সন্তানের কাস্টডি ও অভিভাবকত্ব নির্ধারণে পিতার দাবির চেয়ে সন্তানের কল্যাণই চূড়ান্ত বিচার্য: হাইকোর্টের রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের মানবিক ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন, ১৮৯০ (The Guardians and Wards Act, 1890)-এর ১৭ ও ২৫ ধারা এবং মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী পিতা সন্তানের প্রাকৃতিক ও আইনগত অভিভাবক (Natural Guardian) হওয়া সত্ত্বেও নাবালক সন্তানের হেফাজত বা জিম্মাদারি (Custody / Hizanat) নির্ধারণের ক্ষেত্রে আদালত কোনো যান্ত্রিক বা কঠোর অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন না। আদালতের একমাত্র ও অবিসংবাদিত বিচার্য বিষয় হলো ‘নাবালকের সার্বিক মঙ্গল ও কল্যাণ’ (Welfare of the Minor is of Paramount Consideration)। পিতা যদি পুনর্বিবাহ করেন এবং সৎ মায়ের সংসারে নাবালক শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশে বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা থাকে, তবে মা সুশিক্ষিত ও সক্ষম হলে সন্তানের নিরাপদ হেফাজত মায়ের কাছেই বহাল রাখা আদালত ও শরিয়ার সর্বোচ্চ ন্যায়বিচার।
বাদী ডা. শাহনাজ পারভীন ও বিবাদী ডা. মো. আশরাফুল আলম উভয়েই চিকিৎসক। তাদের দাম্পত্য জীবনে ২০১৮ সালে একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। কর্মজীবনের ব্যস্ততা ও পারিবারিক মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের কারণে ২০২১ সালে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। বিচ্ছেদের পর শিশুকন্যাটি সার্বক্ষণিক তার মায়ের সঙ্গেই ছিল এবং একটি নামীদামী ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল।
পিতা পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং তার নতুন সংসারে আরেকটি সন্তান জন্মগ্রহণ করে। পিতা তখন পারিবারিক আদালতে অভিভাবকত্ব মামলা দায়ের করে দাবি করেন যে কন্যা শিশুর বয়স ৭ বছর পূর্ণ হওয়ায় মুসলিম শরিয়ত অনুযায়ী মায়ের হেফাজতের মেয়াদ শেষ হয়েছে, কাজেই কন্যাকে পিতার জিম্মায় হস্তান্তর করতে হবে। পারিবারিক আদালত পিতার অনুকূলে হেফাজতের আদেশ দেন এবং জেলা জজ আদালত তা বহাল রাখেন। এই আদেশের বিরুদ্ধে মা হাইকোর্টে রিভিশন করেন।
👤 মায়ের আইনি যুক্তি
মা একজন স্বাবলম্বী চিকিৎসক এবং তিনি পুনর্বিবাহ করেননি। কন্যা সন্তানটি মায়ের পরম স্নেহে বড় হচ্ছে। পিতার নতুন সংসারে সৎ মায়ের অধীনে ৬ বছরের একটি অবোধ শিশুর মানসিক বিকাশ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।
👥 পিতার যুক্তি
পিতা দাবি করেন যে শরিয়া আইনে কন্যার বয়স ৭ বছর হলে পিতার হেফাজতের অধিকার তৈরি হয় এবং পিতা হিসেবে তিনিই কন্যার ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও ভরণপোষণের উপযুক্ত অভিভাবক।
হাইকোর্ট বিভাগ লক্ষ্য করেন যে, সহকারী জজ ও জেলা জজ আদালত উভয়ই ৭ বছর বয়সের একটি বাঁধাধরা গাণিতিক ফর্মুলার ওপর ভিত্তি করে রায় দিয়েছেন। কিন্তু অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইনের ১৭ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, আদালতকে ধর্মীয় আইনের চেয়েও নাবালকের ভালো-মন্দ ও সার্বিক মঙ্গলকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিচার করতে হবে।
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত নজির Abu Bakar Siddique Vs. Aftabun Nahar, 39 DLR (AD) 209 এবং 50 DLR (HCD) 54 বিশ্লেষণ করেন। উক্ত নজিরে আপিল বিভাগ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন: “The rules of Hizanat under Mohammedan Law are not rigid or inflexible; the welfare of the minor overrides all other considerations.” শিশুর মানসিক বিকাশ, স্নেহ ও মমতা যেখানে সুরক্ষিত থাকবে, হেফাজত সেখানেই অর্পিত হবে। পিতার পুনর্বিবাহ সৎ মায়ের অধীনে শিশুকে মানসিক ট্রমার মধ্যে ফেলবে, যা কিছুতেই কাম্য নয়।
চূড়ান্ত রায়: সিভিল রিভিশন মঞ্জুর করা হয়। অধস্তন আদালতের রায় বাতিল করে কন্যা শিশুর নিরঙ্কুশ হেফাজত মায়ের অনুকূলে বহাল রাখা হয়। তবে পিতা হিসেবে তার রক্ত ও ভালোবাসার সম্পর্ক অটুট রাখতে আদালত পিতাকে প্রতি মাসের ১ম ও ৩য় শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নিজ দায়িত্বে কন্যার সাথে সাক্ষাৎ ও সময় কাটানোর (Visitation Rights) সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেন।
- শিশুর কল্যাণই সর্বোচ্চ আইন: হেফাজতের মামলায় কোনো অভিভাবকের অহং বা ব্যক্তিগত অধিকার নয়, শিশুর শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তাই একমাত্র বিবেচ্য।
- পিতার পুনর্বিবাহের প্রভাব: পিতার সংসারে সৎ মা থাকলে নাবালকের যত্ন বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনাকে আদালত গভীরভাবে বিবেচনায় নেন।
- সাক্ষাতের অধিকার (Visitation Rights): সন্তান মায়ের কাছে থাকলেও পিতা কখনো তার সন্তান থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হবেন না; নিয়মিত সাক্ষাতের সুযোগ দিতে হবে।
- সন্তানকে দ্বন্দ্বের অস্ত্র বানাবেন না: মা-বাবার বিচ্ছেদের লড়াইয়ে সন্তানকে মানসিক চাপের মুখে ফেলা চরম অমানবিক ও বেআইনি।
- আদালতে শিশুর পড়াশোনার প্রমাণ: মায়েদের উচিত শিশুর স্কুলের ফলাফল, স্বাস্থ্য রিপোর্ট ও পরিচর্যার যাবতীয় নথি আদালতে প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা।
- পিতার জন্য নিয়মমাফিক খোরপোশ প্রদান: কাস্টডি বিরোধ সত্ত্বেও পিতা নিয়মিত ভরণপোষণ দিলে আদালতে তার সদিচ্ছা প্রশংসিত হয়।
- আদালতের চেম্বারে জবানবন্দি: কিছুটা পরিণত বয়সের শিশু হলে বিচারক মহোদয় চেম্বারে ডেকে শিশুর মতামত গ্রহণ করতে পারেন।
- আইনজীবীদের জন্য গাইডলাইন: কাস্টডি মামলায় আবু বকর সিদ্দিকী বনাম আফতাবুন নাহার (৩৯ ডিএলআর এডি) নজিরটির গভীর উদ্ধৃতি দিন।

