বণ্টননামা ছাড়া সহ-শরিকের নির্দিষ্ট দাগ ও চৌহদ্দি বিক্রি আইনত অবৈধ: সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ (Transfer of Property Act, 1882)-এর ৪৪ ধারা এবং সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন অনুযায়ী এজমালি বা অবিভক্ত যৌথ সম্পত্তির সহ-শরিকদের মধ্যে বৈধ বণ্টননামা দলিল বা আদালতের চূড়ান্ত বাঁটোয়ারা ডিক্রি না থাকলে কোনো সহ-শরিক যৌথ সম্পত্তির মধ্য থেকে নির্দিষ্ট কোনো প্লট, দাগ বা সুনির্দিষ্ট চৌহদ্দির জমি (Specific demarcated portion) এককভাবে তৃতীয় পক্ষের নিকট বিক্রয় বা হস্তান্তর করতে পারে না। এরূপ কোনো কবলা সম্পাদিত হলে ক্রেতা কেবল বিক্রেতার অবিভক্ত যৌথ স্বত্ব (Undivided share) অর্জন করে; কিন্তু সে উক্ত জমিতে একক দখল দাবি করতে পারে না এবং অন্য শরিকদের সম্মতি ছাড়া জোরপূর্বক দখলে যেতে পারে না। ক্রেতার একমাত্র আইনি প্রতিকার হলো সহ-শরিকদের বিরুদ্ধে বণ্টন মোকদ্দমা (Partition Suit) দায়ের করে নিজের অংশ আলাদা করিয়ে নেওয়া।
মামলার বিবরণে জানা যায়, কুমিল্লা জেলার বুড়িচং উপজেলার বাসিন্দা মোসাঃ রোকেয়া বেগম ও অন্যান্যরা পৈত্রিক সূত্রে একটি এজমালি জোতের মোট ১.২০ একর জমির সহ-উত্তরাধিকারী হন। উক্ত সম্পত্তি সহ-শরিকদের মধ্যে কোনোদিন রেজিস্ট্রিকৃত আপস বণ্টননামা বা দেওয়ানি আদালতের ডিক্রির মাধ্যমে ভাগ-বাটোয়ারা হয়নি। কিন্তু বিবাদী মোঃ হাবিবুর রহমান উক্ত জোতের একজন সহ-শরিকের কাছ থেকে রাস্তার পাশের সবচেয়ে মূল্যবান ২০ শতক নাল জমি সুনির্দিষ্ট চৌহদ্দি উল্লেখপূর্বক সাব-কবলা দলিলের মাধ্যমে ক্রয় করেন।
দলিল রেজিস্ট্রি করার পরই হাবিবুর রহমান স্থানীয় লাঠিয়ালদের সহযোগিতায় উক্ত ২০ শতক জমিতে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ শুরু করেন এবং অপর শরিকদের জমিতে প্রবেশে বাধা প্রদান করেন। সংক্ষুব্ধ রোকেয়া বেগম সহকারী জজ আদালতে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মামলা দায়ের করেন। সহকারী জজ আদালত বাদীদের অনুকূলে নিষেধাজ্ঞা মঞ্জুর করেন। কিন্তু বিবাদী জেলা জজ আদালতে আপিল করলে অতিরিক্ত জেলা জজ উক্ত রায় উল্টে দিয়ে বলেন যে বিবাদী রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের মাধ্যমে দখল ক্রয় করেছে। অতঃপর সংক্ষুব্ধ রোকেয়া বেগম হাইকোর্ট বিভাগে এই সিভিল রিভিশন মোকদ্দমা দায়ের করেন।
👤 আবেদনকারী সহ-শরিকদের আইনি যুক্তি
আবেদনকারীদের বিজ্ঞ আইনজীবী যুক্তি দেন যে, প্রতিটি সহ-শরিক যৌথ সম্পত্তির প্রতিটি ধূলিকণায় যৌথ মালিকানা ধারণ করে। বণ্টন না হওয়া পর্যন্ত কোনো শরিক এককভাবে রাস্তার ধারের সবচেয়ে মূল্যবান অংশ বিক্রি করতে পারে না। হস্তান্তর আইন ৪৪ ধারা মতে ক্রেতা কেবল সমতার ভিত্তিতে বাঁটোয়ারা পাওয়ার অধিকারী, সরাসরি জবরদখলের নয়।
👥 বিপরীতপক্ষ বহিরাগত ক্রেতার যুক্তি
বিপরীতপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন যে, বিক্রেতা দীর্ঘদিন ধরে উক্ত ২০ শতক জমিতে একচ্ছত্র দখলে ছিলেন। তাই স্বত্ব ও দখল হস্তান্তরে কোনো আইনি বাধা নেই এবং দলিলের ওপর ভিত্তি করে নামজারি হয়েছে।
হাইকোর্ট বিভাগ নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করে দেখতে পান যে, অতিরিক্ত জেলা জজ দেওয়ানি আইনের প্রাথমিক সূত্র অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন। সহ-শরিকদের অভ্যন্তরীণ মৌখিক দখল কখনোই আইনানুগ বণ্টন নয়। একজন সহ-শরিকের সুবিধাজনক দখলকে স্থায়ী বা আইনসম্মত ধরে নিয়ে বহিরাগত ক্রেতাকে নির্দিষ্ট চৌহদ্দিতে প্রবেশের অধিকার দেওয়া সরাসরি সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ও সহ-শরিকানার সুপ্রতিষ্ঠিত ধারণাকে ধূলিসাৎ করে।
মহামান্য হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ল্যান্ডমার্ক নজির 38 DLR (AD) 145, 45 DLR (AD) 120 এবং 51 DLR 336 বিশ্লেষণ করেন। আপিল বিভাগ স্পষ্টভাবে রায় দিয়েছেন: “A co-sharer in an undivided joint property has no right to alienate a specific demarcated portion of the joint land so as to affect the rights of other co-sharers. The purchaser stepping into the shoes of such co-sharer acquires merely an undivided share and an equity to work out his partition by a properly constituted partition suit.” হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করেন যে, ক্রেতা কোনোক্রমেই সহ-শরিকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট প্লটে সীমানা প্রাচীর দিতে পারে না।
চূড়ান্ত রায়: সিভিল রিভিশন মোকদ্দমাটি মঞ্জুর করা হয়। অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতের রায় ও ডিক্রি সম্পূর্ণ রদ ও বাতিল ঘোষণা করা হয় এবং সহকারী জজ আদালতের স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার রায় বহাল রাখা হয়। বিবাদী হাবিবুর রহমানকে উক্ত নির্দিষ্ট ২০ শতক জমিতে প্রাচীর নির্মাণ বা অন্য সহ-শরিকদের নির্বিঘ্ন চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা থেকে স্থায়ীভাবে বারিত করা হয়। তবে বিবাদী সমগ্র সম্পত্তির জন্য যথাযথ বণ্টন মোকদ্দমা দায়ের করে নিজের বিক্রেতার অংশ চিহ্নিত করার আইনি স্বাধীনতা বজায় থাকবে।
- নির্দিষ্ট চৌহদ্দি বিক্রয়ের অক্ষমতা: সহ-শরিকদের সম্মতি ও বণ্টননামা দলিল ছাড়া নির্দিষ্ট সীমানা বিক্রয় করলে দলিলের নির্দিষ্ট চৌহদ্দি বাতিলযোগ্য।
- ক্রেতার অধিকারের সীমাবদ্ধতা: ক্রেতা কখনোই বিক্রেতার চেয়ে বেশি স্বত্ব পেতে পারে না (Nemo dat quod non habet); সে কেবল অবিভক্ত যৌথ অংশের অংশীদার হয়।
- বণ্টন মোকদ্দমা একমাত্র প্রতিকার: ক্রেতাকে যদি নির্দিষ্ট স্থানে ঘরবাড়ি তৈরি করতে হয়, তবে সকল সহ-শরিককে বিবাদী করে বাঁটোয়ারা মামলা ডিক্রি করাতে হবে।
- জমি কেনার আগে বণ্টননামা যাচাই: কোনো শরিকের কাছ থেকে জমি কেনার পূর্বে সকল শরিকের উপস্থিতিতে রেজিস্ট্রিকৃত আপস বণ্টননামা আছে কি না তা শতভাগ নিশ্চিত করুন।
- রাস্তার ধারের লোভনীয় প্লট কেনার ঝুঁকি: অন্য শরিকদের বাদ দিয়ে কেবল ফ্রন্ট সাইডের জমি কিনলে পরবর্তীতে বণ্টন মামলায় পেছনের অংশে চলে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে।
- সহ-শরিকদের অনাপত্তিপত্র: বণ্টননামা না থাকলে সাব-কবলা দলিলে সকল সহ-শরিককে সাক্ষী রেখে তাদের লিখিত সম্মতিপত্র অন্তর্ভুক্ত করুন।
- সহ-শরিকদের দ্রুত নিষেধাজ্ঞা প্রতিকার: কোনো বহিরাগত ব্যক্তি এসে দখল নেওয়ার চেষ্টা করলে সহকারী জজ আদালতে তৎক্ষণাৎ ৩৯ আদেশে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার দরখাস্ত দিন।
- আইনজীবীদের জন্য কৌশল: আরজিতে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ৪৪ ধারা এবং সহ-শরিকানার সুপ্রিম কোর্টের নজিরসমূহ স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরুন।

