স্বামীকে ফাঁসাতে মিথ্যা মামলা: কাঠগড়া থেকে কারাগারে স্ত্রী

বরগুনা: স্বামীর বিরুদ্ধে ৩০ লাখ টাকার চেক ডিজঅনার ও প্রতারণার মিথ্যা মামলা সাজিয়ে নিজেই ফেঁসে গেলেন এক নারী। মিথ্যা অভিযোগ দায়ের ও আদালতকে বিভ্রান্ত করার দায়ে শারমিন আক্তার রুমা নামের ওই বাদীকে এজলাস থেকেই সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গত বুধবার (৬ মে) বরগুনার যুগ্ম দায়রা জজ-১ আদালতের বিচারক কাজী আশরাফুজ্জামান এই নজিরবিহীন আদেশ দেন। একইসঙ্গে মামলার প্রধান অভিযুক্ত স্বামী জসীম উদ্দীন হাওলাদারসহ অন্যান্য আসামিদের মামলা থেকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।
বিয়ের পর স্বামী বিদেশে, স্ত্রীর প্রতারণার ফাঁদ
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, বেতাগী উপজেলার ছোপখালী ইউনিয়নের হোসনাবাদ এলাকার শারমিন আক্তার তাঁর প্রথম স্বামীকে তালাক দেওয়ার পর গত ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর জসীম উদ্দীন হাওলাদারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জসীম জানতেন না যে এটি শারমিনের চতুর্থ বিয়ে। বিয়ের কিছুদিন পর জসীম ব্যবসায়িক কাজে বিদেশে যাওয়ার সময় স্ত্রীর আর্থিক নিরাপত্তার কথা ভেবে তাঁর কাছে ৩০ লাখ টাকার একটি চেক ও একটি স্ট্যাম্পে লিখিত অঙ্গীকারনামা জমা রেখে যান।
কিন্তু জসীম বিদেশে থাকার সুযোগে শারমিন চতুরতার আশ্রয় নেন। তিনি গোপনে জসীমকে তালাক দিয়ে তাঁর পুরোনো স্বামীর কাছে ফিরে যান। এরপর জসীমের দেওয়া ওই সিকিউরিটি চেকটি ব্যবহার করে উল্টো স্বামীর বিরুদ্ধেই জালিয়াতির মিথ্যা মামলা ঠুকে দেন।
আদালতে চরম মিথ্যাচার ও জালিয়াতির প্রমাণ
মামলাটি আদালতে শুনানির পর্যায়ে এলে একে একে বেরিয়ে আসতে শুরু করে জালিয়াতির আসল রূপ। আদালত নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখতে পান, মামলার আরজিতে উল্লেখ করা চেক নম্বর এবং প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা চেকের নম্বরের মধ্যে কোনো মিল নেই। এছাড়া আদালতের পূর্বানুমতি ছাড়াই মামলার নথিতে কলম দিয়ে কাটাকাটি ও ঘষামাজা করার বিষয়টিও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাটি ঘটে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময়। শারমিন আক্তার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচারকের সামনে জসীম উদ্দীনের সঙ্গে তাঁর বিয়ের বিষয়টিই সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বসেন। নিজেকে বাঁচাতে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রে (NID) থাকা স্বামীর নাম এবং তালাকের দাফতরিক কাগজপত্রকেও তিনি নির্লজ্জভাবে ‘জাল’ বলে দাবি করেন। ফ্ল্যাট কেনার কথা বলে যে টাকা দাবির কথা তিনি জানিয়েছিলেন, তার সপক্ষেও কোনো বৈধ চুক্তিপত্র দেখাতে পারেননি।
নিজ আইনজীবীর সামনেই ধরা পড়ল মিথ্যা
আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন জানান, কাবিননামা অনুযায়ী শারমিন ও জসীম বৈধ স্বামী-স্ত্রী ছিলেন এবং পরে শারমিন নিজেই তালাক দেন। অথচ আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি বিয়ের কথাই অস্বীকার করেছেন, যা সরাসরি আদালতকে বিভ্রান্ত করার শামিল।
আরেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. তপু রায়হান বলেন, “শুনানিকালে যখন আমরা একের পর এক অকাট্য প্রমাণ আদালতের সামনে তুলে ধরি, তখন পরিস্থিতি বেগতিক দেখে শারমিনের নিজ আইনজীবীও বিচারকের সামনে স্বীকার করতে বাধ্য হন যে তাঁর মক্কেল মিথ্যা বলছেন। কাগজের তথ্যের সাথে তাঁর মুখের কথার বিন্দুমাত্র মিল ছিল না।”
আদালতের কঠোর রায় ও কারাবাস
দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই শেষে আদালত নিশ্চিত হন যে, মামলাটি সম্পূর্ণ বানোয়াট, অসত্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এবং মিথ্যা মামলা দায়েরের প্রবণতা কঠোর হস্তে দমন করতে বিচারক তাৎক্ষণিকভাবে বাদী শারমিন আক্তার রুমাকে আদালতের গারদে আটকে রাখার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে সরাসরি কারাগারে পাঠানো হয়। আদালতের এই রায় মিথ্যা মামলাবাজদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা বলে মনে করছেন আইনজীবী সমাজ।


