বামী অব্যাহতি পেতে পারেন না। আদালত শাহ বানোর পক্ষে রায় দিয়ে তাকে মাসে ১৭৯.২০ টাকা খোরপোষ এবং ১০,০০০ টাকা আইনি খরচ প্রদানের নির্দেশ দেয়।
এই রায়টি ভারতের নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় এক বিশাল জয় হলেও এটি চরম রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিতর্কের জন্ম দেয়। মুসলিম রক্ষণশীল সমাজ এই রায়কে তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখে দেশজুড়ে প্রবল আন্দোলন শুরু করে। শেষ পর্যন্ত রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন সরকার রাজনৈতিক চাপের মুখে নতি স্বীকার করে ১৯৮৬ সালে “মুসলিম উইমেন (প্রোটেকশন অফ রাইটস অন ডিভোর্স) অ্যাক্ট” পাস করে, যা সুপ্রিম কোর্টের এই ঐতিহাসিক রায়কে কার্যত অকার্যকর করে দেয়। তবুও, ভারতের অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (Uniform Civil Code) নিয়ে বিতর্কে শাহ বানো মামলা আজও এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত।
অধ্যায় ৪: ওলগা টেলিস বনাম বোম্বে মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (১৯৮৫) – বাসস্থানের অধিকার এবং আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার
প্রেক্ষাপট
প্রতি বছর কাজের খোঁজে হাজার হাজার গ্রাম্য মানুষ মুম্বাই (তৎকালীন বোম্বে) শহরে পাড়ি জমায় এবং বাধ্য হয়ে কাজের জায়গার কাছাকাছি বস্তি বা ফুটপাতে আশ্রয় নেয়। ১৯৮১ সালের জুলাই মাসে মহারাষ্ট্রের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এ. আর. আন্তুলে ঘোষণা করেন যে মুম্বাইয়ের ফুটপাত ও বস্তিতে বসবাসকারী যাদের কাছে কোনো বৈধ ফটো-পাস নেই, তাদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে শহর থেকে বের করে দেওয়া হবে। বোম্বে মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (BMC) অ্যাক্টের ৩১২-১৪ ধারা অনুযায়ী পূর্ব নোটিশ ছাড়াই উচ্ছেদের নির্দেশ দেওয়া হলে, সাংবাদিক ওলগা টেলিস এবং বস্তিবাসীরা এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন৷
আইনি বিতর্ক
আবেদনকারীরা দাবি করেন না যে ফুটপাতে বসবাস করা তাদের অধিকার; বরং তারা যুক্তি দেখান যে ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘জীবনের অধিকার’-এর মধ্যে ‘জীবিকার অধিকার’ (Right to Livelihood) ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কাজের জায়গার কাছাকাছি বাসস্থান ছাড়া তাদের পক্ষে জীবিকা নির্বাহ করা অসম্ভব, তাই বিকল্প বাসস্থান না দিয়ে হঠাৎ করে উচ্ছেদ করা মানে তাদের জীবনের অধিকার কেড়ে নেওয়া।
রায় ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব
সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে ভারতের বিচারিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বীকার করে যে, ‘জীবনের অধিকার’-এর অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ‘জীবিকার অধিকার’। তবে, আদালত বিএমসি অ্যাক্টের ৩১৪ ধারাকে অযৌক্তিক বলে বাতিল করেনি এবং শেষ পর্যন্ত ফুটপাত দখলমুক্ত করার উচ্ছেদ অভিযানকে আইনি বৈধতা দেয়। কিন্তু আদালত নির্দেশ দেয় যে, বর্ষাকাল শেষ হওয়ার এক মাস পর পর্যন্ত বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ করা যাবে না এবং সরকার যেন উচ্ছেদকৃতদের পুনর্বাসন ও বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা করে। এই রায়ের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট দ্বিতীয় প্রজন্মের মানবাধিকারকে (যেমন- বাসস্থানের অধিকার) পরোক্ষভাবে মৌলিক অধিকারের মর্যাদায় উন্নীত করে।
অধ্যায় ৫: ইউনিয়ন কার্বাইড কর্পোরেশন বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া (১৯৮৯) – ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডি এবং ন্যায়বিচারের পরাজয়
প্রেক্ষাপট
১৯৮৪ সালের ২-৩ ডিসেম্বরের মধ্যরাতে ভারতের মধ্যপ্রদেশের ভোপালে অবস্থিত আমেরিকান বহুজাতিক কোম্পানি ইউনিয়ন কার্বাইড ইন্ডিয়া লিমিটেডের (UCIL) কীটনাশক কারখানা থেকে মারাত্মক বিষাক্ত মিথাইল আইসোসায়ানেট (MIC) গ্যাস লিক হয়। ৪০ টনের বেশি এই বিষাক্ত গ্যাসে পুরো শহর গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়। তাৎক্ষণিকভাবে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং পরবর্তীতে লাখ লাখ মানুষ শ্বাসকষ্ট, অন্ধত্ব ও জেনেটিক ত্রুটি নিয়ে চিরতরে পঙ্গু হয়ে যায়। এটি ছিল বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা।
আইনি লড়াই: ‘Parens Patriae’ নীতি এবং ক্ষতিপূরণ
ভারত সরকার ‘Bhopal Gas Leak Disaster Act, 1985’ পাস করে এবং ‘parens patriae’ (রাষ্ট্র যখন অভিভাবক হিসেবে কাজ করে) নীতির অধীনে ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে মামলা পরিচালনার একক অধিকার গ্রহণ করে। সরকার প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতে মামলা দায়ের করলেও বিচারক তা ‘forum non conveniens’ বা অনুপযুক্ত ফোরাম হিসেবে খারিজ করে দেন এবং জানান যে ভারতের আদালতেরই এটি বিচারের সক্ষমতা রয়েছে।
পরবর্তীতে মামলাটি ভারতের আদালতে চলতে থাকে এবং ১৯৮৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট একটি আপোষ মীমাংসা (Settlement) অনুমোদন করে। এই আদেশে ইউনিয়ন কার্বাইডকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে মাত্র ৪৭০ মিলিয়ন ডলার প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়, যা ছিল মূল দাবির চেয়ে বহুগুণ কম এবং বিপুল সংখ্যক ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। এর বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সমস্ত সিভিল ও ক্রিমিনাল মামলা বাতিল করে দেওয়া হয়।
রায় ও এর সমালোচনা
এই রায়টি ভারতের আইনি ইতিহাসের অন্যতম বড় একটি পরাজয় হিসেবে বিবেচিত হয়। সুপ্রিম কোর্ট বহুজাতিক কর্পোরেশনের দায়বদ্ধতা এবং পরিবেশগত সুরক্ষা নিয়ে কঠোর দৃষ্টান্ত স্থাপনের বিশাল একটি সুযোগ হাতছাড়া করে। লাখ লাখ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে এই সামান্য ক্ষতিপূরণ ছিল মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো। তবে, এই বিপর্যয়ের একটি ইতিবাচক দিক ছিল যে, এরপর থেকে ভারতে পরিবেশ ও মানবাধিকার রক্ষার জন্য Environment Protection Act (1986) সহ একাধিক কঠোর আইন প্রণীত হয়।
অধ্যায় ৬: ইন্দ্রা সাহনি বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া (১৯৯২) – মন্ডল কমিশন এবং সংরক্ষণের আইনি রূপরেখা
প্রেক্ষাপট
১৯৭৯ সালে গঠিত মন্ডল কমিশন তাদের রিপোর্টে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণীর (OBC) জন্য সরকারি চাকরি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২৭% সংরক্ষণের সুপারিশ করে। প্রায় এক দশক পর, ১৯৯০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ভি. পি. সিং সরকার এই সুপারিশ বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলে সারা দেশে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ, সহিংসতা এবং আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। সংরক্ষণের এই নীতির সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ইন্দ্রা সাহনি সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেন৷
ঐতিহাসিক রায় ও এর প্রভাব
নয় বিচারপতির বেঞ্চ ঐতিহাসিক রায়ে ২৭% ওবিসি (OBC) সংরক্ষণকে সাংবিধানিকভাবে বৈধ বলে ঘোষণা করে। তবে আদালত সমতা নিশ্চিত করতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত জুড়ে দেয়— “ক্রিমি লেয়ার” (Creamy Layer)। আদালত জানায় যে, অনগ্রসর শ্রেণীর মধ্যে যারা সামাজিকভাবে অগ্রসর, আর্থিকভাবে সচ্ছল এবং উচ্চ পদে আসীন, তারা এই সংরক্ষণের সুবিধা পাবে না। এছাড়াও আদালত নির্দেশ দেয় যে, তফসিলি জাতি (SC), তফসিলি উপজাতি (ST) এবং ওবিসি (OBC) মিলিয়ে মোট সংরক্ষণের পরিমাণ কোনোভাবেই ৫০% এর বেশি হতে পারবে না এবং পদোন্নতির (Promotion) ক্ষেত্রে কোনো সংরক্ষণ থাকবে না। এই রায়টি ভারতের সংরক্ষণ নীতির ক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আইনি মাপকাঠি হিসেবে কাজ করছে।
অধ্যায় ৭: নীলাবতী বেহেরা বনাম স্টেট অফ উড়িষ্যা (১৯৯৩) – পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু এবং ক্ষতিপূরণের অধিকার
প্রেক্ষাপট
১৯৮৭ সালে উড়িষ্যার পুলিশ চুরির সন্দেহে সুমন বেহেরা নামে ২২ বছর বয়সী এক যুবককে গ্রেপ্তার করে। পরের দিন সকালে স্থানীয় রেললাইনের ধারে সুমনের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ পাওয়া যায়। পুলিশের দাবি ছিল সুমন হেফাজত থেকে পালিয়ে যায় এবং ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে মারা যায়। কিন্তু সুমনের মা নীলাবতী বেহেরা সুপ্রিম কোর্টে একটি চিঠি লিখে অভিযোগ করেন যে তার ছেলেকে পুলিশি হেফাজতে পিটিয়ে মারা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট সেই চিঠিটিকে রিট পিটিশন হিসেবে গ্রহণ করে।
রায় ও ক্ষতিপূরণমূলক বিচারব্যবস্থা
তদন্ত শেষে সুপ্রিম কোর্ট নিশ্চিত হয় যে, এটি একটি কাস্টোডিয়াল ডেথ (Custodial Death) বা পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা। আদালত রায়ে স্পষ্টভাবে জানায় যে, একজন বন্দীরও জীবনের অধিকার (অনুচ্ছেদ ২১) রয়েছে এবং রাষ্ট্র তা হরণ করতে পারে না। রাষ্ট্র তার ‘সার্বভৌম ক্ষমতার’ (Sovereign Immunity) দোহাই দিয়ে মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের দায় থেকে বাঁচতে পারে না। আদালত নীলাবতী বেহেরাকে ১.৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয় এবং দোষী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে বলে। এই মামলার মাধ্যমেই ভারতে ‘Compensatory Jurisprudence’ বা মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের জন্য ক্ষতিপূরণমূলক বিচার ব্যবস্থার শক্ত ভিত তৈরি হয়।
অধ্যায় ৮: সুপ্রিম কোর্ট অ্যাডভোকেটস-অন-রেকর্ড অ্যাসোসিয়েশন বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া (১৯৯৩) – বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং কলেজিয়াম ব্যবস্থা
প্রেক্ষাপট
ভারতের সংবিধানের ১২৪ এবং ২১৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি ভারতের প্রধান বিচারপতির (CJI) সাথে ‘পরামর্শ’ (Consultation) করবেন। কিন্তু ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে কার্যনির্বাহী বিভাগ (Executive) রাজনৈতিক স্বার্থে বিচারপতি নিয়োগ ও বদলিতে চরম হস্তক্ষেপ শুরু করে, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
রায় ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব
এটি ‘সেকেন্ড জাজেস কেস’ (Second Judges Case) নামেও পরিচিত। ৯ বিচারপতির বেঞ্চ যুগান্তকারী রায় দিয়ে জানায় যে, বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির সাথে ‘পরামর্শ’ করার অর্থ হলো প্রধান বিচারপতির মতামতেরই ‘প্রাধান্য’ (Primacy) বা চূড়ান্ত সম্মতি (Concurrence) থাকতে হবে। এই রায়ের মাধ্যমে আদালত “কলেজিয়াম ব্যবস্থা” (Collegium System) উদ্ভাবন করে, যেখানে ভারতের প্রধান বিচারপতি এবং জ্যেষ্ঠ বিচারপতিদের একটি প্যানেল বিচারপতি নিয়োগের সুপারিশ করবে এবং সরকার তা মানতে বাধ্য থাকবে। এর ফলে বিচার বিভাগ সম্পূর্ণভাবে কার্যনির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত হয়।
অধ্যায় ৯: বিশাখা বনাম স্টেট অফ রাজস্থান (১৯৯৭) – কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি রোধ (Vishaka Guidelines)
প্রেক্ষাপট
রাজস্থানের সমাজকর্মী ভানওয়ারী দেবী একটি বাল্যবিবাহ রোধ করার চেষ্টা করায় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাকে গণধর্ষণ করে। নিম্ন আদালত প্রমাণের অভাবে অভিযুক্তদের বেকসুর খালাস দেয়। এরপর নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা ‘বিশাখা’ নামক একটি এনজিও কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের যৌন হয়রানি রোধে সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা (PIL) দায়ের করে।
বিশাখা গাইডলাইনস (Vishaka Guidelines)
সেই সময়ে ভারতে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি সংজ্ঞায়িত করার বা রোধ করার কোনো নির্দিষ্ট আইন ছিল না। সুপ্রিম কোর্ট মহিলাদের অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি (CEDAW)-এর ওপর ভিত্তি করে একগুচ্ছ গাইডলাইন জারি করে, যা ‘বিশাখা গাইডলাইনস’ নামে পরিচিতি পায়। এই নির্দেশিকায় যৌন হয়রানির সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয় এবং সরকারি-বেসরকারি সমস্ত সংস্থায় অভিযোগ গ্রহণের জন্য একটি ‘Complaints Committee’ গঠনের বাধ্যতামূলক নির্দেশ দেওয়া হয়। বিচার বিভাগীয় এই আইন প্রণয়ন পরবর্তীতে ২০১৩ সালে ভারতে ঐতিহাসিক “POSH Act” (Protection of Women from Sexual Harassment at Workplace Act) পাসের মূল ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
অধ্যায় ১০: অরুণা রামচন্দ্র শানবাগ বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া (২০১১) – প্যাসিভ ইউথানেশিয়া বা স্বেচ্ছামৃত্যু
প্রেক্ষাপট
১৯৭৩ সালে মুম্বাইয়ের কেইএম (KEM) হাসপাতালের নার্স অরুণা শানবাগ হাসপাতালেরই এক সুইপার দ্বারা পাশবিকভাবে ধর্ষণের শিকার হন। ধর্ষক তাকে কুকুরের চেইন দিয়ে বেঁধে রাখায় তার মস্তিষ্কে অক্সিজেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং তিনি সম্পূর্ণ ‘ভেজিটেটিভ স্টেট’ (Vegetative State) বা কোমায় চলে যান। টানা ৩৭ বছর তিনি এই করুণ অবস্থায় বিছানায় পড়ে ছিলেন। লেখিকা পিঙ্কি বিরানি সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন, অরুণাকে জোর করে বাঁচিয়ে না রেখে তার লাইফ সাপোর্ট বন্ধ করে তাকে শান্তিতে মৃত্যুর অধিকার দেওয়ার জন্য৷
রায় ও প্রভাব
সুপ্রিম কোর্ট ইচ্ছামৃত্যু বা ‘অ্যাক্টিভ ইউথানেশিয়া’কে বেআইনি বলে ঘোষণা করে। তবে আদালত প্রথমবারের মতো শর্তসাপেক্ষে ‘প্যাসিভ ইউথানেশিয়া’ (Passive Euthanasia) কে আইনি বৈধতা দেয়। প্যাসিভ ইউথানেশিয়া মানে হলো কোনো লাইফ-সাপোর্ট সিস্টেম বা চিকিৎসা প্রত্যাহার করে স্বাভাবিক মৃত্যুকে মেনে নেওয়া। তবে আদালত অরুণা শানবাগের ক্ষেত্রে এই আবেদন খারিজ করে দেয়, কারণ হাসপাতালের যে নার্সরা ৩৭ বছর ধরে তার সেবা করছিলেন, তারা তাকে মরতে দিতে রাজি ছিলেন না। এই রায়টি ভারতে ইচ্ছামৃত্যু নিয়ে আইনি ও নৈতিক বিতর্কের একটি যুগান্তকারী মাইলফলক।
উপসংহার
জিয়া মোদির “10 Judgments That Changed India” বইটি স্বাধীন ভারতের গণতান্ত্রিক বিবর্তনের এক অনন্য দলিল। সুপ্রিম কোর্ট কীভাবে সংসদীয় স্বৈরাচার ঠেকিয়েছে, প্রান্তিক মানুষের বাসস্থানের অধিকার নিশ্চিত করেছে, কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের সুরক্ষা দিয়েছে এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে আগলে রেখেছে, তা এই বইতে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। আইন শিক্ষার্থী, আইনজীবী এবং সচেতন নাগরিকদের জন্য এই রায়গুলো জানা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এগুলোই আজকের আধুনিক ও গণতান্ত্রিক ভারতের আইনি ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।


