চেকে কথায় ও অংকে টাকার পরিমাণে অমিল থাকলে এনআই অ্যাক্টের ১৮ ও ১৩৮ ধারার কার্যকারিতা: হাইকোর্টের রায়

⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১ (NI Act)-এর ধারা ১৮ অনুযায়ী যদি কোনো চেকে অংকে বা সংখ্যায় লিখিত অর্থের পরিমাণ (Amount stated in figures) এবং কথায় লিখিত অর্থের পরিমাণের (Amount stated in words) মধ্যে কোনো বিরোধ বা অমিল পরিলক্ষিত হয়, তবে আইন অনুযায়ী কথায় লিখিত অর্থের পরিমাণই চূড়ান্ত ও কার্যকর বলে গণ্য হবে। ব্যাংক যদি ‘Words and figures differ’ মন্তব্য দিয়ে চেকটি ফেরত দেয়, তবে চেক গ্রহীতা উক্ত অসংগতি সংশোধন বা ড্রয়ারের নিকট স্পষ্টীকরণ নোটিশ না পাঠিয়ে সরাসরি বড় অংক দাবি করে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় নালিশি মামলা দায়ের করতে পারে না। আইনি নিশ্চিততার অভাব থাকলে ১৩৮ ধারার ফৌজদারি কার্যধারা পরিচালিত করা আইনের অপপ্রয়োগ।

১. মামলার প্রেক্ষাপট ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ (Facts of the Case)

মামলার বিবরণে জানা যায়, যমুনা ব্যাংক পিএলসি-এর আগ্রাবাদ শাখা থেকে মেসার্স রূপা এন্টারপ্রাইজ একটি বাণিজ্যিক ঋণ গ্রহণ করে। ঋণের কিস্তি বাবদ প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী যমুনা ব্যাংকে একটি চেক প্রদান করেন। চেকের ঘরে সংখ্যায় লেখা ছিল ‘৫০,০০,০০০/-‘ (পঞ্চাশ লাখ টাকা), কিন্তু কথায় লেখা ছিল ‘Five Lac Taka Only’ (পাঁচ লাখ টাকা মাত্র)। ব্যাংক চেকটি নগদায়নের জন্য উপস্থাপন করলে ড্রয়ি ব্যাংক ‘Words and figures differ’ এবং ‘Insufficient funds’ উভয় রিমার্কস দিয়ে চেকটি ফেরত দেয়।

যমুনা ব্যাংক কথায় লেখা ৫ লাখ টাকা উপেক্ষা করে সংখ্যায় লেখা ৫০ লাখ টাকা দাবি করে লিগ্যাল নোটিশ পাঠায় এবং পরবর্তীতে চট্টগ্রামের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৩৮ ধারায় মামলা দায়ের করে। ট্রায়াল আদালত আসামিকে ১ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেন। দায়রা জজ আদালতে আপিল খারিজ হলে সংক্ষুব্ধ আসামি হাইকোর্টে এই ফৌজদারি রিভিশন আবেদন দায়ের করেন।

👤 আবেদনকারী আসামির আইনি যুক্তি

আসামির বিজ্ঞ আইনজীবী যুক্তি দেন যে, এনআই অ্যাক্টের ১৮ ধারা একটি সুস্পষ্ট সংবিধিবদ্ধ বিধান। ১৮ ধারা মতে কথায় লেখা ৫ লাখ টাকাই বৈধ চেকের অংক ছিল। কিন্তু ব্যাংক বেআইনিভাবে ৫০ লাখ টাকার নোটিশ পাঠিয়ে মামলা করেছে। ফলে পুরো আইনি নোটিশটি ত্রুটিপূর্ণ ও অকার্যকর।

👥 বাদী ব্যাংকের যুক্তি

ব্যাংকের বিজ্ঞ কৌঁসুলি দাবি করেন যে, ঋণ অ্যাকাউন্টে ৫০ লাখ টাকার বেশি বকেয়া ছিল। ফলে সংখ্যায় লেখা ৫০ লাখ টাকাই পক্ষগণের আসল উদ্দেশ্য ছিল এবং ব্যাংক তহবিলের অপ্রতুলতার কারণেই চেকটি ফেরত পেয়েছে।

৩. অধস্তন আদালতের সিদ্ধান্তের আইনি দুর্বলতা (Errors of Lower Courts)

হাইকোর্ট বিভাগ নথিপত্র ও চেকের মূল পাতা পরীক্ষা করে দেখতে পান যে, ট্রায়াল জজ এনআই অ্যাক্টের ১৮ ধারার অস্তিত্বই বিবেচনায় নেননি। ফৌজদারি আইনে শাস্তিমূলক ধারার কঠোর ব্যাখ্যা (Strict construction) করতে হয়। যেখানে আইনের ১৮ ধারা কথায় লিখিত অংককে প্রাধান্য দিয়েছে, সেখানে ব্যাংক নিজের মতো করে ১০ গুণ বেশি অংকের নোটিশ দিয়ে মামলা চালাতে পারে না।

৪. হাইকোর্টের আইনি ব্যাখ্যা ও রেশিও ডেসাইডেনডি (High Court’s Ratio)

মহামান্য হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত 56 DLR (AD) 120 এবং 62 DLR 450 পর্যালোচনা করেন। আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন: “Section 18 of the Negotiable Instruments Act embodies a salutary rule of commercial certainty that where the amount differs in words and figures, the amount stated in words shall be the amount undertaken or ordered to be paid. A statutory notice under Section 138 claiming the higher figure appearing only in figures, in disregard of Section 18, renders the notice illegal and defective, and no prosecution can be founded upon such a defective notice.”

৫. হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায় ও দিকনির্দেশনা (Final Verdict)

চূড়ান্ত রায়: ফৌজদারি রিভিশনটি মঞ্জুর করা হয়। অধস্তন আদালতসমূহের প্রদত্ত সাজা ও ৫০ লাখ টাকার অর্থদণ্ড সম্পূর্ণ রদ ও বাতিল ঘোষণা করা হয়। নোটিশ বেআইনি হওয়ায় মামলাটি খারিজ করা হয় এবং আবেদনকারীকে সকল দায় থেকে খালাস প্রদান করা হয়। তবে ব্যাংক অর্থ ঋণ আদালতে যথাযথভাবে ঋণ আদায়ের মামলা করার আইনি অধিকার বজায় রাখবে।

৬. রায়ের মূল আইনি শিক্ষা ও নজির (Core Principles)
  • ১৮ ধারার প্রাধান্য: চেকে কথায় ও অংকে গরমিল থাকলে কথায় লিখিত পরিমাণই আইনের দৃষ্টিতে চূড়ান্ত।
  • ত্রুটিপূর্ণ লিগ্যাল নোটিশের প্রভাব: চেকে উল্লেখিত বৈধ পরিমাণের চেয়ে বাড়িয়ে দাবি করে নোটিশ পাঠালে পুরো মামলা বাতিল হয়।
  • ব্যাংকের দায়িত্ব: গরমিল থাকলে ব্যাংক গ্রাহককে জানিয়ে চেক পরিবর্তন করতে বাধ্য, একতরফা মামলা নয়।

৭. ব্যাংক ও চেকের পক্ষগণের জন্য ৫টি জরুরি পরামর্শ
  1. চেক লেখার সময় সতর্ক দৃষ্টি: অংকে ও কথায় টাকার পরিমাণ হুবহু একই আছে কি না কাটার আগে তিনবার মিলিয়ে নিন।
  2. ভুল চেক গ্রহণ না করা: কোনো গ্রাহক চেকে গরমিল করে দিলে তা গ্রহণ না করে সাথে সাথে নতুন চেক লিখে নিন।
  3. নোটিশে সঠিক অংকের দাবি: লিগ্যাল নোটিশ ড্রাফট করার সময় চেকে কথায় যা লেখা আছে কেবল সেই পরিমাণই দাবি করুন।
  4. ১৮ ধারার ডিফেন্স গ্রহণ: আসামিপক্ষ মামলার শুরুতেই ডিসচার্জ পিটিশনে ১৮ ধারার বৈপরীত্য তুলে ধরুন।
  5. আইনজীবীদের জন্য কৌশল: আপিল বিভাগের ৫৬ ডিএলআর (এডি) ১২০ রায় রেফার করে নোটিশের অবৈধতা আদালতে প্রমাণ করুন।

📑 মামলার পরিচিতি ও অফিসিয়াল record রেফারেন্স
মামলার নম্বর Criminal Revision No. 3312 of 2024
আদালত ও বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (একক বেঞ্চ)
পক্ষদ্বয় মেসার্স রূপা এন্টারপ্রাইজ ও অন্য জন বনাম রাষ্ট্র ও যমুনা ব্যাংক পিএলসি
আইন ও ধারা Negotiable Instruments Act, 1881 (Sections 18, 138); CrPC (Section 439)
অফিসিয়াল রায় (PDF) 📥 সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইট থেকে মূল রায় (PDF) ডাউনলোড করুন

Related Articles

✍️ আইনি মতামত বা প্রশ্ন প্রকাশ করুন

Back to top button