স্ত্রীর বকেয়া খোরপোষ (Past Maintenance) প্রদান স্বামীর নিঃশর্ত আইনি বাধ্যবাধকতা: পারিবারিক আদালতের ডিক্রি বহাল রেখে হাইকোর্টের রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ (Family Courts Act, 2023 দ্বারা প্রতিস্থাপিত) এবং মুসলিম শরীয়াহ আইন অনুযায়ী বিবাহ বলবৎ থাকাকালীন স্ত্রীকে ভরণপোষণ ও খোরপোষ প্রদান করা স্বামীর একটি পরম ও নিঃশর্ত আইনি কর্তব্য। স্বামী যদি কোনো বৈধ কারণ ছাড়া স্ত্রীকে বাসস্থান বা খরপোষ থেকে বঞ্চিত করে আলাদা রাখে, তবে স্ত্রী তার সম্পূর্ণ বকেয়া খোরপোষ (Past Maintenance) পাওয়ার পূর্ণ অধিকারী। পরবর্তী সময়ে স্বামী বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাক কার্যকর করলেও দাম্পত্য জীবন বহাল থাকাকালীন সৃষ্ট বকেয়া খোরপোষের দায় কিছুতেই বাতিল বা মওকুফ হয় না। তামাদির ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বকেয়া খোরপোষের দাবি প্রত্যাখ্যান করা পারিবারিক আইনের উদ্দেশ্যকে নস্যাৎ করে।
মামলার বিবরণে জানা যায়, শারমিন সুলতানার সাথে ২০১৩ সালে মোঃ এনামুল কবিরের ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক বিবাহ সম্পন্ন হয়। তাদের সংসারে একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে। বিয়ের ৩ বছর পর যৌতুকের দাবি ও পারিবারিক কলহের জের ধরে স্বামী এনামুল কবির ২০১৬ সালে স্ত্রীকে তার পিতার বাড়িতে রেখে আসেন এবং এরপর থেকে স্ত্রী ও কন্যার কোনোপ্রকার ভরণপোষণ ও চিকিৎসা খরচ প্রদান বন্ধ করে দেন। স্ত্রী বহুবার স্থানীয় সালিশ ও আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে মিমাংসার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।
অবশেষে ২০১৯ সালে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে বিগত ৩ বছরের বকেয়া খোরপোষ বাবদ প্রতি মাসে ১৫,০০০ টাকা হারে সর্বমোট ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং মোহরানার অবশিষ্টাংশ দাবি করে মামলা দায়ের করেন। মামলা চলাকালীন স্বামী তাকে তালাকের নোটিশ পাঠান এবং জবাব দাখিল করে দাবি করেন যে, হানাফি আইন অনুযায়ী পূর্বে ব্যয়িত হয়ে যাওয়া অতীত খোরপোষ (Past maintenance) ডিক্রিযোগ্য নয় এবং স্ত্রী স্বেচ্ছায় পিতার বাড়িতে থাকায় তিনি কোনো খোরপোষ পাবেন না। পারিবারিক আদালত ও আপিল আদালত উভয়ই স্বামীর আপত্তি খারিজ করে স্ত্রীর অনুকূলে বকেয়া ও ইদ্দতকালীন খোরপোষের ডিক্রি দেন। সংক্ষুব্ধ হয়ে স্বামী হাইকোর্টে এই রিভিশন আবেদন করেন।
👤 আবেদনকারী স্বামীর আইনি যুক্তি
স্বামীর বিজ্ঞ আইনজীবী যুক্তি উপস্থাপন করেন যে, প্রাচীন হানাফি ফিকহ অনুযায়ী অতীত ভরণপোষণের কোনো ডিক্রি দেওয়া যায় না যদি না পূর্বে কোনো আদালত বা সালিশি কাউন্সিলের আদেশ থাকে। এছাড়া তালাক কার্যকর হওয়ার পর স্ত্রী কেবল ৩ মাসের ইদ্দতকালীন খরপোষ পাওয়ার যোগ্য।
👥 বিপরীতপক্ষ স্ত্রীর যুক্তি
স্ত্রীর বিজ্ঞ কৌঁসুলি যুক্তি দেন যে, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বহু পূর্বেই অতীত খোরপোষের প্রাচীন বিধিনিষেধ রহিত করে প্রগতিশীল রায় দিয়েছেন। স্বামী অন্যায়ভাবে পরিত্যাগ করায় স্ত্রী পিতার ঋণে সংসার চালিয়েছে, যা পরিশোধ করা স্বামীর পবিত্র আইনি ঋণ।
পারিবারিক আদালত এবং জেলা জজ আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনায় দেখতে পান যে, স্বামী স্বয়ং স্বীকার করেছেন তিনি ২০১৬ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত কোনো টাকা পাঠাননি। স্বামী পক্ষ কোনো মানি অর্ডার রসিদ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা সাক্ষ্য দিতে পারেননি যা দ্বারা প্রমাণ হয় যে স্ত্রী অবাধ্য (Nashizah) হয়ে স্বেচ্ছায় গৃহত্যাগ করেছিলেন। ফলে বিচারিক আদালতের প্রদত্ত বকেয়া খোরপোষের ডিক্রি আইনত সম্পূর্ণ নির্ভুল ও প্রতিষ্ঠিত নীতির অনুকূল।
মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক ল্যান্ডমার্ক রায় Jamila Khatun vs. Rustom Ali, 48 DLR (AD) 110 এবং 53 DLR (AD) 5 বিস্তারিত উদ্ধৃত করেন। আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন: “A Muslim wife is entitled to maintain a suit for past maintenance. The husband is bound to maintain his wife during the subsistence of marriage and this obligation cannot be avoided on the plea that past maintenance is not permissible under Hanafi law.” হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করেন যে, বিবাহবিচ্ছেদ কখনোই অতীত দাম্পত্য ঋণের পরিসমাপ্তি ঘটায় না।
চূড়ান্ত রায়: মহামান্য হাইকোর্ট সিভিল রিভিশন মোকদ্দমাটি সরাসরি খারিজ (Dismissed) করেন। পারিবারিক আদালতের প্রদত্ত বকেয়া খোরপোষ ও ইদ্দতকালীন খোরপোষের ডিক্রি সম্পূর্ণ বহাল রাখা হয়। স্বামীকে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ডিক্রিকৃত সম্পূর্ণ অর্থ পারিবারিক আদালতে জমা দেওয়ার চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়; ব্যর্থতায় পারিবারিক আদালতকে স্বামীর সম্পত্তি ক্রোক ও দেওয়ানি কারাগারে সোপর্দ করার নির্দেশ প্রদান করা হয়।
- অতীত খোরপোষের স্বীকৃতি: বাংলাদেশে মুসলিম স্ত্রীরা বিবাহ বহাল থাকাকালীন স্বামীর অবহেলার কারণে সৃষ্ট যেকোনো সময়ের বকেয়া খোরপোষ দাবি করার বৈধ অধিকারী।
- তালাকের প্রভাবমুক্ত অতীত দায়: পরবর্তীতে তালাক দেওয়া হলেও পূর্বের অবহেলিত দিনগুলোর ভরণপোষণের দায় স্বামীর কাঁধ থেকে মুছে যায় না।
- সন্তানের ভরণপোষণ পিতা থেকে অবিচ্ছেদ্য: সন্তান কার হেফাজতে রয়েছে তা নির্বিশেষে কন্যার প্রাপ্তবয়স্ক ও বিবাহ হওয়া পর্যন্ত পিতা সমস্ত খরচ দিতে বাধ্য।
- পৃথক বসবাসের কারণ প্রমাণ: স্বামী তাড়িয়ে দিয়েছে বা যৌতুকের কারণে ছেড়ে গেছে—এরূপ প্রমাণ ও সাক্ষ্য সতর্কভাবে পারিবারিক আদালতে উপস্থাপন করুন।
- বকেয়ার পরিমাণ সুনির্দিষ্ট করা: আরজিতে কোন তারিখ থেকে কোন তারিখ পর্যন্ত প্রতি মাসের খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসার সঠিক হিসাব সুস্পষ্ট তফসিলে উল্লেখ করুন।
- স্বামীর আয়ের প্রমাণ সংগ্রহ: স্বামীর পেশা, বেতন সার্টিফিকেট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা জমির খতিয়ান আদালতে দাখিল করলে উচ্চহারে খোরপোষ ডিক্রি পাওয়া সহজ হয়।
- জারি মোকদ্দমায় গ্রেফতারি পরোয়ানা: ডিক্রির পর স্বামী টাকা না দিলে পারিবারিক আদালত আইনের অধীনে তৎক্ষণাৎ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন দিন।
- আইনজীবীদের জন্য কৌশল: স্বামীর পক্ষ থেকে প্রাচীন ফতোয়ার উদ্ধৃতি দিলে আপিল বিভাগের জামিলা খাতুন নজির (48 DLR AD 110) সরাসরি রেফার করুন।

