চুক্তিভঙ্গের ক্ষতিপূরণ মামলায় অনুমানভিত্তিক মুনাফার ওপর ডিক্রি প্রদান বেআইনি: সুপ্রিম কোর্টের অনুশাসন
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত: চুক্তি আইন, ১৮৭২ (Contract Act, 1872)-এর ৭৩ ও ৭৪ ধারার বিধান মোতাবেক চুক্তিভঙ্গের কারণে কোনো পক্ষ তখনই ক্ষতিপূরণ (Damages / Compensation) পাওয়ার অধিকারী হন যখন তিনি সন্তোষজনক হিসাব ও অকাট্য দালিলিক প্রমাণের মাধ্যমে তার ‘প্রকৃত প্রত্যক্ষ আর্থিক ক্ষতি’ (Actual direct loss) আদালতে প্রমাণ করতে সক্ষম হন। কোনো অনুমান, সম্ভাবনা কিংবা ভবিষ্যৎ কাল্পনিক বা প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক মুনাফা (Remote or Anticipated profits)-এর ওপর ভিত্তি করে কোনো দেওয়ানি আদালত ক্ষতিপূরণের ডিক্রি জারি করতে পারেন না। প্রমাণহীন ক্ষতিপূরণের দাবি একটি স্পেকুলেটিভ মামলা এবং তা আইনত খারিজযোগ্য।
মামলার বিবরণে জানা যায়, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) সার কারখানার জন্য ব্যাগ সরবরাহের নিমিত্তে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় দরপত্র আহ্বান করে। রেসপনডেন্ট মেসার্স বেঙ্গল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল উক্ত দরপত্রে অংশ নিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়। পরবর্তীতে কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার কারণে বিসিআইসি নির্দিষ্ট মেয়াদে চুক্তি চূড়ান্ত না করে দরপত্র বাতিল করে।
সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান দাবি করে যে তারা দরপত্র পাওয়ার প্রত্যাশায় বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল আমদানির প্রস্তুতি নিয়েছিল এবং চুক্তি সম্পন্ন হলে তারা অন্তত ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা নিট মুনাফা অর্জন করত। বিসিআইসি চুক্তি সম্পন্ন না করায় তারা যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার চুক্তিভঙ্গজনিত ক্ষতিপূরণের মানি স্যুট দায়ের করে। যুগ্ম জেলা জজ আদালত কোনো অডিট রিপোর্ট বা ব্যয়ের ভাউচার তলব না করে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্পূর্ণ ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণের ডিক্রি দেন। এর বিরুদ্ধে বিসিআইসি হাইকোর্টে প্রথম আপিল (First Appeal) দায়ের করে।
👤 বিসিআইসির আইনি অবস্থান
বিসিআইসির বিজ্ঞ কৌঁসুলি যুক্তি দেন যে, দরপত্র আহ্বান কেবল একটি প্রস্তাবের আমন্ত্রণ (Invitation to treat)। আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে কোনো পক্ষ নিশ্চিত মুনাফা দাবি করতে পারে না। ঠিকাদার তার কথিত ক্ষতির স্বপক্ষে কোনো ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা ব্যয়ের প্রমাণ দাখিল করেনি।
👥 ঠিকাদারের যুক্তি
ঠিকাদার দাবি করে যে, তাদের দরপত্র গৃহীত হয়েছিল এবং তারা সরবরাহের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল। চুক্তি ভঙ্গ করায় তারা ব্যবসা ও সম্ভাব্য লাভ হারিয়েছে যার ক্ষতিপূরণ বিসিআইসি দিতে বাধ্য।
হাইকোর্ট বিভাগ নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখতে পান যে, ট্রায়াল জজ চুক্তি আইনের ৭৩ ধারার সুস্পষ্ট বিধানের প্রতি চোখ বন্ধ রেখেছিলেন। ৭৩ ধারার ব্যাখ্যায় স্পষ্ট বলা আছে: “Compensation is not to be given for any remote and indirect loss or damage sustained by reason of the breach.” ঠিকাদার কোম্পানি আদৌ এক টাকাও খরচ করেছিল কিনা তার কোনো বিল বা অডিট ছাড়া অন্ধভাবে কোটি টাকার ডিক্রি দেওয়া বিচারিক বিচারবুদ্ধির মারাত্মক লঙ্ঘন।
হাইকোর্ট বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত নজিরসমূহ 45 DLR (AD) 89, 52 DLR (AD) 112 এবং হাউস অব লর্ডসের যুগান্তকারী নজির Hadley v. Baxendale পুঙ্খানুপুঙ্খ উদ্ধৃত করেন। সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো: ক্ষতিপূরণ দেওয়ার উদ্দেশ্য কাউকে বিনা কারণে ধনী করা নয়, বরং তাকে চুক্তিভঙ্গের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থান থেকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা (Doctrine of Restitution)。 প্রমাণবিহীন অনুমিত মুনাফা দেওয়ার কোনো ক্ষমতা দেওয়ানি আদালতের নেই।
চূড়ান্ত রায়: বিসিআইসির দায়েরকৃত প্রথম আপিল মঞ্জুর করা হয়। যুগ্ম জেলা জজ আদালত কর্তৃক প্রদত্ত ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণের ডিক্রি সম্পূর্ণরূপে বাতিল ও খারিজ ঘোষণা করা হয়। তবে ঠিকাদারের দরপত্র জামানতের অর্থ (Earnest Money) যদি আটকে থাকে, তবে তা কোনো কর্তন ছাড়াই ফেরত প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
- প্রকৃত ক্ষতি প্রমাণের আবশ্যকতা: চুক্তিভঙ্গের ক্ষতিপূরণ পেতে হলে বাদীকে প্রতিটি টাকার ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট ভাউচার ও সাক্ষ্য প্রমাণ দিতে হবে।
- দূরবর্তী ক্ষতির দাবি নিষিদ্ধ: অনুমানভিত্তিক কাল্পনিক মুনাফা বা রিমোট লস চুক্তি আইনের ৭৩ ধারায় ক্ষতিপূরণযোগ্য নয়।
- দরপত্র বনাম চূড়ান্ত চুক্তি: দরপত্র গ্রহণ চূড়ান্ত চুক্তি নয়; চুক্তি কার্যকর হওয়ার পূর্বের লোকসানের ঝুঁকি দরদাতার নিজস্ব।
- লিকুইডেটেড ড্যামেজ ক্লজ রাখা: বড় বাণিজ্যিক চুক্তিতে চুক্তিভঙ্গের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের নির্দিষ্ট সীমা আগেই নির্ধারণ (Liquidated Damages Clause) করে রাখুন।
- ব্যয়ের হিসাবের অডিট সম্পাদন: চুক্তিভঙ্গের ফলে লোকসান হলে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট দ্বারা নিরপেক্ষ অডিট করিয়ে ক্ষতির রিপোর্ট আদালতে দাখিল করুন।
- চুক্তি বাতিলের নোটিশের উত্তর: অপরপক্ষ চুক্তিভঙ্গ করলে সঙ্গে সঙ্গে লিখিত নোটিশ দিয়ে ক্ষতি কমানোর পদক্ষেপ (Duty to mitigate loss) গ্রহণ করুন।
- আদালতের কোর্ট ফি হিসেব: ক্ষতিপূরণের মামলায় অ্যাডভেলোরেম কোর্ট ফি প্রদান করতে হয়, তাই কাল্পনিক অংক দাবি করে নিজের কোর্ট ফি নষ্ট করবেন না।
- আইনজীবীদের জন্য প্র্যাকটিক্যাল টিপস: ৭৩ ধারার মামলার শুনানিতে ‘হবে কি হবে না’ মুনাফার চেয়ে ‘কী হারালো’ তার প্রামাণ্য নথিতে মনোযোগ দিন।

