চেক চুরি বা হারিয়ে যাওয়ার পূর্ববর্তী জিডি ও স্টপ পেমেন্ট নির্দেশ: এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার অনুমান খণ্ডনে হাইকোর্টের রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১ (NI Act)-এর ১৩৯ ধারায় চেক গ্রহীতার অনুকূলে যে আইনি অনুমান (Statutory Presumption) রয়েছে যে চেকটি বৈধ ঋণ বা দায় পরিশোধের জন্য ইস্যু করা হয়েছে, তা কোনো পরম ও চূড়ান্ত সত্য নয়; এটি খণ্ডনযোগ্য অনুমান (Rebuttable Presumption)। যদি চেক দাতা বা ড্রয়ার চেক ডিসঅনার হওয়ার বহু পূর্বেই উক্ত চেক বা চেকবই হারিয়ে যাওয়া বা চুরি হওয়ার মর্মে থানায় জিডি (General Diary) দাখিল করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে ‘স্টপ পেমেন্ট’ (Stop Payment) নির্দেশ প্রদান করে এবং বিরোধের পূর্বে পক্ষগণের মধ্যে কোনো প্রত্যক্ষ লেনদেনের চুক্তিপত্র বা প্রাপ্তিস্বীকার না থাকে, তবে ১৩৯ ধারার আইনি অনুমান সন্তোষজনকভাবে খণ্ডন হয়েছে বলে গণ্য হবে। যথাযথ তদন্ত ব্যতিরেকে একতরফাভাবে সাজা প্রদান আইনবহির্ভূত।
মামলার বিবরণে জানা যায়, জনৈক ঠিকাদার মোঃ রফিকুল ইসলাম ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে প্রকৌশলী মোমিনুল হকের বিরুদ্ধে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় একটি নালিশি মামলা দায়ের করেন। অভিযোগে বলা হয়, আসামি ব্যবসায়িক দেনা বাবদ বাদীকে ২০ লাখ টাকার একটি অ্যাকাউন্ট পেয়ী চেক প্রদান করেন। চেকটি ব্যাংকে উপস্থাপন করা হলে তা ‘Payment stopped by drawer’ এবং ‘Funds insufficient’ মর্মে ডিসঅনার হয়। লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েও টাকা না পাওয়ায় মামলা রুজু করা হয়।
আসামি প্রকৌশলী মোমিনুল হক আদালতে হাজির হয়ে দাবি করেন যে, বাদীর সাথে তার কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি বা দেনা-পাওনা ছিল না। বাদীর প্রতিষ্ঠান একসময় তার অফিসে ইন্টেরিয়র কাজের ঠিকাদার ছিল এবং সেই সময় তার অফিস ড্রয়ার থেকে স্বাক্ষরিত দুটি ব্লাঙ্ক চেক হারিয়ে যায়। উক্ত চেক হারানোর দিনেই (চেক উপস্থাপনের প্রায় ৪ মাস পূর্বে) তিনি ধানমন্ডি থানায় একটি জিডি (জিডি নং ৪১৮) দায়ের করেছিলেন এবং ব্র্যাক ব্যাংকে লিখিত আবেদন দিয়ে চেকটির পেমেন্ট স্টপ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এবং পরবর্তীতে অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত আসামির যুক্তি আমলে না নিয়ে তাকে ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেন। উক্ত আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে এই সিভিল/ক্রিমিনাল রিভিশন মোকদ্দমা দায়ের করা হয়।
👤 আবেদনকারী চেকদাতার আইনি যুক্তি
আবেদনকারীর আইনজীবী যুক্তি দেখান যে, চেক উপস্থাপনের বহু পূর্বে জিডি এবং ব্যাংকে স্টপ পেমেন্ট নির্দেশ করা প্রমাণ করে যে এটি কোনো বানোয়াট প্রতিরোধ নয়। বাদী আদালতে কোনো চালান, ভাউচার, কাজের চুক্তি বা দেনার ভিত্তি দেখাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে ১৩৯ ধারার অনুমান সম্পূর্ণরূপে খণ্ডন হয়েছে।
👥 নালিশকারী বাদীর যুক্তি
বাদীপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন যে, চেকের স্বাক্ষর যখন আসামি অস্বীকার করেনি এবং ব্যাংকে ফান্ড ইনসাফিশিয়েন্ট ছিল, তখন এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার উপাদানসমূহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্ণ হয় এবং স্টপ পেমেন্ট দিয়ে মামলা এড়ানোর সুযোগ নেই।
হাইকোর্ট বিভাগ নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখতে পান যে, বিচারিক আদালত ‘চেকের স্বাক্ষর স্বীকার’ করাকেই অপরাধ গঠনের একমাত্র মাপকাঠি বিবেচনা করে মারাত্মক বিচারিক ভুল করেছেন। এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারা কোনো কঠোর পরম দায় নয় যেখানে আসামির প্রতিরক্ষার কোনো সুযোগ থাকবে না। যদি কোনো ব্যক্তি চেক ইস্যু করার তারিখের পূর্বেই হারিয়ে যাওয়ার আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে, তবে সেই পদক্ষেপকে হালকাভাবে উড়িয়ে দিয়ে দায় চাপিয়ে দেওয়া আইনের অপপ্রয়োগ।
মহামান্য হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ল্যান্ডমার্ক নজির 57 DLR (AD) 59 এবং 60 DLR (AD) 147 উল্লেখ করে পর্যবেক্ষণ দেন: “The presumption under Section 139 of the Negotiable Instruments Act is a rebuttable presumption. The accused is not required to prove his defence beyond reasonable doubt; preponderance of probabilities is sufficient. Prior lodging of a GD regarding loss of cheque and stop payment instruction to the bank are strong materials to rebut the presumption of consideration.” যেহেতু বাদী কোনো বিবেচনার (Consideration) অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারেননি এবং আসামির পূর্ববর্তী জিডি অকাট্যভাবে প্রমাণিত, তাই এই দণ্ডাদেশ টেকসই নয়।
চূড়ান্ত রায়: ক্রিমিনাল রিভিশনটি মঞ্জুর করা হয়। দায়রা আদালতের প্রদত্ত সাজা ও অর্থদণ্ডের রায় সম্পূর্ণ রদ ও বাতিল ঘোষণা করা হয়। আবেদনকারী প্রকৌশলী মোমিনুল হককে সকল অভিযোগ থেকে সসম্মানে খালাস প্রদান করা হয় এবং আপিল বা রিভিশন শুনানির সময় জামানত বাবদ জমা রাখা টাকার ৫০% অবিলম্বে তাকে ফেরত প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
- ১৩৯ ধারার অনুমানের সীমা: চেক গ্রহীতার পক্ষে আইনগত অনুমান থাকলেও উপযুক্ত দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করে তা খণ্ডন করার পূর্ণ অধিকার আসামির রয়েছে।
- পূর্ববর্তী জিডির গ্রহণযোগ্যতা: চেক ডিসঅনার বা লিগ্যাল নোটিশ পাওয়ার পূর্বেই কৃত জিডি আসামির অসৎ উদ্দেশ্যহীনতাকে শক্তিশালীভাবে সমর্থন করে।
- প্রমাণের মানদণ্ড (Preponderance of Probabilities): দেওয়ানি ধরনের সম্ভাব্যতা (Probabilities) প্রমাণ করলেই এনআই অ্যাক্টের মামলায় আসামি খালাস পেতে পারে।
- চেক হারালে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ: কোনো চেক বা চেকবই নিখোঁজ হলে দেরি না করে একই দিনে নিকটস্থ থানায় বিস্তারিত জিডি করুন।
- ব্যাংকে লিখিত স্টপ পেমেন্ট: জিডির কপি সংযুক্ত করে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখায় লিখিত রিসিভ কপি সহকারে স্টপ পেমেন্ট ইনস্ট্রাকশন জমা দিন।
- ব্লাঙ্ক চেকে স্বাক্ষর নিষিদ্ধ: কখনো অগ্রিম স্বাক্ষরিত খালি চেক ড্রয়ারে বা ব্যবসায়িক সহযোগীর নিকট অরক্ষিত অবস্থায় রাখবেন না।
- লিগ্যাল নোটিশের জবাব প্রদান: ডিসঅনারের লিগ্যাল নোটিশ পেলে চুপ না থেকে জিডি ও স্টপ পেমেন্টের রেফারেন্স সহকারে আইনজীবীর মাধ্যমে সুস্পষ্ট জবাব পাঠান।
- আইনজীবীদের জন্য কৌশল: বিচারিক আদালতে জিডি বইয়ের রেকর্ড ও ব্যাংকের রেজিস্টার তলব (Summon) করে সাক্ষীর মাধ্যমে প্রদর্শনী (Exhibit) করান।

