অনিবন্ধিত বায়না চুক্তি ও দীর্ঘদিনের দখল: সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ৫৩এ ধারায় দখল রক্ষার আইনি অধিকার বিষয়ে হাইকোর্টের রায়

আইনি সারসংক্ষেপ: আংশিক চুক্তির পরিপালন (Part Performance) ও দখলের ঢাল

সম্পত্তি হস্তান্তর আইন (Transfer of Property Act), ১৮৮২-এর ৫৩এ ধারায় বিধৃত Doctrine of Part Performance অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি স্থাবর সম্পত্তি ক্রয়ের জন্য লিখিত চুক্তির ভিত্তিতে পণের সম্পূর্ণ বা আংশিক অর্থ পরিশোধ করে জমিতে দখল বজায় রাখেন এবং চুক্তির বাকি শর্ত পালনে সদা প্রস্তুত থাকেন, তবে মূল বিক্রেতা বা তার ওয়ারিশগণ পরবর্তীতে অন্য কারও কাছে দলিল রেজিস্ট্রি করে দিয়ে উক্ত দখলদার ক্রেতাকে উচ্ছেদ করতে পারবেন না। ধারা ৫৩এ ক্রেতার জন্য একটি ‘আইনি ঢাল’ (Shield) হিসেবে কাজ করে।

১. মামলার প্রাথমিক তথ্য ও আদালত

মহামান্য বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একক দেওয়ানি রিভিশন বেঞ্চে এই ৩২ পৃষ্ঠার দীর্ঘ মামলাটির নিষ্পত্তি হয়। রায় প্রদান করেন মাননীয় বিচারপতি আব্দুর রহমান (Mr. Justice Abdur Rahman)। দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫(১) ধারায় দায়েরকৃত এই রিভিশন পিটিশনে সহকারী জজ ও সাব-জজ আদালতের বিরোধপূর্ণ সিদ্ধান্তের পর স্বত্ব ও দখলের সূক্ষ্ম আইনি প্রশ্ন মীমাংসা করা হয়।

২. বিরোধের পটভূমি ও ঘটনাপ্রবাহ

মামলার বিষয়বস্তু ঢাকার অদূরে অবস্থিত মূল্যবান নাল জমি। বাদী মো. আব্দুল মজিদ পণ্ডিত মূল মালিকের সাথে জমি বিক্রির বায়না চুক্তি সম্পাদন করে পণের অধিকাংশ টাকা পরিশোধ করেন এবং জমির বাস্তব দখল গ্রহণ করে বসতবাড়ি ও ফলজ বাগান নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে মূল মালিক চুক্তি ভঙ্গ করে উক্ত জমি বাদীর অজ্ঞাতে তৃতীয় পক্ষ (প্রতিপক্ষ মো. আফাজউদ্দিন গং)-এর নিকট সাফ-কবলা দলিল সম্পাদন করে দেন। প্রতিপক্ষগণ বাদীর দখল অস্বীকার করে স্বত্ব ঘোষণা ও খাস দখলের মামলা দায়ের করেন।

৩. মামলার মূল আইনি প্রশ্ন ও বিচারিক বিশ্লেষণ

মহামান্য হাইকোর্ট গভীর আইনি পর্যালোচনায় উল্লেখ করেন যে, ২০০৪ সালের সংশোধনের পূর্ববর্তী বায়না চুক্তি অনিবন্ধিত হলেও তা সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য। যদি ক্রেতা চুক্তির শর্ত পালন করে দখলপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন, তবে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ৫৩এ ধারা অনুযায়ী বিক্রেতা বা তার উত্তরাধিকারী কিংবা পরবর্তীতে দখল সম্পর্কে অবহিত তৃতীয় কোনো ক্রেতা উক্ত জমি থেকে চুক্তিভুক্ত ক্রেতাকে উচ্ছেদ করতে পারেন না। পরবর্তী ক্রেতাকে প্রমাণ করতে হতো যে তিনি “Good Faith Purchaser for Value without Notice”, কিন্তু যেহেতু বাদী জমিতে সশরীরে দখলে ছিলেন, আইন অনুযায়ী পরবর্তী ক্রেতার ওপর অনুসন্ধান (Notice of Possession) করার বাধ্যবাধকতা ছিল।

৪. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও আদেশ

মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ প্রতিপক্ষের খাস দখলের দাবি নাকচ করে দেন এবং পিটিশনার আব্দুল মজিদ পণ্ডিতের ওয়ারিশগণের দখল বহাল রেখে রুল অ্যাবসলিউট ঘোষণা করেন। বিজ্ঞ হাইকোর্ট সুস্পষ্ট করেন যে আইনের আশ্রয় ছাড়া বৈধ দখলদারকে উচ্ছেদ করা বেআইনি।

৫. জমি ক্রেতা ও নাগরিকদের জন্য সতর্কবার্তা

  • রেজিস্ট্রি বায়না বাধ্যতামূলক: ২০০৪ সালের পর থেকে বাংলাদেশে স্থাবর সম্পত্তির বায়না চুক্তি অবশ্যই নিবন্ধিত (Registered) হতে হবে, অন্যথায় চুক্তি প্রবলের মামলা করা যায় না।
  • দখল পরীক্ষা: যেকোনো জমি কেনার পূর্বে জমিতে অন্য কারো বাস্তব দখল বা বাড়িঘর রয়েছে কিনা সরজমিনে তদন্ত করুন।
  • চুক্তি প্রবলের মামলা: বিক্রেতা দলিল করে দিতে টালবাহানা করলে চুক্তির মেয়াদ উত্তীর্ণের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ১২ ধারায় মামলা দায়ের করুন।

৬. অফিসিয়াল তথ্য ও রেফারেন্স

মামলা নম্বর Civil Revision No. 4257 of 2001
বিচারপতি Mr. Justice Abdur Rahman
আইন ও ধারা Transfer of Property Act Sec 53A; Specific Relief Act Sec 12; CPC Sec 115
অফিশিয়াল কপি সুপ্রিম কোর্ট ওয়েবসাইট থেকে মূল রায় (PDF) ডাউনলোড করুন

Related Articles

✍️ আইনি মতামত বা প্রশ্ন প্রকাশ করুন

Back to top button