বিয়ে বলবৎ থাকা অবস্থায় এবং কোনো বিবাহবিচ্ছেদ ছাড়া বিলম্বিত দেনমোহর দাবি অচল: হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক রায়: মুসলিম পারিবারিক আইন এবং হানাফি ফিকহের প্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী দেনমোহর দুই ভাগে বিভক্ত—আশু দেনমোহর (Prompt Dower) এবং বিলম্বিত দেনমোহর (Deferred Dower)। আশু দেনমোহর স্ত্রী যেকোনো সময় দাবি করতে পারেন এবং স্বামী তা পরিশোধে বাধ্য। কিন্তু কাবিননামায় যা সুস্পষ্টভাবে ‘বিলম্বিত’ হিসেবে উল্লেখিত রয়েছে, তা কেবলমাত্র বিবাহ বিচ্ছেদ (তালাক) ঘটিলে কিংবা স্বামীর মৃত্যু হলেই কেবল আদায়যোগ্য হয়। দাম্পত্য সম্পর্ক আইনত বলবৎ থাকাকালে স্ত্রী কখনোই বিলম্বিত দেনমোহর এককালীন পাওয়ার জন্য আদালতে ডিক্রি দাবি করতে পারেন না। তবে স্বামী বিবাহিত জীবনে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়মিত খোরপোশ প্রদানে নিঃশর্তভাবে বাধ্য।
বাদী মোসাম্মৎ সাবরিনা সুলতানার সাথে বিবাদী মো. তরিকুল ইসলামের ২০১৬ সালে মুসলিম শরিয়ত মোতাবেক ১০ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্যে বিবাহ সম্পন্ন হয়। কাবিননামার ১৬ নং কলাম অনুযায়ী ৫ লাখ টাকা আশু এবং অবশিষ্ট ৫ লাখ টাকা বিলম্বিত হিসেবে লিপিবদ্ধ ছিল। বিবাহের পর তাদের সংসারে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। পরবর্তীতে পারিবারিক মনোমালিন্যের কারণে স্ত্রী সন্তানসহ পিত্রালয়ে চলে যান।
স্ত্রী কোনো পক্ষ থেকেই তালাক কার্যকর না করে সরাসরি পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করে সম্পূর্ণ ১০ লাখ টাকা দেনমোহর এবং বিগত বকেয়াসহ সন্তানের ভরণপোষণ দাবি করেন। সহকারী জজ আদালত সম্পূর্ণ ১০ লাখ টাকা দেনমোহরের ডিক্রি দেন এবং জেলা জজ আদালত তা বহাল রাখেন। এর বিরুদ্ধে স্বামী হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করেন।
👤 স্বামীর আইনি অবস্থান
স্বামী কখনোই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাননি এবং স্ত্রীকে ঘরে তুলে নিতে প্রস্তুত আছেন। কাবিননামার শর্তে বিলম্বিত দেনমোহর বিবাহের অবসান না হওয়া পর্যন্ত অপরিশোধ্য। বিবাহ বলবৎ রেখে বিলম্বিত অংশের ডিক্রি দেওয়া আইনসম্মত নয়।
👥 স্ত্রীর আইনি অবস্থান
স্ত্রী দাবি করেন যে, স্বামী তাকে ভরণপোষণ না দিয়ে দীর্ঘদিন ফেলে রেখেছেন, কাজেই দেনমোহরের সম্পূর্ণ অর্থ একসাথে প্রদানের দায় স্বামীর তৈরি হয়েছে।
হাইকোর্ট বিভাগ লক্ষ্য করেন যে, সহকারী জজ ও জেলা জজ আদালত উভয়ই আশু ও বিলম্বিত মোহরানার মৌলিক আইনি পার্থক্য অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ অনুযায়ী আদালত শরিয়া আইনের মৌলিক বিধান লঙ্ঘন করে ডিক্রি জারি করতে পারেন না।
হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রখ্যাত প্রিভি কাউন্সিল নজির Hamira Bibi Vs. Zubaida Bibi (1916) 43 I.A. 294 এবং ডিএলআর নজির 48 DLR 456 ও 52 DLR 178 বিশ্লেষণ করে রায় দেন যে, বিলম্বিত মোহরানা হলো একটি শর্তসাপেক্ষ দায় যা দাম্পত্য বিচ্ছেদের পর ছাড়া পরিপক্ব (Mature) হয় না। তবে আশু দেনমোহর এবং সন্তানের মাসিক ভরণপোষণ সম্পূর্ণ আইনসঙ্গত এবং তা দ্রুত পরিশোধযোগ্য।
চূড়ান্ত রায়: সিভিল রিভিশন আংশিক মঞ্জুর করা হয়। বিলম্বিত দেনমোহরের ৫ লাখ টাকার ডিক্রি বাতিল করা হয়। তবে আশু দেনমোহরের ৫ লাখ টাকা এবং নাবালক সন্তানের মাসিক ৮ হাজার টাকা হারে খোরপোশের ডিক্রি সম্পূর্ণরূপে বহাল রাখা হয় এবং স্বামীকে দ্রুত তা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
- আশু বনাম বিলম্বিত মোহরানা: আশু দেনমোহর যে কোনো সময় তলবযোগ্য, কিন্তু বিলম্বিত দেনমোহর তলবের পূর্বশর্ত হলো বিবাহ বিচ্ছেদ বা মৃত্যু।
- সন্তানের ভরণপোষণ পিতা থেকে অবিচ্ছেদ্য: দাম্পত্য বিরোধ বা তালাক যাই হোক না কেন, সন্তানের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত ভরণপোষণ দেওয়া পিতার ধর্মীয় ও আইনি বাধ্যবাধকতা।
- কাবিননামার শর্তের পবিত্রতা: নিকাহনামার কলামে যা কিছু শর্ত হিসেবে স্বীকৃত তা চুক্তি আইনের মতোই উভয় পক্ষের ওপর সমানভাবে বাধ্যকর।
- কাবিননামা লেখার সময় সতর্কতা: বিয়ের সময় মোহরানার কত অংশ আশু এবং কত অংশ বিলম্বিত তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন।
- স্বামীর জন্য মোহরানার প্রমাণ: বিয়ের সময়েই স্বর্ণালংকার বা নগদ টাকা দিয়ে থাকলে তা কাবিননামার উসুল কলামে সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করান।
- সন্তানের খোরপোশে গড়িমসি নয়: দাম্পত্য দ্বন্দ্বের কারণে কখনো সন্তানের খোরপোশ বন্ধ করবেন না, নতুবা আদালতের কঠোর ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে।
- পারিবারিক আদালতের নতুন আইন ২০২৩: পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ অনুযায়ী এখন আপিল দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, তাই আইনি পরামর্শ নিন।
- আইনজীবীদের জন্য আর্জি রচনার টিপস: দেনমোহরের মামলায় বিবাহ বলবৎ আছে কি নেই তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে পৃথকভাবে প্রেয়ার করুন।

