স্বামীর নির্যাতন ও অবহেলার কারণে স্ত্রী কর্তৃক তালাকে তাফবিজ প্রয়োগেও সম্পূর্ণ দেনমোহর প্রদেয়: হাইকোর্টের রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন এবং নিকাহনামার ১৮ নম্বর কলামে স্বামীকে প্রদত্ত শর্তাধীন বা নিঃশর্ত তালাকের ক্ষমতা স্ত্রী কর্তৃক প্রয়োগের ক্ষেত্রে (Talaq-e-Tafweez / Delegated Divorce) স্ত্রী স্বামীর ওপর অর্পিত ক্ষমতাবলেই বিবাহবিচ্ছেদ ঘটায়। স্বামী যদি বৈবাহিক জীবনে শারীরিক ও মানসিক নিষ্ঠুরতা, অবহেলা বা ভরণপোষণ বন্ধ করে স্ত্রীকে এমন অসহনীয় অবস্থায় ঠেলে দেয় যার ফলে স্ত্রী আত্মরক্ষার্থে ১৮ নম্বর কলামের ক্ষমতাবলে তালাক দিতে বাধ্য হয়, তবে স্বামী কোনোক্রমেই এই দাবি করতে পারে না যে স্ত্রী নিজে তালাক দেওয়ায় দেনমোহর মওকুফ হয়ে গেছে। তালাকে তাফবিজ প্রয়োগ কোনো ‘খোলা’ নয়; এর ফলে স্ত্রী তার সম্পূর্ণ বকেয়া ও বিলম্বিত দেনমোহর (Prompt and Deferred Dower) শতভাগ আদায় করার আইনত অধিকারী।
মামলার বিবরণে জানা যায়, মোসাঃ রাজিয়া সুলতানার সাথে মোঃ গোলাম সারওয়ারের ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। কাবিননামায় ৮ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করা হয় এবং নিকাহনামার ১৮ নম্বর কলামে স্ত্রীকে নিঃশর্ত তালাক প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া হয়। বিয়ের পর স্বামী যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতন করতে থাকে এবং একপর্যায়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। স্থানীয়ভাবে সালিশি করে ব্যর্থ হয়ে রাজিয়া সুলতানা কাজীর মাধ্যমে ১৮ নম্বর কলামের ক্ষমতাবলে তালাকে তাফবিজ কার্যকর করেন।
তালাক কার্যকর হওয়ার পর স্ত্রী পারিবারিক আদালতে ৮ লাখ টাকা দেনমোহর ও ইদ্দতকালীন খোরপোষের মামলা দায়ের করেন। স্বামী গোলাম সারওয়ার আদালতে জবাব দাখিল করে দাবি করেন যে স্ত্রী নিজে তালাক দিয়েছে, সুতরাং স্ত্রী কোনো দেনমোহর পাওয়ার অধিকারী নয়। কিন্তু পারিবারিক আদালত এবং অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত উভয়ই স্বামীর আপত্তি খারিজ করে স্ত্রীর অনুকূলে ৮ লাখ টাকার দেনমোহরের ডিক্রি দেন। সংক্ষুব্ধ স্বামী হাইকোর্টে এই রিভিশন মামলা দায়ের করেন।
👤 আবেদনকারী স্বামীর আইনি যুক্তি
স্বামীর আইনজীবী যুক্তি দেন যে, স্বামী সংসার টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল কিন্তু স্ত্রী স্বেচ্ছায় বিবাহ ভেঙেছে। স্ত্রী নিজ ইচ্ছায় সম্পর্ক ছিন্ন করলে স্বামীকে দেনমোহরের দায় চাপানো অন্যায়।
👥 বিপরীতপক্ষ স্ত্রীর যুক্তি
স্ত্রীর বিজ্ঞ কৌঁসুলি দাবি করেন যে, তালাকে তাফবিজ মানে স্বামীর ক্ষমতারই প্রতিনিধিত্বমূলক প্রয়োগ। স্বামী বাধ্য করায় স্ত্রী এই ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে এবং দেনমোহর স্ত্রীর অর্জিত অলঙ্ঘনীয় অধিকার।
পারিবারিক আদালত এবং জেলা জজ আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনায় দেখতে পান যে স্বামী যৌতুকের জন্য নির্যাতন করেছিল যা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সালিশে প্রমাণিত। স্বামী স্ত্রীকে এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছিল যেখানে তালাক দেওয়া ছাড়া আত্মসম্মান রক্ষার উপায় ছিল না। ফলে দেনমোহর কর্তনের কোনো ভিত্তি নেই।
মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত 44 DLR (AD) 273 এবং 52 DLR (AD) 140 বিস্তারিত উদ্ধৃত করেন। আপিল বিভাগ দ্ব্যর্থহীনভাবে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন: “Talaq-e-Tafweez is a delegated power of divorce given by the husband to the wife in the Kabinnama. When the wife exercises this power, she acts on behalf of the husband, and in the eye of law, the divorce proceeds from the husband himself. Therefore, the wife does not forfeit her claim to prompt or deferred dower. The husband remains under an unconditional statutory obligation to pay the entire dower.”
চূড়ান্ত রায়: সিভিল রিভিশন মোকদ্দমাটি সরাসরি খারিজ (Dismissed) করা হয়। পারিবারিক আদালতের ৮ লাখ টাকার দেনমোহর ও ইদ্দতকালীন খোরপোষের ডিক্রি সম্পূর্ণ বহাল রাখা হয়। স্বামীকে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ অর্থ জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়; ব্যর্থতায় পারিবারিক আদালতকে স্বামীর সম্পত্তি ক্রোক ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ প্রদান করা হয়।
- তালাকে তাফবিজের প্রকৃতি: ১৮ নম্বর কলামের তালাক প্রয়োগ হলে আইনি দৃষ্টিতে তা স্বামীর দেওয়া তালাক হিসেবে গণ্য হয়।
- দেনমোহর অটুট থাকা: স্ত্রী তালাক দিলেও দেনমোহর মওকুফ হওয়ার কোনো আইনগত বিধান নেই।
- স্বামীর নির্যাতন শাস্তিযোগ্য: অবহেলা বা নির্যাতনের ফলে সৃষ্ট বিচ্ছেদে আর্থিক দায় সবসময় স্বামীর ওপরই বর্তায়।
- নিকাহনামার ১৮ নম্বর কলাম নিশ্চিত করা: বিয়ের সময় কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে শর্তহীন তালাকের ক্ষমতা লিখে রাখা অপরিহার্য।
- তালাক নোটিশে কারণ লিপিবদ্ধ করা: কাজীর মাধ্যমে নোটিশ পাঠানোর সময় স্বামীর নির্যাতন ও ভরণপোষণ না দেওয়ার বিবরণ উল্লেখ করুন।
- খোলা ও তাফবিজের পার্থক্য বোঝা: কখনো খোলা তালাকের ফরম পূরণ করবেন না; ১৮ কলামের একতরফা তাফবিজ নোটিশ পাঠান।
- দেনমোহরের মামলা দ্রুত করা: ৯০ দিনের ইদ্দত শেষ হওয়া মাত্র পারিবারিক আদালতে আরজি দাখিল করুন।
- আইনজীবীদের জন্য কৌশল: আপিল বিভাগের ৪৪ ডিএলআর (এডি) ২৭৩ নজির দিয়ে স্বামীর দেনমোহর মওকুফের যুক্তি নস্যাৎ করুন।

