বায়না চুক্তির মেয়াদ নির্দিষ্ট না থাকলে বা বৃদ্ধি পেলে তামাদি গণনার নিয়ম: সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ (Specific Relief Act, 1877)-এর ১২ ধারা অনুযায়ী বায়না চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদন (Specific Performance of Contract) মোকদ্দমায় তামাদি আইনের প্রথম তফসিলের ১১৩ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য। চুক্তিপত্রে যদি সাফ-কবলা দলিল রেজিস্ট্রির সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ না থাকে কিংবা পক্ষদ্বয়ের পারস্পরিক সম্মতিতে বা কিস্তি গ্রহণের মাধ্যমে উক্ত চুক্তির সময়সীমা বাড়ানো বা স্থগিত রাখা হয়, তবে ১১৩ অনুচ্ছেদের প্রথম অংশ নয় বরং দ্বিতীয় অংশ প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ বিক্রেতা যে তারিখে সুস্পষ্ট ভাষায় জমি রেজিস্ট্রি করে দিতে ‘অস্বীকার’ (Date of Refusal) করবে, কেবলমাত্র সেই অস্বীকৃতির নোটিশ বা তারিখ থেকেই ১ বছরের তামাদি গণনা শুরু হবে। তামাদির ভুল গণনার অজুহাতে ক্রেতার বৈধ চুক্তির মামলা খারিজ করা বিচারিক অন্যায়।
মামলার বিবরণে জানা যায়, আপিলকারী মো. মকবুল হোসেন দিনাজপুর সদর উপজেলার শ্রী ননী গোপাল রায়ের সাথে ২০১০ সালে একটি রেজিস্ট্রিকৃত বায়নাপত্রের মাধ্যমে মোট ২৮ শতক জমি ক্রয়ের চুক্তি সম্পাদন করেন। মোট পণমূল্য ছিল ৩৫ লাখ টাকা, যার মধ্যে চুক্তির দিনই ৩০ লাখ টাকা বায়না বাবদ নগদে পরিশোধ করা হয়। অবশিষ্ট ৫ লাখ টাকা পরিশোধ করে দলিল রেজিস্ট্রির জন্য কোনো কঠোর দিনক্ষণ বেঁধে দেওয়া হয়নি; চুক্তির শর্তে বলা হয়েছিল বিক্রেতা নিজের পূর্বতন অংশের নামজারি ও খাজনা হালনাগাদ করে ক্রেতাকে জানালে ক্রেতা বাকি টাকা দিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করিয়ে নেবেন।
পরবর্তীতে বিক্রেতা নামজারি সম্পন্ন করতে ৪ বছর সময় নেন এবং ক্রেতা অবশিষ্ট ৫ লাখ টাকার ব্যাংক ড্রাফট প্রস্তুত করে রেজিস্ট্রি সম্পাদন করার তাগিদ দেন। কিন্তু জমির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বিক্রেতা ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়ে জানান যে তিনি জমি রেজিস্ট্রি করে দেবেন না। ক্রেতা এর ঠিক ৩ মাসের মাথায় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের চুক্তি প্রবলের মামলা দায়ের করেন। কিন্তু যুগ্ম জেলা জজ আদালত চুক্তি সম্পাদনের তারিখ থেকে ৩ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে ধরে নিয়ে তামাদি আইনের ১১৩ অনুচ্ছেদের কারণে মোকদ্দমা খারিজ করে দেন। সংক্ষুব্ধ হয়ে ক্রেতা হাইকোর্টে প্রথম আপিল দায়ের করেন।
👤 আপিলকারী ক্রেতার আইনি যুক্তি
ক্রেতার বিজ্ঞ কৌঁসুলি যুক্তি দেন যে, চুক্তিপত্রে কোনো নির্দিষ্ট সমাপ্তির তারিখ ছিল না। বিক্রেতা নোটিশ দিয়ে ২০১৫ সালে রেজিস্ট্রি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সুতরাং তামাদি আইনের ১১৩ অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় লিম্ব (Limb) অনুযায়ী অস্বীকৃতির তারিখ থেকে ১ বছরের মধ্যে মামলা দায়ের করায় তা শতভাগ তামাদির মধ্যে রয়েছে।
👥 রেসপনডেন্ট বিক্রেতার যুক্তি
রেসপনডেন্ট দাবি করে যে, চুক্তিপত্রে নির্দিষ্ট মেয়াদ না থাকলেও রেজিস্ট্রেশন আইন ও এসআর অ্যাক্টের সংশোধিত ধারা অনুযায়ী অনির্দিষ্টকালের জন্য চুক্তি ঝুলিয়ে রাখা যায় না এবং দীর্ঘ কালক্ষেপণে মামলা তামাদিতে বারিত হয়েছে।
হাইকোর্ট বিভাগ পর্যালোচনা করে দেখতে পান যে, ট্রায়াল জজ তামাদি আইনের ১১৩ অনুচ্ছেদের দুটি পৃথক অংশের মধ্যকার সুক্ষ্ম আইনি পার্থক্য বিবেচনায় নিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। যখন চুক্তির কার্যসম্পাদন কোনো শর্তের ওপর নির্ভরশীল থাকে (Contingent on mutation), তখন সেই শর্ত পূরণ ও অস্বীকৃতির পূর্বে তামাদির মেয়াদ চালু হতে পারে না। বিচারকের তামাদি গণনার ভুল সরাসরি ন্যায়বিচারকে ব্যাহত করেছে।
হাইকোর্ট বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক নজির 44 DLR (AD) 255, 48 DLR (AD) 162 এবং 53 DLR (AD) 17 বিশ্লেষণ করেন। আপিল বিভাগ দ্ব্যর্থহীনভাবে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন: “Article 113 of the Limitation Act has two limbs. If no date is fixed for performance, limitation runs from the date when the plaintiff has notice that performance is refused.” যেহেতু বিক্রেতা ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথম অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং এপ্রিল মাসে মামলা হয়েছে, মোকদ্দমাটি সম্পূর্ণ সময়সীমার মধ্যে দাখিল করা হয়েছে।
চূড়ান্ত রায়: প্রথম আপিলটি মঞ্জুর করা হয়। যুগ্ম জেলা জজ আদালতের খারিজ আদেশ সম্পূর্ণ রদ ও রহিত করা হয়। বাদী-আপিলকারীর অনুকূলে সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের ডিক্রি প্রদান করা হয়। নির্দেশ দেওয়া হয় যে বাদী অবশিষ্ট ৫ লাখ টাকা ৩০ দিনের মধ্যে আদালতে জমা দেবেন এবং জমা দেওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে বিক্রেতা রেজিস্ট্রি সম্পাদন করবেন; অন্যথায় আদালত স্বয়ং দলিল রেজিস্ট্রি করে দেবেন।
- ১১৩ অনুচ্ছেদের দ্বৈত রূপ: সুনির্দিষ্ট তারিখ থাকলে তারিখ থেকে ১ বছর, আর অনির্দিষ্ট বা শর্তাধীন থাকলে নোটিশে অস্বীকৃতির তারিখ থেকে ১ বছর তামাদি।
- পণের সিংহভাগ পরিশোধের সুরক্ষা: পণমূল্যের সিংহভাগ পরিশোধকারী ক্রেতার অনুকূলে আদালত সবসময় সমতার দৃষ্টিতে (Equity) প্রতিকার নিশ্চিত করেন।
- অদালতের স্বয়ং রেজিস্ট্রি ক্ষমতা: বিক্রেতা ডিক্রির পর দলিল করে না দিলে সিভিল কোর্ট স্বয়ং সাব-রেজিস্ট্রারের নিকট উপস্থিত হয়ে দলিল নিষ্পাদন করে দেন।
- বায়নাপত্র রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক: সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ৫৩এ ধারা অনুযায়ী ২০০৫ সালের পর থেকে বায়নাপত্র বাধ্যতামূলকভাবে রেজিস্ট্রি করুন।
- মেয়াদ বৃদ্ধির লিখিত ডকুমেন্টস: সময় বাড়াতে হলে মৌখিক কথায় বিশ্বাস না করে চুক্তির পৃষ্ঠায় বা নতুন এগ্রিমেন্টে স্বাক্ষর নিন।
- লিগ্যাল নোটিশের প্রমাণ সংরক্ষণ: বিক্রেতাকে রেজিস্ট্রি করার জন্য পাঠানো রেজিস্ট্রি ডাকযোগের নোটিশ ও একনলেজমেন্ট ডিউ (AD) কার্ড যত্ন সহকারে রাখুন।
- অবশিষ্ট টাকা ব্যাংকে প্রস্তুত রাখা: ক্রেতার সদিচ্ছা প্রমাণের জন্য অবশিষ্ট টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স বা পে-অর্ডার রেডি রাখুন।
- আইনজীবীদের জন্য আরজি ড্রাফটিং: আরজিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন যে কেন এবং কোন তারিখের অস্বীকৃতি থেকে তামাদির হিসাব গণনা করা হয়েছে।
