টাকা আদায়ের মামলায় বিবাদীর লিখিত সাক্ষ্য ও জেরা নিশ্চিতের নির্দেশ: হাইকোর্টের রায়

⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও যুগান্তকারী আইনি সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ টাকা আদায়ের মোকদ্দমায় (Money Suit) চূড়ান্ত শুনানির স্তরে সময় প্রার্থনা, দেওয়ানী কার্যবিধির ১৭ আদেশ ১(৪) ও ৩ বিধির যথাযথ প্রয়োগ এবং হলফনামাসহ লিখিত সাক্ষ্য (Evidence on Affidavit) উপস্থাপনের অধিকার প্রসঙ্গে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ এক রায় প্রদান করেছেন। হাইকোর্ট বিভাগ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, (১) দেওয়ানী কার্যবিধির ১৭ আদেশ ১(৪) বিধির বিধান অনুযায়ী চূড়ান্ত শুনানির স্তরে আদালত খরচ ছাড়া সময় মঞ্জুর করতে পারে না; খরচ অনাদায়ে বিবাদীর বিরুদ্ধে মামলা একতরফা নিষ্পত্তির নির্দেশ প্রযোজ্য হয়; (২) ১৭ আদেশ ৩ বিধির বিধান অনুযায়ী সময় পেয়ে কোনো পক্ষ সাক্ষ্য দিতে ব্যর্থ হলে আদালত কালবিলম্ব না করে তৎক্ষণাৎ মোকদ্দমার সিদ্ধান্ত গ্রহণের (Proceed to decide the suit forthwith) ক্ষমতা রাখে; (৩) বিচারিক আদালত বিবাদীর ১ নম্বর সাক্ষীর (DW1) অসম্পূর্ণ জবানবন্দি অসমাপ্ত রেখে এবং সাক্ষ্য প্রত্যাহারের দরখাস্ত ঝুলিয়ে রেখে ১৭ আদেশ ৩ বিধি অনুযায়ী মোকদ্দমা নিষ্পত্তি না করে কেবল যুক্তিতর্কের জন্য নির্ধারণ করা গুরুতর বিচারিক ভুল; এবং (৪) দেওয়ানী কার্যবিধির সংশোধিত বিধান অনুযায়ী সাক্ষীর প্রধান জবানবন্দি হলফনামাসহ লিখিত আকারে পেশ করার সুযোগ রয়েছে; অতএব সুবিচারের স্বার্থে শত শত কোটি টাকার জটিল ক্ষতিপূরণ মামলায় বিবাদীকে ৩০ দিনের মধ্যে হলফনামাসহ লিখিত সাক্ষ্য পেশ এবং অবিলম্বে বাদীর জেরার মুখোমুখি করার সুযোগ দিতে হবে।

১. মামলার প্রেক্ষাপট ও বিচারিক কার্যবিবরণী (Facts & Procedural History)

মামলাটি ঢাকার ২য় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ২০০৮ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার (জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়) এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) কর্তৃক দায়েরকৃত Money Suit No. 224 of 2008 থেকে উদ্ভূত।

মামলার মূল ঘটনা, পক্ষগণের অবস্থান ও দীর্ঘ বিচারিক পরিক্রমা নিম্নরূপ:

  • ৭৪৬ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা: টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার ও বাপেক্স বাদী হয়ে ১ নম্বর বিবাদী নাইকো রিসোর্সেস (বাংলাদেশ) লিমিটেডের বিরুদ্ধে সর্বমোট ৭৪৬ কোটি ৫০ লক্ষ ৮৩ হাজার ৯৭৩ টাকা (Taka 746,50,83,973/-) ক্ষতিপূরণ ও ড্যামেজ দাবি করে এই অর্থ মোকদ্দমা দায়ের করে।
  • সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিলম্বিত শুনানি: মামলাটি চূড়ান্ত শুনানির (Preemptory Hearing) জন্য নির্ধারিত হলে বাদীপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত হয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট বিবাদীপক্ষের ১ নম্বর সাক্ষী (DW1) জনাব মো: মাসুদুর রহমান জবানবন্দি প্রদান শুরু করেন। কিন্তু সেই জবানবন্দি অসমাপ্ত থেকে যায় এবং নানা কারণ দেখিয়ে বিবাদীপক্ষ মোট ১১ বার মুলতবি (Adjournment) গ্রহণ করে।
  • লিখিত জবাব সংশোধনের দরখাস্ত ও খারিজ: ২০১৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মামলাটি বিবাদীর ১ নম্বর সাক্ষীর জবানবন্দি সমাপ্তির জন্য ধার্য ছিল। ওই তারিখে বিবাদীপক্ষ লিখিত জবাব সংশোধনের লক্ষ্যে সময় চেয়ে একটি দরখাস্ত দাখিল করে। বিজ্ঞ ২য় যুগ্ম জেলা জজ উক্ত দরখাস্ত খারিজ করে সাক্ষীর জবানবন্দি সমাপ্ত ঘোষণা করেন এবং মামলাটি ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখে যুক্তিতর্ক শুনানির জন্য নির্ধারণ করেন (আদেশ নং ১৭৩)।
  • সাক্ষ্য প্রত্যাহারের আবেদন বনাম অবশিষ্টাংশ গ্রহণের প্রার্থনা: পরবর্তীতে ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখে বাদীপক্ষ দরখাস্ত দিয়ে দাবি করে যে, যেহেতু বিবাদীর ১ নম্বর সাক্ষীর জবানবন্দি অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে এবং বাদী তাকে জেরা করার সুযোগ পায়নি, সেহেতু তার ওই অসমাপ্ত জবানবন্দি রেকর্ড থেকে বাতিল (Expunge) করা হোক। অন্যদিকে বিবাদীপক্ষ দরখাস্ত দাখিল করে তাদের ১ নম্বর সাক্ষীর বাকি জবানবন্দি গ্রহণের জন্য যুক্তিতর্কের তালিকা থেকে মোকদ্দমাটি সাক্ষ্য স্তরে ফিরিয়ে নেওয়ার আবেদন জানায়।
  • বিচারিক আদালতের আদেশ নং ১৭৪: বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ বিবাদীপক্ষের আবেদন খারিজ করেন এবং মামলাটি বাদীপক্ষের সাক্ষ্য বাতিল সংক্রান্ত আবেদন ও চূড়ান্ত যুক্তিতর্কের শুনানির জন্য বহাল রাখেন।
  • হাইকোর্টে রিভিশন মোশন: বিচারিক যুগ্ম জেলা জজ আদালতের উক্ত আদেশদ্বয় (আদেশ নং ১৭৩ তারিখ ১১.০৯.২০১৯ এবং আদেশ নং ১৭৪ তারিখ ১৮.০৯.২০১৯) দ্বারা সংক্ষুব্ধ হয়ে ১ নম্বর বিবাদী নাইকো রিসোর্সেস (বাংলাদেশ) লিমিটেড হাইকোর্ট বিভাগে দেওয়ানী কার্যবিধির ১১৫(১) ধারার অধীন এই দেওয়ানী রিভিশন মোকদ্দমা (Civil Revision No. 2874 of 2019) দায়ের করে এবং রুল নিশি লাভ করে।

২. বাদি ও বিবাদি পক্ষের আইনি অবস্থান ও দ্বন্দ্ব (Pleadings of the Parties)

🛡️ দরখাস্তকারী বিবাদীর যুক্তি (Petitioner)

  1. জটিল আইন ও তথ্যের মোকদ্দমা: মামলাটি অত্যন্ত জটিল ভূতাত্ত্বিক, প্রযুক্তিগত ও আইনি বিষয় সংক্রান্ত এবং শত শত কোটি টাকার ড্যামেজ জড়িত। বিবাদীর লিখিত জবাব সংশোধন আবশ্যক হওয়ায় যুক্তিসঙ্গত কারণে সময়ের আবেদন করা হয়েছিল।
  2. ১৭ আদেশ ৩ বিধির লঙ্ঘন: ট্রায়াল কোর্ট সাক্ষীর জবানবন্দি বন্ধ ঘোষণা করলেও ১৭ আদেশ ৩ বিধির বিধান মেনে সরাসরি মামলার নিষ্পত্তি করেনি; বরং অসম্পূর্ণ সাক্ষ্য রেকর্ডে ঝুলিয়ে রেখে যুক্তিতর্ক নির্ধারণ করেছে, যা আইনসম্মত নয়।
  3. লিখিত হলফনামার মাধ্যমে সাক্ষ্যের সুযোগ: দেওয়ানী কার্যবিধির সংশোধিত বিধিমতে সাক্ষীর জবানবন্দি হলফনামাসহ লিখিত আকারে দাখিলের সুযোগ রয়েছে। বিবাদীকে শেষ একটি সুযোগ দিলে তারা অবিলম্বে লিখিত জবানবন্দি দেবে এবং কোনো মুলতবি ছাড়াই জেরার মুখোমুখি হবে।

🏛️ প্রতিপক্ষ বাদিপক্ষের যুক্তি (Opposite Parties)

  1. পরিকল্পিত কালক্ষেপণ ও ১১ বার মুলতবি: মামলাটি ২০০৮ সালের। বিবাদীর ১ নম্বর সাক্ষীর জবানবন্দি ২০১৮ সালে শুরু হলেও বিবাদীপক্ষ দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ১১ বার মুলতবি নিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিচার বিলম্বিত করেছে।
  2. শেষ দিনে অপ্রাসঙ্গিক জবাব সংশোধন: যেদিন সাক্ষ্য সমাপ্তির জন্য চূড়ান্ত দিন ধার্য ছিল, সেদিন মূল সাক্ষীকে কাঠগড়ায় হাজির না করে হঠাৎ লিখিত জবাব সংশোধনের অজুহাতে সময় চাওয়া নিছক অপকৌশল।
  3. অসমাপ্ত সাক্ষ্য আইনত বাতিলযোগ্য: যে সাক্ষীকে জেরা করা যায়নি, তার অসম্পূর্ণ জবানবন্দির কোনো সাক্ষ্যগত মূল্য নেই। ট্রায়াল কোর্ট ন্যায়সঙ্গতভাবেই সময় আবেদন নাকচ করেছে এবং যুক্তিতর্ক নির্ধারণ করেছে, যাতে হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।

৩. আইনগত বিশ্লেষণ: দেওয়ানী কার্যবিধির ১৭ আদেশ ১(৪) ও ৩ বিধি

হাইকোর্ট বিভাগ রায়ে দেওয়ানী মোকদ্দমায় শুনানির মুলতবি এবং সাক্ষ্য উপস্থাপনে ব্যর্থতার পরিণতি সংক্রান্ত দেওয়ানী কার্যবিধির ১৭ আদেশের মূল বিধানগুলো গভীরভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন:

দেওয়ানী কার্যবিধির ১৭ আদেশ ১(৪) বিধি (Order XVII Rule 1(4) CPC):

“Notwithstanding anything contained in the Code, the Court shall not grant any adjournment at the preemptory hearing stage and thereafter in a suit at the instance of either party to the suit: Provided that if for ends of justice any adjournment is granted to a party under this sub-rule, the Court shall direct that party to pay a cost of not less than two hundred taka and not more than one thousand taka to the other party, within time to be specified by it, noncompliance with which, by the plaintiff shall render the suit liable to be dismissed and, by the defendant shall render the suit liable to be disposed to ex-parte.”

আইনি তাৎপর্য: চূড়ান্ত শুনানির স্তরে কোনো পক্ষকে মুলতবি দেওয়া আদালতের সাধারণ নিয়ম নয়। তবে আদালত যদি ন্যায়বিচারের স্বার্থে একান্তই সময় মঞ্জুর করে, তবে অপর পক্ষকে ন্যূনতম ২০০ টাকা থেকে অনূর্ধ্ব ১,০০০ টাকা খরচ প্রদানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিবাদী উক্ত খরচ প্রদানে ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে মোকদ্দমা একতরফা নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। ট্রায়াল কোর্ট বিবাদীকে ১১ বার সময় দেওয়ার ক্ষেত্রে এই বিধিবদ্ধ খরচের শর্ত আরোপ না করে আইনগত ভুল করেছে।

দেওয়ানী কার্যবিধির ১৭ আদেশ ৩ বিধি (Order XVII Rule 3 CPC):

“Where any party to a suit to whom time has been granted fails to produce his evidence, or to cause the attendance of his witnesses, or to perform any other act necessary to the further progress of the suit, for which time has been allowed, the Court may, notwithstanding such default, proceed to decide the suit forthwith.”

আইনি তাৎপর্য: কোনো পক্ষকে সময় দেওয়ার পরও যদি সে সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপনে ব্যর্থ হয়, তবে আদালত ওই ব্যর্থতা সত্ত্বেও অবিলম্বে মোকদ্দমার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথে অগ্রসর হতে পারে। অথচ বিচারিক আদালত বিবাদীর সাক্ষ্য সমাপ্ত ঘোষণা করে ১৭ আদেশ ৩ বিধির আওতায় সরাসরি একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে মোকদ্দমাটি যুক্তিতর্ক ও সাক্ষ্য বাতিলের দরখাস্তের শুনানিতে ঝুলিয়ে রেখেছে।

৪. হাইকোর্ট বিভাগের সূক্ষ্ম বিচারিক পর্যবেক্ষণ ও যুক্তি

মাননীয় বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান এবং বিচারপতি তামান্না রহমান খালিদীর সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালার আলোকে নিম্নোক্ত সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করেন:

ক. খরচার বিধান ব্যতীত মুলতবি প্রদান বিধিবহির্ভূত:

হাইকোর্ট লক্ষ্য করেন যে বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ চূড়ান্ত শুনানির স্তরে বিবাদীকে একাধিকবার সময় দিয়েছেন, কিন্তু ১৭ আদেশ ১(৪) বিধির বাধ্যতামূলক বিধান অনুযায়ী অপর পক্ষকে কোনো আইনি খরচ প্রদানের আদেশ দেননি। ফলে ওই মুলতবি আদেশগুলো স্বয়ং দেওয়ানী কার্যবিধির সুনির্দিষ্ট নীতিমালার পরিপন্থী ছিল।

খ. ১৭ আদেশ ৩ বিধির অসঙ্গতি ও বিচারিক অসাবধানতা:

বিবাদী যখন ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখে সাক্ষ্য না দিয়ে জবাব সংশোধনের দরখাস্ত দিল, তখন ট্রায়াল কোর্ট চাইলে ১৭ আদেশ ৩ বিধি অনুযায়ী মোকদ্দমা একতরফা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে পারত। কিন্তু আদালত সাক্ষ্যগ্রহণ বন্ধ করেও একতরফা নিষ্পত্তির আদেশ দিল না; আবার ১৮ সেপ্টেম্বর তারিখে বিবাদীর অবশিষ্টাংশ সাক্ষ্য রেকর্ডের আবেদন নাকচ করে যুক্তিতর্কের দিন ধার্য করল। এর ফলে ১ নম্বর সাক্ষীর অসম্পূর্ণ জবানবন্দি নথিতে জীবিত রইল এবং পুরো প্রক্রিয়া আইনি দোলাচলে আটকে গেল।

গ. কার্যবিধির আধুনিকায়ন: এফিডেভিটের মাধ্যমে লিখিত সাক্ষ্য (Affidavit in Chief):

হাইকোর্ট অত্যন্ত গঠনমূলকভাবে স্মরণ করিয়ে দেন যে, দেওয়ানী কার্যবিধি সংশোধন করা হয়েছে এবং এখন কোনো সাক্ষীকে দীর্ঘ সময় ধরে মৌখিক জবানবন্দি দিতে হয় না; বরং প্রধান জবানবন্দি লিখিত আকারে হলফনামা (Affidavit) সহকারে দাখিল করা যায় এবং অপর পক্ষ তাকে কাঠগড়ায় জেরা করার সুযোগ পায়। এতে আদালতের মূল্যবান সময় সাশ্রয় হয় এবং সাক্ষ্যগ্রহণ দ্রুততম সময়ে শেষ হয়।

ঘ. মূল গুণাগুণের ভিত্তিতে বিচার নিষ্পত্তি (Disposal on Merits):

মামলাটি দেশের রাষ্ট্রীয় সম্পদ, জ্বালানি খাত এবং প্রায় সাড়ে সাতশত কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ জড়িত এক জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন মামলা। এই ধরনের মোকদ্দমা নিছক প্রক্রিয়াগত ত্রুটি বা আইনজীবীর সময়ের আবেদনের দ্বন্দ্বে একতরফা বা সাক্ষ্যহীনভাবে বিচার না হয়ে উভয় পক্ষের পূর্ণ সাক্ষ্য-জেরার ভিত্তিতে গুণাগুণের ওপর (On Merit) নিষ্পত্তি হওয়াই ন্যায়বিচারের চূড়ান্ত দাবি।

৫. হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও বাধ্যতামূলক নির্দেশনা (Final Directions)
  • রুল পরম (Rule Made Absolute): দরখাস্তকারী বিবাদীর রিভিশন দরখাস্ত মঞ্জুর করা হলো এবং রুল পরম (Absolute) ঘোষণা করা হলো।
  • খারিজ আদেশসমূহ বাতিল: বিজ্ঞ ২য় যুগ্ম জেলা জজ, ঢাকা কর্তৃক Money Suit No. 224 of 2008-এ প্রদত্ত আদেশ নং ১৭৩ (তারিখ ১১.০৯.২০১৯) এবং আদেশ নং ১৭৪ (তারিখ ১৮.০৯.২০১৯) বাতিল ও প্রত্যাহার করা হলো।
  • ৩০ দিনের মধ্যে হলফনামাসহ লিখিত জবানবন্দি দাখিল: বিচারিক আদালতে আদেশ বা নথি পৌঁছানোর তারিখ থেকে ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে ১ নম্বর বিবাদীকে তাদের ১ নম্বর সাক্ষী (DW1) জনাব মো: মাসুদুর রহমানের পূর্ণাঙ্গ লিখিত জবানবন্দি হলফনামাসহ দাখিলের চূড়ান্ত সুযোগ প্রদান করা হলো।
  • বিনা মুলতবিতে জেরা সম্পন্ন করার নির্দেশ: লিখিত জবানবন্দি দাখিলের পর বাদীপক্ষকে উক্ত সাক্ষীকে অবিলম্বে জেরা করার সুযোগ দিতে হবে এবং কোনো পক্ষকেই অযৌক্তিক মুলতবি প্রদান করা যাবে না।
  • ৬ মাসের মধ্যে মূল মামলা নিষ্পত্তির কঠোর নির্দেশ: আদেশ পৌঁছানোর পরবর্তী ৬ (ছয়) মাসের মধ্যে উক্ত Money Suit No. 224 of 2008-এর পূর্ণাঙ্গ বিচার আইনানুযায়ী গুণাগুণের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করার জন্য বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজকে নির্দেশ দেওয়া হলো।

৬. আইনি নীতি ও রেশিও ডেসিডেন্ডাই (Ratio Decidendi)

এই রায়ের সুনির্দিষ্ট আইনি নীতিসমূহ:

  1. ১৭ আদেশ ১(৪) বিধির খরচার বাধ্যবাধকতা: প্রি-এম্পটরি হিয়ারিং স্তরে আদালত কোনো পক্ষকে সময় মঞ্জুর করলে আইনানুযায়ী ২০০ থেকে ১০০০ টাকা খরচ আরোপ করতেই হবে; অন্যথায় ওই মুলতবি আদেশ বিধিপরিপন্থী।
  2. ১৭ আদেশ ৩ বিধির যথাযথ প্রয়োগ: সাক্ষ্য প্রদানে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে আদালতকে ১৭ আদেশ ৩ বিধির আওতায় অবিলম্বে মামলা নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নিতে হবে; সাক্ষ্য অসম্পূর্ণ রেখে ও নিষ্পত্তির নির্দেশ না দিয়ে মোকদ্দমা যুক্তিতর্কে ফেলে রাখা বেআইনি।
  3. লিখিত হলফনামার সুবিধাজনক প্রয়োগ: সময়ক্ষেপণ রোধে সাক্ষীর মূল জবানবন্দি দেওয়ানী কার্যবিধির সংশোধিত নিয়মে হলফনামাসহ লিখিত আকারে গ্রহণ করাই ন্যায়বিচার ও দ্রুত নিষ্পত্তির সর্বোত্তম পন্থা।
  4. মেটেরিয়াল ক্লেইমে গুণের ভিত্তিতে বিচার: বিশাল আর্থিক দায় বা ক্ষতিপূরণ জড়িত মোকদ্দমায় যান্ত্রিক সময়সীমার কারণে সাক্ষ্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেয়ে নির্দিষ্ট স্বল্প সময়ে লিখিত জবানবন্দি ও জেরা সম্পন্ন করানোই আইনসিদ্ধ।

৭. প্র্যাকটিসিং দেওয়ানী আইনজীবীদের জন্য ৫টি প্র্যাকটিক্যাল টেকঅ্যাওয়ে
১. প্রি-এম্পটরি স্তরে খরচার আবেদন করুন:

প্রতিপক্ষ চূড়ান্ত শুনানির স্তরে বারবার সময় প্রার্থনা করলে ১৭ আদেশ ১(৪) বিধির বিধান তুলে ধরে আদালতের কাছে সর্বোচ্চ বিধিবদ্ধ খরচ (Cost) মঞ্জুরের প্রার্থনা জানান।

২. লিখিত জবানবন্দি (Evidence on Affidavit) প্রস্তুত রাখুন:

কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা জবানবন্দি না লিখিয়ে সাক্ষীর প্রধান জবানবন্দি নোটারি বা ওথ কমিশনারের মাধ্যমে হলফনামা আকারে টাইপ করে জমা দিন; এতে সময়ক্ষেপণের অভিযোগ ওঠে না।

৩. সাক্ষীর অসমাপ্ত জবানবন্দি ঝুলিয়ে রাখবেন না:

কোনো সাক্ষীর জবানবন্দি অসমাপ্ত থাকলে অপর পক্ষ তাকে জেরা করতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে অবশিষ্ট জবানবন্দি শেষ করার অথবা লিখিত হলফনামা দাখিলের বিকল্প দরখাস্ত দিন।

৪. ১৭ আদেশ ৩ বিধির অপপ্রয়োগ ঠেকাতে সজাগ থাকুন:

আদালত যদি সাক্ষ্য বন্ধ করেও ৩ বিধিমতে একতরফা সিদ্ধান্ত না দিয়ে মামলা অন্য প্রক্রিয়ায় ফেলে রাখে, তবে তা উচ্চ আদালতে রিভিশনযোগ্য আইনগত ভুল হিসেবে চিহ্নিত করুন।

৫. রিভিশনে আন্ডারটেকিং বা নিশ্চয়তা দিন:

হাইকোর্টে সাক্ষ্যের সুযোগ পুনর্বহালের আবেদন করার সময় সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার দিন যে নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে হলফনামা জমা দেওয়া হবে এবং আর কোনো মুলতবি চাওয়া হবে না।

৮. মামলার রেফারেন্স ও বিচারিক তথ্যের পূর্ণাঙ্গ সারসংক্ষেপ
মামলার শিরোনাম ও নম্বর দেওয়ানী রিভিশন নং ২৮৭৪ / ২০১৯ (Civil Revision No. 2874 of 2019)
উচ্চ আদালত ও বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (দেওয়ানী রিভিশন এখতিয়ার: মাননীয় বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান ও মাননীয় বিচারপতি তামান্না রহমান খালিদী)
পক্ষসমূহ নাইকো রিসোর্সেস (বাংলাদেশ) লিমিটেড (১ নম্বর বিবাদী-দরখাস্তকারী) বনাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, পক্ষে সচিব, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য (বাদী-প্রতিপক্ষগণ)
বিজ্ঞ আইনজীবীবৃন্দ দরখাস্তকারী পক্ষে: জনাব মোস্তাফিজুর রহমান খান, সিনিয়র অ্যাডভোকেট এবং সুমাইয়া ইফরিত বিনে আহমেদ, শাফায়েত আহমেদ, প্রান্ত বড়ুয়া, মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন, সুমন সেনগুপ্ত, মো: আবুল কাশেম ও ফারজানা রশিদ, অ্যাডভোকেটগণ | ২ নম্বর প্রতিপক্ষ পক্ষে: জনাব মো: জাহাঙ্গীর হোসেন ও সঞ্চিতা সিদ্দিকী, অ্যাডভোকেটগণ
অধস্তন আদালতের মামলা ও আদেশ ২য় যুগ্ম জেলা জজ আদালত, ঢাকা (মানি স্যুট নং ২২৪/২০০৮, আদেশ নং ১৭৩ তারিখ ১১.০৯.২০১৯ ও আদেশ নং ১৭৪ তারিখ ১৮.০৯.২০১৯)
শুনানি ও রায় ঘোষণার তারিখ শুনানি অনুষ্ঠিত: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | রায় ঘোষণা: ৩০ আগস্ট ২০২৬
আইনি বিষয়বস্তু ও মূল ধারা দেওয়ানী কার্যবিধি ১৯০৮-এর ১১৫(১) ধারা, ১৭ আদেশ ১(৪) ও ৩ বিধি; সাক্ষ্য আইন ১৮৭২; মানি স্যুট ও ড্যামেজ ক্লেইম; এফিডেভিট ইন চিফ (Evidence on Affidavit)
অফিসিয়াল রায় ও পিডিএফ লিংক
📥 সুপ্রিম কোর্ট অফিসিয়াল PDF ডাউনলোড


🌐 সুপ্রিম কোর্ট পোর্টাল

Related Articles

Back to top button