১ জুলাই ২০০৫ পূর্ববর্তী মৌখিক হেবা ও স্মরণলিপি (Memorandum of Gift): বাটোয়ারা মোকদ্দমায় সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত

📌 সংক্ষিপ্ত আইনি সারসংক্ষেপ (Legal Summary)

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক ঐতিহাসিক রায়ে সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন যে, ২০০৫ সালের ০১ জুলাই রেজিস্ট্রেশন আইনের সংশোধন (Registration Act Amendment with effect from 01.07.2005) কার্যকর হওয়ার পূর্বে মুসলিম আইনানুযায়ী (Mohammedan Law) সম্পন্ন যেকোনো বৈধ মৌখিক হেবা (Oral Gift / Heba) প্রমাণে কোনো রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের বাধ্যবাধকতা নেই। কোনো দাতা যদি মৌখিকভাবে হেবা ঘোষণা, গ্রহীতা কর্তৃক তা গ্রহণ এবং নালিশি ভূমির বাস্তব দখল হস্তান্তরের পর তা স্মরণ রাখার সুবিধার্থে কোনো অপঞ্জিকৃত স্মরণলিপি বা স্মারকপত্রে (Unregistered Memorandum of Gift) স্বহস্তে লিপিবদ্ধ করেন, তবে উক্ত স্মরণলিপি কোনো নতুন স্বত্ব সৃষ্টি করে না বিধায় তা বাধ্যতামূলকভাবে রেজিস্ট্রেশনযোগ্য নয় এবং তা আদালতে পূর্ণ সাক্ষ্যমূল্য পাওয়ার যোগ্য। একইসঙ্গে হাইকোর্ট স্পষ্ট রায় দিয়েছেন যে, বিগত ২০০০ সালে বিচারিক আদালতে প্রদত্ত সাক্ষ্যে দাতা কেন ২০০৫ সালে সংঘটিত ভবিষ্যৎ হেবার কথা বলেননি—আপিল আদালতের এরূপ ভিত্তিহীন ও কালানুক্রমিক ভ্রান্তি (Chronological absurdity & gross misreading of evidence) সম্পূর্ণ বেআইনি। ফলে জেলা জজ আদালতের রায় বাতিল করে বাটোয়ারা মামলায় বাদিপক্ষের অনুকূলে ০.১৩ একর ভূমির প্রাথমিক ডিক্রি পুনর্বহাল করা হলো।

১. মামলার সূচনা ও বংশলতিকার প্রেক্ষাপট (Background & Origin)

আলোচ্য মামলার সূচনা মাগুরা জেলার ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ২০০২ সালে দায়েরকৃত ১ নম্বর বাটোয়ারা মোকদ্দমা (Title Suit No. 1 of 2002) থেকে। মোকদ্দমাটি দায়ের করেছিলেন আখতারুজ্জামান মৃধা (মূল বাদী) নালিশি ভূমিতে তাঁর অবিসংবাদিত ০.১৩ একর (১৩ শতক) জমির পৃথক সাহাম ও বণ্টন ডিক্রি আদায়ের প্রার্থনায়।

নালিশি ভূমির মূল মালিক ছিলেন জগবন্ধু, যাঁর নিকট থেকে বিগত ২৯ অক্টোবর ১৯৩৭ তারিখে জুলমত খাঁ পত্তনসূত্রে মালিক হন। পরবর্তীতে আদেলুদ্দিন বিগত ২১ মার্চ ১৯৬৯ তারিখে ২৮ শতক জমি ক্রয় করেন এবং সেখান থেকে ১৯৮৮ ও ১৯৯২ সালের দুটি পৃথক রেজিস্ট্রি কবলা দলিলের মাধ্যমে মোট ১৩ শতক (০.১৩ একর) জমি আখতারুজ্জামান মৃধার নিকট বিক্রয় করেন। মূল বাদী উক্ত জমিতে বসতবাড়ি নির্মাণ করে শান্তিপূর্ণ বসবাস শুরু করেন। কিন্তু পরবর্তীতে বিবাদীগণ তাঁর স্বত্ব ও বাটোয়ারা অস্বীকার করায় তিনি বণ্টন মোকদ্দমাটি দায়ের করেন।

মোকদ্দমাটি বিচারাধীন থাকাবস্থায় মূল বাদী আখতারুজ্জামান মৃধা মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বিধবা স্ত্রী শাহিদা আক্তার এবং চার কন্যা স্থলাভিষিক্ত বাদী (Substituted Plaintiffs) হিসেবে পক্ষভুক্ত হন। বাদিগণ দাবি করেন যে, মৃত্যুর পূর্বে আখতারুজ্জামান মৃধা তাঁর সমুদয় ১৩ শতক জমি স্ত্রী ও চার কন্যার অনুকূলে মৌখিকভাবে হেবা প্রদান করেন এবং বিগত ০৩ জুন ২০০৫ তারিখে স্বহস্তে একটি অপঞ্জিকৃত স্মরণলিপি বা হেবানামা (Exhibit-7) লিখে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে স্বাক্ষর করেন। অপরদিকে মূল বাদীর ভাই (১৩ নং বিবাদী) ও বোন (১৪ নং বিবাদী) দাবি করেন যে, ভাইয়ের মৃত্যুর পর তারা মুসলিম ফারায়েজ আইন অনুযায়ী অবশিষ্ট সম্পত্তির আসাবা বা অংশীদার হিসেবে ০.০৫ একর জমির ওয়ারিশ হয়েছেন।

২. পক্ষগণের বিপরীতমুখী দাবি ও প্রতিদ্বন্দ্বী বক্তব্য (Pleadings of the Parties)

বিচারিক আদালতে স্থলাভিষিক্ত বাদিগণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ১৩ ও ১৪ নম্বর বিবাদীগণ বিপরীতমুখী দাবি উপস্থাপন করেন।

🏛️ বাদীপক্ষের বক্তব্য ও আইনি দাবি

  • অবিসংবাদিত মূল স্বত্ব: মূল বাদি আখতারুজ্জামান মৃধা ১৯৮৮ ও ১৯৯২ সালের কবলা মূলে ১৩ শতক জমির একক ও বৈধ মালিক ছিলেন, যা সকল পক্ষ কর্তৃক স্বীকৃত।
  • বৈধ মৌখিক হেবা: পুত্রসন্তান না থাকায় দাতা মৃত্যুর পূর্বে স্ত্রী ও চার কন্যাকে বসতবাড়িসহ সমুদয় ১৩ শতক জমি মৌখিকভাবে হেবা প্রদান ও দখল সঁপে দেন।
  • স্মরণলিপি (Exhibit 7): মৌখিক হেবাটি স্মরণে রাখার জন্য দাতা ০৩/০৬/২০০৫ তারিখে নিজ হাতে স্মরণলিপি লেখেন, যা সাক্ষীদের উপস্থিতিতে অকাট্যভাবে প্রমাণিত।
  • ২০০৫ পূর্ববর্তী হেবার বিধান: ০১/০৭/২০০৫-এর পূর্বে মৌখিক হেবার ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক ছিল না; স্মরণলিপি কেবল পূর্বের হেবার স্মৃতিস্মারক।
  • বসতবাড়িতে নিরবচ্ছিন্ন দখল: বাদিগণ পিতার জীবদ্দশা থেকে অদ্যাবধি উক্ত বসতভিটায় একক দখলে আছেন, যা হেবার দখল হস্তান্তরের স্পষ্ট প্রমাণ।

🛡️ বিবাদীপক্ষের (১৩ ও ১৪ নং) জবাব ও প্রতিরক্ষা যুক্তি

  • রেজিস্ট্রেশন আইনের বাধা: অপঞ্জিকৃত কোনো কাগজ বা দলিলের মাধ্যমে স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর আইনত অগ্রহণযোগ্য ও অপ্রমাণিত।
  • মৌখিক হেবার দাবি: ১৩ নং বিবাদী মোখতারুজ্জামান দাবি করেন যে, ভাই আখতারুজ্জামান জীবিতাবস্থায় ২০০৪ সালে তাঁকেই ০.০৪ একর জমি মৌখিক হেবা দিয়েছিলেন।
  • উত্তরাধিকার ও ফারায়েজ: ভাইয়ের মৃত্যুর পর পুত্রসন্তান না থাকায় ভাই হিসেবে ১৩ নং বিবাদী এবং বোন হিসেবে ১৪ নং বিবাদী ০.০৫ একর ভূমির বৈধ ওয়ারিশ।
  • বাদীর নিজের সাক্ষ্যে অসঙ্গতি: আখতারুজ্জামান যখন পিডব্লিউ-১ হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিলেন, তখন তিনি স্ত্রী-কন্যাকে হেবা দেওয়ার কোনো কথা বলেননি।
  • সাক্ষীদের বয়ানে অমিল: প্রদর্শনী-৭ লেখার সময় নিয়ে পিডব্লিউ-৫ এবং পিডব্লিউ-৭ এর বয়ানে সময়ের পার্থক্য থাকায় দলিলটি বানোয়াট ও সন্দেহজনক।

৩. বিচারিক আদালতের কার্যক্রম ও প্রাথমিক ডিক্রি (Trial Court Findings)

১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত, মাগুরা উভয় পক্ষের সাক্ষ্য-প্রমাণ সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেন। বাদিপক্ষে পিডব্লিউ-৫ (স্ত্রী শাহিদা বেগম), পিডব্লিউ-৬ (আলী আকবর) এবং পিডব্লিউ-৭ (নুরুল ইসলাম—যিনি দলিলের হস্তাক্ষর ও সাক্ষীর স্বাক্ষর শনাক্ত করেন) সাক্ষ্য প্রদান করেন। দাতার স্বহস্তে লিখিত অপঞ্জিকৃত হেবার স্মারকপত্রটি প্রদর্শনী-৭ (Exhibit-7) হিসেবে বিনা আপত্তিতে চিহ্নিত হয়।

বিচারিক আদালত লক্ষ্য করেন যে, পিডব্লিউ-৫ এবং পিডব্লিউ-৭ এর জবানবন্দিতে প্রদর্শনী-৭ লেখার সময় নিয়ে সামান্য অমিল রয়েছে (একজন বলেছেন মাগরিবের পর সন্ধ্যা ৬টায়, অন্যজন বলেছেন মাগরিবের পূর্বে বিকেল ৪:৩০ বা ৫টায়)। বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ অভিমত দেন যে, ৮ বছর আগের একটি ঘটনার ক্ষেত্রে সময়ের এরূপ সামান্য ব্যবধান মানবীয় স্মৃতির স্বাভাবিক দুর্বলতা, যা মূল হেবার সত্যতাকে বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ করে না। যেহেতু দাতা নিজ হাতে লিখে গেছেন এবং সাক্ষীরা তা সমর্থন করেছেন, সেহেতু হেবাটি আইনসংগতভাবে প্রমাণিত। তদ্ব্যতীত বিবাদীগণ তাদের কথিত ৪ শতক মৌখিক হেবার পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে বিচারিক আদালত বিগত ১৯ মে ২০১৩ তারিখে প্রাথমিক ডিক্রি প্রদান করে বাদিদের অনুকূলে পূর্ণ ১৩ শতক (০.১৩ একর) জমির সাহাম ঘোষণা করেন।

৪. আপিল আদালতের বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্ত (Reversal by District Judge)

উক্ত প্রাথমিক ডিক্রির বিরুদ্ধে কেবল ১৩ ও ১৪ নম্বর বিবাদী মাগুরার জেলা জজ আদালতে দেওয়ানী আপিল নং ১০৩/২০১৩ দায়ের করেন। জেলা জজ আদালত বিগত ২৪ মার্চ ২০১৪ তারিখে আপিলটি আংশিক মঞ্জুর করে বিচারিক আদালতের রায় উল্টে দেন।

বিজ্ঞ জেলা জজ রায়ে দুটি বিস্ময়কর যুক্তি প্রদান করেন:

  1. মুসলিম আইনে মৌখিক হেবা বৈধ হলেও যখনই কোনো লিখিত কাগজ প্রমাণের জন্য ব্যবহার করা হবে, তখন অবশ্যই তা রেজিস্ট্রিকৃত দলিল হতে হবে; অন্যথায় তা সাক্ষ্য হিসেবে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
  2. মূল বাদি আখতারুজ্জামান মৃধা মামলা চলাকালে পিডব্লিউ-১ হিসেবে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। কিন্তু সাক্ষ্যদানকালে তিনি তাঁর স্ত্রী, কন্যা কিংবা ভাইকে জমি হেবা দেওয়ার কোনো কথা উচ্চারণ করেননি! সুতরাং হেবার দাবি অপ্রমাণিত।

উক্ত অযৌক্তিক ও বেআইনি রায়ে সংক্ষুব্ধ হয়ে বাদিপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল রিভিশন নং ২৯৬৮/২০১৪ দায়ের করেন।

৫. মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে পর্যালোচিত আইনি বিরোধ (Core Legal Issues)

হাইকোর্ট বিভাগের একক বেঞ্চের শুনানিতে নিম্নলিখিত মৌলিক আইনি বিরোধসমূহ নিষ্পত্তির জন্য চিহ্নিত হয়:

  • হেবার স্মারকপত্রের রেজিস্ট্রেশন আবশ্যকতা: ২০০৫ সালের ১ জুলাই সংশোধনী কার্যকর হওয়ার পূর্বে মুসলিম আইনে সম্পন্ন মৌখিক হেবার বিবরণ সম্বলিত কোনো অপঞ্জিকৃত স্মরণলিপি কি রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭ ধারা অনুযায়ী বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রিযোগ্য, নাকি তা নিছক সংঘটিত ঘটনার সহায়ক প্রমাণ?
  • আপিল আদালতের চরম কালানুক্রমিক ভ্রান্তি: যেক্ষেত্রে মূল বাদী পিডব্লিউ-১ হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন ২৩ মে ২০০০ তারিখে, আর মৌখিক হেবাটি সংঘটিত হয়েছিল তার ৫ বছর পর ০৩ জুন ২০০৫ তারিখে—সেক্ষেত্রে ২০০০ সালের সাক্ষ্যে ২০০৫ সালের হেবা উল্লেখ না থাকার কারণে আপিল আদালত কর্তৃক হেবা অবিশ্বাস করা কি নথির মারাত্মক অপব্যাখ্যা (Gross misreading of record) নয়?
  • প্রথম আপিল আদালতের দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা: সাক্ষ্য-প্রমাণ সরাসরি পর্যবেক্ষণকারী বিচারিক আদালতের সুনির্দিষ্ট যুক্তি খণ্ডন না করে প্রথম আপিল আদালত আইনের ভুল প্রয়োগে প্রাথমিক ডিক্রি পরিবর্তন করতে পারে কি না?

৬. সুপ্রিম কোর্টের বিশ্লেষণ ও আইনগত অনুসিদ্ধান্ত (Judicial Analysis & Precedents)

মাননীয় বিচারপতি আবদুর রহমান মামলার নথি, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং মুসলিম আইনের বিধানাবলি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করেন:

(এক) ২০০৫ পূর্ববর্তী মৌখিক হেবা ও স্মরণলিপির সাক্ষ্যমূল্য:
আদালত দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন যে, ২০০৫ সালের ০১ জুলাই রেজিস্ট্রেশন আইন সংশোধিত হয়ে হেবা দলিল বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশনের আওতাভুক্ত হয়। কিন্তু উক্ত সংশোধনীর পূর্বে মুসলিম আইনের অধীনে সম্পন্ন মৌখিক হেবার জন্য কোনো লিখিত বা রেজিস্ট্রি দলিলের প্রয়োজন ছিল না। যদি পূর্বে মৌখিকভাবে তিনটি উপাদান—(১) দাতার পক্ষ থেকে প্রস্তাব/ঘোষণা (Declaration), (২) গ্রহীতার পক্ষ থেকে গ্রহণ (Acceptance), এবং (৩) সম্পত্তির বাস্তব দখল হস্তান্তর (Delivery of possession)—সফলভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকে, তবে পরবর্তীতে তা স্মরণে রাখার জন্য লিখিত যেকোনো কাগজ কেবল একটি ‘স্মরণলিপি’ (Memorandum of a past transaction)। এই স্মরণলিপি কোনো নতুন স্বত্ব বা হস্তান্তর সৃষ্টি করে না, বরং অতীত ঘটনা লিপিবদ্ধ করে মাত্র। সুতরাং তা রেজিস্ট্রেশন আইনের বেড়াজালে অবৈধ হতে পারে না।

(দুই) আপিল আদালতের চরম অবিমৃশ্যকারিতা ও নথির ভুল পাঠ:
হাইকোর্ট বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেন যে, জেলা জজ আপিল খারিজ করতে গিয়ে লিখেছেন—”আখতারুজ্জামান পিডব্লিউ-১ হিসেবে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় স্ত্রী-কন্যাকে হেবা দেওয়ার কথা বলেননি।” অথচ মামলার নথি সাক্ষ্য দেয় যে, আখতারুজ্জামান আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিলেন ২৩ মে ২০০০ তারিখে, আর হেবাটি সম্পন্ন হয়েছিল এর পাঁচ বছর পর ০৩ জুন ২০০৫ তারিখে! একজন মানুষ ২০০০ সালে দাঁড়িয়ে কীভাবে পাঁচ বছর পরের ভবিষ্যৎ হেবার কথা আদালতে বলবে? আপিল আদালতের এই অবিমৃশ্যকারিতা নথিপত্রের স্পষ্ট অপব্যাখ্যা এবং এটি ন্যায়বিচারের চরম অবমাননা (Substantial miscarriage of justice)।

(তিন) নিরবচ্ছিন্ন ভোগদখল ও হেবার পূর্ণতা:
মূল বাদি তাঁর জীবদ্দশায় বসতভিটাসহ নালিশি ১৩ শতক জমিতে বাস করতেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী ও কন্যারা নিরবচ্ছিন্নভাবে সেখানে বসবাস করছেন। এই দখল হেবার দখল অর্পণ ও গ্রহণের অকাট্য প্রমাণ। এছাড়া প্রদর্শনী-৭ যখন বিচারিক আদালতে দাখিল করা হয়, তখন বিবাদীপক্ষ কোনো আপত্তি তোলেনি বা জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিতে পারেনি। অতএব, বিচারিক আদালতের যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত খারিজ করার কোনো এখতিয়ার আপিল আদালতের ছিল না।

৭. হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও আদেশ (Final Decision)

মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ সার্বিক পর্যালোচনায় জেলা জজ আদালতের আপিল রায় বেআইনি ও বাতিলযোগ্য মর্মে সাব্যস্ত করে নিম্নোক্ত চূড়ান্ত আদেশ ঘোষণা করেন:

  • রুল অ্যাবসোলিউট: দেওয়ানী রিভিশন রুল নং ২৯৬৮/২০১৪ কোনো খরচা ছাড়াই পরম (Absolute without costs) করা হলো।
  • আপিল আদালতের রায় বাতিল: মাগুরার জেলা জজ আদালত কর্তৃক দেওয়ানী আপিল নং ১০৩/২০১৩-এ বিগত ২৪.০৩.২০১৪ তারিখে প্রদত্ত রায় ও ডিক্রি সম্পূর্ণরূপে বাতিল ও রদ করা হলো।
  • বিচারিক আদালতের রায় ও ডিক্রি পুনর্বহাল: ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত, মাগুরা কর্তৃক বাটোয়ারা মোকদ্দমা নং ০১/২০০২-এ বিগত ১৯.০৫.২০১৩ তারিখে প্রদত্ত রায় ও প্রাথমিক ডিক্রি (বাটোয়ারার প্রাথমিক ডিক্রি) পূর্ণাঙ্গরূপে পুনর্বহাল (Restored) করা হলো। বাদিগণ পূর্ণ ০.১৩ একর জমির একক সাহাম পাবেন।
  • বিবাদীগণের জন্য বিকল্প নির্দেশনা: যেহেতু এটি একটি বণ্টন মোকদ্দমা, সেহেতু অন্যান্য বিবাদীগণ বাদিদের ০.১৩ একর ভূমির কোনো ক্ষতিসাধন না করে অবশিষ্ট জমি থেকে প্রযোজ্য কোর্ট ফি প্রদান সাপেক্ষে বিচারিক আদালত বা জারি আদালত হতে পৃথক সাহাম গ্রহণ করতে পারবেন।
  • স্থিতাবস্থা প্রত্যাহার ও নথি প্রেরণ: হাইকোর্ট কর্তৃক ইতিপূর্বে জারিকৃত স্থিতাবস্থার আদেশ প্রত্যাহার করা হলো এবং অধস্তন আদালতের নথিপত্র অনতিবিলম্বে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হলো।

৮. মামলার রেফারেন্স ও বিচারিক তথ্যাদি (Case Summary Table)

আইনি গবেষক ও বিজ্ঞ আইনজীবীদের সুবিধার্থে এই যুগান্তকারী রায়ের সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও বিচারিক রেফারেন্স নিম্নের টেবিলে সন্নিবেশিত হলো:

বিষয়বস্তু মামলার বিস্তারিত তথ্য
উচ্চ আদালত ও বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (দেওয়ানী রিভিশন এখতিয়ার)
মাননীয় বিচারপতি আবদুর রহমান (Mr. Justice Abdur Rahman)
মামলা নম্বর ও শ্রেণি দেওয়ানী রিভিশন নং ২৯৬৮ / ২০১৪ (Civil Revision No. 2968 of 2014)
পক্ষগণের নাম শাহিদা আক্তার এবং অন্যান্য (দরখাস্তকারী/বাদী) বনাম মো: মোকারুজ্জামান এবং অন্যান্য (প্রতিপক্ষ/বিবাদী)
বিজ্ঞ আইনজীবীবৃন্দ দরখাস্তকারী পক্ষে: জনাব চঞ্চল কুমার বিশ্বাস এবং জনাব সৌগত গুহ, অ্যাডভোকেট
প্রতিপক্ষ পক্ষে: জনাব মো: দিদার আলী ফকির, অ্যাডভোকেট (শুনানিতে অনুপস্থিত)
উৎস ও বিচারিক আদালত জেলা জজ আদালত, মাগুরা (দেওয়ানী আপিল নং ১০৩/২০১৩, রায়: ২৪.০৩.২০১৪)
১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত, মাগুরা (বাটোয়ারা মোকদ্দমা নং ০১/২০০২, ডিক্রি: ১৯.০৫.২০১৩)
শুনানি ও রায় ঘোষণার তারিখ শুনানি: ২৪ ও ২৫ জুন ২০২৬
চূড়ান্ত রায়: ২৮ জুন ২০২৬ (১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ)
মূল আইনি আলোচ্য ধারা ও বিষয় Mohammedan Law (Oral Gift / Heba), Registration Act, 1908 (Section 17 – Prior to 01.07.2005 Amendment), Code of Civil Procedure (Section 115(1))
অফিসিয়াল রায় ও পোর্টাল লিংক 📥 অফিসিয়াল জাজমেন্ট PDF ডাউনলোড
🌐 সুপ্রিম কোর্ট পোর্টাল

Related Articles

Back to top button