প্রতারণা ও অপূরণীয় ক্ষতি প্রমাণিত হলে ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়নে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যায়: হাইকোর্টের নজির

⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও চুক্তি আইনে ব্যাংক গ্যারান্টি (Bank Guarantee / Performance Bond) হলো একটি স্বতন্ত্র ও নিঃশর্ত চুক্তি, যা মূল চুক্তি থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। সাধারণ নিয়মে ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়নে আদালত হস্তক্ষেপ করেন না। তবে এই সর্বজনীন নিয়মের দুটি সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যতিক্রম রয়েছে—প্রথমত: যদি ব্যাংক গ্যারান্টি আহ্বানের পেছনে স্পষ্ট ও প্রতীয়মান প্রতারণা (Established Fraud) থাকে যা ব্যাংকের গোচরীভূত, এবং দ্বিতীয়ত: যদি গ্যারান্টি নগদায়ন করার ফলে আবেদনকারীর অপূরণীয় অবিচার ও বিপর্যয় (Irretrievable Injustice / Irreparable harm) সৃষ্টি হয়। এই দুই ব্যতিক্রম উপস্থিত থাকলে দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৯ আদেশের ১-২ নিয়ম ও ১৫১ ধারার সহজাত ক্ষমতাবলে দেওয়ানি আদালত অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে বেআইনি নগদায়ন স্থগিত করতে সম্পূর্ণ ক্ষমতাবান।

১. মামলার প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক প্রকল্পের বিরোধ (Facts of the Case)

মামলার বিবরণে জানা যায়, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের একটি সাব-কন্ট্রাক্ট কাজের জন্য আন্তর্জাতিক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি সোনালী ব্যাংক পিএলসির মাধ্যমে একটি স্থানীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ২৫ কোটি টাকার পারফরম্যান্স ব্যাংক গ্যারান্টি ইস্যু করে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে মালামাল সরবরাহ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় এবং ভুয়া শিপিং ডকুমেন্টস প্রদর্শন করে।

ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান চুক্তি বাতিল করার সাথে সাথেই উক্ত স্থানীয় সরবরাহকারী অসৎ উদ্দেশ্যে সোনালী ব্যাংকে গ্যারান্টির সম্পূর্ণ ২৫ কোটি টাকা নগদায়নের জন্য দাবি জানায়। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান জালিয়াতির প্রমাণসহ ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ ১ম আদালতে মানি মোকদ্দমা দায়ের করে ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়ন স্থগিতের জন্য অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন করে। কিন্তু যুগ্ম জেলা জজ আদালত “ব্যাংক গ্যারান্টি নিঃশর্ত” এই প্রচলিত ধারণার ওপর ভিত্তি করে নিষেধাজ্ঞার দরখাস্ত খারিজ করে দেন। এই আদেশের বিরুদ্ধে ঠিকাদার হাইকোর্টে প্রথম বিবিধ আপিল (First Miscellaneous Appeal) দায়ের করে।

👤 আপিলকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানের যুক্তি

আপিলকারীর বিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ কৌঁসুলি তুলে ধরেন যে, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ভুয়া বিল অব লেডিং ও জাল কাস্টমস এন্ট্রি দাখিল করেছে। প্রতারণার ক্ষেত্রে ব্যাংক গ্যারান্টির সুরক্ষা বাতিল হয়ে যায় (Fraud unravels everything)। টাকা ছাড় হলে তা আর কখনো উদ্ধার করা যাবে না।

👥 রেসপনডেন্ট ব্যাংকের যুক্তি

সোনালী ব্যাংকের আইনজীবী দাবি করেন যে, ব্যাংক মূল চুক্তির বিরোধ দেখার অধিকারী নয়; তলব হওয়া মাত্রই টাকা পরিশোধ করতে ব্যাংক বাধ্য, অন্যথায় ব্যাংকিং সুনামে আঘাত আসবে।

৩. অধস্তন আদালতের বিচারিক অপর্যাপ্ততা (Errors of Lower Court)

হাইকোর্ট বিভাগ পর্যালোচনা করে দেখতে পান যে, যুগ্ম জেলা জজ আদালত জাল দালিলিক প্রমাণগুলো খতিয়ে দেখেননি। আদালত যান্ত্রিকভাবে ব্যাংক গ্যারান্টির সাধারণ সূত্র প্রয়োগ করেছেন কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক আইনের অতি গুরুত্বপূর্ণ ‘ফ্রড ও ইরেট্রিভেবল ইঞ্জাস্টিস’ ব্যতিক্রমটি এড়িয়ে গেছেন।

৪. হাইকোর্টের আইনি ব্যাখ্যা ও রেশিও ডেসাইডেনডি (High Court’s Ratio)

হাইকোর্ট বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত নজিরসমূহ 44 DLR (AD) 273, 56 DLR (AD) 211 এবং ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায় U.P. State Sugar Corporation v. Sumac International Ltd. উদ্ধৃত করেন। আদালত অভিমত দেন যে, ব্যাংক গ্যারান্টি কোনো জালিয়াতিকে সুরক্ষা দেওয়ার ঢাল নয়। যেখানে কোনো মালামাল সরবরাহ না করে জাল কাগজ তৈরি করা হয়েছে, সেখানে আদালত চোখ বন্ধ করে থাকতে পারেন না।

৫. হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায় ও দিকনির্দেশনা (Final Verdict)

চূড়ান্ত রায়: প্রথম বিবিধ আপিলটি মঞ্জুর করা হয়। যুগ্ম জেলা জজ আদালতের আদেশ রদ করে সোনালী ব্যাংককে উক্ত ২৫ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়ন বা ছাড় করার ওপর মূল মানি স্যুট নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা হয় এবং বিজ্ঞ বিচারিক আদালতকে ৬ মাসের মধ্যে মূল মামলা ট্রায়াল সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

৬. রায়ের মূল আইনি শিক্ষা ও নজির (Core Principles)
  • ব্যাংক গ্যারান্টির ব্যতিক্রমী সুরক্ষা: প্রতারণা (Fraud) এবং অপূরণীয় ক্ষতি (Irretrievable injustice) প্রমাণিত হলে ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়নে আদালত নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেন।
  • প্রতারণা সমস্ত বৈধতাকে ধূলিসাৎ করে: ল্যাটিন নীতি ‘Fraud unravels everything’ অনুযায়ী কোনো প্রতারক পক্ষ আদালতের সুবিধা পেতে পারে না।
  • আন্তর্জাতিক কন্ট্রাক্টের নিরাপত্তা: জাতীয় মেগা প্রকল্পে আন্তর্জাতিক ঠিকাদারদের অসৎ সাব-কন্ট্রাক্টরদের জালিয়াতি থেকে আদালতের এই রায় রক্ষাকবচ প্রদান করেছে।

৭. করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকারদের জন্য ৫টি জরুরি পরামর্শ
  1. গ্যারান্টি ড্রাফটে স্পষ্ট শর্ত যুক্ত করা: ব্যাংক গ্যারান্টির ফরম্যাটে সুনির্দিষ্ট মাইলস্টোন এবং অথরাইজড ইঞ্জিনিয়ারের সার্টিফিকেটের ক্লজ রাখুন।
  2. জালিয়াতি ধরা পড়ার সাথে সাথে নোটিশ: অপরপক্ষ ভুয়া ডকুমেন্টস দিলে কালক্ষেপণ না করে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাংককে লিখিতভাবে সতর্ক করুন।
  3. নিষেধাজ্ঞা মামলায় সুনির্দিষ্ট জালিয়াতির বিবরণ: দেওয়ানি কার্যবিধির ৬ আদেশের ৪ নিয়ম অনুযায়ী জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট বিবরণ আরজিতে তুলে ধরুন।
  4. ব্যাংকের আন্তর্জাতিক সুনামের ভারসাম্য: ব্যাংককে নিশ্চিত করতে হবে যে তারা যেন জেনেশুনে কোনো জালিয়াত চক্রের সহায়তাকারী না হয়।
  5. আইনজীবীদের জন্য কৌশল: ব্যাংক গ্যারান্টি মামলায় কেবল ‘কন্ট্রাক্ট ব্রিচ’ দাবি না করে ‘এস্টাবলিশড ফ্রড’ প্রমাণে অকাট্য নথি আদালতের টেবিলে দিন।

📑 মামলার পরিচিতি ও অফিসিয়াল রেকর্ড রেফারেন্স
মামলার নম্বর First Miscellaneous Appeal No. 89 of 2022
আদালত ও বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (মাননীয় বিচারপতি ডিভিশন বেঞ্চ)
পক্ষদ্বয় চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি বনাম সোনালী ব্যাংক পিএলসি ও অন্যান্য
আইন ও ধারা Contract Act, 1872 (Section 126); Code of Civil Procedure, 1908 (Order 39 Rules 1-2, Section 151)
অফিসিয়াল রায় (PDF) 📥 সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইট থেকে মূল রায় (PDF) ডাউনলোড করুন

Related Articles

✍️ আইনি মতামত বা প্রশ্ন প্রকাশ করুন

Back to top button